বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার নোদাখালীর সাতগাছিয়ার লেখক আবদুল জব্বার। আবদুল জব্বারের সাহিত্য সম্পর্কে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্য দিয়ে আমরা তাঁর গল্পবলয়ে প্রবেশ করব-

‘’…আপনার লেখা আর লেখার মধ্যে নিহিত সত্যকথা, খাঁটি কথা, কাজের কথা বলবার যে একটা সার্থক চেষ্টা দেখেছি, সেটাই আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। আপনার লেখায় আমাদের এই সুখ-দুঃখময় জীবনের যে ছবি ফুটে উঠেছে, সততায় আর শক্তিতে সেটা আমার কাছে অতুলনীয় লেগেছে। আপনি নিজে নিজেকে যা মনে করেন সেটুকু স্পষ্ট করে জোরের সঙ্গে বলতে আপনার দ্বিধা বা সংকোচ নেই- এর মূলে আছে আত্মসম্মানবোধ।… আপনি মানুষকে বড়ো করেই দেখেন-নিজের আত্মসম্মানবোধ আছে বলে অপরকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে আপনার আটকায় না।..’’ ( সত্যজীবনচিত্র, স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠ গল্প, ইন্ডিয়ান প্রোগ্রেসিভ পাবলিশিং )

  বঙ্গদেশকে সামনে রেখে তিনি লিখেছেন তিন খণ্ডে ‘বাংলার চালচিত্র’। বঙ্গদেশের অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখেই তিনি গল্পভুবন সাজিয়েছেন। সুন্দরবন, বাদা অঞ্চল তাঁর গল্পের পঠভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। মুসলিম জীবন নিয়ে লেখা তাঁর অন্যতম গল্প ‘লালবানু’। দরিদ্র মুসলিম পরিবারের বধূ লালবানু।মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য কত লড়াই সংগ্রাম ও ছল-চাতুরি করতে হয় তাঁর দৃষ্টান্ত ‘লালবানু’। অভাবের তাড়না মানুষকে কীভাবে মূল্যবোধ ও নৈতিক অধঃপতনের চরম সীমায় নিয়ে যায়, শুধুমাত্র বেঁচে থাকতে মানুষকে কীভাবে জীবিকার পরিবর্তন করতে হয় তা লেখক অদ্ভুতভাবে দেখিয়েছেন। দারিদ্র্য মুসলিম সমাজে সবচেয়ে বেশি শোষিত হতে হয় নারীকে- লালবানু তারই দৃষ্টান্ত। তেমনি গোটা সমাজ ব্যবস্থাই লেখকের লক্ষ। রূপচাঁদ কয়াল মাতাল ও নারী সঙ্গ করে সমস্ত সম্পত্তি হারিয়েছে। রূপচাঁদ এখন পঙ্গু। অভাবের তাড়নায় কীভাবে একটি সংসার নষ্ট হয়ে গেল তা লেখক নিদারুণ ভাবে দেখিয়েছেন। সংসার বাঁচাতে লালবানুকে নামতে হয়েছে মদের ব্যবসায়। সংসার চালাতে এমনকি তাঁকে যৌনদাসত্বও করতে হয়েছে। মুসলিম সমাজে মদ্যপান নিষেধ। আর মুসলিম নারী হিসেবে মদের কারবার করার জন্য লালবানু পিতার কাছে উপমা পেয়েছে-‘ বেশ্যারও অধম’। তবুও সে সংসার চালিয়ে গেছে। অভাব ঘোঁচাতে সে চুরি, প্রতারণা সবই করেছে। দারিদ্র্যের টানে বড় মেয়ে ময়জিনা অন্য ছেলের সঙ্গে চলে গেছে। দুই ছেলে চুরিতে যোগ দিয়েছে, ইতিমধ্যে রূপচাঁদেরও মৃত্যু ঘটে- তাঁর সুখের সংসার তছনছ হয়ে যায়, আর সেই ধ্বংসের চিত্রই এ গল্প-

“ মায়ের সম্বন্ধে নোংরা কথা শুনতে শুনতে ছেলে দুটো ক্রমেই যেন তেড়িয়ে হয়ে ওঠে। ভাইয়ে ভাইয়ে মিল নেই। একটা মেয়ের সঙ্গে আসনাই করতে গিয়ে দুজনে মারামারি করে মাথা ফাটায়। মা বড়টার দোষ দিলে সে মায়ের মাথা ফাটিয়ে দেয়। রাগে লালবানু থানায় গিয়ে ডায়েরি ঠুকে আসে। বড় ছেলে পুলিসের ভয়ে ঘরছাড়া হয়। যাবার সময় ছোট ভাইয়ের জামাপ্যান্ট, মায়ের শাড়ি সায়া নিয়ে তো যায়ই, উপরন্তু ঘরের মাঝখানে এক কাঁড়ি ময়লা ছাড়িয়ে রেখে যায়।“ 

