আইনজীবী রজত দে হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষণার কথা ছিল সোমবার। কিন্তু তা পিছিয়ে যায়৷ দিন ধার্য হয় ১৬ সেপ্টেম্বর৷ তিনি কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী ছিলেন৷ ডিভোর্স না দেওয়ায় আইনজীবী স্বামীকে খুন করে আইনজীবী স্ত্রী অনিন্দিতা। এদিন স্ত্রীকে দোষী সাব্যস্ত করল আদালত।

২০১৮ সালের ২৫ নভেম্বর নিউটাউন ডিবি ব্লকে আইনজীবী রজত দে-কে রহস্যজনকভাবে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। কয়েকদিনের মধ্যেই ডিসেম্বর মাসের ১ তারিখে রজত দে খুনের অভিযোগে পুলিশ গ্রেফতার করে তারই আইনজীবী স্ত্রী অনিন্দিতা পাল দেকে। অর্থাৎ গ্রেফতার হওয়ার এক বছর নয় মাস চোদ্দো দিন পর আইনজীবীর রহস্যময় হত্যা মামলার রায় শোনাবে বারাসত আদালত।

জন মানসে আলোড়ন ফেলা রজত দে হত্যা মামলা ছিল চাঞ্চল্যকর প্রসঙ্গ। অবশেষে এই মামলার রায় ঘোষণা করতে চলেছে বারাসত আদালত। আইনজীবী খুনে ধৃত অনিন্দিতা পাল দের জন্য আদালতের কোন রায় অপেক্ষা করে আছে তা আজ শোনার প্রতীক্ষায় উদগ্রীব বাদী-বিবাদী পক্ষ তথা আইনজীবী মহল। কারণ খুন হওয়া রজত দে ও তার খুনে অভিযুক্ত অনিন্দিতা পাল দে উভয়েই আইনজীবী এবং স্বাভাবিক কারণেই উভয়েই বহু আইনজীবীর ঘনিষ্ঠ।

ফলে যুগপৎভাবে অত্যন্ত মর্মান্তিক একটি ঘটনা ও কৌতূহল উদ্রেককারী এক মামলার যবনিকা পড়া সময়ের অপেক্ষা মাত্র। গ্রেফতার হওয়ার ঠিক দশ মাসের মাথায় ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বারাসাত আদালত থেকে জামিন পেয়েছিলেন অনিন্দিতা পাল দে। ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর বারাসত আদালত থেকে অনিন্দিতা পাল দে জামিন পেলেও তা ছিল অস্থায়ী রক্ষাকবচ। দ্ৰুত মামলার রায় ঘোষণার দিকে লক্ষ্য রেখে এগোতে থাকে বিচার প্রক্রিয়া।

প্রসঙ্গত, পুলিশ ২০১৮ সালের ২৫ নভেম্বর নিউটাউনের বহুতল আবাসনে নিজের ফ্ল্যাটে ৩৪ বছর বয়সী রজত দে কে মৃত অবস্থায় পাওয়ার পরে পুলিশ একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু বা ইউডি-র মামলা রুজু করে। কিন্তু এরপরেই মৃতের বাবা সমীর কুমার দে র অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ একটি খুনের মামলা রুজু করে। মৃতের বাবা সমীর কুমার দে অভিযোগ করেন তাঁর পুত্রবধূ অনিন্দিতা পাল দের এই হত্যাকাণ্ডে যোগ রয়েছে।

একই সঙ্গে তিনি অভিযুক্ত অনিন্দিতার মা-বাবা এবং ভাইয়ের নামেও অভিযোগ করেন। শুরু হয় তদন্ত। নিউটাউন থানায় ডাকও পড়ে অনিন্দিতার। তিনি পুলিশকে জানান রজতদের মৃত্যু ছিল স্বাভাবিক৷ অটোপসি রিপোর্ট প্রকাশ পেতেই তদন্ত অন্য মাত্রা পায়। অটোপসি রিপোর্টে ধরা পড়ে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়েছিল রজত দেকে। আইনজীবীর খুনের বিষয় নিশ্চিত হতেই পুলিশ তদন্তে নয়া মোড় আসে।

তদন্তে প্রকাশ পায় সুক্ষ তার জাতীয় কিছু দিয়েই শ্বাসরোধ করে খুন করা হয় রজত দেকে। প্রাথমিক ব্রেক থ্রু আসে যখন অনিন্দিতাকে গ্রেফতার করে পুলিশ জানায় রজত দেকে মোবাইলের চার্জার দিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়েছিল। অনিন্দিতাকে বিশেষভাবে জেরা শুরু করে পুলিশ। আট ঘণ্টা জেরা করার পরে খুনের অভিযোগ কবুল করে নেয় অনিন্দিতা।

তাকে গ্রেফতার করার পরেই তৎকালীন বিধাননগর পুলিশ কমিশনার জ্ঞানবন্ত সিংহ জানান, একটানা জিজ্ঞাসাবাদের পরে অনিন্দিতা ভেঙ্গে পড়ে খুনের কথা স্বীকার করে নিয়েছে। ভারতীয় দন্ডবিধির ৩০২(হত্যা), ৩৪ ও ১২০ বি (ষড়যন্ত্র তথা অপরাধের ষড়যন্ত্র) এবং ২০১ ধারায় অভিযুক্ত হয় অনিন্দিতা পাল দে এবং শুরু হয় রজত দে হত্যা মামলায়।

