বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

(পর্ব ২০)

এক অদ্ভুত নারী নূরবানুকে নিয়ে গড়ে উঠেছে শওকত আলীর ‘রাস্তার দৃশ্য’ গল্পটি। নূরবানুকে সামনে রেখে লেখক সরকারি অর্থনীতি, দুর্ভিক্ষ দমনে সরকারের ব্যবস্থা, সরকারের প্রকৃত অবস্থা কেমন ও সাধারণ মানুষ সরকারকে কোন চোখে দেখেছে তা তুলে ধরেছেন। স্টেশনে মারা যায় নূরবানুর স্বামী সদরালি। স্বামীর মৃত্যুতে তাঁর সব বোধ দিশেহারা হয়ে যায়। নূরবানুকে কেন্দ্র করে স্টেশনে সরকারি লোক সহ সাধারণ মানুষের কোলাহল নিয়েই এ গল্প গড়ে উঠেছে। কেউ নুরবানুর দুঃখ বোঝেনি। সকলেই দায়িত্ব সামলাতে চেয়েছে, কেউ সহানুভূতি বা করুণা প্রকাশ করেছে। তবে লেখক নূরবানুকে বড় কঠিন করে গড়ে তুলেছেন। স্বামীর মৃত্য পর সে একটি কথাও বলেনি। এমনকি নিজের কন্যা ফুলবানু কোথায় চলে গেল সেদিকেও নজর নেই। এই নূরবানুকে কেন্দ্র করে স্টেশনে রীতিমত নাটকীয় অবস্থা শুরু হয়েছে। পুলিশ এসেছে জিজ্ঞাসাবদের জন্য কীভাবে মারা গেল স্বামী, তবে নূরবানু মুখ দিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ হয়নি। স্টেশনের জনগণ, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার দেওয়া খাদ্যের প্রলোভন, সাধারণ মানুষের দেওয়া খাদ্য ও টাকা সে কিছুই গ্রহণ করেনি, শুধু মুখ ঘুরিয়ে বসে আছে। এমনকি এক ব্যক্তি টাকা ভিক্ষা দিতে চাইলেও সে নেয় না অথচ ভিক্ষারিদের কোলাহলে সে পদপৃষ্ট হয়েছে –

“নূরবানু  ধাক্কা খেয়ে পেছনে ছিটকে যায়। সেখান থেকে কে যেন আবার তাকে সামনের দিকে ঠেলে দেয়। তাতে হুমড়ি খেয়ে পড়তে হয় তাকে। কার পায়ের চাপে ভিক্ষের থালাটা মচ মচ শব্দ করে দুমড়ে যায়। কে একজন তার পায়ের ওপর ভর দিয়ে চলে যায়। কারো পা তার পেটের ওপর পড়ে, কেউ পিষে দেয় তার নাকমুখ।

এবং কিছুক্ষণ পর ভিড়টা সরে গেলে নূরবানু চৌরাস্তার মোড়ে কাত হয়ে পড়ে থাকে। তার দেহটিও, তখন ঐ দিনের বেলা, দুপুরের রোদে অদ্ভুত একটি দৃশ্য হয়ে ওঠে। কেননা আল্লাহর দুনিয়ায় তখন সূর্য একেবারে মাথার উপরে।“ (তদেব, পৃ. ১৩৬ )

স্বামীর মৃত্যুতে নুরবানুর সমস্ত চেতনা লোপ পেয়েছে। অথচ নূরবানুর দুঃখ কেউ বোঝেনি। আজ ব্যস্ত সময়ের কাছে মানুষের প্রয়োজনই হয়ত বড় হয়ে উঠেছে। অপরের দুঃখে আমরা  হয়ত কিছু অর্থ বা সহানুভূতি প্রকাশ করতে পারি আর কিছু নয়। লেখক আত্মবিধ্বংসী সময়ের মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করিয়ে দেন। যে সময় নিজেই আমাদের মুখে চাবুক মারে। শওকত আলীর গল্প যেন আত্মদর্শনের প্রতিচ্ছবি। সে দর্শনে পাঠক মগ্ন হয়ে নিজেই বিবেকবোধের জাগরণে জাগরিত হয়। 

