বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

সেলিনা হোসেনের গল্পে প্রবেশের আগে দুটি প্রশ্ন উত্থাপন করে যেতে চাই। প্রশ্ন দুটি ইলিয়াসের ডায়েরির ১১০ নং পৃষ্ঠা থেকে।  ইলিয়াস লিখছেন -১. ‘বাংলাদেশের সাহিত্যকে আলাদাভাবে পড়ানো হচ্ছে কেন ?’ ২. ‘বাংলাদেশের সাহিত্য ও বাঙালি মুসলমানের সাহিত্য’। প্রশ্ন দুটি সঙ্গত। সঙ্গত একারণেই ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, ওয়াল্লীউল্লাহ বা সেলিনা হোসেন যাই বলি না কেন তাঁকে আমি বাংলা ভাষার কথাকার হিসেবে ভাবি। দেশ আলাদা হলেই ভাষা আলাদা হতে পারে না। ইংল্যান্ডে বসে দীপেন ভট্টাচার্য যখন কল্পবিজ্ঞান লেখেন তখন তো বলি না তা ইংল্যান্ডের সাহিত্য ! তাঁদের প্রেক্ষাপট , ভূগোল, প্রত্যক্ষ দেখা বাংলাদেশ বলে তা বাংলাদেশের সাহিত্য বলে দেগে দেওয়ার কোন কারণ নেই, তা বাংলা ভাষার সাহিত্য। দ্বিতীয় জিজ্ঞাসা হল ওপার বাংলার মুসলিমকে আমি বাঙালি মুসলিম বলতে চাই। লেখকের বড় হয়ে ওঠা সেই মুসলিম ঘরে, চোখের সামনে সেই বিরাট জনজাতি ফলে গল্প উপন্যাসে সেই জনজাতি উঠে এসেছে। খ্রিস্টান লেখকের লেখায় খ্রিস্টান মানুষই আসবে, তেলেগু লেখকের লেখায় তেলেগু জনজীবনই আসা স্বাভাবিক। ফলে সেইসব লেখকের লেখায় মুসলিম জনজাতির কথাই উঠে আসা স্বাভাবিক। আর সেই জনজাতি বাঙালি মুসলিম জনজাতি। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দুটি দেশ ভাগ হয়ে গেল। সংখ্যাগুরু জাতির সংস্কৃতিই দেশের সংস্কৃতি হয়ে উঠল। সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি আমরা রাখলাম বটে কিন্তু মনে মনে শুরু হল সংখ্যালঘুর শোষণ। সংখ্যালঘুর সংস্কৃতিকে নিজের সংস্কৃতি বলে মেনে নিতে পারলাম না। মনে মনে বিরোধী মানসিকতা বড় হয়ে উঠল। সংগত প্রশ্ন তুলেছেন নীরদচন্দ্র চৌধুরী ‘হিন্দু মুসলমান বিরোধের গোড়ার কথা’ প্রবন্ধে –

‘’ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলমান বিরোধের মূলেও আছে এই স্বাতন্ত্র্য-ভোগের ইচ্ছা। অবশ্য মনে রাখা প্রয়োজন এই স্বাতন্ত্র্য কোন ব্যক্তিবেশেষের নয়, দুইটি বিরাট সম্প্রদায়ের। আজ জাতীয় জীবনের যে-কোন ক্ষেত্রই ধরি না কেন, তাহাতে সব চেয়ে বড় যে জিনিসটা পাই তাহা হিন্দুর হিন্দুত্ব ও মুসলমানের মুসলমানত্ব বজায় রাখিবার ইচ্ছা। হিন্দুরা অবশ্য এ-কথা স্বীকার করেন না। তাঁহারা বলেন, তাঁহারা যে আদর্শ ধরিয়াছেন উহা জাতীয় আদর্শ, মুসলমানরা বিদেশ হইতে গৃহীত আদর্শের মোহে আচ্ছন্ন রহিয়াছেন বলিয়াই ভারতবর্ষকে চিনিতে পারিতেছেন না। কিন্তু এই কথা বলিলেই বিবাদ ঘটিবে না। যে রীতিনীতি, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে মুসলমানরা ধরিয়া আছেন, বিদেশীই হউক কিংবা স্বদেশীই হউক তাহাকে তাঁহারা নিজস্ব বলিয়া মনে করেন। সহস্র যুক্তিতেও তাঁহারা এই আদর্শকে ছাড়িয়া অন্য আদর্শ অবলম্বন করিবেন না। পক্ষান্তরে হিন্দুরাও নিজেদের আচার-ব্যবহার ও সংস্কৃতির ঐতিহাসিক ধারা বজায় রাখিতে বদ্ধপরিকর। ইহাই হিন্দু-মুসলমান বিরোধের একেবারে গোড়ার কথা।‘’ ( আমার দেশ আমার শতক, মিত্র ও ঘোষ, পৃ. ২৩)

