সুকুমার বাড়ই

বিশেষ প্রতিবেদন, অক্টোবর ১,২০২০: ১ লা অক্টোবর, এদেশের জাতীয় রক্তদান দিবস। এই রক্তদান দিবসের একটা ইতিহাস আছে। আর সে ইতিহাসের নায়ক হলেন ডা. জয় গোপাল জলি ( জে জি জলি)। তাঁর অদম্য প্রয়াস রক্তদানের মত মহান ব্রতকে উৎসবে পরিণত করেছে। এই রক্তদান আন্দোলন একদিনে গড়ে ওঠেনি। আমাদের দেশের মত জায়গায় যেখানে সংস্কারে ভরা মানুষের মন সেই দেশে তিনি অসাধ্য সাধন করে গেছেন। সম্প্রতি চলছে করোনাকাল। তাতে আমাদের রাজ্যে সামনেই দুর্গাপুজো। এবং তারপরই বিধানসভার ভোট। সব মিলিয়ে যে রক্ত সংকট দেখা দিয়েছে এবং দেবে তা নিয়ে এখনই না ভাবলে দেশ ও রাজ্য যে সমুহ বিপদের সামনে তা নিয়ে বোধকরি কারো সন্দেহ নেই।

প্রায়ই খবরের কাগজে দেখা যায়, মারণ করোনার জেরে রক্তের সঞ্চয় শূন্য অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালের ব্লাডব্যাঙ্কে। অথচ এই সময়েও প্রচুর রোগীর রক্তের প্রয়োজন। কিন্তু করোনা আবহে সেভাবে রক্তদান শিবিরের আয়োজন করা যাচ্ছে না। অনেক সংগঠনই পিছিয়ে আসছে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো ভিড় এড়াতে ইচ্ছে থাকলেও তা সম্ভব হয়ে উঠছে না । ফলে তৈরী হয়েছে রক্তের সংকট।
যে পরিমাণ রক্তসংকট তৈরি হয়েছে জেলায় জেলায় , তা কিভাবে সামাল দেবে রাজ্য, তার হিসেব কষতেই দিশেহারা সকলে। আসলে রক্তের যোগান ও চাহিদায় বিস্তর ফারাক আছে। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিকল্পনার অভাবে নষ্ট হচ্ছে জীবনদায়ী রক্ত। এই মুহুর্তে কতটা রক্ত সংকটের মুখোমুখি রাজ্য, সমাধানের পথই বা কি? তা নিয়ে কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবক সংস্থা ছাড়া কারুর তেমন হুশ নেই।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রাজ্যে সরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের সংখ্যা আটান্ন। কেন্দ্রীয় সরকারের ব্লাড ব্যাঙ্ক ষোলো। বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের সংখ্যা পঁয়ত্রিশ। রাজ্যে প্রতি বছর রক্তের চাহিদা দশ লক্ষ ইউনিট। মাসের হিসেবে সংখ্যাটা তিরাশি হাজার তিনশো চৌত্রিশ ইউনিট।

এই ফাঁকে জানিয়ে রাখি রাজ্যে প্রতি বছর কত পরিমাণ রক্ত জমা হয়। বছরে রাজ্যের সংগ্রহ চার লক্ষ একষট্টি হাজার পাঁচশো তেরো ইউনিট রক্ত। কেন্দ্রীয় ব্লাড ব্যাঙ্কগুলির সংগ্রহ এগারো হাজার দুইশো সাঁইত্রিশ ইউনিট। আর বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কগুলির সংগ্রহ দুই লক্ষ বিরাশি হাজার ছয়শো ছাপ্পান্ন ইউনিট। মোট সংগ্রহ সাত লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার চারশো নয় ইউনিট। দেখা গেল এতে কিন্তু পূরণ হয় না রক্তের চাহিদা। রাজ্যে বার্ষিক রক্তের ঘাটতি দুই লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজার পাঁচশো একানব্বই ইউনিট। মাসে রক্তের ঘাটতি দু হাজার তিনশো বিরাশি ইউনিট। অর্থাত্‍ রাজ্যে প্রতিদিন রক্ত পাচ্ছেন না ছশো আশিজন। সাম্প্রতিক সময়ে এই ঘাটতি আরও বেশি।

কেন এই রক্ত সংকট? এর পেছনে আছে নানা কারণ। রাজ্যে তিরিশ শতাংশ রক্তদান শিবির বর্তমানে বন্ধ। এর প্রধাণ কারণ করোনা। তাছাড়া যুব সমাজ কর্মহীন। পেটের খোরাক মেটাতে তারা হিমশিম খাচ্ছে। প্রথম দিকে স্বাস্থ্য দপ্তর রক্তদান শিবিরের অনুমতি দিলেও বাঁধা দিয়েছিল পুলিশ প্রশাসন।ফলে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা রক্তদান শিবির আয়োজনে উৎসাহ হারায়। পরে অবশ্য পুলিশও রক্তদান শিবিরের আয়োজন করেন।

শুধু কি রক্তদান শিবির বন্ধ হওয়াই রক্ত সংকটের মূল কারণ? সেটা মানতে নারাজ অনেকেই। তাঁদের মতে ব্লাড ব্যাঙ্কগুলিরও যথাযথ পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম.

  • বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রক্ত বিভাজন ও সংরক্ষণের ব্যাবস্থা না থাকায় জমানো রক্ত অব্যবহৃত থেকে যায়।
  • বিকেল পাঁচটার পর সরকারি ব্লাডব্যাঙ্কে রক্ত নেওয়া হয়না।
  • রক্ত সংগ্রাহকদের সংখ্যা দিনকে দিন কমে যাচ্ছে।
  • দুর্গাপুজো, নির্বাচন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মত বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে রক্ত সংকটের প্রচার হয়না।
  • সংরক্ষণের অভাবের জন্য অনেক সময় নষ্ট হয় রক্ত।
  • পাউচের ব্যবস্থা না থাকায় শিশু কিম্বা নবজাতকদের রক্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে এই সমস্যা হয়। কারণ তাদের শরীরে যে রক্ত লাগে, একটা পূর্ণ বয়স্ক মানুষের শরীরে সেই পরিমাণ রক্ত লাগে না। ফলে বাকি রক্ত অপচয় হয়।
  • কোথাও কোথাও রক্তদান বিষয়ে হেল্পলাইন চালু হলেও তা বাস্তবে কাজে আসে না।

আজকাল রক্তদান উত্‍সবে পরিণত হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন । কোথাও কোথাও দেখা যায় রক্তদাতাদের উপহার দেওয়ার জন্য ক্লাবগুলোর মধ্যেও চলে প্রতিযোগিতা। তাই যাঁরা ভালো উপহার দিতে পারেন না, তাঁদের রক্তদান শিবিরেও সাড়া মেলে না। সমস্যা আরও আছে। প্রয়োজনের সময় কোন গ্রুপের রক্ত কোন ব্লাড ব্যাঙ্কে আছে, তা আগাম জানতে না পারায় ব্লাড ব্যাঙ্ক গুলিতে ঘুরে ঘুরে হয়রানির শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে। সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে অশনি সংকেত দেখছেন চিকিত্‍সকসহ সাধারণ মানুষ। রক্ত সংকট মেটাতে আরও বহু জে জি জলির প্রয়োজন আমাদের দেশে তথা রাজ্যে । এখন স্বেচ্ছাসেবী রক্তদানকারীদের আমরা সব জায়গায় লক্ষ্য করে থাকি তা কিন্তু একদিনে হয়নি। এর জন্য আমাদের দেশে বহু আন্দোলন হয়েছে। বহু সমাজসেবীর আজীবন কর্মপ্রয়াসের ফলে আজ এই স্বেচ্ছাসেবী রক্তদান উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে। আর এই স্বেচ্ছাসেবী রক্তদান আন্দোলনের পথিকৃৎ ছিলেন ডা. জয় গোপাল জলি। তাঁর অগাধ অবদানকে স্বীকৃতি জানাতে ও তাঁকে স্মরণে রাখতে ১ অক্টোবর ভারতের জাতীয় রক্তদান দিবস পালিত হয়। জয়গোপাল জলি ছিলেন ভারতের ট্রানস্ফিউশন মেডিসিনের জনক। তাঁর জন্মদিনকে উপলক্ষ করে পালিত হয় জাতীয় রক্তদান দিবস। ভারতের পেশাদার রক্ত-দাতাদের থেকে রক্ত ক্রয় ও বিক্রয় নিষিদ্ধ করার অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এই মানুষটি। যা পরবর্তী সময়ে ভারতীয় রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ১ অক্টোবর রক্তদাতা দিবস পালনের মধ্য দিয়ে রক্তদান কর্মসূচির তাৎপর্য সম্পর্কে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করেছিলেন তিনি। আজও সেই ধারা বহমান। এই রক্তদাতা দিবস পালন স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে রক্তদানের সহায়তা করে আসছে।। দিনের-পর-দিন জনসংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অসুস্থ ও মুমূর্ষ রোগীর সংখ্যা। কিন্তু সেই তুলনায় রক্তদাতার সংখ্যা বাড়ছে না। হাসপাতাল কর্মীদের রক্ত নিয়ে ব্যবসা ছাড়াও রয়েছে হাজারো সমস্যা। যে মানুষটির জন্য আজ জাতীয় রক্তদাতা দিবস হিসেবে পালন করা হয় সেই মানুষটি ১৯২৬ সালের ১ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর এই ৯৫ তম জন্মদিনে তাঁর অনবদ্য অবদানের কথা সকলেই স্বীকার করেন।