        মুসলিম জীবনের প্রেম রোমান্সকে কেন্দ্র করে এক রোমান্টিক গল্প হল ‘সন্ধ্যায় সাক্ষাৎ’। প্রতিটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার যেমন আছে, তেমনি আছে ভালোবাসা ও প্রেমের অধিকার। সে অধিকার বয়স, শরীর মনের কোন ব্যবধান নেই। আসলে জীবনে বেঁচে থাকাটাই প্রধান কথা। শওকত আলীর গল্পে যৌনতার প্রাধান্য তেমন দেখা যায় না। তিনি বিভিন্ন দিক থেকে জীবনের ওপর আলো ফেলতে চান। ফলে এক সহজাত সহজ সরল প্রবণতা তাঁর গল্পে লক্ষ করা যায়। এ গল্প সিরাজ ও সাহানাকে নিয়ে এক প্রেমের গল্প। দুজনেরই বয়স অতিক্রান্ত। তবুও তাঁরা মিলিত হয়েছে জীবনের দাবি নিয়ে। এই সাক্ষাতে বা মিলনে যৌনতার কোন  ইঙ্গিত নেই। আসলে জীবনের নিঃসঙ্গতা কাটাতে তাঁরা মিলিত হতে চেয়েছে। সিরাজ স্ত্রীকে হারিয়েছে, সাহানাও স্বামীকে হারিয়েছে। সিরাজের ছেলে আছে, সাহানারও মেয়ে আছে। তবুও তাঁরা ছিল নিঃসঙ্গ, ক্লান্ত , বিষন্ন। সিরাজের নানা বন্ধু, আত্মীয় ছিল কিন্তু স্ত্রীর মৃত্যুর পর কাউকেই উপযুক্ত সঙ্গী বলে মনে হয়নি। তাই নিজের নিঃসঙ্গতা কাটাতে সে বন্ধুর জন্য আবেদন জানিয়ে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। ফলে বন্ধু হয়েছে সাহানা। এতদিন পত্রালাপে কথাবার্তা চললেও আজ তাঁরা দেখা করেছে। যদিও সাহানার আসতে অনেক দেরি বলে সিরাজ বাড়ি চলে যেতে চেয়েছিল। তবুও শেষ পর্যন্ত দেখা হয়েছে। মুখোমুখি বসে দুজনে নিজেদের প্রেম-প্রেমহীনতা, সংসার, একাকিত্ব নিয়ে নানা গল্পে মেতে উঠেছে। সিরাজ যৌনতার ইঙ্গিত দিলেও সাহানা তা প্রত্যাখ্যান করেছে। আসলে সমস্ত কিছু জীবনে বয়ে নিয়েও যে বাঁচতে হয়, সেই বাঁচার দাবি নিয়েই তাঁরা এগিয়ে এসেছে –“সিরাজকেও চুপচাপ থাকতে হলো। জীবনের এই একটা জায়গা সর্বক্ষণ থাকবে –শোকের জায়গা, নিঃস্ব হওয়ার জায়গা –যাই বলা যাক, এটা চিরকাল থেকে যাবে। কারণ এটা তো অস্তিত্বেরই একটা অংশ। এ জায়গাটুকু বাদ দিলে নিজেকেই বাদ দিয়ে দিতে হয়।“ (তদেব, পৃ. ১৪৮ ) সমস্ত না থাকার মধ্যেও তাঁরা বাঁচতে চেয়েছে। জীবনের দাবি নিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখেছে, আর সেই স্বপ্নেরই কারিগর লেখক শওকত আলী।

                        জীবনের পাশাপাশি আছে মৃত্যু, সেই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ‘অচেনা ঘাতক’ গল্প। শওকত আলী গল্পে বারবার মানবতার ওপর জোড় দিয়েছেন। ফলে তাঁর গল্পে মানুষই বড় হয়ে উঠেছে। এ মানুষ প্রবৃত্তি সর্বস্ব মানুষ নয়।  মানুষের যে বিবিধ অবস্থা, মনস্তাত্ত্বিকতা, একটি মানুষ কোন অবস্থার সম্মুখীন হয়ে ঘাতক হয়ে ওঠে সে পরিস্তিতির ওপর জোড় দিয়েছেন ‘অচেনা ঘাতক’ গল্পে। এই আঘাতের জন্য তিনি চরিত্রকে দায়ী করেননি, দায়ী করেছেন পরিস্তিতিকে। মহাতাব ভাল গান গাইতো, সে ছিল দিলওয়ারের বন্ধু। এই মহাতাব একদিন হায়দারকে দেহাতী ভূত বলায় সে আঘাত করেছিল ফলে মারা যায় মহাতাব। এই ঘটনার সাক্ষী ছিল দিলওয়ার। দিলওয়ারের চোখে অপরাধী হায়দার। হায়দারের ও দিলওয়ার সংলাপ নিয়ে গল্প গড়ে উঠেছে। তাঁর অপরাধ, ঘটনা, অনুশোচনা সব মিলিয়ে গল্প এগিয়ে যায় পরিণতির দিকে। কিন্তু আজ হায়দারের মনে হয়েছে দিলওয়ার মনে হয় তাঁকে পুলিশে ধরিয়ে দেবে, তাই সে দিলওয়ারের কাছ থেকে পালাতে চেয়েছে। তখনই দিলওয়ারের আঘাতে মৃত্যুশয্যায় চলে যায় হায়দার। দিলওয়ার চোখে অপরাধী ছিল হায়দার, আজ সে নিজেই অপরাধী হয়ে যাচ্ছে। একটি মৃত্যুকে সামনে রেখে লেখক আরকটি মৃত্যু ঘটিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন মৃত্যুর জন্য হিংসা , রাগ ক্রোধ দায়ী নয়। দায়ী পরিস্তিতি। আসলে মানবমনের নানা জটিলতা, বহু রিপু, মনস্তাত্ত্বিকতা ও অবস্থা নিয়ে বর্তমান। আসলে মানুষ অবস্থার দাস। ফলে যেকোন মুহূর্তে চরিত্রের নৈতিক পতন ঘটতে পারে, তার জন্য চরিত্র কোনভাবেই দায়ী নয়। 