‘মতিজানের মেয়েরা’ গল্পে সেলিনা হোসেন প্রবল নারীবাদীচেতনা নিয়ে উপস্থিত হলেন। এক মুসলিম নারীকে পরিবার ও সমাজের অন্তঃরাল থেকে বাইরে নিয়ে এলেন। রোকেয়া যে নারী স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করেছিলেন তা মুসলিম নারী কখনোই পায়নি। সামাজিক ও ধর্মীয় নিষ্পেষণে মুসলিম নারীকে বারেবারে শোষিত হতে হয়েছে। সেই শোষণমুক্তির ভাষ্যই লেখিকা রচনা করেছেন এ গল্পে মতিজানের মধ্য দিয়ে। আবুলের সঙ্গে বিবাহ হয় মতিজানের। সংসারে স্বামী ছাড়াও রয়েছে শাশুড়ি গুলনূর। এ সংসারে গুলনুরই প্রধান। নারী হয়েও সে শোষণ করেছে এক নারীকে। আর এই গুলনূরের বিরুদ্ধে প্রতি পদক্ষেপে লড়াই করতে হয়েছে মতিজানকে। পণের টাকা থেকে শুরু করে ঠিক মত খেতে না দেওয়া, খিস্তি খেউড় , স্বামীর প্রহার সবই সহ্য করতে হয়েছে। সেখান থেকে সে অবকাশ পেয়েছিল পুকুর থেকে বাসন মাজার উপায়ে। ফলে আজ মতিজান বাসন মাজা বা বাজার সদাইয়ের নাম করে অনেকটা সময় কাটিয়ে আসতে পারে। সেখানে সখ্য ঘটে বালক বুধে ও যুবক লোকমানের সঙ্গে। এবার শাশুড়ি গঞ্জনা দেয় সন্তান প্রসব নিয়ে। মতিজানকে জানিয়ে দেয় সন্তান প্রসব না হলে পুত্রের আবার বিবাহ দেবেন , এমনকি মতিজানকে ‘বাজা’ বলতেও দ্বিধা করেন না। কিন্তু যৌন সংসর্গে কে ব্যর্থ তা নিয়ে খোঁজ নেন না তিনি। এবার মতিজান লোকমানের সঙ্গে যৌন সংসর্গ করে সন্তান ধারণ করেন কিন্তু শাশুড়ি জানায় পুত্র সন্তান না হলে বাড়ি থেকে বের করে দেবেন। আজ আর মতিজান পাত্তা দেয় না শাশুড়িকে। জন্ম দেয় কন্যা সন্তান, ফলে শাশুড়ির গঞ্জনা আসে, সে আরও জেদি হয়ে দ্বিতীয় কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়। এই কন্যা সন্তানের জন্ম মেনে নিতে পারেনা শাশুড়ি, ফলে বাড়ি থেকে বিতাড়িত করে দিতে চেয়েছে। যখন কোলাহলে গ্রামের মানুষ উপস্থিত হয়েছে, মতিজান ও গুলনূরের প্রবল ঝগড়া চলছে তখনই মতিজানের কন্যারা মানুষের দিকে তাকিয়েছে জ্বলজ্বল চোখে।

