অনির্বাণ ঘোষ

হ্যামলেটিয়

অনির্বাণ ঘোষ

‘শালি মাগি, শালী রেন্ডি’- কচি গলার ঝাঁঝালো স্বরে পরস্পর থেকে ছিটকে সরে যায় দুই শরীর। সংগমরত সাপের মত আষ্টেপৃষ্টে ছিল তারা।
চারদিকে শাল গাছের ছোট বন। মাঝে মাটি ফেলে একটু উঁচু করা জায়গায় কিছু নবীনতর গাছ মোটামুটি একমানুষ হাইটে কাটা। চারপাশে চায়না টগরের ঝোপ জায়গাটাকে একটু  গোপনীয়তা দিয়েছে। লক্ষ্য ছিল একটা চালা তুলে রাধামাধব জীউ-এর ছোটখাটো একটা মন্দির গড়া যেখানে একটু মজলিশি হরিনাম করা যায় নির্বিঘ্নে। অবশ্য তা হয়ে ওঠেনি। মাটি ফেলে সমান করে চায়না টগর-এর চারা লাগিয়েই একদিনের ম্যাসিভ স্ট্রোকে হঠাৎ করে চলে গেলেন এলাকার সাতপুরুষের জোতদার দীনু রায়। হরিনামের মজলিশ আর বসানো হল না দীনু রায়ের। তবে ছেলে ছোকরাদের মহফিল যে এখানে বসে সন্ধ্যের পর তার নমুনা এখানে ছড়ানো – ভাঙা বিয়ারের বোতল, চীপসের প্যাকেট, ব্যাবহৃত কন্ডোম, আরো টুকিটাকি। আর এই পাকস্থানের পবিত্রতা রক্ষা করে  অনাথের মত প্রকৃ্তির ধারাস্নানে পুষ্ট হয়ে বেড়ে ওঠা চায়না টগরের ঝোপ। কোথাও এক কোমর কোথাওবা এক হাঁটু। দু’এক জায়গায় ফাঁক। ওখান দিয়ে গেছে পায়ে চলা পথ। মানুষের গতি রুদ্ধ করে সাধ্যি কার!
সে পায়ে চলা পথেই চায়না টগরের ঝোপ পেরিয়ে দেবু মুখোমুখি শরীরী আখ্যানের এই দুই চরিত্রের। ধড়ফড়  করে উঠে দাঁড়ায়। মাধ্যাকর্ষণের টানে কমলির ওঠানো শাড়ি আর সাদেকের গোটানো লুঙ্গি যথাস্থানে নেমে আসে। সাদেকের উত্থিত লিঙ্গ ডালচাপা সাপের মতো নিষ্ফল আক্রোশে লুঙ্গি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চায়। কমলির তখনো-উন্মুক্ত বুক শুকনো পাতার টুকরো ও খড়কুটো মেখে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে একরত্তি দেবুর দিকে।