 আজ ছেলে মাংস নিয়ে এলেও ঘরে চাল নেই। এমন সময় ভিক্ষেয় আসে ফকির। লালবানু ভোজনের জন্য অনুরোধ করে ফকিরকে। ফকির ঝোলা রাখলে, সেই ঝোলার চাল নিয়েই ভাত রান্না করে। এমনকি ফকিরকেই সে জালে ফাঁসায়-“ হঠাৎ লালবানু ফকির সাহেবকে জড়িয়ে ধরে চেল্লাতে লাগল, ‘ওগো পাড়াপড়শি বাপ সকলরা, বেরোও গো- ফকিরটার কি আক্কেল গা, এ্যাঁ – আমাকে জোড় করে ধরে ইজ্জৎহানি করল…..” এক অদ্ভুত নারী লালবানু। নিজের স্বামীর সঙ্গে যৌন জীবনে সে সুখী হয় নি, এমনকি রূপচাঁদকে সে বারবার ফিরিয়ে দিয়েছে। রূপচাঁদ পঙ্গু বলেই হয়ত পছন্দ হয় নি। লালবানুরও আজ বয়স হয়েছে। অর্থের অভাবে আজ সে আর মদের ব্যবসা করতে পারে না। জীবনে বাঁচার জন্য মানুষ মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কোন পর্যায়ে পৌঁছায় তা লেখক বিস্ময়কর ভাবে দেখিয়েছেন। লালবানু নিকা করেছে ফকিরকে শুধুমাত্র বেঁচে থাকতে সামান্য খাদ্যের জন্য। আজ আর সন্তান চিন্তা নয়- সন্তানরা অভাবের তাড়নায় চোর ডাকাত হয়ে গেছে। যে সংসারকে বাঁচতে লালবানু মদের ব্যবসা থেকে যৌনবৃত্তি করতে বাধ্য হয়েছিল সে সংসারের ছিন্নমূলে আবার সে অন্য পুরুষের কাছে আশ্রয় পেতে চেয়েছে। লালবানুর পরবর্তী জীবনের কোন ইঙ্গিত গল্পে নেই। ফকির ভিক্ষে করবে আর সে ক্ষুধা মেটাবে – এই চিন্তা নেয়েই সে ঘর ছেড়েছে। ফকিরের কেউ নেই, তাই লালবানুর মনে হয়েছে তার কাছে আশ্রয় পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু ফকির তো উদাসীন, তাই সে ফকিরকে কৌশলে বন্দি করেছে। সামান্য খাদ্যের জন্য, বেঁচে থাকার জন্যে মানুষকে কত কৌশল অবলম্বন করতে হয় তা লেখক অদ্ভুত ভাবে দেখিয়েছেন। আর মাটি থেকে তুলে আনা মানুষগুলিকে পরিবেশের সঙ্গে অসাধারণ ভাবে মিলিয়ে দিয়েছেন লেখক- বোঝাই যায় গল্পগুলি লেখকের অভিজ্ঞতার ফল।

