রেডিও

মৃন্ময় গোস্বামী


মহালয়ার আগের দিন বড়দা একটা কান্ড বাধিয়ে ফেললো। উইদাউট নোটিশে পাড়ার কমন জামাইবাবুর কাছ থেকে তাঁর পুরোনো রেডিওটা পনেরো টাকায় কিনে এনে, দিবানিদ্রায় মগ্ন বাবার পাশে রেখে দিলো। হাফপ্যান্ট পরা আমি বাড়ির বড় উঠোনে চক্কর কাটতে কাটতে রেডিও এসেছে এসেছে বলে প্রবল চিৎকারে বাড়ি মাথায় করছি। আমার চিৎকার শুনে ভাতের থালা ছেড়ে মা এঁটো হাতে দৌড়ে গিয়ে রেডিওর সামনে হাঁ করে দাঁড়িয়ে পড়লো। মুখে প্রশান্তির হাসি।ছোড়দা কোথায় ছিলো কে জানে, সেও ছুটতে ছুটতে এসে আমাকে হ্যাঁচকা টানে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করে, কোথায়? আমার ছোট্ট উত্তর, বাবার খাটে।ছোড়দা নাচতে নাচতে বাবার ঘরে চলে গেলো। আমি ও ক্লান্ত অবসন্ন শরীর নিয়ে ঘেমে নেয়ে বাবার খাটে ধপাস করে বসে পড়লাম। আমি বসতে খাট নড়ে উঠতেই বাবা আচমকা জেগে উঠে বিরক্ত হয়ে আমার দিকে হাত তুলে মারমূখী হয়ে মারতে গিয়েই,রেডিওটা তাঁর দৃষ্টিগোচর হতেই আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠে বললেন, এ কান্ড কে করলো? নিশ্চয় মিন্টুর কাজ।দাদা লাজুক মুখে বাবার দিকে তাকাতেই, বাবা বললেন হারামজাদা রেডিও চালু কর। দাদা মাথা নিচু করে বলে, ব্যাটারি নেই। ব্যাটারি আর এরিয়ালের তার জামাইবাবু দিলেন না। ওগুলো নিলে আরো পনেরো টাকা বেশি দিতে হতো।বাবা তুমি ব্যাটারির দাম আর মা তুমি এরিয়ালের তারের দাম দাও বলে বায়না ধরলো। বাবা বললেন, তোমাদের মা কোথায় পাবেন টাকা ওটাও আমি দিচ্ছি। বাবা বাক্সো খুলে পনেরো টাকা দাদাকে বললেন, যাও ওগুলো কিনে নিয়ে এসো, তবে শর্ত একটাই, আজই রেডিও চালু করতে হবে।মনে থাকে যেন কাল মহালয়া। কিছুক্ষণের মধ্যেই দাদা ব্যাটারি ও এরিয়ালের তার নিয়ে এসে হাজির। কিন্তু এবারে যে সমস্যা দেখা দিলো, সেটা হলো বাঁশ। দুটি বাঁশের প্রয়োজন। কিন্তু বাড়িতে কোনো বাঁশ নেই। দাদা ছোড়দাকে বললো, আমি মা ও বাবা এগুলো দিলাম। তোরা দুই ভাই সারাদিন আগানে বাগানে ঘুরে বেড়াস, তোরা বাঁশ দিবি। দাদার মুখে একথা শুনে ছোড়দা ফিক করে হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, চল দাদাকে দেওয়ার মতো বাঁশ কোথায় পাই দেখি। দাদা ছোড়দার পেছনে লাগা মার্কা কথা শুনে মাথা গরম করে আমাদের দিকে তেড়ে আসতেই আমরা ছুট লাগলাম বাঁশের খোঁজে। পাশেই নতুনগ্রাম। অনেক বাঁশঝাড়। ঝাড়ের মালিককে ছোড়দা বললো, মেসোমশাই,(তখন একমাত্র কাকা ছাড়া এখনকার মতো গড়ে সবাইকে কাকা বলার চল ছিলো না।)আমরা দুটো বাঁশ নেবো? মালিকের উত্তর,বাঁশ পছন্দ করো, আমি কেটে দিচ্ছি।তোমরা নিয়ে যাও।বাঁশের মালিক আমাদের দুজনের চোখে তখন ঈশ্বর।