ডাঃ দেবব্রত রায়

বিশেষ প্রতিবেদন, সেপ্টেম্বর ২১,২০২০: করোনার কমিউনিটি সংক্রমণ তত্ব ( Community Transmission) অনেক দেরিতে সরকারি শিলমোহর পেয়েছে বলে অনেকের ধারণা। যার অর্থ এখন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে প্রচুর সংখ্যক মানুষ সংক্রমিত হবেন। এবং হচ্ছেনও।সবার মধ্যে হয়তো রোগের লক্ষণ তেমনভাবে প্রকাশ পাবে না। ডাক্তারি পরিভাষায় যাদের asymptomatic বলে।  

প্রতিদিন এ দেশে প্রায় এক লক্ষ মানুষের  করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ছে। এর বাইরেও থেকে যাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ যাঁরা কোনো না কোনো কারণে নিজেদের উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা করাবার সাহস পাচ্ছেন না বা উপসর্গহীন ভাবে ঘুড়ে বেড়াচ্ছেন। আমাদের রাজ্যে  কলকাতার সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এই পরীক্ষার সুযোগ থাকলেও দেশের এবং রাজ্যের অধিকাংশ জায়গাতেই সরকারি পরিকাঠামোই একমাত্র ভরসা। স্বাভাবিকভাবে আশঙ্কা করা যায় যে পর্যাপ্ত সংখ্যক পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলে এবং সবাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পরীক্ষা করালে এই সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কেউ বলতে পারবে না।

আক্রান্তের সংখ্যা ভয়াবহ হলেও আশার আলোও আছে বৈকি।

পরিসংখ্যান বলছে মোট আক্রান্তের 80% হয় কোনো উপসর্গ থাকে না বা থাকলেও   জ্বর সর্দি কাশির মতো অতি সাধারণ কিছু উপসর্গগুলো থাকে যে উপসর্গগুলো প্রতিবছরই ঋতু পরিবর্তনের কারণে আমরা দেখে থাকি। এই ধরনের রোগীদের চিকিৎসায় বিশেষ কোনো ওষুধেরই প্রয়োজন হয় না অথবা খুব সামান্য বাজারচলতি ওষুধেই এঁরা রোগমুক্ত হ’ন। 10 শতাংশ রোগীর অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় যা বাড়িতে বা হাসপাতালে দেওয়া যেতে পারে। সঙ্গে বিশেষ ওষুধপত্র এবং মাত্র 5% জটিল পর্যায়ে  চলে যায় ।এঁদের এন্টিভাইরাল, স্টেরয়েড, হাই ফ্লো অক্সিজেনের সঙ্গে সঙ্গে আইসিইউ এবং ভেন্টিলেশান সাপোর্ট লাগে। এ কথা ঠিক যে লক ডাউনের একটা উদ্দেশ্য যেমন সংক্রমণের প্রবাহ পথ ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা , তেমনি অন্য উপযোগিতা হল এই সময়টাতে দেশের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো শক্তিশালী করা যাতে এই মহামারীর মোকাবিলা করা যায়।

লক ডাউনের এই দীর্ঘ  সময়টাকে আমরা পরিকাঠামো তৈরীর কাজে ঠিকঠাক লাগাতে পেরেছি কি পারিনি অতিমারীর এই পর্যায়ে পৌঁছে এই প্রশ্ন অবান্তর। যেটা কঠোর বাস্তব সেটা হলো এই যে এই মুহূর্তে লভ্য পরিকাঠামোতে আক্রান্তদের সবাইকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করানো সম্ভব নয়। বিপুল সংখ্যক রোগী এবং সরকারি এবং বেসরকারি স্তরে  পরিকাঠামোর অপ্রতুলতা এর সহজবোধ্য কারন। সেই কারণে সরকারের নতুন নির্দেশিকা অনুসারে উপসর্গহীন অথবা সামান্য উপসর্গ যুক্ত রোগীদের বাড়িতে থেকে চিকিৎসা সম্ভব যদি অবশ্য নির্দিষ্ট কিছু ব্যবস্থা বাড়িতে থাকে বা করানো যায়। । যার পোশাকি নাম ‘হোম আইসোলেশন’। এই মুহূর্তে সমস্ত বাস্তব দিক বিবেচনা করে এছাড়া  উপায়ান্তর নেই। ‘ হোম আইসোলেশানে’র ক্ষেত্রে

