ভদ্র … নাম তো সুনাহি হোগা

আফতাব হোসেন

বিশেষ প্রতিবেদন: উত্তমকুমারের সুপার ফ্লপের কোন গল্প শুনেছেন । শুনেছেন কখনো ওনার বাড়িতে পাথর হামলা হয়েছে । না.. না.. কাশ্মীরে না ।খোদ কলকাতার ।
শুনুন ।

কলকাতার রামধন মিত্র স্ট্রিটের গলিতে যদি কখনো যান দেখবেন সামনেই চুনখসা হলুদ রঙের একটা বিশাল পুরোনো বাড়ি দাঁড়িয়ে । সামনের ফলকটায় ওনার নাম,জন্ম আর মৃত্যুর দিন লেখা । সাথে কয়েকটা লাইন -” এই বাড়িতে আমৃত্যু বাস করেছেন বেতার মহিষাসুরমর্দিনীর সর্বকালজয়ী এই সুসন্তান । ব্যাস এইটুকুই ।

কোন সুর শুনতে পাচ্ছেন । পাবেন না । আরো শুনুন ।

1931 সালের দোরগোড়ায় মানে যখন জাতের নামে বজ্জাতির সুপ্ত বিষ বাতাসে অতটা ভাসেনি । তখন এক কায়স্থ ছেলে কে নিয়ে বড্ড গন্ডগোল । আকাশবানিতে নাকি কায়েতের ছেলে মা দুর্গার ব্রহ্ম মুহূর্তে মা দুর্গাকে স্মরণ করে স্ত্রোত্র পাঠ করবেন । ঘোর অশান্তি । কায়েতের ছেলে হয়ে স্ত্রোত্র পাঠ , একি অনাচার । আকাশবানীর আনাচে কানাচে পুঞ্জীভূত অশান্তি । কিন্তু উনি করলেন । নির্ভয়ে ।
স্ত্রোত্র পাঠ করতে করতে তিনি আস্তে আস্তে ডুবে যেতে লাগলেন মন্ত্রের মধ্যে। তাঁর পাঠের সঙ্গে চলছে সমস্ত শিল্পীদের কালজয়ী গান— ‘তব অচিন্ত্য রূপ জড়িত মহিমা’, ‘জাগো তুমি জাগো’, ‘বিমানে বিমানে’…। যত সময় আগাচ্ছে ওনার শরীর কাঁপছে , উনি ডুবে গেছেন কোন এক অজানা জগতে ।চোখের জল বাঁধ মানছে না।

ইসসস,,থামুন থামুন ,,,অত সেন্টু খাবেন না । তখন ফেসবুক ভাগ্যিস ছিল না । নইলে পুরো টা লাইভ স্ট্রিম হলে লাইক আর শেয়ারের বন্যা বয়ে যেত । ব্যস,, আপাতত এইটুকু ।

কিছুটা সুর শুনতে পাচ্ছেন । পাবেন না । আরো শুনুন ।

কয়েক বছর আগে মহালয়ার কিছুদিন আগে এক স্বনামধন্য পত্রিকার সাংবাদিক ওই রামধন মিত্র স্ট্রিটের বাড়িতে গিয়ে হাজির । নবীন সাংবাদিক । পুরো মাইক্রোফোন সেটিং নিয়ে ভেবেছিলেন একটা গমগম আওয়াজ ফিল করবেন ।সদর দরজার থেকে একটু এগিয়ে ছাদের পাশের ঘরটা ওনার ভাইপোর আর উপরের তলার ঘরটা ওনার বড় মেয়ের ।দুজনেই অবাক । সাংবাদিক দেখে প্রশ্ন করেছিলেন ” আপনারা পথ ভুল করে নাকি ? অনেককাল তো কেউ আসেনি । আজকাল কেউ খোঁজ খবর নেয়ার প্রয়োজন বোধ করে না ” ।

