ফটো ও লেখা: শুভময় ব্যানার্জি


এদের প্রথম দেখাতেই পাতিহাঁস বলে মনে হলেও, এরা হাঁস গোত্রেরই অন্য প্রজাতির খুবই আকর্ষণীয় দেখতে একটি পাখি। এই পাখিটির বাংলা নাম চখাচখি। চখাচখি বলতে একটি হাঁস কে আলাদা করে বোঝায় না, বরং একজোড়া হাঁস কে বোঝায়। জোড়ার যে পুরুষ হাঁস টি থাকে তাঁকে চখা ,আর স্ত্রী হাঁসটিকে চখি নামে ডাকা হয়।
যদিও এই চখা-চখি নামকরণের পিছনে একটি কথিত গল্প আছে, যে এই পাখিদের জোড়ার বন্ধন এতই অটুট যে জোড়ার কোন একটি পাখির যদি কোন কারনে মৃত্যু হয় তাহলে জোড়ার অন্য পাখিটিরও মৃত্যু হয়। আর এই জোড়ার বন্ধনের কথা মাথায় রেখেই এদের একত্রে বাংলায় চখাচখি নামে ডাকা হয়।

বাংলায় পুরুষ পাখির নাম: ‘চখা’ স্ত্রী পাখির নাম:‘চখি,’ একত্রে নাম হয়েছে চখা-চখি। ইংরেজি নাম: ‘রাড্ডি শেলডাক’ (Ruddy Shelduck), বৈজ্ঞানিক নাম: ‘টাডোর্না ফেররুগিনি’ (Tadorna Ferruginea),
গোত্রের নাম:’অ্যানাটিডি’।


বিস্তৃতি:-
এই পাখি সাধারণত শীতের মরসুমে আমাদের দেশে পরিযায়ী পাখি হিসেবে আসে ।এশিয়ার তুরস্ক থেকে জাপান পর্যন্ত এদের বিস্তৃতি। আফ্রিকা ,ইউরোপ, এশিয়াতে চখাচখির উপস্থিতি সাধারণত লক্ষ্য করা যায়।


দেহের গঠন:-
চখা চখি উভয়ের চোখ বাদামি। ঠোঁট ,পা ও পায়ের পাতা কালো বর্ণের হয় । এরা আকারে বেশ বড় এবং ওজন প্রায় দেড় কিলোগ্রাম হয়ে থাকে। এদের দৈর্ঘ্য কম বেশি ৬৪ থেকে ৬৬ সেন্টিমিটার, ডানা ৩৬ সেন্টি মিটার, ঠোট ৪.৩ সেন্টিমিটার, পা ৬ সেন্টিমিটার, এবং লেজ ১৪ সেন্টিমিটার।
একই রকম দেখতে হলেও চখা-চখির মধ্যে কিছু পার্থক্য থাকে। স্ত্রী পাখিগুলি (চখি) পুরুষ পাখির( চখা) চেয়ে আকারে কিছুটা ছোট হয়।পুরুষ পাখি কমলা বাদামি থেকে দারুচিনি বর্ণের । মাথা ও ঘাড় হালকা বাদামী রঙের ।ডানা সবুজ, সাদা, কালো এবং বাদামী বর্ণে সংমিশ্রিত। এদের ডানা মেলে আকাশে উড়ার সময় ভারতের জাতীয় পতাকার তিনটি রংয়ের সাথে মিল পাওয়া যায় । প্রজনন ঋতুতে পুরুষ পাখির (চখা) গলায় শুরু কালো বলয় তৈরি হয় ,যা স্ত্রী পাখির( চখি) ক্ষেত্রে দেখা যায় না।


খাদ্যাভ্যাস:-
এদের সাধারণত পলিময় উপকূল অঞ্চল, হাওর ,নদ-নদীতে ,বেশি বিচারণ করতে দেখা যায়। স্বভাবে এরা নিশাচর হলেও, ভোর সন্ধ্যার দিকে বেশি বিচরণ করে। চখাচখি সর্বভুক পাখি । খাদ্য হিসেবে এরা সাধারণত ঘাসের কচি ডগা, শস্যদানা, শামুক ,কাঁকড়া জাতীয় প্রাণী ,জলজ পোকামাকড়, ছোট মাছ ,সাপ ,এসব কিছুই খেয়ে থাকে।


প্রজনন:-
এদের প্রজনন কাল সাধারণত মে- জুন মাস । এরা উঁচু মালভূমি বা জলাভূমির কাছাকাছি গর্তে পালক দিয়ে বাসা বানিয়ে ৮ থেকে ১০টি করে ডিম পাড়ে। স্ত্রী পাখিরা একাই ডিমে তা দেয়। ডিম ফুটতে ২৮ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায় এবং শাবক গুলি ৫৫ দিনের মধ্যে উড়তে শিখে যায়।
প্রজনন মৌসুমের পর এদের শরীরের সমস্ত পালক পরিবর্তিত হওয়ার কারণে প্রায় একমাস এরা উড়তে পারে না।


সংরক্ষণ:-
বর্তমানে, পৃথিবীতে এই পাখিদের অবস্থা খুব একটা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে এখনো পৌঁছায়নি ,এই কারণে আই.ইউ.সি.এন এই প্রজাতিটিকে ন্যূনতম বিপদযুক্ত বা Least Concern বলে ঘোষণা করেছে ।
তবে বাড়তে থাকা অপরিকল্পিত আবাসন ও উন্নয়নের কারণে সৃষ্ট দূষণ , ব্লাড ফ্লু এর মত রোগের ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি ,চখাচখি দের অস্তিত্বকে বিশ্বব্যাপী সমস্যার সম্মুখীন করে তুলেছে । এছাড়া বহু দেশে শিকারিদের মাংসের লোভে প্রচুর সংখ্যায় চখাচখির শিকারের প্রবণতা , পাখি গুলির জীবন সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

20