অভিজিৎ সাহা

প্রতিবেদন, সেপ্টেম্বর ৮,২০২০: আপাত অর্থে, সংসদীয় রাজনীতিতে দলবদল, দলভাঙ্গন নতুন দল গঠন এবং উক্ত দলে যোগদান ইত্যাদি সমস্ত কিছুই সংবিধানসন্মত যদিও তা বেশ কিছু নিয়মকানুন/ বিধিব্যবস্থার শর্তাধীন। ভারতীয় রাজনীতিতে দলবদলের ইতিহাসের দিকে যদি নজর দেওয়া যায় তাহলে দেখা যাবে ১৯৬৭ সালের হরিয়ানার রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনের অব্যবহিত পরেই গয়া লাল নামক এক রাজনৈতিক ব্যক্তি একদিনে সর্বমোট নয় ঘণ্টায় তিনবার দলবদল করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। আবার ওই একই রাজ্যে ভজন লাল নামক এক ব্যক্তি নিজেও দলবদলের ক্ষেত্রে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। এই সবেরই পরিপ্রেক্ষিতে রাজনীতিতে “আয়া রাম গয়া রাম” নামক শব্দবন্ধ একটি গড়ে উঠে। ভজন লালকে ভারতীয় রাজনীতিতে দলবদলের পিতা বলা হয়। দলবদলের এই বিকৃত ও সুবিধাভোগী প্রবণতাকে ১৯৮৫ সালে ৫২ তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সাংবিধানিক বেড়ি পড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তৎসত্ত্বেও দলবদলের ঘটনাটিকে নিয়ন্ত্রিত করা যায়নি। সাধারণত কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দলবদলের ক্ষেত্রে যে সমস্ত পন্থা ও পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে সেগুলি হল- এক, তিনি বর্তমানে যে দলের সাথে জড়িত আছেন সেই দলের সাথে যাবতীয় সম্পর্ক ছেদ করে নতুন দলে যোগদান করেন। এক্ষেত্রে তিনি উক্ত দলের দ্বারা যে সমস্ত পদ পেয়েছিলেন দলীয়পদ থেকে শুরু করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্বের পদ ইত্যাদি সবই পরিত্যাগ করেন (যদিও নির্বাচিত পদটি পরিত্যাগের ক্ষেত্রে নানান প্রবণতা লক্ষণীয়); দুই, অন্যক্ষেত্রে একটি স্বীকৃত দলের অনেক নেতা একসাথে সংশ্লিষ্ট দলটি থেকে বেরিয়ে এসে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে; তিন, দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত কোনো জনপ্রতিনিধি ক্ষেত্রবিশেষে দলীয় আদেশ ( হুইপ) অমান্য করলে তার সদস্যপদ বিলুপ্ত হতে পারে। আবার ক্ষেত্রবিশেষে এমন পরিস্থতির উদ্ভব হতে পারে যেখানে উক্ত ব্যক্তি নির্দলীয় প্রতিনিধি হিসেবে তার বাকি সময়ের কার্যকাল অতিবাহিত করতে পারেন। এছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষনেতৃবৃন্দও অনেক সময় ভিন্ন রাজনৈতিক দলের এমনকি সংসদীয় রাজনীতিতে প্রায় সম্পূর্ণ বিপরীত ও ভিন্ন মতাবলম্বী রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরও নিজের দলে যোগদানের আহ্বান জানিয়ে থাকেন। স্বভাবতই এইরূপ যোগদানের পিছনে রাজনৈতিক মূল্যবোধের তথা মতাদর্শের অবক্ষয়ের পাশাপাশি নানাবিধ স্বার্থের ও দরকষাকষির হিসেবনিকেশও নিহিত থাকে। রাজনৈতিক দল পরিবর্তনের এইরূপ নানাবিধ বিচিত্র প্রবনতা আমাদের দেশের সংসদীয় রাজনীতির একটি পরিচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে দলবদলের বা কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলে যোগদানের ক্ষেত্রে এক নতুন প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে যা রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রাজ্যের রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি পেশাদারী সংস্থা কর্তৃক যা কর্পোরেট কায়দাতে অন্য দল থেকে নেতা-কর্মীদের কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলে যোগদানের জন্য কাজ করবে এ হল এক সাম্প্রতিক সময়ের প্রবণতা। কিন্তু কোনো ঘটনা বা নতুন ধারা আকাশ থেকে পড়ে না, বরং সবটাই বাস্তবের প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। এই বাস্তব প্রেক্ষাপটটি হল ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যের শাসক দলের খারাপ নির্বাচনী ফলাফল। তৃণমূল কংগ্রেস নির্বাচনী প্রচারে দাবী করেছিল তারা রাজ্যের মোট ৪২ টি আসনেই জিতবে। তাদের স্লোগান ছিল ৪২ এ ৪২। কিন্তু নির্বাচনী ফল প্রকাশের পরেই দেখা গেল রাজ্য রাজনীতিতে এতদিন প্রায় আনকোরা অবস্থায় থাকা বিজেপি ৪০% ভোট পেয়ে ১৮টি আসনে জয় লাভ করেছে। নির্বাচনী এই ফলাফলের ভিত্তিতে রাজ্যের শাসক দলের তথাকথিত দৃঢ়  ও শক্তিশালী সংগঠনের ধারনাটি বেশ কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। ফলতঃ রাজ্যের শাসক দলের