করোনা চলিতেছে — দেবী বাপের বাড়ি  আসিবেন তো ?

ডাঃ দেবব্রত  রায়

স্বর্গলোকে হুলুস্থুলু পরিয়া গিয়াছে।মা দুর্গার বাপের বাড়ি যাইবার সময় আসিল অথচ সেখানকার পরিবেশ শান্ত হইল না। এদিকে শিব ঠাকুর পই পই করিয়া বলিয়া  রাখিয়াছেন যে পরিস্থিতির পরিবর্তন না হইলে এবারে বাপের বাড়ি যাত্রা বাতিল করিতে হইবে। এমন বিতর্কিত নিষেধাজ্ঞা  অবশ্য  ঠাকুরমশাই বরাবরই করিয়া থাকেন কোন না কোন ভাবে। বন্যা,খরা, ভূমিকম্প, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, অজানা জ্বর- কিছু না পাইলে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রসঙ্গ টানিয়া  প্রতিবারই বাপের বাড়ি যাইবার সময় ব্যাগরা দেন। তাতে অবশ্য পারুর কিছু আসে যায় না ।আজ পর্যন্ত দেবের বাপের বাড়ি আসা কেউ আটকাইতে পারেন নাই।
কথা কাটাকাটি, তর্ক-বিতর্ক প্রচুর হইয়াছে, কান্নাকাটি হইয়াছে কিন্তু শেষ হাসি  হাসিয়াছেন ঠাকরুনই। আর রণে ভঙ্গ দিয়া শিব ঠাকুর নন্দী ভৃঙ্গী কে সঙ্গে লইয়া আরো বেশি করিয়া গাঁজার কলিকায় ফুঁ দিতে দিতে চোখ বন্ধ করিয়া গড়াগড়ি খাইয়াছেন।
তবে এবারের পরিস্থিতি একটু ঘোরালো। কি যে হইতেছে আর কিভাবে যে হইতেছে আর কি ঘটিতেছে আর কে কি বলিতেছে তাহা বুঝিতে পারা যাইতেছে না । টিভি চালাইলে মনে হইতেছে করোনার হাত হইতে নিস্কৃতি পাইবার কোন উপায়
নাই। আবার রাস্তাঘাট দেখিলে মনে হইতেছে করোনা বলিয়া তেমন কিছুই নাই ইহা কেবল মিডিয়ার টিআরপি বাড়ানোর কৌশল মাত্র।
করোনা প্রসঙ্গ আসিলেই মা ঠাকুরণের  বুকের ভেতরটা ধুক্ পুক্ করে। যেহেতু করোনার উৎপত্তি স্থল চায়না। সেই কারণে সারা বিশ্বেই আপাতদৃষ্টিতে চায়নার বিরুদ্ধে একটা বিরুদ্ধ জনমত এই মুহূর্তে দেখিতেছেন দেবী। ভারতবর্ষ তো এক ধাপ আগাইয়াই থাকে এইসব ব্যাপারে! তাহারা চাইনিজ মাল বয়কটের ডাক দিয়াছে।
হিমালয় পর্বতের অনেকটাই তো এই অঞ্চলে । সেই দিক দিয়ে দেখিলে মা তো তবে চায়না হইতেই আসিতেছেন!! এই ব্যাপারটি যদি মর্তের ক্লাবগুলির মাথায় একবার  ঢুকিয়া যায় তবে এইবারে বাপের বাড়ি যাওয়া কঠিন হইয়া পরিবে। তবে মা দুর্গা শুনিয়াছেন মর্তের পূজা কমিটিগুলিকে নাকি সরকারি অনুদান দিবার ব্যবস্থা হইয়াছে তাঁহার আরাধনার জন্য। এবং খবর লইয়া জানিয়াছেন যে যাঁহারা  পুজো করিবেন না বলিয়া ঠিক করিয়াছিল এক্ষণে তাঁহারাও পূর্ণোদ্যমে উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছেন পুজোর আয়োজনে। এসব খবরে অবশ্য নারদে দেওয়া। নারদের এই জাসুসিগিরি অবশ্য নতুন নয়। বিগত কয়েক বছর হইতেই দেবী মর্তে যাইবার আগে নারদের হাতে পায়ে ধরিয়া এই কাজটি করাইয়া  থাকেন। আসলে কিছুই নয়। দিনকাল দ্রুত পাল্টাইয়া যাইতেছে তাই ঠিক ভরসা পাইতেছেন না। প্রতিবারই তাই বিশ্বকর্মা পুজোর