দেবু। বয়স আট। চন্ডিতলা নিম্ন অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃ্তীয় শ্রেণীর সবুজ নাম ডাকার খাতায় রোল নম্বর বারোর নামের জায়গায় গোটা গোটা হস্তাক্ষরে লেখা আছে দেবেন্দ্র নারায়ণ সিংহ। আজ দুপুরেই স্কুলে এসেছে। হুটোপুটি করে। সমস্বরে সবার সাথে চেঁচিয়ে পড়া করেছে মিড ডে মীলের সয়াবিন দেওয়া খিচুড়ি খেয়ে গেছে। শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে নতুন চিন্তা চেতনা এবং ভরপেট খিচুড়ি নিয়ে বাড়ির পথ ধরেছে সঠিক তিনটায়। হ্যাঁ এরকম চিন্তা চেতনার মতো কথাই তো বলেছিলেন হেড টীচার কালাচাঁদ প্রামাণিক। স্বাধীনতা দিবসের সকালে।
সেদিন তিরংগা উঠল। সমবেতভাবে বলা হল ‘জয়হিন্দ’। বন্দেমাতরম,  জনগণমন হলো । একটি ছেলের ভাষণ ছাত্রদের ফিসফাস এবং তারপরই আসলি স্বাধীনতা লাল নীল রঙের কাগজ মোড়া লজেন্স এর মিঠাসে যে আজাদী তার কাছে দুনিয়ার তাবৎ আজাদি ঝুটা হয়ে যায়।দেবুর চিন্তার উৎস ওর পেট; তার চেতনার চাবিকাঠি হল জিভ। জিভ আর পেট খুশ তো সব খুশ। দিল ভি খুশ জাহান ভি খুশ। পেটের আগ চেনে দেবু। মাঝে মাঝে ওর বাপু যখন টাকা পাঠাতে দেরি করে তখন পেটের আগ জ্বলে। এ আগ এমন যাতে ধুঁয়া নেই। তবু খুব জ্বলে। ওর মা বাকীতে একটু চাওল আর একটু আলু সাউজির মুদীর দোকান থেকে এনে সেই কদিন চালায়। তাতে চিন্তার আগ তো মেটে কিন্তু চেতনার মাপকাঠিতে উৎরোয় না।
আরেক রকম আগের কথা শুনেছে দেবু। নিতাই এর চায়ের দোকানের টিভিতে সালমানের সিনেমা দেখতে গিয়ে। এই আগ লাগলে হিরোর গা ঘেঁষে এঁকেবেঁকে হিরোইনি বারিসে ভিজে নাচে। ঠিক বোঝে না দেব তবে এসব আগুন লাগলে নাচের সময় জোয়ান থেকে বুডঢা সবার চোখ ড্যাবড্যাবে হয়ে যায় আর ঘন ঘন টান মারে বিড়িতে। কেউ কেউ আবার অজান্তে হাজার মলম এর অ্যাড এর মত দুপায়ের ফাঁকে অথবা কুঁচকিতে অজান্তে খুজলে নেয়।
এ আগুন চেনে কমলি। মাঝে মাঝে তাড়িত করে তাকে। তখন সারা শরীরে জ্বলন। ঘটি ঘটি জল ঢেলেও যখন নেভে না তখন পুকুরে ডুব দিতে যায়। পুকুরের কালো শীতল জল কিছুটা উত্তাপ শুষে নিলেও তার হৃদয়ের কাঁপন কমে না। শরীরের ব্যথা আরো উন্মুখ হয়ে ওঠে। সে পিষ্ট হতে চায় বিদ্ধ হতে চায়। বুক ধড়ফড় করে। অসহ্য লাগে। সারা বছর প্রতীক্ষার প্রহর গুনে মোবাইলে আলাপ খুব বেশি জমে না। ফিসফিস রসের কথা মোবাইলের ক্যাচার দিয়ে ইথার বাহিত হয়ে কয়েকশো মাইল দূরে পৌঁছাতে সময় নেয় না বটে তবে তার দৃশ্যহীনতা আবেগের মাত্রা অনেকটাই কমিয়ে দেয়।

রঞ্জিত সালভর দিল্লিতে থাকে। রিকশা চালায় । মাঘের জাড় যখন কুয়াশার কম্বল ওড়ে, যখন কুলিকের জল থেকে ধুঁয়া ওঠে,  রাজ্য সড়কে পিকনিক পার্টির হুল্লোড় শুরু হয়, যখন মিশন মাঠ নবজাতক যীশুকে বরণ করার জন্য বাহারি মরশুমি ফুলে সেজে ওঠে, রঞ্জিত আসে হপ্তা দু’- তিনেকের জন্য। ওখানে নাকি ধান্দায় মন্দা এই সময়। ঠাণ্ডা আর ধোঁয়াশায় সওয়ারীও কম।
দিল্লি বোলে তো দিলকি নগরী। কিন্তু দিল্লিতে খাটতে যাবার পর থেকে রঞ্জিত কেমন যেন বেদিল হয়ে পড়েছে। যে কদিন থাকে ওকে ছিঁড়ে খুঁড়ে খায়। দু একটা পেয়ার মহব্বতের কথা বলবারও ফুরসত নেই। ক্রাশারের নিচে পরা পাথরের মত পিষতে থাকে। ভুক তো মেটে শরীরের কিন্তু মনের পেয়াস সেটা বুজায় কে!  শীতের শুকনো কুলিক এর মত তা বইতে থাকে তির তির। তাও নিজেরই অজান্তে ওর ঠোঁটে খেলে যায় একটা শান্তির হাসি। দিল্লিতে রঞ্জিত অন্তত অন্য কোন বাধা আওরাতের খপ্পরে পড়ে নি। দুই তিন হপ্তা যে থাকে সারা শরীরে ব্যথা ধরে যায়। দু পায়ের মাঝে রোমাঞ্চ কুহক। শিরশিরানি সারা শরীরজুড়ে তখন। তলপেট অবশ হয়ে আসে। কোমরে চাপ ব্যথা রেখে যায়। মনে রেখে যায় শরীরী সুখের যাপন মালা। রভসে দাউ দাউ শরীর কিছুটা হলেও প্রশমিত হয়ে আসে। জ্বালা জুড়ায় । অবশ ব্যথা রেখে যায়। কিন্তু মন!  মনের গহীন নিস্তরঙ্গে ঘাই মারে না কেউ। আর শরীর সেও তো অভুক্ত বছরভর।