        মতিজানকে লেখিকা বড় শক্ত করে এঁকেছেন। সে জানে এ সমাজে আঘাত পেলে প্রতিঘাত ফিরিয়ে দিতে হয়। নয়ত এ সমাজে বাঁচা সম্ভব নয়। প্রথমে মতিজান সব সহ্য করলেও পরে প্রতিবাদী হয়েছে। লেখিকা মতিজান চরিত্রের পর্বে পর্বে বিন্যাস করে দেখিয়েছেন একটি সাধারণ নারী কখন প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। অবস্থাই আজ মতিজানকে এ পথে নিয়ে এসেছে –“শাশুড়ির মুখের সামনে মতিজান মেয়েকে নাচায়, দোলায় এবং গান গেয়ে ঘুম পাড়ায়। মতিজানের এই আনন্দ সহ্য হয় না গুলনূরের। সে মারমুখী হিংস্র হয়ে ওঠে। মতিজান ভেতরে ভেতরে শক্ত হয়ে বলে আমি পারলে শত মেয়ের জন্ম দিতাম। এখন ও আর চুপ করে থাকে না। তারস্বরে কথার জবাব দেয়, ঝগড়া করে। গুলনূর আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ইদানীং আবুল ঘরে একরকম ফিরেই না। মতিজান শুনেছে রসুইকে ছেড়ে দিয়ে ও আর একজনের সঙ্গে জুটেছে। ওর এখন ব্যস্ত সময় কাটে। মতিজানের জেদ হয়।“ (মতিজানের মেয়েরা ও অন্যান্য গল্প, সম্পাদনা অগ্নি রায়, ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, প্রথম প্রকাশ ২০১৩, পৃ. ১২৬ ) এই সমাজই মতিজানকে প্রতিবাদী করে তুলেছে। সেও বুঝেছে এই সমাজে নিজের কন্যাদের কীভাবে মানুষ করতে হবে। লেখিকা একটি বাক্য বারবার ধ্বনিত করেছেন –‘দিন তো গড়াবেই, দিনের নিয়ম’ , আসলে নতুন দিনের উষালগ্নে তিনি নারীদের নিয়ে যেতে চান। যেখানে শোষণহীন এক সুস্থ সমাজ গড়ে উঠবে, সে সমাজের অধিকারী হয়ত হবে মতিজানের মেয়েরা !

                    জীবনে বেঁচে থাকতে নারীকে নানাভাবে সংগ্রাম করতে হয়, আর তা যদি মুসলিম নিম্নবিত্ত নারী হয় তবে সংগ্রাম আরও ভয়ংকর। জীবনের রন্ধে রন্ধে বেঁচে থাকার যে সংগ্রাম তাই দেখিয়েছেন সেলিনা হোসেন ‘মইরম জানে না ধর্ষণ কি’ গল্পে। রবীন্দ্রনাথের ‘শাস্তি’ গল্পের সমাপ্তি ঘটেছিল চন্দ্ররার আক্ষেপ ‘মরণ’ শব্দ দিয়ে। এ গল্পের সমাপ্তিও ঘটেছে ‘মরণ’ শব্দ দিয়ে। তবে রবীন্দ্রনাথ একবারই মাত্র শব্দটি ব্যহবার করলেও সেলিনা হোসেন বরবার ব্যবহার করেছেন। রবীন্দ্রনাথ যেখানে অভিমানের বিস্ফরণ ঘটিয়েছেন শব্দটির মধ্য দিয়ে সেখানে সেলিনা হোসেনের নারী শোষিত হয়েছে ইচ্ছার বিরুদ্ধে, ফলে এই শব্দটি ব্যবহার করে গল্পের ভিন্ন ভাষ্য রচনা করেছেন। সাকিনার সন্তান মইরম, স্বামীহীন সংসারে অভাব সদা বর্তমান। ইতিমধ্যেই কন্যা বড় হয়েছে, এমনকি কন্যার সঙ্গে ভাব হয়েছে জসিমের। জসিম ভূমিহীন এক মানুষ, তাঁকে পছন্দ সাকিনার কিন্তু ভূমি ছাড়া কীভাবে সংসার গড়ে উঠবে ? এই পরিস্তিতে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয় মইরমকে।সত্তর বছরের নূরালী হাওলাদার চারটি বিবাহ করলেও সন্তান জন্ম দিতে পারেনি। সে বিবাহের প্রস্তাব দেয় মইরমকে, এমনকি এও জানায় সন্তান জন্ম দিতে পারলে জমি দেবে মইরমকে। এই সুযোগকে কাজে লাগায় সাকিনা ও জসিম। কিন্তু মইরমের ইচ্ছাকে কেউ পাত্তা দেয়নি, আর অভাবের সংসারে মইরমের কোনো স্বাধীনতা ছিল না। তাঁকে ভোগ করেছে জসিম, তবে বিবাহ করতেও রাজি হয়েছে। কিন্তু শুধু জমির জন্য প্রেমিকাকে তুলে দিয়েছে নূরালী হাওলাদারের হাতে। জসিমের যৌন সংসর্গেই  সন্তান পেটে আসে, কিন্তু নূরালীও স্পর্শ করেছিল। কিন্তু নূরালীর যে ক্ষমতা হারিয়ে গেছে তা গল্পপাঠক জানে। আজ জমি পেয়েছে মইরম, নতুন করে ঘর শুরু করেছে জসিমের সঙ্গে কিন্তু সেই আনন্দ, উৎসাহ আর কিছুই নেই। ছোটবেলা থেকেই মইরম জেনে এসেছে মেয়ে মানুষের কোনো মূল্য নেই কিন্তু বংশ রক্ষার জন্য মেয়ে মানুষের কাছেই মাথানত করতে হয়েছে বলে সে খুশি। লেখক জসিম ও মইরমের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণে জোড় দিয়েছেন –