বিভিন্ন রকম গুঞ্জন ওঠে এই মামলাকে ঘিরে। প্রাথমিকভাবে একাধিক সূত্র থেকে একাধিক চাঞ্চল্যকর অথবা মুখরোচক তথ্য উঠে আসে গণমাধ্যমে। কখনও শোনা যায় এ আর অ্যাসোসিয়েটসে (অনিন্দিতা রজত অ্যাসোসিয়েটস) নিজেদের আর্থিক বোঝাপড়ার গোলযোগে ক্ষেপে ওঠে অনিন্দিতা। কখনও বলা হয় তৃতীয় ব্যক্তির মদতে বলিষ্ঠ রজত দেকে খুন করে রোগা চেহারার অনিন্দিতা। কিন্তু পুলিশ প্রকাশ্যে এই খুনের কারণ প্রাথমিকভাবে প্রকাশ করেনি।

১ ডিসেম্বর অনিন্দিতা পাল দেকে গ্রেফতার করার পরের দিনই অনিন্দিতাকে তোলা হয় বারাসত আদালতে। সরকারি আইনজীবী বিভাস চট্টোপাধ্যায়ের অসহযোগিতার অভিযোগ করেন অনিন্দিতার বিরুদ্ধে। তিনি বলেন একের পর এক মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে অনিন্দিতা। প্রথমে স্বাভাবিক মৃত্যু, পরে আত্মহত্যা বললেও শেষে হত্যা বলে স্বীকার করেছে অনিন্দিতা।

অন্যদিকে অভিযুক্ত অনিন্দিতার উকিল চন্দ্র শেখর বাগ মানবিক দৃষ্টি ভঙ্গীতে অনিন্দিতা কে জামিন দেওয়ার আবেদন জানান। জামিনের কারণ হিসেবে অভিযুক্তর আইনজীবী অনিন্দিতার সন্তানের সে সময় দেড় বছর বয়সকে তুলে ধরেন। সেদিন আট দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেয় বারাসত আদালত। সেই মাসের দশ তারিখে আবার তাকে আদালতে তোলা হলে সরকারি আইনজীবী বিভাস চট্টোপাধ্যায় জানান, রজত দে-র হত্যাকান্ড ছিল পূর্ব পরিকল্পিত এবং গুগুল দেখে হত্যাকাণ্ডের ছক কষে অনিন্দিতা।

দ্বিতীয় শুনানীতে ছয়দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর পুলিশ হেফাজত থেকে জেল হেফাজতে এবং বারাসত আদালতে তোলা এই সব ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্যে অভিযুক্ত পক্ষের আইনজীবী চন্দ্রশেখর বাগ লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন। তিনি ক্রমাগত অভিযুক্তকে নির্দোষ দাবি করে জানাতে থাকেন, অভিযুক্ত অনিন্দিতা পাল দের শিশু পুত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে মানবিক কারণে জামিন দেওয়া হোক অভিযুক্তকে।

হাইকোর্টেও জামিনের আবেদন করা হয় এবং হাইকোর্ট ও অনিন্দিতার জামিনের আর্জি খারিজ করে দেয়। অবশেষে সাময়িক অনিন্দিতার সাময়িক স্বস্তির ইঙ্গিত আসে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিক থেকেই। অবশেষে গত বছরই অক্টোবর মাসের পয়লা তারিখ জামিনে মুক্তি পান অনিন্দিতা। দীর্ঘ দশ মাস কারান্তরালে থাকার পরে ঘরে ফেরেন অনিন্দিতা। কিন্তু সে স্বস্তি ছিল সাময়িক কারণ আদালত দ্ৰুত চুড়ান্ত নিস্পত্তির দিকে এগোতে থাকে। অবশেষে ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ রজত দে হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষণার দিন ধার্য হয়।

অন্যদিকে, পুত্রকে খুন করার অভিযোগে পুত্রবধূ দোষী সাব্যস্ত হতেই আনন্দে কেঁদে ফেললেন রজতদের বাবা সমীর কুমার দে। সরকারি আইনজীবী বিভাস চট্টোপাধ্যায় জানালেন, বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে সরে যেতে স্বামীকে বারবার চাপ দিচ্ছিলেন। স্বামী বিবাহ বিচ্ছেদে রাজি না হওয়ায় চাদরের ওপর দিয়ে মোবাইল চার্জারের তার জড়িয়ে শ্বাসরোধ করে রজতকে খুন করে অনিন্দিতা।

অনিন্দিতার পক্ষের আইনজীবী জ্যোতির্ময় অধিকারী জানালেন, আদালতের রায় “ভুল’। তাঁরা হাইকোর্ট যাবেন অনিন্দিতার ন্যায় বিচার অর্জন করার লক্ষ্যে। রজত দের বাবা সমীর কুমার দে জানালেন, মানুষের পর্যায়ভুক্ত নয় অনিন্দিতা। পুত্রবধূকে নারী জাতির কলঙ্ক আখ্যা দিয়ে সমীর কুমার দের বক্তব্য, অনিন্দিতার চরমতম সাজাই প্রাপ্য। কি সাজা হয় তার জন্য প্রতীক্ষা ১৬ তারিখ অবধি।