পর পর নারদকে  মর্তে পাঠাইয়া মর্তের মনোভাব মনোভাব যাচাই করিয়া থাকেন। সমস্যা হইয়াছে এই বারে। খবর সংগ্রহ করিতে  মর্তে যাইতে ভয় পাইতেছেন নারদ। একে তো করোনা সংক্রমনের ভয় তাহার উপর আশঙ্কা এই পরিস্থিতিতে মর্তে যাইবার খবর যদি বিষ্ণুদেবের কানে যায় তবে তাঁহাকে নিশ্চয়ই দেবলোকে ঢুকিতে দিবেন না । অন্ততঃ দুই সপ্তাহ  অন্য কোথাও কোয়ারেন্টাইনে রাখিয়া দিবেন ।সত্যি কথা বলিতে কি ইহাই নারদের কাছে মৃত্যুদণ্ডের সামিল। কেননা ঢেঁকিতে চড়িয়া অবাধে ঘুরিয়া ঘুরিয়া সবাইকার অন্দরে অন্দরে    উঁকি মারা এবং ইধারকার খবর উধার কার উধারকার খবর ইধার না করিতে পারিলে  নারদের  পেটে গ্যাস জমিয়া  ফুলিয়া ওঠে।
সুতরাং শত প্রলোভন দেখাইয়াও নারদকে রাজি করানো যাইতেছে না। একমাত্র নারদই এই কাজে পারদর্শী ছিলেন। কখনো অন্য  কাউকে প্রয়োজন হয় নাই। সেই কারণে অন্য কাউকে এই কাজের জন্য কখনো ভাবাও হয় নাই।কাহাকে তেমন ভাবে তৈরিও করা হয় নাই। এখন একমাত্র অবলম্বন হইতে পারে নন্দী ভৃঙ্গী । ইতপূর্বে কয়েক  ছিলিম গাঁজা আর কয়েক ঘটি ভাঙের লোক দেখাইয়া এদের দ্বারা অনেক কাজ করানো গিয়াছে সুতরাং এখন একমাত্র ইহারাই উদ্ধারকর্তা হইতে পারে। সুতরাং  নন্দী ভৃঙ্গীকে  ডাকিয়া পাঠানো হইলো। কাজের কথা বলা হইল। কিন্তু তাহারা বিশেষ উৎসাহ দেখাইলো না। ‘কাল ভাবিয়া আসিয়া বলিব’ বলিয়া সেইযে ডুব মারিল আর এমুখো হইল না।
দেবী হতোদ্যম হইয়া বসিয়া রহিলেন ।সমস্তকিছুই কেমন হাতের বাহিরে চলিয়া যাইতেছে ।দেবী কুপিত হইলেন কিন্তু কিছু করিতে পারিলেন না। কেন জানি অভিশাপ অভিশাপ আর আজকাল গায়ে লাগে না। স্থির করিলেন যাহা ঘটে ঘটুক তিনি বাপের বাড়িতে যাইবেনই । মর্তে খবর পাঠাইলেন যেন উপযুক্ত সংখ্যক মাস্ক  এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে স্যানিটাইজার এর ব্যবস্থা রাখা হয় এবং পরিকল্পনার সময় যেন মনে রাখা হয় মায়ের দশখানি  হাত আছে সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই অতিরিক্ত স্যানিটাইজার লাগিবে। উদ্যোক্তারা এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করিলেন। কিন্তু গণেশের মাস্ক মর্তে পাওয়া যাইবে কিনা বলিতে পারিলেন না। তবে তাঁহারা খোঁজ করিবেন। দুইদিন পর ফিরতি বার্তা আসিল যে গণেশের মাস্ক মর্তে  অমিল কেননা এখানকার কারো এই ধরনের মাস্কের প্রয়োজন হয়না।  সুতরাং দেবীকেই স্বর্গ হইতে জোগাড় করিতে হইবে। মর্তের অবস্থা বিবেচনা করিয়া দেবী স্থির করিয়াছেন এবার সদলবলে পিপিই পরিয়াই বাপের বাড়ি আসিবেন। কিন্তু সে কথা  ভক্তদের বলিলেন না ।কেননা তাহাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হইতে পারে ।
কিন্তু বিপদ বাঁধিলো সেইখানেও ।