                ‘ মেয়ে কি তোমাদের খেয়াল- খুশীর ব্যাপার ? তাদের জীবনের দাম নেই।‘- এই জীবন সত্যের খোঁজে অগ্রসর হয়েছেন লেখক ‘নাজিয়ার চোখের পানি’ গল্পে। মুসলিম সমাজের দুই দ্বন্দ্বের কাহিনি উপস্থিত হয়েছে। একদিকে ধর্মান্ধতা অন্যদিকে উদারনৈতিক ধর্মসত্তা। কিছু মানুষ প্রচলিত বিশ্বাস অতিক্রম করে বেরিয়ে আসতে চাইলেও সমাজ আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখে, আর মুসলিম সমাজে সেই ধর্মান্ধতায় সবচেয়ে শোষিত হতে হয় নারীদের। সাহিত্য তো সমাজ থেকেই উঠে আসে। তাই মুসলিমজীবনকেন্দ্রিক গল্পগুলিতে নারী শোষণের ইতিহাস বিপুভাবে ধরা দেয়। ধর্মান্ধতায় কীভাবে একটি দাম্পত্যজীবন নষ্ট হয়ে গেল তা লেখক তুলে ধরেছেন- ‘নাজিয়ার চোখের পানিতে’ গল্পে। কদম রসুল চাকুরীজীবী হলেও সে ধর্ম ব্যবসায় নেমেছে। অন্যদিকে স্ত্রী নাজিয়া আধুনিক নারী, মুসলিম সমাজের প্রর্থা, অনুশাসনে বিশ্বাস করে না। নাজিয়া পর্দাপ্রথা বা বোরখা পড়ে না। কোরানের অপব্যবহার করে কিছু মানুষ কীভাবে ব্যবসা ফেঁদেছে বা ফকিররা কীভাবে মুসলিম সমাজকে শোষণ করে তাই লেখকের লক্ষ। আর সেই ধর্মান্ধতার কথা তুলে ধরতে গিয়ে শোষিত হতে হয়েছে নাজিয়াকে। শত শোষণেও নাজিয়া ভেঙে পড়েনি, সে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চেয়েছে। ধর্মান্ধতাকে অস্বীকার করে নাজিয়া আজ জীবিকা পাল্টে ফেলেছে- গৃহবধূ থেকে হয়েছে চুড়িবালা – তবু সে লক্ষে অবিচল। নাজিয়া যেন কবিতা সিংহ বা মল্লিকা সেনগুপ্তের সৃষ্ট নারী চেতনার অগ্রদূত। নাজিয়ার উদারনৈতিক ধর্মের কিছু দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক-

ক. “ চাল বাছতে নাজিয়া অবিশ্বাসের হাসি হাসে। বলে, ‘মৌলবি পীর- ওলিয়া বড্ড স্বপন দেখে ! পরের মুরগি খেয়ে তো তাদের ‘প্যাট’ গরম হয় বেশি তিন- চার কাপ চা খাও না, কত রকমের স্বপন দেখবে সারারাত।“

খ. “ চাকরি করবে না, ধর্মের নামে ব্যবসা ! প্রতিবাদ করলেই আমরা কাফের শয়তান !”

গ. “ মুসাল্লির বিবি নাজিয়া খাতুন শয়তানী ফেরেবে পড়ে নামাজ- রোজা কিছুই করে না, বোরখা পরালে ‘ভূত’ বলে হেসেই খুন।“

নাজিয়া গৃহবধূ অথচ উদারনৈতিক, অন্যদিকে কদম রসুল চাকুরিজীবী হয়েও মৌলবি হয়েছে- লেখকের ব্যঙ্গ এখানেই। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কাছে নারী চিরদিনই শোষিত হয়েছে। তবে নাজিয়া কিন্তু আপোস করে নি, সে চলে গেছে। বাপের বাড়িতে শত অপমান সহ্য করেও থেকেছে, শেষে বৃত্তি হিসেবে বেঁছে নিয়েছে চুড়িবিক্রি। দাম্ভিক, অত্যাচারী কদম রসুলের আজ যৌবন অতিক্রান্ত, সে দ্বিতীয় বিবাহ করেছে কিন্তু দাম্পত্য জীবনে সুখী হব নি। আজ কদম ডেকেছে নাজিয়াকে, কিন্তু নাজিয়া সে ডাক প্রত্যাখ্যান করেছে। কোন রকম আপোস নয় মাথা উঁচু করে বাঁচতে চেয়েছে নাজিয়া। সে যেন কবির ভাষায়-

“ কেড়ে নিয়েছিলে বেদ পড়বার সুযোগও

তোমরা বললে মেয়েরা শুধুই ঘরণী

সংস্কৃতের অধিকারী শুধু পুরুষ

মেয়েদের ভাষা, শূদ্রের ভাষা আলাদা

…..      …….   …….. ………

তিল তিল করে হাজার বছরে মেয়েটি

অর্জন করে নিয়েছে মেধা ও শক্তি

ভেতরে তপ্ত হৃদয়, ওপর শান্ত

আজ অর্ধেক আকাশ মেয়ের তালুতে।“

        ( ‘নারী –ডট- কম’- মল্লিকা সেনগুপ্ত )

