বিশেষ প্রতিবেদন,কলমে জয়র্ষি ভট্টাচার্যঃ

চব্বিশ ঘন্টা পার হয়ে গেছে রায়গঞ্জের রাজপথ প্রতিবাদে উত্তাল হওয়ার পর। তবু রেশ এখনো মেলায়নি। উত্তরপ্রদেশের হাথরাসের তরুণী মণীষা বাল্মিকীকে নৃশংসভাবে ধর্ষণের পর পুলিশ যে আগুনে দেহটা পুড়িয়ে দিয়েছে, সেই আগুন যেন এখনো জ্বলছে শহরবাসীর হৃদয়ে৷ আর এর জন্য অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হয় রায়গঞ্জের শিক্ষার্থী ও যুবসমাজকে। তাদেরই আহ্বানে পথে নেমেছিলো নাগরিকবৃন্দ। সদ্য স্কুলজীবনের গণ্ডী পার হওয়া থেকে প্রবীণ ব্যক্তিরা একসাথে পথে নামলেন মণীষার হয়ে ন্যায়বিচারের দাবীতে।
ধর্ষণ একটি আদিম প্রবৃত্তি, সম্ভবত বিশ্বের নিকৃষ্টতম অপরাধ। আর ভারতবর্ষে প্রতিদিন অসংখ্য ধর্ষণ হয়, যার অধিকাংশ নথিবদ্ধও হয় না। হয়তো, এই প্রতিবেদন লিখতে লিখতেও আরও একটি নক্কারজনক ঘটনা ঘটে যেতে পারে। উত্তরপ্রদেশের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে স্মৃতিতে আসে এ রাজ্যের কামদুনী, পার্ক স্ট্রীট বা মধ্যমগ্রামের কথা৷ এই সমস্ত ক্ষেত্রেই প্রশাসন কখনো নিশ্চুপ কখনো ধর্ষককে মদত দিয়ে গেছে, কখনো ধর্ষিতাকে অপমান করেছে৷ হাথরাসের ঘটনাও এর ব্যতিক্রম নয়৷ বরং সেখানে এর মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। উত্তরপ্রদেশের প্রশাসন ধর্ষণের ঘটনা এখন চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বিরোধীর চক্রান্ত বলে। পুলিশ দিয়ে রাতের অন্ধকারে মণীষার দেহ জ্বালিয়ে দেওয়া, মহিলা সাংবাদিকদের পুরুষ পুলিশ দ্বারা হেনস্থা করা, ধর্ষিতার পরিবারকে চুপ থাকার ভয় দেখানো – এসব কোনোকিছু করেই সাধ মেটেনি প্রশাসনের। এরকম প্রশাসনিক মদতে ধর্ষণের জন্য ব্যাপক রব তোলার প্রয়োজনীয়তা রায়গঞ্জের যুবসমাজ উপলব্ধি করেছিলো এবং সুধী নাগরিকবৃন্দ তাতে যোগদান করে মিছিলের মাত্রা বৃদ্ধি করেছে।
অবশ্য, শুধু ধর্ষণের কথা বললেই হাথরাসের ঘটনা শেষ হয়ে যায় না। ধর্ষণের পরে ধর্ষকের সমর্থনে মিছিল বের হয়েছে সবর্ণ সমাজের। সালিশী সভা বসেছে ধর্ষককে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। উঁচু জাতের ধর্ষক যে নীচু জাতের মেয়েটিকে ধর্ষণ করে পিটিয়ে ফেলায় কোনো অপরাধ করেনি, সেই জাস্টিফিকেশনও দেওয়া হয়েছে ক্রমাগত। কোনো ঘটনার সাথে মিল পাচ্ছেন? কদিন আগেই কাশ্মীরের এক মন্দিরে মাত্র আট বছরের এক শিশুকন্যাকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়। আসিফার ধর্ষকদের সমর্থনেও একই রকম মিছিল বের হয়েছিলো। উদ্দেশ্যটা ছিলো সেই অঞ্চলের মুসলিমদের ‘অওকাত’ বুঝিয়ে দেওয়া। হাথরাসের ঘটনাও এর থেকে আলাদা নয়। ‘নীচুজাত’ যে আসলেই কত ‘নীচু’ তা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য ধর্ষককে সমর্থন করে চলে রাজ্য প্রশাসন। অবশ্য যে মুখ্যমন্ত্রী বলে, মেয়েদের স্বাধীন ভাবে চলা উচিৎ না, যে নির্দেশ দেয় বিধর্মী নারীকে কবর থেকে তুলে ধর্ষণ করার জন্য, সেই আদিত্যনাথ যোগীর কাছে আর কী-ই বা প্রত্যাশিত? আসলে যোগী কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি নয়। সংঘ পরিবারের দীর্ঘদিনের বর্ণবাদী পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