কিন্তু প্রশ্ন এবং শঙ্কা  কিছু থেকেই যায়। হোম আইসোলেশন এর সবচেয়ে বড় সমস্যা যদি হয় বাড়িতে  স্থানাভাব এবং উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাব তবে আর এক বড় অন্তরায় বোধহয় পারিপাশ্বির্ক পরিস্থিতি । শুধুমাত্র কোভিড রোগীদের পরিষেবা দেবার ব্যবস্থা দেখভালের কারনে যে দেশে প্রশাসনিক কর্তাকে হেনস্থা হতে হয় আর হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা করছেন বলে চিকিৎসক স্বাস্থ্য কর্মীদের বাস্তুচ্যুত করার চেষ্টা হয় সেখানে বাস্তবে  পরিস্থিতি কতটা বিরুদ্ধ সেটা সহজেই অনুমেয়।

   একটা অত্যন্ত  অস্বস্তিকর প্রবণতা  বহুদিন থেকে সাধারণের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। । যে কেউ একজন কোভিড পজিটিভ হলেই মুখে মুখে রটে যাচ্ছে  – ওই পাড়ায় একজন ধরা পড়েছে। যেন কোনো মারাত্মক অপরাধী অপরাধের জুলুমে ধরা পড়েছে এবং আরো আশ্চর্যজনকভাবে প্রশাসন এমনভাবে তার সমস্ত শক্তি নিয়ে হৈ চৈ করে অকুস্থলে পৌঁছুচ্ছে যেন কোন আতঙ্কবাদী গ্রেফতারে নেমেছে । আশঙ্কা সেখানেই। সক্রিয়তা অবশ্যই দরকার কিন্তু এই ধরনের অতি সক্রিয়তা জনমানসে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে এবং এক সামাজিক অবরোধ এবং আশঙ্কার জায়গা তৈরি হচ্ছে।  ঠিক এই পরিস্থিতি এড়াতেই অনেক মানুষ আতঙ্কে টেস্টিংএই যাচ্ছেন না।অনেকেই কোভিডকে যত না ভয় পাচ্ছেন তার চেয়ে আতঙ্কিত হচ্ছেন পজিটিভ হ’লে নিজের এবং পরিবার কোন পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির শিকার হবেন সেই ভয়ে। প্রত্যেকটি মানুষকে বুঝতে হবে পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে তাতে প্রত্যেকটি মানুষই সংক্রমিত হবেন বলেই অনুমান। এবং এমনটি হলে তাঁকেও বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা করাতে হতে পারে।কারণ হাসপাতালে ঠাঁই পাবার সম্ভাবনা কম বস্তুত অধিকাংশ আক্রান্তের তার প্রয়োজনই হবেনা।  যতই আমরা বলি , শুনি আর শোনাই না কেন যে ”আমাদের রোগের সঙ্গে লড়তে হবে রোগীর সঙ্গে নয়”- পারিপার্শ্বিক পরিবেশ কিন্তু অন্য ইঙ্গিত দেয়। সেই চেতনা সবার মধ্যে না এলে ‘হোম আইসোলেশানের’ ধারণাটাই মার খাবে। যার ফল ভুগতে হবে সবাইকে। যেমন লকডাউন প্রক্রিয়াটিকে ছেলেখেলায় পরিণত করে এখন তার গুনাগার দিতে হচ্ছে সবাইকে।

83