এরকম বছরের অভুক্ত দিনগুলোর কোন একটিতে বৃষ্টিস্নাত কোন তৃষ্ণার্ত দুপুরেই ভিজে লতপত এসেছিল সাদেক। গা মাথা দিয়ে জল পড়ছে টপ টপ। ভিজে গামছা লেপ্টে আছে শরীরে। পুরুষাঙ্গের অবস্থান স্পষ্ট। অবশ্য সেসব কিছুই চোখে পড়েনি কমলির। মানসিক অবস্থা ছিল না। ওর নজর ছিল সাদেকের হাতে ধরা আপাদ-মস্তক ভেজা দেবুর দিকে । কিছুটা ম্রিয়মাণ কিন্তু চোখে অনাগত অথচ প্রায় সম্ভাব্য বিপদের ইঙ্গিত। অপর হাতে ধরা দেবুর স্কুল ব্যাগ। দেখে চিলের মতো ছুটে ছোঁ মেরে কোলে তুলে নেয় কমলি। একতরফা প্রশ্নবাণ ও মায়ের সোহাগ। দেবু উত্তর দিতে গিয়েও দিতে পারে না। সাদেক  উদ্ধার করে দেবুকে কমলির প্রশ্নের গুঁতো থেকে। পুরুষালী সংক্ষিপ্ততায় জানায় কিভাবে খরস্রোতা ক্যানেলের জল থেকে তুলে এনেছে দেবু কে। শাড়ির পল্লু দিয়ে পরম মমতায় গা মাথা মুছিয়ে দেয় কমলি। সাদেক দাঁড়িয়ে থাকে বুঝে পায়না ওদের চাটাইয়ের ঘরের কোথায় রাখবে সে দেবুর ভেজা ব্যাগ। ব্যাগ থেকে চুঁইয়ে জলবিন্দুরা ওদের রাফঢালাই মেঝের ওপর ডিকন্সট্রাকশন এর আলপনা তৈরি করে চলে। কমলি দেবুর পোশাক পাল্টে খাটের তলা র ট্রাঙ্ক থেকে রঞ্জিতের একটা লুঙ্গি বের করে সাদেকের দিকে এগিয়ে দেয়। ইশারায় কলতলা দেখিয়ে বলে চায়ে পিয়ে যাবা। বলে ঘরের লাগোয়া চাটাই ঘেরা জায়গাটায় যায় গ্যাস স্টোভ জ্বেলে জল চাপায়। নিমেষেই গ্যাসের গুণে কি ওর হাতের গুণে  চা আর দুটো বিস্কুট নিয়ে ঘরে এসে দেখে সাদেক আর দেবু উবু হয়ে জল চুপচুপে ব্যাগ থেকে বের করে ঘরের মেঝের ওপর মেলে দিচ্ছে দেবুর স্কুলের বই ও খাতা। সাদেকের বই বিছানোর মধ্যে কেমন একটা অপত্য স্নেহ ছিল। বেশ খানিকটা মায়াভরা। ভালো লেগেছিল কমলির। পরে জেনেছিল সাদেক নয় ক্লাসের পর আর পড়াশোনা করতে পারেনি । রাজমিস্ত্রির সাথে জনের কাজ করে। ইচ্ছা রাজমিস্ত্রির কাজ শিখবে কোনদিন। কমলি হাত বাড়িয়ে চা দেয় সাদেককে। সাদেক চা খায় আর কমলি নৈশব্দ কাটায় নটখট দেবুর কীর্তিকলাপ আর ওর বাপের দিল্লিতে থাকা নিয়ে। চায়ের কাপের দিকে নজর নামিয়ে মাথা নাড়ায় সাদেক। কমলি নাম-পতা পুছতে মুখ তোলে ও। পাশের বস্তিতেই ঘর ভাড়া ওর। নাম সাদেক শুনেই কমলির মুখে যে বিপন্নতা ও চোখে বিহ্বলতা  ফোটে তা নজর এড়ায় না সাদেকের। ঘন দুধ কড়া চিনি দেওয়া স্বাদু চা বিস্বাদ লাগে ওর। চায়ের শেষটুকু এক ঢোকে মেরে দিয়ে ডিশের ওপর কাপ রাখতে গিয়ে যেন একটু বেশিই শব্দ হয়। নিজেরই কানে বাজে ওর । 