“আবার প্রাণ খুলে হাসতে থাকে মইরম। জসিম হাসতে পারে না। শক্ত হয়ে যায় বুকের পাটাতন। ও বুঝে যায় মইরমের কেন এত দাম। নূরালী হাওলাদার মইরমের কাছে ছেলে চায়। আর ও নিজে মইরমের কাছে জমি চায়। যে জমি ওকে দেবে বলে নূরালী কথা দিয়েছে। জসিমের বিশ্বাস নূরালী কথা রাখবে। আর ওর সঙ্গে বিছানায় যাওবার আগে জমিটা লিখিয়ে নিতে পারলে আর পায় কে । নূরালী গায়ের ধনী কৃষক, কিন্তু বাপ হতে না পারার দুঃখ বেড়ায়। নূরালী মইরমের হাতে ধরে বলেছিল, আমি তোরে ভালোবাসি মইরম। তোরে আমি সতীনের ঘরে নিমু না। আলাদা দাম দিমু।“ (তদেব, পৃ. ৯৫ )

জসিম সব জেনেও মইরমকে এগিয়ে দিয়েছে। এই জসিমকে গড়তেও লেখিকার কম শক্তি অপব্যায় হয়নি। সে জানে এই ঘটনা সবাই জানবে কিন্তু সমাজকে বুড়ো আঙুল দিয়ে স্বপ্ন দেখতে চেয়েছে। আর সেই স্বপ্নের জন্য সামান্য জমিও প্রয়োজন। আর সে প্রয়োজন জসিম নিজে মেটাতে পারবে না বলেই মইরমকে ব্যবহার করতে হয়েছে। তবে মইরমকে সে মনে প্রাণে ভালোবেসেছে –“মইরম তুই আর আমি এই সমাজের খাঁচা বানামু। ওরা বন্দি থাকবে। আমরা ঘুইরা বেড়ামু সমাজের নাকে দড়ি দিয়া।“ (তদেব, পৃ. ৯৬ ) আজ জমি পেয়েছে মইরম। সব স্বপ্ন পূর্ণ হয়েছে জসিম ও সাকিনার। কিন্তু জীবনের অর্থ বোঝে না মইরম। মইরমদের জানার অবকাশ নেই ধর্ষণ কি, তাঁদের ভালোবাসা ও আত্মসম্মানের কোন দাম নেই এই পৃথিবীর কাছে। আছে বেঁচে থাকার লড়াই, আর সে বেঁচে থাকার জন্য সমস্ত ত্যাগ স্বীকারের অভিলাস। এই এই যন্ত্রণার যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে জীবনের অর্থই তারা ভুলে যায়, ভুলে যেতে বাধ্য হয়। তাঁদের মন বুঝবার অবকাশ ভগবান দেননি মাতা বা প্রেমিকাদের। স্বার্থমগ্ন এ পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি শোষিত হতে হয় নারীকে। তাই মইরমরা সময়ের বিরুদ্ধে, সমাজের বিরুদ্ধে ছোট একটি প্রতিবাদ জানিয়ে যায় ‘মরণ’। 