সুরটা শুনতে পাচ্ছেন । পাবেন না । আরো শুনুন ।

1976 সাল । ইন্দিরা গান্ধী জরুরী অবস্থা জারি করেছেন । হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সুপারহিট । উত্তম কুমার মধ্যগগনে । আকাশ বাণীর মনে হয় টিআরপি প্রেম জাগলো । উত্তম কুমার আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে দায়িত্ব দেওয়া হল । নতুন শো ।নতুন রূপে । নাম ” “দুর্গা দুর্গতিহারিণী ” । উত্তম বাবুর গলা । সুপার ফ্লপ । উত্তম বাবুর বাড়িতে পাথর পড়লো । ইসসস ভাগ্যিস তখন হ্যাশট্যাগ জাস্টিস ছিল না । কিছুদিন পর আকাশবাণী থেকে আবার ডাক পেলেন উনি । গেলেন ।আকাশবাণীর দারোয়ান আটকালো । নতুন নিয়ম, পাস লাগবে । উনি চুক্তি ভিত্তিক কর্মী । পাস নেই । রাগে দুঃখে অভিমানে উনি ছাড়তে চাইলেন আকাশবাণী । দারোয়ানকে কান্নাভেজা গলায় চিৎকার করে বলেছিলেন ” এই রেডিও কে জন্ম দিয়েছে জানিস ? ” ।

থামুন থামুন সুরটা শুনতে পাচ্ছেন । পাবেন না । আরো একটু শুনুন ।

ওনার মেয়েকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় উনি খুব ঠাকুর ভক্ত ছিলেন তো , বাড়িতে খুব পূজা অর্চনা করেন বুঝি ? ওনার মেয়ে তো শুনে অবাক । উনি নাকি কোনদিনও ধুপ সুদ্দ জ্বালাননি বাড়িতে । তাবড় পৈতেধারীদের দের নাকের উপরে রাজ করা অভিমানী এই মানুষটির বক্তব্য ছিল স্পষ্ট ” বিশ্বাস আমার নিজের , দেখাবো কেন “। ঐজন্যি মনে হয় বছরের ওই বিশেষ দিনটায় মাইক্রোফোন সেট করার দায়িত্বে মুসলমান টেকনিশিয়ান ছিলেন যিনি ওনাকে গাজিসাহেব ভাবতেন ।
ইসসস,,এসব লিখছি । আঁটি সেল যদি আবার দেখে । সরি সরি ।

একটু সুর পাচ্ছেন কি ? আর একটু শুনুন…

উত্তমকুমার নিজে এসেছিলেন ক্ষমা চাইতে । আকাশবাণী বাধ্য হয়েছিল ষষ্ঠীর দিনে ওনার গলায় মহালয়ার সুর বাজাতে । কিন্তু যে রেডিওর জন্য উনি এত কিছু করলেন সেই রেডিও ওনাকে সামান্য পেনশন টুকুও দেয়নি । একটু হ্যাশট্যাগ জাস্টিস হবে নাকি ফ্রেন্ডস । বাদ দিন । উনি তো আর শুনবেন না । নাঃ উনি শেষ সময়টাতে শুনতে পাননি । শেষদিকে স্মৃতিভ্রংশ হয়ে গিয়েছিল ওনার। শেষ পুজোতেও ওই রামধন মিত্র স্ট্রিটের গলির ঘরটাতেই মহালয়া বেজেছিল ওনার ই গলায় । উনি বোধহয় বুঝতেও পারেননি।’

এবার সুরটা শুনুন,,,,,

কোন এক মহালয়ার সকাল । গমগম স্বরে রেডিও তে ওনার গলা বাজছে । ওই তো কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছেন তিনি। পাট ভাঙা ধুতি । গায়ে সাদা উত্তরীয়। উল্টো করে আঁচড়ানো চুল। হাতে পুরোনো নস্যির কৌটো।
নতুন ভোরের আলোয় অপেক্ষায় সারা বাংলা ।

শুনলেন সুরটা,,,?

বি: দ্র : – লেখক এর তথ্যসূত্র থেকে । ভুল হলে ক্ষমাপ্রার্থী ।