রাজারাম সাহা

সেপ্টেম্বর ১১,২০২০: প্রকৃতির সাথে সাহিত্য জগতের এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এই প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে কত না গান, কবিতা, ছড়া লেখা হয়েছে। বাংলা সাহিত্য জগতে ছোট ছোট শিশুদের জন্য লেখা বিভিন্ন কবিতার মধ্যে কত রকমের পাখির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। দোয়েল, কোয়েল, ফিঙে, শ্যামা, দামা প্রভৃতি কত রকমের রংবাহারি পাখির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এই পাখি গুলির নাম শুনে শিশুর মনের মধ্যে এদের সম্পর্কে জানার কৌতুহল জাগাটা খুবই স্বাভাবিক।

বেশ কিছু বছর আগে আমার মনের মধ্যে এমনই এক প্রশ্ন জাগিয়ে তুলেছিল আমার ভাইজি। সে তার পাঠ্যপুস্তকে চন্দনা, মদনা, টিয়া, শ্যামা, দামা প্রভৃতি পাখির নাম পরে। প্রতিটি পাখি সম্পর্কে তার জানার আগ্রহ জন্মায়। সেই জানার আগ্রহ থেকেই আমার কাছে এসে প্রতিটি পাখি সম্পর্কে প্রশ্ন করতে থাকে। প্রতিটি পাখি আমার চেনা ছিল তাই খুব একটা অসুবিধা হয়নি তাদের সম্পর্কে জানাতে। কিন্তু দামা? এই পাখিটির নাম আমি কবিতায় পড়েছি কিন্তু কোনদিন দেখিওনি বা তার সম্পর্কে জানার চেষ্টাও করিনি। আমি নিজে যেহেতু এই পাখিটাকে চিনিনা তাহলে কিভাবে আমি অন্য কে চেনাবো?
এখন ইন্টারনেটের যুগ । গুগল-এ গিয়ে দামা পাখি লিখে সার্চ করলে ছবি চলে আসবে সাথে কিছু বর্ণনা ও থাকবে। কিন্তু এর থেকে পাখিটিকে স্বচক্ষে দেখে তার সম্পর্কে জানাটা আমার কাছে শ্রেয় মনে হয়েছিল। কারণ তাত্ত্বিক জ্ঞান থেকে ব্যবহারিক জ্ঞানই অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। তাই দামা পাখি দেখার জন্য ও তার সম্পর্কে জানার জন্য অধীর আগ্রহে প্রস্তুত হতে শুরু হলাম।

ঘটনাক্রমে একদিন সন্ধ্যায় শেখরদা অর্থাৎ যার হাত ধরে এই পাখিদের নিয়ে চর্চার হাতেখড়ি হয়েছিল তাকে জিজ্ঞেস করে বসলাম- “আচ্ছা দামা পাখি কোনটা?” সে শুনে মুচকি হাসি দিয়ে বলল-“চল কালকে তোকে দেখাবো।” সাথে একটি বই দিয়ে বলল, “রাতে ভালো করে দেখে নিবি।”
এই শুনে খুব উৎসাহের সঙ্গে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে আসছি অমনি আমাকে পিছু ডাক দিয়ে বলল-“বইটা ইংরেজিতে লেখা আর দামা নামটা বাংলা,তাহলে খুঁজবি কিভাবে?” সত্যি তো খুঁজবো কিভাবে!এই চিন্তাটা আমার মাথায় এলো। ইংরেজিতে পাখির নাম রাখা হয় তাদের রং, শ্রেণী, পরিবার প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে যার ফলে একটু চর্চা করলেই নামগুলো আয়ত্তে আনা, মনে রাখা সম্ভব কিন্তু বাংলায় পাখিদের নামের ক্ষেত্রে তেমন কোনো নিয়ম নেই আবার আরো মজার বিষয় হলো স্থান ভেদে একই পাখির ভিন্ন ভিন্ন নাম হয়। এই ভাবতে ভাবতেই শেখরদা বলে উঠলো, “দামাকে ইংরেজিতে Thrush বলে।” অর্থাৎ এই বই এর মধ্যে যে কয়টি Thrush নামক পাখি আছে তাদের সম্পর্কে আমায় জানতে হবে এবং তাদের ছবিগুলো দেখে রাখতে হবে যাতে কাল সহজেই চিনে নিতে পারি। রাতে বইটি খুলে দেখলাম 14-15 রকমের দামা পাখি রয়েছে। এরমধ্যে আমি যে দামা পাখিটির খোঁজ করছি সেটি কোনটি!