        ‘কেঁদোনা’ গল্প জাদুবাস্তব, ফ্যান্টাসি, মুসলিম নারীর অসহয়তা ও মুক্তিযুদ্ধে লড়াই করা নারীর অবমাননা নিয়ে গড়ে উঠেছে। আসলে মুক্তিযুদ্ধ স্বীকৃতি দিয়েছে শুধুমাত্র পুরুষদেরই, নারী সেখানে বঞ্চিত থেকে গেছে, এই বাস্তব সত্যকে লেখিকা রূপ দিয়েছেন। জাদুবাস্তবের আশ্রয়ে গল্পের প্লট আবর্তিত হয়েছে, খালাআম্মা প্রতিদিনই কন্যার কবরের কাছে  গিয়ে কন্যার সঙ্গে নানা কথা বলে। মাতা ও কন্যার কথোপকথনের দেশ, রাষ্ট্র , সমাজের নানা কথা উঠে আসে। আসলে কন্যার জন্য মাতার অন্তরবেদনার যে চিত্র তা লেখিকা তুলে ধরেন। কন্যাকে হারিয়ে আজ খালাআম্মা সমস্ত নারীজাতির মধ্যে নিজের কন্যার উপস্থিতি খুঁজে পেয়েছেন। কন্যাকে হারিয়ে এক সচেতন নারীসত্তা তিনি ফিরে পেয়েছেন। তাই বাড়ির পরিচারিকা কলমিলতা ড্রাইভার দ্বারা অত্যাচারিত হলে, তাঁর সেবার সব দায়িত্ব তিনি নিয়েছেন। এমনকি তিনি উপলব্ধি করেছেন নিজের চোখের সামনে নারীরা কীভাবে পরাজিত হচ্ছে। তিনি সারাজীবন কলমীলতার ভালো চেয়ে এসেছেন কিন্তু তেমনভাবে কিছুই করে উঠতে পারেননি। এর জন্য নিজের মধ্যেই এক আত্মবিশ্লেষণ যেমন আছে তেমনি আছে অনুশোচনা। মাতা ও কন্যার সংলাপে নারীর অসহয়তার দিকগুলি বারবার ধরা পরে –“তাহলে দেখ মেয়েরা কত অরক্ষিত। তোমার একার সাধ্য নেই এই অবস্থা থেকে মেয়েদের বাঁচানোর। এটাতো শুধু একটা ঘটনা। আরও কত ভাবেইতো মেয়েরা মরছে। দেখো আমাকে ? তোমার কি সাধ্য ছিল আমাকে বাঁচানোর ? তোমার কলমীলতা একভাবে পুড়েছে, আমি অন্যভাবে। তুমি ওর কাছে যাও।“ (তদেব, পৃ. ৮)    আসলে সমাজে ও রাষ্ট্রে নারীরা নানাভাবে শোষিত হচ্ছে, নারীর সমস্যা গুলিই লেখিকাকে প্রবলভাবে আঘাত করেছে। সেই শোষণ যন্ত্রণার সাতকাহনই তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে। ইতিমধ্যেই খবর আসে তারাবনই অসুস্থ, সে ছিল মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু তারাবনইয়ের মৃত্যু হলে সরকার তাঁকে উপযুক্ত সম্মান দিতে চায় না –“নির্যাতিতনারীদের জন্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নাই। আপনি আসুন।“ –আসলে নারী বলেই এই অপমান। তবে খালাআম্মা সবসময় প্রতিবাদমুখর হয়েছে, নারীর যন্ত্রণাকে একজন নারী হিসাবে উপলব্ধি করেছে, কিন্তু নারী স্বাধীনতার উপযুক্ত পথ তিনি আবিষ্কার করতে পারেননি। গল্পের নাম ‘কেঁদোনা’, আসলে চোখের জলকে আশ্রয় করেই নারীকে বাঁচতে হয়, প্রতিবাদ ও বিদ্রোহ আছে কিন্তু তবুও কোথায় যেন এক অসহয়তাবোধ বড় হয়ে ওঠে। আসলে সমাজই নারীকে কতগুলি বন্ধনের মধ্যে বড় করে তোলে। সেখানে মানুষের জন্য, স্বশ্রেণির জন্য কান্না ছাড়া নারীজাতির কিছু করার নেই। কিন্তু নিজের অধিকার আদায় করতে হলে এই কান্না থেকে বেরিয়ে লড়াইয়ের শক্ত মাটিতে দাঁড়াতে হবে, নিজের অধিকার ছিনিয়ে নিতে হবে। আজ আর কান্নার দিন নেই , পুরুষের সঙ্গে সমতালে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে, তাই গল্পের শেষ বাক্যে সেই ধ্বনি শুনতে পাই –“বলেছি না কেঁদো না।“ ছোটোগল্পের সমস্ত ধর্মগুলি পালন করেছে এইসব গল্পগুলি। অযথা বর্ণনা নয়, একটি দৃঢ়পিনদ্ধ নিটোল রূপের মধ্যে জীবনের চিরন্তন ব্যঞ্জনাগুলি এঁকেছেন। কোথাও চাবুকমারা সমাপ্তি, কোথাও গভীর ব্যঞ্জনা বা পাঠককে এক গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বিদায় নিয়েছেন।

36