‘সহমরণ’ গল্পটি নকশাল আন্দোলের প্রেক্ষাপটে লেখা। জমিদার ও কৃষকের দ্বন্দ্ব সমাসের কথা যেমন উঠে এসেছিল নকশাল আন্দোলনের ফলে তেমনি উঠে এসেচিল মাটি মেশানো ভূমিজ মানুষের কথা। সেই ভূমিজ চাষিদেরই নিয়ে গড়ে উঠেছে এ গল্প। এখানে দুটি শ্রেণির দ্বন্দ্বই প্রধান হয়ে উঠেছে – কৃষক ও খেতমজুর। কৃষক আলাউদ্দিনের জমিতে খেতমজুরের কাজ করত স্যায়দালি, কানাই, রহিম, বন্দে আলি, গুলিরাম ও হাসেন বানুরা। পুরুষদের মজুরি দুই টাকা ও নারী( হাসেন বানু)র মজুরি দেড় টাকা। ইতিমধ্যে কমিউনিষ্ট পার্টি ঘোষণা করে খেতমজুরদের বেতন বৃদ্ধি করতে হবে। কিন্তু কৃষক আলাউদ্দিন ও তাঁর স্বজাতিরা রাজি হয় না। ফলে মাঠের ফসল মাঠেই পড়ে থাকে। অন্যদিকে কৃষকরা নিজেরাই ফসল তুলতে গেলে বাধা দেয় খেতমজুররা। ক্ষুধার জ্বালায় খেতমজুররা শেষে বলে-

“ রাত্রে চৌকি দিতে আসে সবাই। জনমজুরদের দিন চলে না। একদিন রাত্রে রহিম এল আলাউদ্দিনের কাছে। বললে, বিড়ি দাও দাদা, আজ তিনদিন খাওয়া নেই। এই সাতদিন কাজকাম বন্ধ। হাঁড়ি সিকেয় উঠেছে। তুমি এক কাজ করো। বলো যে চার টাকা দিচ্ছি। আর তিন টাকা করে দাও। আমরা পার্টিকে বলব চার টাকা দিচ্ছে। ল্যাঠা চুকে যাক।“

ক্ষুধার তাড়নায় খেতমজুররা শেষে চুরি করে। অভাব মানুষকে কতটা নৈতিক অধঃপতনের দিকে নিয়ে যায় তা লেখক তীর্যক ভাবে দেখিয়েছেন। অভাবের জ্বালায় খেতমজুররা শেষে প্রথা ভেঙে আলাউদ্দিনের জমিতে কাজে যায়। সে জমিতে গিয়ে দেখে খেতমজুররা সব ফসল চুরি করে নিয়ে গেছে। ফলে সংঘর্ষ বাধে আলাউদ্দিনের সঙ্গে রহিম, কানাইদের। তিনজনেই মৃত্যুবরণ করে। গল্পের নামকরণের ইঙ্গিত এই মৃত্যুর দিকে। লেখক দুই শ্রেণিকেই সহানুভূতির সঙ্গে অঙ্কন করেছেন। পিছিয়ে থাকা খেতমজুরদের তিনি লড়াই থেকে পরাজিত করেন নি। এমনকি আলাউদ্দিনকে হত্যা করেছে নারী হাসেন বানু। শ্রমজীবীর মৃত্যু হতে পারে না, তারা যুগে যুগে কাজ করে, এ যেন কবির ভাষায়-

“ আজ আকাশ রং হারাল

মানুষ হাঁটে পিপঁড়ের মত

অথচ প্রতি হৃদয়েই গান ছিল

লোহার পৃথিবীতে হয়তো ইস্পাতের গান।“

            -( ‘ গান, শ্লোগান, মেসিনগান’, দিনেশ দাস )