পরদিন সকালে দুজনে বেরিয়ে পড়লাম দামা পাখির সন্ধানে। শেখরদার জানা ছিল কোন এলাকায় এই পাখিটি পাওয়া যায়। তাই খুব সহজে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে গেলাম। সেটা ছিল একটি কদম বাগান। কদমের শুকনো পাতা মাটিতে পড়ে আছে। মাটিতে সূর্যের আলো খুব বেশি পৌঁছাতে পারেনি কদমের পাতার জন্য। বিভিন্ন ধরনের পাখি ডাকছে। তাদের মধ্যে বসন্তবৌরি, বুলবুল, বেনে বউ প্রকৃতিকে দেখতে পেলাম। কিন্তু দামা পাখির দর্শন তখনো পায়নি। হঠাৎ করে শেখরদা পিঠে হাত দিয়ে বলল, “ওই দেখ তোর দামা খাবার খাচ্ছে।” তাকিয়ে দেখি কমলা রঙের একটি পাখি মাটিতে পড়ে থাকা পাতাগুলিকে ঠোঁট দিয়ে তুলে তুলে ফেলছে আর পাতার নিচে লুকিয়ে থাকা পোকাগুলোকে খাচ্ছে। ঠিক এই ভাবেই খেতে দেখেছিলাম দোয়েল পাখিকে। একটু এগোতেই দেখলাম গাছের ডালে উঠে বসলো। সেদিনের মত আর দেখা পেলাম না। অল্প সময়ের জন্য দেখা পেলেও পাখিটিকে চিনতে পারলাম। অন্য দামা পাখিগুলোর থেকে এর রং, আকার, আকৃতি একদমই ভিন্ন। অন্য যে দামা পাখিগুলি রয়েছে তা সবগুলি পাহাড়ি অঞ্চলে পাওয়া যায় কেবলমাত্র এই দামা পাখিটি আমাদের আশেপাশে দেখতে পাওয়া যায়।

বেশ কিছুদিন পরে রায়গঞ্জের পার্শ্ববর্তী বনাঞ্চলে আবার এর দর্শন পেলাম। মাথা, গলা, ঘাড়, বুক, পেট কমলা রঙের হয় যা দেখে খুব সহজেই এদের চেনা যায়। এই কমলা রং এর জন্য ইংরেজিতে এদের Orange headed thrush নামকরণ হয়েছে। আর বাংলায় কোথাও কমলা দামা বা কমলাফুলি ,আবার অনেক জায়গায় কমলা দোয়েল বা কমলা বউ নামে পরিচিত। ডানা দুটি নীলচে ছাই রঙের হয় আর পা দুটি গোলাপি। এদের আকৃতি প্রায় 20-21 সেমি।

এরপর বেশ কয়েকবার এই পাখিটিকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। কখনো গান করতে শুনেছি, আবার কখনো সঙ্গীকে খাইয়ে দিতে দেখেছি। প্রজননের সময় সঙ্গী নির্বাচন লড়াইও দেখেছি। এরা খুবই লাজুক ও শান্ত স্বভাবের পাখি। একা থাকতে বেশি পছন্দ করে। কখনও কখনও জোড়ায় দেখা যায়। পাতাঝরা শান্ত বনাঞ্চলে একটু স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় এদের দেখা যায়। সাধারণত মানুষের বস্তির কাছাকাছি খুব কম আসতে দেখা যায়। লাফিয়ে লাফিয়ে এরা চলাফেরা করে আর অল্প আওয়াজ পেলেই সতর্ক হয়ে গাছের ডালে উঠে পড়ে।

এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর নাগাদ গাছের উঁচু ডালে পাতার ঝোপে শুকনো ডালপালা, মস দিয়ে চায়ের কাপের মতো বাসা বানায়। এরা একবারে 3 -4 টি ডিম পাড়ে। 14 দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। বাচ্চার যত্ন স্ত্রী ও পুরুষ পাখি উভয় মিলেই করে। এই পাখিটির স্বভাব ও গায়ের রং এতটাই সুন্দর যে কেউ এদের দেখলে মুগ্ধ হয়ে পড়বে।

আজ থেকে বেশ কয়েক দশক আগে হয়তো এই পাখির সংখ্যা অনেক বেশি ছিল তাই কবির কবিতার জগতে খুব সহজে স্থান করে নিয়েছিল। আমাদের আশেপাশের বন জঙ্গল দ্রুত কাটার ফলে এদের বাসস্থানের অভাবের জন্যই হয়তো এদের সংখ্যা কমে এসেছে। তাই দোয়েল, কোয়েল প্রভৃতি পাখিকে চিনতে পারলেও এদের আমরা অনেকেই চিনি না। তার ফলে কবিতার পাখি রূপকথার পাখি হয়ে রয়ে যাচ্ছে আমরা আমাদের নতুন প্রজন্মকে এদের চিনতে পারিনা। তাই এই পাখিগুলি কে বাঁচানোর উদ্যোগ আমাদের সকলকে নিতে হবে যাতে নতুন প্রজন্ম এদের দেখতে পারে। এদের সম্পর্কে জানতে পারে। আমরা প্রত্যেকে যদি কিছু গাছ লাগাই এবং সেই গাছের যত্ন করে বড় করে তুলতে পারি তাহলে এই নিরীহ পাখিগুলি আবার তাদের সংখ্যা আশাকরি বাড়াতে পারবে এবং আধুনিক কবিদের কবিতাতেও এরা স্থান করে নিতে পারবে।

37