                            এক চুরির ইতিবৃত্ত নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘অচেনা’ গল্পটি। তবে এ চুরি ধরা পড়েনি। তবে বিবেকবোধে আঘাত দিয়েছে। তবে চুরি ছাড়া কোন উপায় ছিল না। আসলে মানুষকে বেঁচে থাকতে নানা উপায় অবলম্বন করতে হয়। আর দরিদ্র নিম্নবিত্ত জীবনে সে সংগ্রাম ভয়ংকর। দরিদ্র মানুষকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যেতে হয় জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে। আর সেই টিকে থাকারই গল্প লিখেছেন শওকত আলী। কিসমত আলী অভারের তাড়নায় হারিয়েছে স্ত্রীকে। সামান্য খাদ্যের জন্য ভিটেমাটি বন্দক দিতে হয়েছে। ফলে মহাজন চৌধুরী বাড়িতে আজ সে চুরির পথ বেঁছে নিয়েছে। আগেও চুরি করেছে তবে তা সামান্য। কখনও শাবল, কখনও সামান্য সরষে। কিন্তু আজ অভাবই তাঁকে এ পথে নিয়ে গেছে। প্রথমে চুরি নিয়ে দ্বিধা থাকলেও আজ সব দ্বিধা কেটে গেছে। কিসমত আলী আজ এসেছে চৌধুরী বাড়িতে চুরি করতে। কিন্তু সহজেই তো কেউ ঘুমায় না, ফলে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে। শেষে যখন সে ধান বস্তা ভর্তি করে চলে যাবে তখন ঘুম ভেঙে গেছে দাসী জয়গুনের। কিসমতও মতিচ্ছন্ন হয়ে বাড়ির পিছন দিক দিয়ে না গিয়ে উঠোন দিয়েই গেছে। দৈবক্রমে আকাশের চাঁদ তখন মেঘে ঢেকে গেছে। কিসমতকে দেখেছে চৌধুরী বাড়ির বড় ছেলে ও জয়গুন। বড় ছেলে চিনতে না পারলেও জয়গুন বোধহয় চিনতে পেরেছিল। কিন্তু এই কিসমত ও তার অভাবী ছেলেদের জন্য জয়গুনের সহানুভূতি আমরা আগেই দেখেছি। বোধহয় সেজন্যেই সে কিছু বলেনি। লেখকের লক্ষ কিসমত চরিত্র। সামান্য ধানের জন্য গোটারাত তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। সে মহাজনের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ বা বিদ্রোহ করেনি, চুরির পথ বেঁছে নিয়েছে। এই চুরিতে অপরাধবোধ বা অনুশোচনা আছে তবে পরক্ষণেই মনে হয়েছে –“  ই বড় পাপ বাহে – তার কানের কাছে তখন মুহুর্মূহু বলে যেতে থাকে অচেনা –অজানা একটা স্বর – ই বড় পাপের কাম, ই কাম ভালো নহে। কথাটা সে শুনতে পায় এবং মাথা নাড়ায় – না, পাপ নহে, পাপ কিসের ? পাপ ক্যানে হোবে ?” (তদেব, পৃ. ১৬৫ ) এই পাপবোধ লুপ্ত হয়ে যায় অভাববোধের কারণেই। দরিদ্র মানুষের প্রতি এক সহানুভূতির দৃষ্টি নিয়ে শওকত আলী এইসব চরিত্র এঁকেছেন। ফলে চরিত্রের স্বাভাবিক প্রবণতা খুব সহজেই ধরা পড়ে।