তার  কেটে যাওয়ার ছিল ওখানেই। কিন্তু কি করে যে তা জুড়ে গেল,  বাঁধন মজবুত হল তা মনে করতে পারে না কমলি। সকাল সকাল বাড়ির সামনের উঠান  ঝাড়ু পোঁছা করার সময় কাজে যেত সাদেক। চোখে চোখ পড়লে বোকা একটা হাসি দিত । তাতে শুরুতে শুরুতে  পিত্তি জ্বলে যেতো কমলির তবুও পাল্টা হাসি দিতে হতো ওকে। সেদিন ও না থাকলে আজ দেবু থাকতো না।
এর পর আনা-গোনা বাড়তে থাকে সাদেকের অথচ এ পথে ওকে আগে দেখেনি কমলি । তারপর রাস্তা পেরিয়ে উঠান। উঠান পেরিয়ে দরমার বেড়ার ঘরে ঢুকে পড়ে । আর ছড়াতে থাকে বদনামি। শীতের তখন বেশ খানিক বাকি । পুজোর শুরুর দিকেই বাড়ি ফেরে রঞ্জিত। বিছানায় চিৎ হয়ে পড়ে থাকা নিথর নিস্পন্দ নিষ্কাম কমলির অর্গলহীন শরীর বড়ই ঠাণ্ডা ঠেকে তার।  কমলির শরীরে তার আসমুদ্র সেঁচা পৌরুষ ঢেলে রমণক্লান্ত রঞ্জিত হাঁফাতে হাঁফাতে বলে প্যার হ্যায় মুঝসে? মাথা নাড়ায় কমলি। ধোঁকা দিয়া তো জান সে যায়েগী। রঞ্জিত ডানহাতের পাঞ্জা দিয়ে গলার মাপ নেয় কমলির। গলায় আলতো চাপ দেয়। কমলির ঠোঁট ফুটে ওঠে লিঙ্গবাদ অগ্রাহ্য করা ছিনাল হাসি। ঝটতি রঞ্জিতের হাত গলা থেকে সরিয়ে ওকে ওর ওপর থেকে ঝেড়ে ফেলে সে। চড়ে বসে সে চিৎ হয়ে পড়া রঞ্জিতের ওপর। শুরু হয় বিপরীত রতিক্রিয়া। রঞ্জিত ঝিমিয়ে যেতে যেতে আবার  জেগে ওঠে। কমলি ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলায়।

শেষবারের মতো  কমলিকে শাসিয়ে ৭টা ১০ এর দিল্লি গামী সীমাঞ্চল এক্সপ্রেসের ঠাসাঠাসি জেনারেল কামরায় উঠে বসলো রঞ্জিত। সাদেক এর কল এল ঠিক ৮টায়। দীর্ঘ অদর্শনজনিত দিলের ধড়কন বুক ধড়ফড় শ্বাসের ওঠাপড়া ইথারবাহিত হয়ে কমলির কাছে এল। গলায় চরম উৎকন্ঠা। সে রাতেই এসেছিল সাদেক যেমন আগে  মাঝে মাঝেই আসতো।ওর বাড়ির দরজায় সাদেকের অধৈর্য কড়া নাড়া খুব উপভোগ করত। কমলি শব্দহীন পায়ে বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে দরজা খুলে নিজেকে উন্মুক্ত করে দিত সাদেকের কাছে। সাদেকের শরীরী গন্ধ, ঠোঁটের স্বাদ মাতাল করে দিত ওকে। সংসার সমাজ পরিবার সবকিছু ভুলে সাদেকে জুড়িয়ে যেত কমলি। ওই কটা মুহূর্ত ওর কাছে একটা আদিগন্ত প্রসারী উন্মুক্ত আকাশের সূচনা করত যা তাদের বৈবাহিক সম্পর্কের ক্লেদ মুছে দিত লহমায়।একবার বলেওছিল ও সাদেককে,  চল পালিয়ে যাই সাদেক এক মুহূর্তের জন্য হলেও থমকে গিয়েছিল কিছু বলেনি পরদিন বলে ছিল – রাজি।রাজি ছিল সাথে দেবুকে নিতেও। কমলি শেষমেষ হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। মাঝরাতে মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙ্গে যায় কমলির। নিঃসাড়ে ঘুমায় দেবু। ঘুমন্ত দেবুর শরীরে হাত রাখে ও। ওর শরীরে বইছে রঞ্জিতের বদমেজাজী রক্ত। এমনিতেই দেবু বাপ নেওটা। বাপ ছেড়ে ওর সাথে কখনই যাবেনা সে। আর সাদেককে বাপ বলে স্বীকার করা তো দূর অস্ত। হালে আবার সাদেকের একটা বাই চেপেছে। মাঝে মাঝে বলে নিকে করবে। কমলির  ইচ্ছে করে এক ছুটে সবকিছু পেছনে ফেলে সাদেক এর সাথে অনেক দূরে কোথাও হারিয়ে যায়। মনে প্রাণে চায় তবু পারে না।