তাই মনে রাখা জরুরি, হাথরাসের ধর্ষণ আসিফার ঘটনার মতোই নিছক একটি ধর্ষণ নয়। এর পেছনে রয়েছে বর্ণবাদী আক্রোশ। প্রশাসনের বিরুদ্ধে ধর্ষকের শাস্তির ব্যবস্থা করা এমনিই কঠিন। কিন্তু সমাজের স্তরের উচ্চভাগে থাকা ব্যক্তি যখন ধর্ষণ করে, তখন তার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা আরও কঠিন। তাই ধর্ম বা জাতের সুপিরিওরিটি বুঝিয়ে এই যে ধর্ষণ তা আরও নিকৃষ্ট অপরাধ। তাই দলিত মেয়েটির ধর্ষণ প্রসঙ্গে দলিত ও জাতিভেদ প্রথা সম্বন্ধে বারবার আওয়াজ তোলা খুব জরুরি। আসলে ধর্ষণ চরমতম অপরাধ বটেই। কিন্তু সামাজিক বা রাষ্ট্রের মদতে সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালীরা যখন ক্ষমতাকে প্রকাশ করতে ধর্ষণ করে, তখন তা হয়ে ওঠে জঘন্যতম অপরাধ। সেই কারণ, বর্ণ দেখে দলিত নিপীড়ন, কিংবা ধর্মযাজক, পুরোহিত কিংবা মৌলবীর দ্বারা ধর্ষণ অথবা আর্মির হাতে বা পুলিশ কাস্টডিতে ধর্ষণ সবসময়ই আলাদা করে আওয়াজ তোলার দাবী রাখে। এগুলোর চেয়ে নিকৃষ্ট অপরাধ বোধহয় এ জগতে নেই। রায়গঞ্জের জনতা এই বিষয়টা নিয়েও আওয়াজ তুলতে সক্ষম হয়েছে।
ধর্ষণের পেছনে একাধিক কারণ থাকে। নিছক অতৃপ্ত যৌনলালসা ধর্ষণের কারণ না। নারী-পুরুষ ও তৃতীয় লিঙ্গ সকলের ধর্ষণের অন্যতম প্রধান কারণ পিতৃতন্ত্র। যে কোনো ব্যক্তির ‘পৌরুষ’-এ হানি দেখা গেলে তার ওপরে ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে উঠে আসে ধর্ষণের মতো অপরাধ। একই সাথে আছে অপর্যাপ্ত ও অনুন্নত যৌনশিক্ষা। এ দেশে যৌনশিক্ষা সম্বন্ধে এক অদ্ভুত বিবমিষা কাজ করে। অথচ, মানুষকে সঠিক যৌনশিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে লিঙ্গ ও যৌনতা সম্পর্কে সচেতন করলে এবং পিতৃতন্ত্রের অবসান ঘটালেই ধর্ষণকে রোধ করার দিকে অনেকটা এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। সাধারণ মানুষ হিংস্রতা পছন্দ করে। তাই ধর্ষকের ফাঁসি বা লিঙ্গচ্ছেদের মতো ভয়াবহ শাস্তিতে যত উৎফুল্ল হয়, ধারাবাহিকভাবে লিঙ্গসচেতনতা ও পিতৃতন্ত্রবিরোধী পড়াশোনার মাধ্যমে ধর্ষণ প্রবনতা কমানোর দিকে আগ্রহ তত দেখা যায় না। এখানে রায়গঞ্জের এই মিছিলটি অন্যান্য মিছিলের চেয়ে স্বতন্ত্র। তারা বেশ জোরের সাথে লিঙ্গ সচেতনতা ও সঠিক যৌনশিক্ষা বিকাশের দাবী করেছে। আশা করা যায়, এই পরিকল্পনাকে সুদূরপ্রসারী করে তোলার চেষ্টাও তারা করবে।
এমনিও এক মাঘে শীত যায় না। এক মিছিলেও সমাজে পরিবর্তন আসে না। তবে রায়গঞ্জের বুকে এ এক শুভ সূচনা বলা যেতে পারে। তবে এই মিছিলের ফলাফল হিসেবে যে সামাজিক পরিবর্তনের চিন্তা মিছিলে উঠে এসেছে, তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যুবসমাজের কর্তব্য। তারা কতটা নিষ্ঠার সাথে পালন করে সেটাই দ্রষ্টব্য। মণীষার যে জিভটা ধর্ষকেরা কেটে ফেলেছিলো, সেটাও নাহলে কদিন পর খনার জিভের মতো স্বগতোক্তি করবে, “কাটা জিভটা কার?” আমরা, যারা এসবের পরেও চুপ করে থাকতে পারি, তাদের নয় তো?

136