                    আকরাম ড্রাইভার ও কাশেম ড্রাইভারকে নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘কুলায় প্রত্যাশী’ গল্প। এ গল্প এক যাত্রাপথের গল্প। আকরাম ড্রাইভার চলেছে এক বোবা মেয়েকে নিয়ে। সেই যাত্রাপথের বিবরণ, আকরামের চেতনায় নানা ভাবনা, কাশেম সম্পর্কে নানা কথা, সেই বোবা মেয়েকে ঘরে নিয়ে আসা, তার ওপর ভালোবাসা জন্মানো , আবার সেই মেয়ের পালিয়ে যাওয়া এবং তার খোঁজে আবার আকরামের বেরিয়ে যাওয়া, সব মিলিয়ে একটি সুখপাঠ্য গল্প । জাহিদ ও মেজর আহসানকে নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘প্যাট্রিজ’ গল্প। মেজর আহসান জাহিদকে শুনিয়েছে পাখি শিকারের গল্প। শিকারের রহস্যময়তা, আনন্দ, উন্মত্ততা সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত শিকার হয়েছে নারী। নারীও যেন পুরুষের লালসার কাছে এক শিকারের বস্তু। আর সে শিকারের জন্য পুরুষের বক্র দৃষ্টি ক্রমাগত ধাবিত হয়।

                    ‘জ্যোৎস্না রাতে দাও বন্দুকের খেলা’ গল্প গড়ে উঠেছে কিছু দরিদ্র মানুষের ডাকাতি কেন্দ্র করে। শওকত আলী ঘটা করে কখনই মুসলিম জীবনের ইতিবৃত্ত লিখতে বসেননি। তাঁর অভিজ্ঞতা মুসলিম জীবনকেন্দ্রিক বলে গল্পে মুসলিম জীবন এসেছে। আর সেদেশে সংখ্যা গুরু মুসলিম বলেই এমনটা হয়েছে। মুসলিম জীবনের পাশাপাশি বাঙালি হিন্দুও এসেছে। আসলে তিনি মানুষের গল্প লিখতে চেয়েছেন, মানবতার মেলবন্ধন ঘটাতে চেয়েছেন। ফলে তাঁর গল্পে মুসলিম জীবনকে পৃথক করে দেখার কোন দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে না। এ গল্পে হিন্দু মুসলিম কিছু চরিত্রকে সামনে রেখে তিনি দরিদ্র মানুষের বেদনা, আত্মযন্ত্রণার ভাষ্য রচনা করতে চেয়েছেন। আব্দুল, গোবিন্দ, মানু বিশ্বাস ও আইয়ুবালী এঁরা সবাই ডাকাতি করে। এঁদের মধ্যে আব্দুলের বন্দুক আছে বলে একটু বাড়তি খ্যাতি পায়। একদিন ডাকাতিতে গিয়েছে, আব্দুল না খেয়ে যাওয়ার জন্য প্রচন্ড ক্ষুধায় সে কাতর। ডাকাতিতে তাঁরা সফল হয়নি, ফলে বাড়ি ফেরার সময় হামলা করে শুকবর মিঞার বাড়ি। শুকবর মিঞা এমনিতেই গরিব সেখানে কী পাবে ডাকাতের দল ! কিন্তু আব্দুল এখানে ভাত খেতে চেয়েছে। পোহাতু পান্তা ভাত এনে দিয়েছে, জ্যন্ত মুরগি ধরেছে। এই ডাকাত দলের ইতিবৃত্ত দেখলে পাঠকের আপাত হাসি পাবে, কিন্তু উভয়ই যখন দরিদ্র তখন ডাকাতি তো এমনই হবে। আসলে দরিদ্র মানুষের কোন ধর্ম নেই, রীতি, নিয়ম, প্রথা নেই। তাই আব্দুলরা ক্ষুধার কাছে ভুলে গেছে যে তাঁরা ডাকাত। আইয়ুবালীরা ডাকাতিতে গিয়ে নারী ধর্ষণে যুক্ত থাকলেও আজ নূরবানুকে কিছু করেনি। গর্ভবতী নূরবানুকে গোবিন্দ আঘাত করতে গেলেও প্রতিরোধ করেছে আব্দুল। হয়ত নিজের স্বজাতি বলেই। সে ডাকাত কিন্তু গর্ভবতী মহিলাকে খুন করা তাঁদের ধর্ম নয় তা বুঝিয়ে দিয়েছে আব্দুল।