সেদিন সাদেকের ডাকে সাড়া দিয়ে গিয়েছিল দীনু রায়ের গাছগাছালি ঘেরা জমিতে। ভরদুপুরে এদিকটাতে লোকজনের চলাচল প্রায় না বরাবর। হাঁটা পথ ছেড়ে শালবন পেরিয়ে আসতে হয় এখানে।দেবুরও মিডডে মিল খেয়ে ফিরতে তাও ঘন্টাখানেক আরো দেরী। ওখানে পৌঁছাতেই  হঠাৎ করে পেছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরলো সাদেক কমলিকে। হাতের হলুদ প্যাকেট থেকে বের করল কমলা সবুজ একটা শাড়ি। জড়িয়ে ধরল ওর মাথার উপর ঘোমটার আদলে। বলল, আমার বিবি। কমলি লাজুক হাসি হেসে উঠতেই ওর মুখের সামনে তুলে ধরল লাল টুকটুকে একটা আপেল। কমলি তখন হবার মত ছোট্ট কামড়ে এক খাবলায় তুলে নিল নিষিদ্ধ আপেলের একটু অংশ। আপেলের লালিমার  থেকে উঁকি দিল সাদা শাঁস। ছাপ রেখে গেল কমলির দাঁতের। নিজেকে বিছিয়ে দিল সে সাদেকের জন্য ঝোপের আড়ে। সাদেকের সর্পিল বাঁধনে যখন আনন্দের চরম সীমায় কমলি তখনি দেবু চলে এসেছিল। ওর শাসানি তে ঘোর কাটে কমলি আর সাদেকের। সাদেক ওকে বোঝাতেই গেছিলো। কোথা থেকে কি যে হয়ে গেল। দেবু অসহ্য রাগে ক্ষোভে চীৎকারে ফেটে পড়লো। সাদেক ওকে জাপ্টে ধরে ওর মুখে গুঁজে দিল ওর কোমরের গামছা – যতটা পারে। ওর চীৎকার গোঙানিতে পরিণত হলে সাদেক মিষ্টি কথায় কিছু বোঝাতে গেল। দেবুর পা দাপানো বেড়ে গেছিল তাতে আরো। সাদেকের ময়াল বাঁধনে কখন যে শিথিল শীতল হয়ে এসেছিল দেবু সাদেক টের পায় নি। স্থবির পাথরপ্রতিমা কমলি যখন ছুটে এসে দেবুকে সাদেকের বাঁধন থেকে ছাড়ালো তখন সব শেষ।

পরের সব ঘটনা ঘোরের মধ্যে কেটে গেছে। পরদিন প্রতিবেশীরা খুঁজে পায় দেবুর ঝুলন্ত দেহ। গাছের ডাল থেকে নতুন শাড়িতে জড়িয়ে ঝুলছিল। নিচে পড়েছিল আধখাওয়া আপেল। স্থানীয় কাগজের পাতা জুড়ে দিনকয়েক কাপালিক, শবসাধনা আর নরবলির কচকচি।

কদিন পর যখন পুলিশ ভ্যানে উঠছিল কমলি মাথাটা একটু টলে গিয়েছিল ওর। পাশে দাড়ানো মহিলা সিভিক না ধরলে হয়তো পড়েই যেত। কেসের আই ও গোঁফে সদ্য পাক ধরা সোমেন শিকদার তার অভ্যস্ত চোখে বুঝে নিলেন অভিযুক্ত তার নার্ভ ফেল করল। শুধু কমলিই টের পেল ওর শরীরে অনাগত প্রাণের স্পন্দন।

(পূর্ব প্রকাশিত)

32