সৃজন শীল

ছোট থেকে বড়োরা একটা কথা আমাদের শিখিয়েছে যে বিপদে পড়লে বুঝতে পারবি আসল বন্ধু কে বা কারা। কোভিড-২০১৯ নামক অতিমারিটা আমাদের দেশের বিশেষত রাজ্যের  মানুষকে এটা চিনিয়ে দিয়েছে যে বিপদের সময় আসল বন্ধু কে এবং কারা পাশে থাকে শুধু নয় তাদের জন্য মরে ও বাঁচে। আজকের দিনে এটা কোনোভাবেই আর প্রবাদ বাক্য নয়, বাস্তবিক পক্ষে সত্য হয়ে উঠেছে। নতুন প্রজন্ম এই প্রবাদ বাক্যটিকে নিজের চোখে দেখার সুযোগ পেল। অতিমারির সময় থেকে সারা ভারতের শ্রমশক্তি যখন রাস্তাই হাঁটছে সেই সময় থেকে আজ অবধি শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বামপন্থীরা। এটা সত্য। আমাদের রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকরা যখন সারা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে আটকে রয়েছিল তথন বামপন্থী শ্রমিক সংগঠনের নেতারা তাদের কাছে খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে পৌঁছিয়ে গিয়েছিল। সিটু নামক শ্রমিক সংগঠনটি এই কাজটি করেছিল। এটা হল এপ্রিল ও মে মাসের ঘটনা। এতদিন ধরে যে ট্রেড ইউনিয়নের নাম শুনলে বাঙালি মধ্যবিত্ত কেমন যেন করত, অর্থাৎ “এদের কি কাজ নেই”, — এই তারাই হয়ত নতুন করে বুঝল ট্রেড ইউনিয়নের তাৎপর্য-গুরুত্ব। কোভিড -২০১৯ সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে কমিউনিস্টরা এইভাবে প্রাথমিকভাবে সারা ভারত জুড়ে সাধারন খেটে-খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল । কমিউনিস্টরা বুঝেছিল যে এই সংকট খুব সহজে মিটবে না, কাজেই এক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে। কারন কোভিড-২০১৯ এর জন্য বহু মানুষের আয়, রোজগার, কর্মসংস্থান প্রভৃতিতে টান পড়েছে। সর্বোপরি মানুষের হাতে টাকা নেই। এহেন পরিস্থিতিতে এই কাজটিকে অর্থাৎ মানুষের পাশে থাকার বিষয়টিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং সেবার এমন এক কর্মসূচী গ্রহন করতে হবে যেটা মানুষের দু-বেলা খেয়ে বেঁচে থাকার বিষয়টিকে খানিক হলেও নিশ্চিত করবে।  এই বোঝাপড়া থেকে আমাদের রাজ্যের  বামপন্থীরা সাধারণ খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের জন্য সারা রাজ্য জুড়ে চালু করলেন কমিউনিটি  রান্নাঘর বা শ্রমজীবী রান্নাঘর।

এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে কি এই শ্রমজীবী ক্যান্টিন ? আর কি অর্থে অন্যান্য সেবামূলক সংস্থা থেকে এটা পৃথক। অর্ক রাজপন্ডিত তাঁর “কমিউনিটি কিচেন থেকে থেকে রেড ভল্যান্টিয়াসঃ একটি সোভিয়েত উত্তরাধিকার” ( আরেক রকম, ১৬ সেপ্টম্বর, ২০১৯) নামক প্রবন্ধে দেখিয়েছেন “ বিপ্লব পরবর্তী সোভিয়েত রাশিয়ায় প্রথম কমিউনিটি কিচেনের ধারণা গড়ে ওঠে নারীমুক্তির প্রশ্নটিকে সামনে রেখে”। কমিউনিস্ট  সমাজে মহিলা শ্রমিক, কৃষক, গৃহস্থালি মহিলারা যাতে বিনা মাজুরিতে কাজ না করে সেই বিষয়টিকে সামনে রেখে অর্থাৎ মহিলাদের মুক্তির বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ভাবনা থেকেই সামাজিক ক্যান্টিন, কেন্দ্রীয় যৌথ রান্নাঘার গড়ে উঠেছিল। সুতরাং দেখা যাচ্ছে একটি বিকল্প ও তাত্ত্বিক ভাবনা থেকে এই শ্রমজীবী ক্যান্টিন সমূহ গড়ে উঠেছিল। আমাদের দেশের বা রাজ্যের বামপন্থীকর্মীরা এই বিষয়টিকে রাজ্যের  বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এটাকে প্রয়োগ করেছেন। আর দ্বিতীয় বিষয়টির ক্ষেত্রে বামপন্থীদের বোঝাপড়া এইরুপঃ অন্য কোন সামাজিক বা ধর্মীয় সংস্থা যে সেবামূলক কাজ করে সেটা ভাল বিষয় খারাপ কিছু নয়। কারন বিপদের সময় যে কোন প্রকারের সাহায্য মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় ও জরুরী বলে বিবেচিত হয়। এই ধরনের সংগঠনগুলি আর্ত, অভুক্ত মানুষের কাছে ত্রান, সেবা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্তর পৌঁছে দেয় এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তবে, এদের ভূমিকা এই অবধি সীমাবদ্ধ। কিন্তু বামপন্থীরা তাদের কাজকে শুধু এই অবধি আটকে বা সীমাবদ্ধ রাখতে  ইচ্ছুক নয়। বামপন্থীরা এই ব্যাপারে বলে থাকেন যে এই কাজের মাধ্যমে সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের কাছে অবধি পৌঁছানো সম্ভব নয়। এই কাজ সরকারের কাজ। ক্ষমতাশীন সরকার তাঁর পরিকাঠামোগত সুবিধাকে ব্যবহার করে বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে সরকারের সাহায্যকে পৌঁছিয়ে দিতে পারে যেটা কখনোও বামপন্থীদের দ্বারা সম্ভব নয়। বামপন্থীরা এমন কথা বলেনও না। বামপন্থীরা কেবলমাত্র মিশনারি গোছের কার্যকলাপের মধ্যে নিজেদেরকে আটকে রাখে না। তারা এই ধরনের কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে একদিকে সরকারকে তাদের দায়িত্ব কর্তব্য সম্বন্ধে সচেতন করে অন্যদিকে শোষিত বঞ্চিত মানুষকে তাদের অধিকারবোধ সম্বন্ধে সচেতন করে। এই ভাবে বামপন্থীরা সমাজের শ্রমজীবী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে যাতে করে মানুষকে ব্যবস্থার গুনগত পরিবর্তনের জন্য প্রস্তত করা যায়। অর্থাৎ বামপন্থীদের এই ধরনের কাজকর্ম শেষমেশে মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই-এ পর্যবসিত হয়। এটাই হল অন্যান্য সেবামূলক সংস্থার সাথে বামপন্থীদের মতাদর্শ  ও দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য। করোনা ও আমফান পরবর্তী সময়ে বামপন্থীরা এটাকে শুধুমাত্র ত্বত্তকথার মধ্যে আটকে না রেখে বাস্তবে এর প্রতিফলন করে দেখিয়েছে। যার উদাহরন হিসেবে সারা রাজ্য জুড়ে অত্যন্ত সাফল্যের সাথে চলা নানান ধরনের শ্রমজীবি ক্যান্টিন এর কথা বলা যায়। এই ক্ষেত্রে যাদবপুরের জ্যোতি দেবী শ্রমজীবী ক্যান্টিন থেকে শুরু করে সারা রাজ্য এবং এর অন্তর্গত জেলা জুড়ে এই ধরনের ক্যান্টিন গুলির বিস্তার ঘটছে। সাম্প্রতিক সময়ে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে এই ধরনের একাধিক ক্যান্টিন গড়ে উঠেছে। যেমন উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জের শ্রমজীবী ক্যান্টিনের এর কথা বলা যায়। এই ক্যান্টিনটি নামমাত্র মূল্যে পুষ্টিকর খাবার পরিবেশন করছে। এই ক্যান্টিনটি আজকের দিনে তার কার্যকাল একমাস পূরণ করল। এটা একটা অসাধারণ সাফল্য ও গর্বের বিষয়। এমন উদাহরণ অনেক দেওয়া যায়। কিন্তু এই স্বল্প আলোচনার পরিসরে এটা সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের প্রদেয় চাঁদা ও সাহায্যের ভিত্তিতে এই ক্যান্টিনগুলি কাজ করে যাচ্ছে। আজকের  সময়ে দাঁড়িয়ে বামপন্থীদের এই প্রচেষ্টা শুধুমাত্র ক্যান্টিনের প্রতিষ্ঠার মধ্যে আবদ্ধ নেই। সস্তার সব্জি বাজার, করোনা সাহায্য কেন্দ্র, নিভৃতবাস নির্মাণ ,পরিযায়ী শ্রমিকদের নানাবিধ সাহায্য, বিনামূল্যে রেশন বিলি সহ অনেক কাজ বামপন্থী ছাত্র যুবরা করছে। এটাকে শুধুমাত্র নির্বাচনী লড়াইয়ের সিঁড়ি হিসাবে বামপন্থীরা দেখেন না। এর থেকে অনেক বৃহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে বামপন্থীরা এই কাজ করে যাচ্ছেন। আর এখানেই বামপন্থীদের অনন্যতা নিহিত রয়েছে। 

263