                    ‘শিকার’ কয়েকটি মুসলিম যুবক যুবতীর রহস্য অভিযানের গল্প। শিকারে বেরিয়েছে মহিউদ্দিন, আহসান, শহর আলি, মাসুদরা। এক তরতাজা মন নিয়ে আনন্দের আমেজে ভোররাতে শিকারে চলেছে সবাই। বন্যপ্রাণী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দিকে লেখক নজর দেননি। শিকারকে সামনে রেখে তিনি মাসুদ ও নীলার অবৈধ প্রেমের দিকে নজর দিয়েছেন। মুসলিম জীবনে এই অবৈধ প্রেম আরও ভয়ংকর। তবে এ প্রেমের জন্য মাসুদ ও নীলার কোন ভয় বা সংকোচ নেই। কিন্তু অবৈধ প্রেমকে সমাজ সর্বদা দেখেছে ব্যঙ্গের চোখে। তাই এ প্রেম কথকের দৃষ্টিতে মনে হয়েছে অনৈতিক। তবে একটি প্রেমকে কেন্দ্র করে রমণী ও পুরুষ যদি মিলিত হয় সেখানে নৈতিকতা বা অনৈতিকতার কোন প্রসঙ্গ নেই, সরল দুটি হৃদয় মিলিত হয়েছে লেখকের দৃষ্টি সেদিকে। আর এই প্রেম সহজাত নয় লেখকের মতে পরিস্তিতির শিকার। তবে কথকের মনে হয়েছে –“অন্যের প্রেমিকা যে বউ , তার সঙ্গে যে স্বামী সংসার করে তার মতো মূর্খ কে আছে !” (তদেব, পৃ. ১৩৩ ) তবে মাসুদেরও স্ত্রী রয়েছে, নীলারও সংসার রয়েছে। তবুও তাঁরা মিলেছে, মিলনের আনন্দ উপভোগ করেছে। আর এই মিলনকে লেখক নিয়ে গেছেন শিকারের মাধ্যমে প্রাকৃতিক পরিবেশে। যে সজীব মন নিয়ে ভোরে তাঁরা শিকারে গিয়েছিল বাড়ি ফিরেছে ক্লান্ত বিদ্ধস্ত হয়ে।

                    উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে আজ পর্যন্ত কত গল্প লেখা হয়েছে আর লেখা হবে লক্ষ থেকে লক্ষাধিক কিন্তু মানুষের চেতনাকে আঘাত করতে না পারলে হয়ত সব চেষ্টাই ব্যর্থ হবে। সমাজ সংশোধন বা সমাজের কল্যাণের জন্য লেখক কলম ধরবেন এমন কোন দাসখত রাষ্ট্রের কাছে দিয়ে বসেননি। তবে শৌখিন মজদুরি হবেন এও বুঝি কাম্য নয় ! কেননা আজ রাষ্ট্র,সময় , সমাজ , মানুষ এক ভয়ৎকর বিপদের সম্মুখীন। সেখান থেকে বাঁচার রসদ, সঠিক পথ, মানুষে মানুষে সৌভ্রাত্বের বন্ধন লেখককেই গড়ে তুলতে হবে। সেদিক থেকে শওকত আলীর গল্প আজ অবশ্যই পাঠ্য। তিনি কাহিনি বলতে চাননা। একটি দৃষ্টিভঙ্গি বা মানবমনের দর্শনকে সামনে রেখে গল্প গড়ে তোলেন। সেই দর্শন পরিস্ফুটনের জন্য কাহিনির অবতারণা করতে হয়। নিজস্ব বয়নে সে বক্তব্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে –‘’জীবনের যে উপলব্ধিটি তাঁর মনে আত্মপ্রকাশের তাগিদ সৃষ্টি করে, সেটিকে তাঁর বিবেচনায় যথাযথভাবে প্রকাশের জন্যই ঐ নতুনতর উপাদানের ব্যবহার এবং প্রকরণগত পরিবর্তন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বৈরি রাষ্ট্র বা সামাজিক কোনো শক্তির পীড়ন এড়িয়ে যাবার জন্য অমন প্রকরণ ব্যবহৃত হয়েছে এমনও কেউ কেউ বলে থাকেন।‘’(গল্পসমগ্র, ভূমিকা )

36