সারা দেশে যেভাবে করোনাকালে রক্ত সংকট দেখা দিয়েছে তাতে দেশে আরো জয়গোপাল জলির প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন ওয়াকিবহাল মহল। এই মানুষটি চন্ডিগড়ের পোস্ট গ্রাজুয়েট ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল এডুকেশন রিসার্স এর ডিপার্টমেন্ট অব মেডিসিনের এমিরিটাস প্রফেসর ছিলেন। তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রক্ত স্থানান্তর বিশেষজ্ঞ। ভারতে তিনি ছিলেন স্বেচ্ছায় রক্তদান আন্দোলনের প্রকৃত পথ প্রদর্শক। তাঁকে ভারতের স্থানান্তর চিকিৎসার জনক বলা হয়। তিনি রক্ত ক্রয়-বিক্রয়ের ঘোর বিরোধী ছিলেন। এটি ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে সংযুক্ত হয়। তিনি জনগণকে সচেতন করতে নানা রকমের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। স্বেচ্ছাসেবকদের রক্তদান এর মধ্যে অন্যতম। তাঁর এই ভাবনা রক্তদানকে আন্দোলন পরিণত করে। পরে তা উৎসবে পরিণত হয়। ডা. জয়গোপাল জলি চন্ডিগড়ে ব্লাড ব্যাংক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ব্লাড ট্রান্সফিউশন এন্ড ইমিউনো হ্যামিওটলজির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। রক্ত পরিকল্পনা নিয়ে তিনি প্রচুর কাজ করেছেন। স্বেচ্ছা রক্তদান আন্দোলন ছিল তাঁর ধ্যান -জ্ঞান। তাঁর এই যুগোপযোগী কাজকে স্বীকৃতি দিতে বহু দেশি ও আন্তর্জাতিক সংস্থা তাঁকে দিয়েছেন সম্মাননা।
তিনি ওয়ার্ল্ড হেলথ ওরগাইজেশন, ইন্টার্নেশনাল সোসাইটি অফ ব্লাড ট্রান্সফিউশন এবং ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অফ হিমোফিলিয়া থেকে সম্মানিত হয়েছেন। ১৯৫৮ সালে লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জে জি মুখার্জি গোল্ড মেডেল পান তাঁর অসাধারণ গবেষণার জন্য। ডঃ বি সি রায় ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পান ১৯৮১ সালে। ফিলিপ লিভাইন মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড পান ১৯৯৩ সালে। আই ডি পি এল ডায়মন্ড জুবিলি আই এম এ ওরাসান অ্যাওয়ার্ড১৯৯৬ সালে। ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর এই মহান মানুষটির জীবন প্রদীপ নির্বাপিত হয়। তাঁর কর্ম, তাঁর,চেতনা, তাঁর সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে অসীমকাল। মানুষটি সারা জীবন ধরে যেভাবে স্বেচ্ছাসেবী রক্তদান আন্দোলনকে একটি মানবিক আন্দোলন তথা উৎসবে রূপান্তরিত করে গেছেন তা আজ মানবতার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। বর্তমান সময়ে বিশেষ করে পশ্চিমবাংলায় সামনে দুর্গাপুজো, তারপরেই আছে বিধানসভার নির্বাচন। একে করোনা জের তারপরে দুর্গাপুজো এবং নির্বাচনের কারণে রক্ত সংকট যে আগামীতে আরও বাড়বে সে নিয়ে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। রাজ্যে এবং দেশে দিনকে দিন যেভাবে নানা ধরনের রোগের প্রকোপ বাড়ছে তাতে স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতাদের আরো বেশি করে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারকে এ বিষয়ে সদর্থক ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। বিভিন্ন সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। সর্বোপরি এগিয়ে আসতে হবে যুব সমাজকে।

এক্ষেত্রে ওয়েস্ট বেঙ্গল ভলান্টারী ব্লাড ডোনারস ফোরাম অসাধারণ কাজ করে চলেছে। রায়গঞ্জের সুব্রত সরকার,কৌশিক ভট্টাচার্য সহ অনেকেই এই কাজে যথেষ্ট ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। এই স্বেচ্ছাসেবী রক্তদান আন্দোলনকে সার্বিকভাবে আরো বেশি সফল করতে হলে প্রয়োজন আছে আরও জয়গোপাল জলির মতো মহানুভব মহাত্মা। জাতীয় রক্তদাতা দিবসে ডা. জলির পাশাপাশি যে সমস্ত স্বেচ্ছাসেবক সংস্থা এবং তাদের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে রক্তদান শিবির সংগঠিত করেন এবং এই রক্তদানকে উউৎসাহিত করেন ও রক্তদানের মধ্য দিয়ে রোগীদের প্রাণ বাঁচানোয় লিপ্ত থাকেন তাঁদের এই কর্মপ্রয়াসকে সম্মান জানানোরও দিন আজকে। তাই এই দিনে আন্তরিক শ্রদ্ধা নিবেদন করি ডা. জলি, স্বেচ্ছা রক্তদাতা ও রক্তদান শিবিরের আয়োজনকারী স্বেচ্ছাসেবীবন্ধুদের।

171