 আবদুল জব্বারের গল্প যতই পড়ি ততই বিস্মিত হতে হয়। কি অসীম শক্তি লেখকের, সেই সঙ্গে দেখার দৃষ্টিকেও কুর্নিশ জানাতে হয়।গ্রামীণ জীবনের চিত্রায়ণে আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহারে গল্পকে যেমন জীবন্ত করে তোলেন তেমনি প্রান্তিক মানুষের সামগ্রিক জীবনবোধ ও জীবন সম্পর্কে এক উদার ও স্বচ্ছ দৃষ্টি, ভূমিগত –ভূমিহীন মানুষের সামগ্রিক চালচিত্র অবগত হয়েই তিনি গল্পে অবতীর্ণ হন। ‘জনক’ গল্পটি আবদুল জব্বারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প। বাস্তবজীবন, মানবজীবন ও পশুপ্রীতি একাকার হয়ে গেছে এ গল্পে। এ গল্প পড়তে গিয়ে পাঠকের দুটি গল্পের কথা মনে পড়তে পারে- রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ ও প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘আদরিণী’। ‘ছুটি’ গল্পের ফটিকের মতই চঞ্চল আজাদ। প্রিয় হাতির মৃত্যুতে ‘আদরিণী’ গল্পে যে দৃশ্য উঠে এসেছিল এ গল্পেও গরুর মৃত্যুতে সে দৃশ্য উঠে এলেও আবদুল জব্বার পূর্বের দুই গল্পকারকেই ছাপিয়ে গিয়েছেন। আসলে সময়ের ব্যবধানে গল্পভাবনা ও জীবন পরিসর কত বর্ধিত হয় তা লেখক দেখাতে পেরেছেন। হাতির মৃত্যুতে জয়রাম মুখোপাধ্যায় দুই মাসের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন কিন্তু এ গল্পে আছে প্রতিশোধ ও নতুন করে বাঁচার চেষ্টা। গল্পের কাহিনি এমন- নিম্নবিত্ত চাষি ইনসানল ইনসানের কথা বলতে গিয়ে লেখক বলেছেন-“ বাঘের মতো ভয়ঙ্কর আর হিংস্র- টেরিফিক এবং ফেরোসাস চরিত্র।“ ইনাসানের স্ত্রী পীরবানু, সেও অসম্ভব সুন্দরী। ইনসানের সন্তান আজাদ। সে চেয়েচিল আজাদ শিক্ষিত হয়ে উঠুক। কিন্তু আজাদ এক ভবঘুরে ছেলে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-‘ বন্ধনহীন হরিণশিশু’। আজাদকে শিক্ষিত করতে ব্যর্থ হয়ে ইনসান চায় সে চাষেই মন দিক। তবে আজাদের কিন্তু সৃষ্টিশীল প্রতিভা ছিল- সে ছাড়াও লিখেছে। শেষে ইনসান বলে’ চাষার বেটা চাষ করবি চল’। আজাদ আজ কৃষকই হয়ে গেছে। পিতার কাছ থেকে শিখে নিয়েছে চাষের যাবতীয় রীতি পদ্ধতি। হঠাৎ গরুর মৃত্যু হলে ইনসান সমস্ত বিক্রি করে আবার নতুন গোরু ক্রয় করে। কিন্তু নতুন গোরুর মৃত্যুতে সমস্ত পরিবার দিশেহারা হয়ে যায়। লেখক অনবদ্য ভাষায় সে বর্ণনা দিয়েছেন-

“ ওষধ বেটে খাওয়ানো হল। হাতীশুঁড়ের শিকড়, আড়াইটা গোলমরিচ, তুলসীপাতা, হলুদ, গঙ্গাজল। কিন্তু ভোররাতে গরুটা মারা গেল গোঁ- গোঁ করে গোঙাতে গোঙাতে জিব বার করে। দেখলে কষ্ট হয়। ইনসান, আজাদ, পীরবানু সবাই কাঁদতে লাগল হাউ মাউ করে। একটা ছেলে মরার শোক লেগেছে যেন ইনসান আর পীরবানুকে। কপালে হাত চাপড়াতে লাগল ইনসান গরুটাকে জড়িয়ে ধরে বসে।“

মৃত গরু ভাগাড়ে পড়ে থাকলে আজাদ জঙ্গলে দাঁড়িয়ে থাকে। তেমনি উঠে এসেছে গ্রাম্য জীবনের কদাচার। মুচিই চামড়ার লোভে বিষ দিয়েছিল গরুকে। সেই প্রতিশোধ নিতেই আজাদ হত্যা করে মুচিকে- ফলস্বরূপ আজাদের ছয় মাস জেল হয়। তবে ইনসান হতাশ হয় নি। সে দাম্ভিক, শ্রমজীবী সংগ্রামী মানুষের প্রতিনিধি-“ছেলে প্রতিশোধ নিয়েছে, বাঘের বাচ্চা বাঘ হয়েছে।“ ইনসান আবার গরু কিনেছে। তাঁর আছে শ্রমের আনন্দ। আবার সে জমি প্রস্তুত করেছে, সন্তানের ফেরার অপেক্ষায় বসে আছে। আবদুল জব্বার পরাজিত মানুষের কথাকার নন। তিনি শ্রমজীবী নিম্নবিত্তদের জিতিয়ে দেবার কথাকার। আর সেই শ্রমজীবীরা হল প্রান্তিক মুসলিম সমাজের জনজাতি। সেই জাতির অভিজ্ঞাতার কথাই তিনি লিপিবদ্ধ করেন এক অদ্ভুত কৌশলে, সেই সঙ্গে ভাষা সৃষ্টির দক্ষতা সহজেই চোখে পড়ে।

82