লক্ষ্মী, সরস্বতী ,কার্তিক এর পিপিই জোগার হইল বটে কিন্তু  দশভূজা দেবীর পিপিই আর গণেশের শুঁড় ওয়ালা পিপিই কোথাও মিলিল না। এই প্রথম সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা আর শনি ঠাকুরের ওপর ভীষন রাগ হইল দেবীর। কী দরকার ছিল দেবীকে দশভূজা করিয়া পাঠানোর?। আর শনির দৃষ্টিতে গণেশের মুন্ডচ্ছেদ না হইলে আজ এই বিপত্তিতে পরিতে হইত না । এখন একমাত্র ভরসা বিশ্বকর্মা। লকডাউন এর কারণে এবার বিশ্বকর্মা প্রায় কর্মহীন। বিশেষ খাটাখাটনি নাই। সুতরাং তাঁহার সময় অফুরন্ত।  তবু সমস্ত কথা শুনিয়া গাইগুই শুরু করিলেন। শেষমেষ রাজি হইলেন বটে তবে দেবীর মনে শঙ্কা থাকিয়াই গেল যে শেষ মুহূর্তে বিশ্বকর্মা না বাঁকিয়া বসেন।সমস্ত কিছু ব্যবস্থা করিয়া দেবী মোটামুটি হাঁপ
ছাড়িলেন। তবে মনটা খচখচ করিতেই থাকিল। দিন দিন সমস্ত কিছু কেমন হাতের বাহিরে চলিয়া যাইতেছে। দেবদেবীদের কেউ পাত্তাই দিতেছেন না। দেবী না থাকিলে আজ স্বর্গ যে দেবভূমি থাকিত না অসুরভূমি হইয়া  যাইতো স্বর্গের দেব দেবতাদের যে অসুরদের পদানত হইয়া থাকিতে হইত এই ইতিহাস কি কারো অজানা তবু কেউই দেবীকে সাহায্য করিতেছেন। না বিশ্বকর্মা, না নারদ, না নন্দিভৃঙ্গী।শুধু ইহাদের দোষ দিয়াই বা কি লাভ! ঘরের মানুষ দেবাদিদেব মহাদেব পর্যন্ত  বেসুরো গাইছেন!!
দেবী পালঙ্কে আধশোয়া  অবস্থায় দিবানিদ্রার আগে পান চিবাইতে চিবাইতে এই সব কথাই ভাবিতে ছিলেন । কি একটা যেন মনের মধ্যে হইতেই পার্বতী তড়াক করিয়া উঠিয়া বসিলেন। আচ্ছা যদি মর্তে  ভক্তরা তাঁহার  কাছে জানিতে চাহেন যে তাহারা যে এত আরাধনা করিতেছেন এত আকুতি মিনতি করিয়া তেত্রিশ  কোটি দেবতার নাম স্মরণ করি তেছেন করোনা হইতে বাঁচিবার জন্য কিন্তু দেবলোকের বাসিন্দারা কোনো সাড়া দিতেছেন না কেন? এই যে এত মানুষ মরিতেছে মানুষকে যে দুর্ভোগ পোহাইতে হইতেছে  দেবলোক তাহাতে নির্বিকার কেন?কি করিতেছেন তাঁহারা?!
ইহার উপর দেবী যদি ছেলেমেয়েদের পিপি পড়াইয়া  বারেবারে হাত ধুইতে ধুইতে মর্ত্যে লইয়া আসেন  তাহা হইলে তো ভক্তদের  মধ্যে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হইবে। দেবীর  দিবানিদ্রার বারোটা বাজিয়া গেল।  ইহারা শুধু নিজেদের কথাই ভাবিতেছেন ভক্তদের দুর্দশা মুক্তির জন্য কিছু করতেছেন না কেন?  তাহা হইলে ভক্তরা গদগদ হইয়া ভক্তি প্রদর্শন করিবেন কেন?
মুখের আধখাওয়া বেনারসি মিষ্টি  পান  বিস্বাদ  লাগিল। থুতু থু করিয়া ফেলিয়া
দিলেন। দুই ঢোক জল খাইয়া পায়চারি করিতে লাগিলেন  সিংহাসনচ্যুত হইবার আশঙ্কায় দেবী মৃদু মৃদু কাঁপিতে লাগিলেন ।বুক ধরফর করিতে লাগিল। ঘনঘন জল তেষ্টা পাইতে শুরু করিল। আরো কত কিছু হইল দেবীর নিজেও অনুভব করিতে পারিলেন না।
শুধু অনুধাবন করিলেন বাপের বাড়িতে যাওয়াটা এইবারে বেশ ঘটনাবহুল হইবে। 

84