সোমা সরকার

ঐ শুনছো,
আলু শেষ। নিচ থেকে এনে দেবে?

না, পারবো না। যা আছে তাই দিয়ে করে ফেলো রান্না। বিকেলে আনা যাবে। আমি এখন কাজ করছি।

ভাস্করের কথা শেষ হতে না হতেই মঞ্জু গজগজ করে বলে উঠলো, আচ্ছা বাপু ঠিক আছে। আলু কি আর আমি খাবো?
মাংসের বাটিতে আলু না পড়লে তো আপনারই মুখটা বেজার হবে। থাক আমিই যাচ্ছি। আগে যাওবা হরেনের বউকে ফোন করলে ঘরে মাল পৌঁছে দিতো সেটাও এখন বন্ধ। ভাস্কর বাবুর ১ টাকা ২ টাকার হিসেবের জন্য।

ধুর ভাললাগে না..

এতক্ষণ চুপ থাকলেও হরেনের দোকানের কথা আসতেই ভাস্কর এক লাফে খাট থেকে নেমে দাঁড়াল।

থামো….
ওখানে যেতে হবে না। ও বেটা বহুত দাম বেশি নেয়।তারপর আবার জ্ঞানের কথা। যত টুকু মুখ না তত বড়ো কথা বলে।

এমনিতেই বাজারে আলু ৩৫ টাকা কেজি। ওর দোকানে গেলে আরো বেশি হবে।

আমি বাইক নিয়ে বাজার থেকে এনে দিচ্ছি।
ব্যাগ দাও।

ভাস্কর বেড়িয়ে যেতেই মঞ্জু রান্না ঘরে ঢুকে মশলা করতে লাগলো।

এর মধ্যেই বাড়িতে ফেলে যাওয়া ভাস্করের ফোনটা বেজে উঠলো। মঞ্জু ফোন তুলতেই ওপার থেকে একটু উদ্বেগের স্বরে মঞ্জুর দাদা সুপ্রতীক বললো, হ্যাঁরে ভাস্কর কই?ওকে ফোনটা দে।

ও তো বাজারে দাদা।
২ টাকা বাঁচাতে ১০ টাকার তেল পুড়িয়ে বাজার গেছে আলু আনতে।

আচ্ছা শোন, ভাস্কর বাড়ি আসলে কল করতে বলিস আমাকে।
দরকার আছে।

কিছু পর ভাস্কর আসলো। যথারীতি মঞ্জু ভুলে গেলো দাদার কথা বলতে।

তেল ঝাল মশলা সহযোগে মাটনটা জমিয়ে রাঁধল। সাথে সাদা ভাত, টমেটোর চাটনি, পাপড় ভাজা।

স্নান খাওয়া শেষে ভাস্কর একটু ঘুমানোর জন্য যেই না বিছানায় গেলো অমনি ফোন।
ফোনটা হাতে নিয়ে নামটা দেখতেই মুখ খিচিয়ে বিরক্ত নিয়ে বললো,
মঞ্জু,তোমার দাদার ফোন। নাও এখন বকবক করো।

মঞ্জু জিভটা দাঁত দিয়ে চেপে একটু আস্তে আস্তেই বললো….

ঐ শুনছো, ফোনটা তোমার জন্যই। আমি বলতে ভুলে গেছি।

একবার ফোন কেটে যাওয়ার পর আবার ফোন। বাধ্য হয়ে ফোনটা ধরলো ভাস্কর। ওপার থেকে আওয়াজ আসলো, তোমার জামা কাপড় একটা ব্যাগে রাখো।প্রয়োজনীয় যা লাগে তা নাও। তোমার টেস্ট রিপোর্ট পজিটিভ। সন্ধ্যায় হাসপাতালের গাড়ি যাবে।

কথা গুলো শুনে ভাস্কর চুপ।একটু থেমে বললো, কি বলেন?
এইতো কদিন আগে রিপোর্ট নেগেটিভ এলো।
এখন আবার পজিটিভ কি করে??
আপনার ভুল হচ্ছে কোনো?

সুপ্রতীক খুব ধীরে ধীরেই বললো, ওখানে যারা থাকে ওরা যে কি করে বলা কঠিন। তবে তোমাকে নিয়ে আরো কজনের রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছিলো। আজ তাদের মধ্যেই তোমার সহ আরো দুজনে পজিটিভ এসছে রিপোর্ট।

ভাস্কর চুপ।আতঙ্কিত খুব।কোনো ক্রমে ফোন রেখে মঞ্জুকে সব কথা বললো।
আর অপেক্ষা করতে শুরু করলো গাড়ি আসার। মঞ্জু কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেললো। বারবার দাদাকে ফোন। কি হবে এখন? কি হবে এখন?

আর এদিকে ফ্ল্যাটে সবাই ইতি মধ্যেই জেনে গেছে ভাস্কর নেগেটিভ নয় বরং করোনা পজিটিভ। এ ওকে ফোন করছে।ফিসফাস চলছে। আমরা বুঝি আর বাঁচবো না।
কি হবে আমাদের…

চারি দিকে গেলো গেলো রব।
ভাস্করের একটাই আতঙ্ক। সে হাসপাতালে গেলে তার পরিবারকে কে দেখবে??
কেউ তো আসবে না।
ওদের দরকারের জিনিস কে দেবে……
পাশে কে থাকবে?

রাত ৮ টা নাগাদ গাড়ি ফ্ল্যাটের গেট থেকে একটু দূরে দাঁড়ালো। উৎসুক চোখ গুলো ফ্ল্যাটের বারান্দা,জানালা ঠেলে বেড়িয়ে আসতে চাইছে।

ছাদে সেফ ডিস্টেন্স মেইনটেইন করে অনেকে অপেক্ষা করছে ভাস্করকে গাড়িতে উঠতে দেখবে।

নিজের ফ্লোর থেকে নেমে ভাস্কর দেখলো গেটের বাইরে ওর বউএর দাদা সুপ্রতীক দাঁড়িয়ে আছে। আর
আর দাঁড়িয়ে আছে হরেনের বউ।

জল চোখে সুপ্রতীককে ভাস্কর বললো দাদা ওদের খোঁজ রেখো।
হরেনের বউ খানিকটা আগ বাড়িয়েই বললো দাদা আপনি চিন্তা করবেন না। আপনি সুস্থ হয়ে ফিরুন। আমরা আছি। আপনি নিশ্চিন্তে যান।

70