শৌভিক রায়

ডুয়ার্স ভ্রমণ লেগে থাকে সারা বছর। তবু আশ মেটে না। আসলে সেটা মিটবার নয়। কেননা শুধু অসামান্য প্রকৃতিই তো নয়, ডুয়ার্সে লুকিয়ে নানা মনিমুক্ত। কুড়িয়ে নিতে জানলে সেই সংগ্রহ এক জীবনে শেষ হবে না। 

এই লেখাতে মূলত আলিপুরদুয়ার জেলার কিছু অংশ বিবৃত। তবে একটানা লেখা নয়। যখন মনে হয়েছে, লিখেছি। তাই আলাদা আলাদা টাইটেলে ভাগ করা আমার নানা দেখা ও অনুভব। পড়তে গিয়ে হয়ত ছন্দ কাটবে। তাই ক্ষমা চাইছি আগেই…

।। ডুয়ার্সে বৃষ্টি।।

নদী কাঁদলে বুঝি তার বুকে এভাবেই জল বয়ে যায়! 

দাঁড়িয়ে আছি পানা নদীর কাছে। উত্তরের মোহিনী এই ডুয়ার্সে কত যে নদী জানা-অজানা! কিছু নদী নাম পেয়েছে, কিছু নামহীন। অবশ্য মহাকবি বলেছেন যে, নামে কী আর যায় আসে! 

সত্যি হয়তো কিছু যায় আসে না। আবার অনেক সময় আসতে যেতেও পারে। যেমন ধরা যাক কালজানি নদীর কথা। আলিপুরদুয়ার-কোচবিহার জেলার এই নদী কিন্তু বেশ পরিচিত। ভুটানের ডুঙ্গিনাতে উৎপত্তি স্থল এই নদীর। ১৮৯৫ সালে সান্ডার সাহেব কিন্তু এই নদীকে আলাইকুমরী নামে চিহ্নিত করেছিলেন। ডিমা আর আলাইকুমরী মিশে সৃষ্টি হয়েছে কালজানি। কালজানি বলতে বোঝায় করোয়া জানি। তরাই-ডুয়ার্সের চা-বাগানগুলির নিজস্ব ভাষা হয়ে যাওয়া সাদরিতে ‘করোয়া’ মানে কালো আর ‘জানি’ মানে বউ, অর্থাৎ কালজানি মানে কালো বউ। ভাবতেই বেশ লাগে! কী সুন্দর এই নামকরণ! 

ডুয়ার্সের  জনজাতি সমাজকে দু`ভাগে যদি ভাগ করি তবে  দেখব যে, সাদা বা ফর্সা রঙের জনজাতি মানুষের রয়েছেন পাশাপাশি কালো জনজাতির মানুষেরা। এই কালো জনজাতির মানুষদের আনা হয়েছিল ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে। প্রাচীন জনপদ কালচিনিকে ঘিরে এতো যে চা-বাগান তা প্রতিষ্ঠার পেছনে এই কালো মানুষগুলির অবদান কিন্তু ভুলবার নয়। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে, কালজানি নামের মধ্যে দিয়ে সেই মানুষগুলিকে, বিশেষ করে নারী সম্প্রদায়কে, স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, কালজানি শব্দটি থেকেই কিন্তু এসেছে কালচিনি। ডুয়ার্সের প্রাচীন এই জনপদ আর তার পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদী কালজানির এহেন সম্পর্কে কখনও কখনও মনে হয় যে, নাঃ নামে বোধহয় কিছু যায় আসে!

ধান ভানতে শিবের গীত শেষ করি এবার। পানার কাছে এসেছি সেন্ট্রাল ডুয়ার্স টি এস্টেটে পার করে। ইংরেজিতে ‘untrodden’ বললে যা বোঝায়, আক্ষরিক অর্থেই বোধহয় এই জায়গাটি ঠিক সেরকম। বলছি ছিপছিপির কথা।

ছিপছিপি

নামটা বেশ মজাদার। কালচিনি রেলগেট পার হয়ে উত্তর পথে সোজা এগোলে চুয়াপাড়া চা-বাগান। সে বাগান আসবার আগে ডানহাতে চলে গেছে রায়মাটাং যাওয়ার পথ। চুয়াপাড়া পার ক’রে খানিক এগিয়ে অরণ্য চিরে সোজা এগোলে সেন্ট্রাল ডুয়ার্স টি এস্টেট। ঝকঝকে চেহারার এই চা-বাগান খানিকটা উঁচুতে, পাহাড়ের ঢালে। ঝকঝকে সেন্ট্রাল ডুয়ার্স টি এস্টেটকে অদ্ভুতভাবে ঘিরে রেখেছে পানা নদী। বাগানের একদিকে পানার ওপারে ভুটানের পাশাখা। আর একদিকে মিষ্টি ছিপছিপি।

সেন্ট্রাল ডুয়ার্স টি এস্টেট

নদীর ওপারে সবুজ পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে মেঘ। মেঘের গায়েও মন খারাপের বৃষ্টি। ঝিরঝিরি কেঁদে ফেলছে সে নিজেও কখনও। পানা বইছে শব্দ করে কাঁদতে কাঁদতে। আর পানার তীরের সবুজ অরণ্যও যেন নদীর বেদনায় নিজেদের অশ্রু ফেলছে।

পাশাখা

ওরা সবাই জানে যে, বৃষ্টিই  আসলে চোখের জল মুছিয়ে দেয়। আর কেউ নয়।  

ডুয়ার্সে তাই বৃষ্টি ঝরে, অদ্ভুত বৃষ্টি ঝরে….

122