একবার চাইতেই আমাদের বাঁশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে, আমাদের পছন্দ করা বাঁশ দুটো নিপুণ হাতে কেটে কঞ্চি ছাড়িয়ে আমাদের বললেন, নিয়ে যাও। আমরা বাঁশে হাত দিতেই তিনি আমাদের দিকে তাঁর ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, আগে তিরিশটাকা দাম ছাড়ো, তারপর বাঁশে হাত লাগাও। হাঃ ঈশ্বর! ইনিই একটু আগেই আমাদের দুজনের চোখে ঈশ্বর ছিলেন। আমরা দুই ভাই তখন দুজন দুজনের দিকে একবার তাকিয়েই এক হাতে হাফপ্যান্ট সামলে ভোঁ দৌড়।বাঁশ ঝাড়ের মালিক আমাদের পিছু পিছু কিছুটা এসেও ফিরে গেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা দৌড়োতে দৌড়োতে আবার ফিরে এলাম বাঁশঝাড়ে।ঝাড়ের মালিক এসে বললেন,দৌড়ে চলে গেলে কেন? আমাদের দুজনের হাতে রথের মেলা থেকে কেনা দুটো মাটির পয়সা জমানোর ঘট।আমরা ঘট দুটো তাঁর হাতে দিলাম। ছোড়দা বললো,এতে আমাদের দুই ভাইয়ের জমানো পয়সা আছে। বাবা যেদিন যেদিন ইস্কুলে টিফিনের পয়সা দেন সেদিন সেদিন ওই পয়সা বাঁচিয়ে আমরা জমিয়েছি।দুটো বাঁশ না হলে কাল আমাদের মহালয়া শোনা হবে না। ওই বাঁশ পুঁতে এরিয়াল টাঙাবো। ছোড়দার কথা শুনে মেসোমশায়ের চোখের ভাষা বদলে গেলো। তাঁর স্নেহ মাখানো হাত দুটো আমাদের ছোট ছোট দুটো বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,এ কথা আমাকে আগে বলবে তো? তোমাদের কোন পয়সা দিতে হবে না। এমনিই নিয়ে যাও। আমি বললাম, মা বলেছে, পয়সা না দিয়ে কিছু নিতে নেই। ওটা লোক ঠকানো। ওতে ঠাকুর পাপ দ্যায়। মেসোমশাই ঘট দুটো নিজের মাথায় ঠেকিয়ে বললেন, তোমরা মানুষ হও।তোমাদের এই ঘট আমি ভাঙবো না।যতদিন আমি বেঁচে থাকবো, ততদিন এই ঘট দুটো আমার ঠাকুরের আসনে থাকবে।এতে যে আমার "জীবনের শিক্ষা সঞ্চিত" আছে। রাত পোহালেই মহালয়া। সন্ধ্যে থেকে রেডিও বাজা শুরু হয়েছে। রাত এগারোটায় জাতীয় সংগীত হওয়ার পর রেডিও সেন্টার বন্ধ হয়ে গেলো। আমরা দুই ভাই মহালয়া শোনার উত্তেজনায় রাত জেগে রয়েছি।যদি ভোরবেলা উঠতে না পারি।কখন যে ঘুমে অচেতন হয়ে পড়েছিলাম জানিনা।যখন ঘুম ভাঙলো তার অনেক আগেই রেডিওর মহালয়া পর্ব শেষ হয়ে গিয়েছে।মা কে বললাম, কেন ডাকোনি? মা জানালেন, তোকে ডাকলাম। তুই উঠে বসলি।সেই প্রথমবারের বাড়ি বসে মহালয়া শুনতে না পাওয়ার বেদনা আমাকে আজও এই বৃদ্ধ বয়সে আহত করে। তারপর থেকে নানা কারণে সরাসরি পুরোটা মহালয়া শোনা আমার আর হয়ে ওঠেনি। বাবা চলে যাওয়ার পর গঙ্গার ঘাটে গিয়ে পিতৃতর্পণ মা চলে যাওয়ার পর একসঙ্গে পিতৃ ও মাতৃতর্পণ করে বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যাওয়ায় মহালয়া শোনা হয়নি। এবারে কোভিড19 এর জন্যে গঙ্গায় তর্পণ করা ঝুঁকিপূর্ণ বলে বাড়িতেই তর্পণ করবো এবং বাড়িতে রেডিওতে মহালয়া শুনবো বলে মনস্থ করেছি। আলমারি থেকে রেডিওটা বার করে ওটা চালাতে গিয়ে দেখি ওটা চলছে না। অবশেষে রেডিও কোলে করে মেকানিকের খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম।অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটা জীর্ণ দোকানের আরো জীর্ণ জংধরা সাইনবোর্ড চোখে পড়লো।অনেক কষ্ট করে সাইনবোর্ডের লেখাটা পড়ে যা উদ্ধার করলাম, সাইনবোর্ডে যে কথা আছে সেটা "এখানে রেডিও সরানো হয়। পরীক্ষা প্রার্থনীয়।" দুর্বল আলোর আলোঅন্ধকার দোকানে বসে আছেন মেকানিক। মনে হচ্ছে যেন, আমার ঈশ্বর ওখানে বসে আছেন,আমার স্বপ্ন পূরণ করতে।ওঁর সামনে রেডিওটা রেখে বললাম, এটা সারিয়ে দেবেন? আজ ভোরে মহালয়া। রেডিওটা চালাতে গিয়ে দেখি, বাজছে না। মেকানিক মাথাটা একটু উঁচু করে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, দাদা, ওসব এখন অতীত।এখন কেউই রেডিওটেডিও সারায় না।টিভি কিংবা ফোনেই শুনে নেবেন। ইউ টিউবে শুনে নেবেন। যখন ইচ্ছে তখনই শুনবেন। আমি বলি, আমার রেডিওতেই মহালয়া শুনতে ভালো লাগে। মেকানিক আমার কথার উত্তরে বললেন, আপনার ভালোলাগার মূল্য কে দিচ্ছে? এই দেখুন না,আমার রেডিও সারাতে ভালো লাগতো। একমাত্র ভালোলাগা থেকেই এই কাজটা আমি শিখেছিলাম।আমি ওই কাজ ছাড়া অন্য কোন কাজ আমি শিখিনি। এটাই আমার জীবিকা ছিলো।আমি কি এখন আমার ভালোলাগার মূল্য পাচ্ছি? বিজ্ঞানের অগ্রগতির ঝড় আমাকে শূন্যে তুলে নিয়ে আমাকে নিয়ে নির্মম এক খেলা খেলছে। যে কোনো সময় আমাকে আছড়ে ফেলে দিতে পারে।হঠাৎ আমার মাথায় আশীর্বাদের হাওয়া বয়ে গেলো। অনাহুতের মতো এলো করোনা।ভাগ্যিস করোনা এসেছিল!ওর কল্যাণেই তো এখন দুমুঠো খেতে পাই। এই যে দেখুন, মাস্ক আর সেনাইটাইজার বিক্রি করে আমি আর আমার স্ত্রী দুবেলা দু মুঠো ফুটিয়ে খেতে পাচ্ছি। দাদা, আমার না খুব ভয় হয়। আমি জানতে চাই, কেন? করোনার জন্যে। শুনুন দাদা, বিশ্বের তাবর তাবর বিজ্ঞানীরা দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে করোনা প্রতিষেধক আবিষ্কারে মগ্ন। ওঁদের ওপর বিশ্বাস হারাবেন না। নিশ্চয় খুব তাড়াতাড়ি করোনা প্রতিষেধক ভ্যাক্সিন ওঁরা আবিষ্কার করবেনই। কোন ভয় করবেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে। মেকানিক বলেন, দাদা, এটাতেই তো আমার ভয়। করোনা ভ্যাক্সিন নিয়ে যখন কোন ইতিবাচক খবর শুনি, বিশ্বাস করুন সে রাতে আমার ঘুম হয় না। যদি ভ্যাক্সিন আবিষ্কার হয় তাহলে তো করোনা আর থাকবে না। করোনা চলে গেলে আমার রেডিও তো আর ফিরে আসবে না। তখন তো কেউই তো মাস্ক আর সেনিটাইজার কিনবে না। এখনো তো দুবেলা দুমুঠো ফুটিয়ে খাচ্ছি। আপনি এক কাজ করুন, কোনো বড়ো দোকানে চলে যান, ওখানে আপনি নতুন রেডিও পেয়েও যেতে পারেন। এই শ পাঁচেক টাকা দাম নেবে। আমার কাছে এই সেপ্টেম্বরের ষোল তারিখে হাজার খানেক টাকাই সম্বল। গিন্নি কে ডাক্তার না দেখালেই নয়। রেডিও ও গিন্নির চিকিৎসার কলহে গিন্নির চিকিৎসারই জয় হলো।রেডিও না কিনে রেডিওটাকে অসুস্থ ছেলের মতো কোলে নিয়ে বাড়ি ফিরে টেবিলের ওপর রেখে গিন্নিকে বললাম, এই রুগীর কোন ডাক্তার পাওয়া গেলো না।