সামনে দল পরিচালনাগত বেশ কিছু সাংগাঠনিক সীমাবদ্ধতার বিষয়টি যেমন প্রকট হয়ে উঠে অন্যদিকে ভবিষ্যতে দল পরিচালনর ব্যাপারে এই ধরনের সীমাবদ্ধতাকে যাতে কাটিয়ে দলকে যাতে পুনরায় আগের ন্যায় মজবুত করা যায় তার জন্য তারা একটি পেশাদারী সংংস্থার সাহায্য নেয়। অর্থাৎ দলীয় সংগঠনকে মজবুত করার জন্য দলীয় স্তরে সাংগঠনিক ঝাঁকুনি, রদবদল, সংশোধন এই ধরনের কর্মসূচিকে সরাসরি দলীয় স্তরে সম্পাদন করার পরিবর্তে, একটি পেশাদারী সংস্থা কর্তৃক সম্পাদন করার উপর গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনী ফলাফলের অব্যবহিত পরেই প্রশান্ত কিশোরের আই-প্যাক নামক একটি সংস্থার সাথে তৃণমূল কংগ্রেসের একসাথে কাজ করার নানাবিধ সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন করা হয়। কোনো একটি সংস্থার পেশাদারী সংস্থার পরামর্শের ভিত্তিতে কোনো একটি রাজনৈতিক দল তার কার্যাবলী, কর্মসূচি এবং সাংগাঠনিক আয়োজন – বিন্যাসকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ঢালার চেষ্টা করে— এই ধরনের বিষয়টি রাজ্যের রাজনীতিতে একদম এক নতুন সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই । এই ধরনের পেশাদারী সংস্থাগুলি কাজ করার সময় সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক স্তরবিন্যাসের প্রত্যেকটি স্তরের নানান জটিল বিন্যাসকে তাদের নিজেদের পেশাদারি মাপকাঠির ভিত্তিতে যাচাই করার চেষ্টা করে। এই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পেশাদারী সংস্থাটিকে নানাবিধ কর্মসূচি গ্রহন করতে হয় যার মধ্যে অন্যতম হল জেলা, মহকুমা, ব্লক স্তর সহ একদম স্থানীয় নিচুস্তরে সংশ্লিষ্ট দলটি যে যে ধরনের সম্পদ, নেটওয়ার্ক, যোগাযোগের তথা সমন্বয়য়ের অভাবসহ প্রাতিষ্ঠানিক সমস্ত সমস্যার মুখোমুখি হবে সেগুলোর মীমাংসা করা এবং এর সাথে যদি প্রয়োজন পরে তাহলে অন্য রাজনৈতিক দল থেকে অপেক্ষাকৃত ভাল, বা উক্ত দলের পুরানো কর্মীদের ফিরিয়ে আনার কর্মসূচি ও গৃহীত হতে পারে। এই ক্ষেত্রে কোনোরূপ ছুৎমার্গ, বা মতাদর্শের কাঠিন্য তাদের মাপকাঠিতে বিবেচ্য হতে পারে না। যদি দেখা যায় উক্ত দলের শীর্ষনেতৃত্ব এটা উপলব্ধি করেন যে স্থানীয় স্তরে বেশ কিছু নেতার জন্য দলটির ভাবমূর্তি খারাপ হচ্ছে তাহলে স্থানীয় স্তরে অন্য দল থেকে নেতাকর্মী টেনে আনার বিষয়টি আরও গতি লাভ করে। অন্য দল থেকে যাদের উক্ত দলে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয় সে ক্ষেত্রে নানবিধ পদ, মর্যাদা ,সম্পদ প্রভৃতি নিশ্চিতকরণের জন্য একটা সুসংবদ্ধ সাংগাঠনিক উদ্যোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা লক্ষ্য করা যায় যা একান্তভহাবেই এই পেশাদারী সংস্থাগুলির একচেটিয়া সম্পদ। কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে এই কাজ করা সম্ভব নাও হতে পারে। এই ফাঁক থেকেই আজকের দিনে রাজনীতিতে এই ধরনের সংস্থাগুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সংবাদ পত্রে এই খবর পরিবেশিত হয়েছে যে এই পেশাদারী সংস্থাটি রাজ্যের বিরোধীদল বিশেষত বামফ্রন্টের প্রাক্তন মন্ত্রী, সাংসদ,বিধায়ক সহ বর্তমান জনপ্রধিনিতিদের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলে যোগদানের আহ্বান জানিয়েছেন। এই ক্ষেত্রে তাদেরকে নানাবিধ প্রস্তাব, পদের কথাও বলা হয়েছিল বলে তারা সংবাদমাধ্যঞমে জানিয়েছেন । অপরদিকে উক্ত পেশাদারী সংস্থাটি এইরূপ যোগাযোগ ও ফোন কলের বিষয়টিকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে রাজ্যের শাসকদলও বিষয়টিকে অস্বীকার করেছে। এই ধরনের অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ ও অস্বীকার রাজনীতির অপরিহার্য অঙ্গ। রাজনীতিতে এই ধরনের পেশাদারী সংস্থাগুলো একদিকে যেমন নানাবিধ নতুন মাত্রা সৃষ্টি করে অন্যদিকে এই সংস্থাগুলি রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতে এক ধরনের যান্ত্রিকতাও সৃষ্টি করে। সংশ্লিষ্ট দলের কর্মীদের আবেগ,সুখ-দুঃখ, নিরাপত্তা, মমত্ববোধ, দলের জন্য জীবন অবধি বাজি রাখা এগুলি সবই পেশাদারি সংস্থা  নির্ধারিত রাজনৈতিক কৌশলে ও বয়ানে উপেক্ষিত হলেও হতে পারে। তবে, আই-প্যাক রাজ্যের রাজনীতিতে এক নতুন প্রবণতা সৃষ্টি করেছে এই ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই । তবে এই প্রক্রিয়া সাফল্য পাবে কি পাবে না তা ভবিষ্যৎই বলবে।

9