ওয়েব ডেস্ক সেপ্টেম্বর ৩,২০২০: প্রথমে লকডাউন তারপর আমফান একের পর এক ধাক্কায় রাজ্যের অর্থনীতি একদম বেসামাল। কাজ হারিয়ে অসহায় লক্ষ লক্ষ মানুষ। তার ওপরে আবার ভিনরাজ্য থেকে আতঙ্কে ঘরে ফিরেছে অসংখ্য পরিযায়ী শ্রমিক। সব মিলিয়ে দেশের সাথে সাথে রাজ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক। এর ওপর রাজ্যের শাসক দলের চাপ আরো বাড়িয়ে তুলেছে দলের নেতাদের প্রতি একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ। অবস্থা এমনই শোচনীয় যে বাধ্য হয়ে প্রকাশ্যে শাসন করতে হচ্ছে রাজ্যের তৃণমূল সুপ্রিমোকে। এই পরিস্থিতিতে আগামী বছরের রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনকে মাথায় রেখে ইতিমধ্যেই রাজ্য ও জেলা সংগঠনকে কলঙ্কমুক্ত করতে বদ্ধপরিকর তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শোনা যাচ্ছে এরজন্য বহাল হয়েছেন কর্পোরেট বিশেষজ্ঞ ‘পিকে’ এবং তার সংস্থা আই প্যাক। তাদেরই পরামর্শে এরমধ্যেই বেশ কিছু জেলায় নেতৃত্বে নিয়ে আসা হয়েছে একেবারে তরুণ ও নতুন অবিতর্কিত মুখ। আগামী বিধানসভা নির্বাচনকে সবদিক থেকেই কঠিন লড়াই হিসেবে বিবেচনা করে জোর দেওয়া হয়েছে ব্লক, অঞ্চল ও বুথভিত্তিক সংগঠনে। পাশাপাশি পঞ্চায়েত স্তরে পদাধিকারীদের প্রতিও মানুষের সীমাহীন ক্ষোভের আঁচ পেয়ে সতর্ক হতে চলেছেন রাজ্যের তৃণমূল নেতারা। পিকের পরামর্শে স্বচ্ছতা প্রমানে এখন গ্রাম পঞ্চায়েতগুলির আয়ব্যয়ের হিসেব খুঁটিয়ে দেখতে চাইছেন তারা । জানা গিয়েছে, এ বিষয়ে ইতিমধ্যেই একটি বেসরকারি সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি তারা তৃণমূল পরিচালিত পঞ্চায়েতগুলির আর্থিক লেনদেন নিয়ে অডিট শুরু করবে। শোনা যাচ্ছে দুর্নীতিগ্রস্তদের চিহ্নিত করতে পঞ্চায়েতের এই অডিটকেই হাতিয়ার করতে চাইছে রাজ্যের শাসক দল। আমফান থেকে ইন্দিরা আবাস একাধিক ক্ষেত্রে কাটমানি ইস্যুর মতো একাধিক দুর্নীতিতে দলের জনপ্রতিনিধি এবং নেতাদের জড়িয়ে পড়ার ঘটনা সামনে আসায় যথেষ্ট ফাঁপরে পড়েছেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। তাই দলের ভাবমূর্তি ফেরাতে পিকের পরামর্শে  ‘দিদিকে বলো’, ‘বাংলার গর্ব মমতার’ মতো কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।  কিন্তু তৃণমূলের অন্দরের খবর, তাতেও জনমানসে ক্ষোভের তেমন একটা উপশম ঘটেনি। এছাড়া লোকসভা নির্বাচনে ধাক্কা খাওয়ার পর রাজ্যজুড়ে যে সার্ভের কাজ করা হয়েছে, তাতে বোঝা গিয়েছে, নীচুতলায় দলের ভাবমূর্তি ফেরানো খুবই প্রয়োজন। সার্ভেতে উঠে আসা তথ্যে দেখা গিয়েছে, দলের পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি এবং জেলা পরিষদ সদস্যদের অনেকেই নানা অপকর্ম এবং দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। সেসব নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভও রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। ফলে তৃণমূল নেতৃত্ব বুঝেছেন, শুধুমাত্র আগের মতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে উজ্জ্বল ভাবমূর্তির কাঁধে ভর করে আগামী ভোট বৈতরণি পার করা যাবে না। তৃণমূলস্তরে দলের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন। আর সেজন্যে সব দলীয় কমিটি ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি মানুষের ক্ষোভ প্রশমনে নীচুতলার প্রশাসনেও মুখ বদল করতে উদ্যোগী হয়েছে শাসকদল। খোঁজ চলছে বিরোধী দলেও। সেসব নিয়েও রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় উঠেছে বিস্তর। একাধিক বাম বিধায়ক,প্রাক্তন সাংসদ ও নেতৃত্বের তরফে অভিযোগ এসেছে যে স্বয়ং পিকের সংস্থা থেকে তাঁদের কাছে দলবদলের লোভনীয় সব প্রস্তাব এসেছে। যদিও পত্রপাঠ তার সবই ফেরানো হয়েছে বলে বাম নেতৃত্বের দাবি।

তবে এই আবহে রাতারাতি নিজেদের বিতর্কিত সব নিচুতলার নেতৃত্ব বদল করার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের পঞ্চায়েত আইনের সংশোধন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজ্যে সংশোধিত পঞ্চায়েত আইন অনুসারে, আড়াই বছর হওয়ার আগে প্রধান সহ বোর্ড পরিবর্তন করা যাবে না। সেই হিসেবে আগামী বছর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসেই পূর্ণ হচ্ছে পঞ্চায়েত বোর্ডগুলির আড়াই বছরের মেয়াদ। সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই রাজ্যের প্রায় সমস্ত জেলাতেই পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি এমনকি জেলা পরিষদ স্তরের প্রধান, উপপ্রধান, সভাপতি বা সভাধিপতিদের চিহ্নিত করে কালো তালিকাভুক্ত করেছেন তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব। এই বিষয়ে দলীয় রিপোর্ট এবং পিকের টিমের সার্ভে রিপোর্টের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বসে যাওয়া দলের পুরোনো কর্মীদের মতামত, সোশ্যাল মিডিয়া এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে খবর। এখন দেখার আগামী বিধানসভা ভোটের আগে পঞ্চায়েত স্তরের এই পাহাড়প্রমান দুর্নীতির অভিযোগ থেকে নিজেদের নিষ্কলুষ প্রমান করতে সত্যি ই কতটা কঠোর হতে পারেন শাসক দল।

7