বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

পর্ব ১৫

হাসান আজিজুল হকের ‘প্রেমের গল্প’ প্রকাশিত হল অভিযান থেকে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে। প্রেম সম্পর্কে তাঁর মনে হয়েছে -“বিজ্ঞান বলেছে প্রেম একটা দৈহিক গোলযোগের ব্যাপার। ১৪-১৫ বছরের ছেলেমেয়েদের দেহের ভিতরে এই গোলযোগ শুরু হয়। কঠিন নামের একগুচ্ছ গ্লান্ড আছে। তারাই কি এই গোলাযোগ ঘটায় ! তাহলে মনে হয় প্রেম বোধহয় এই দৈহিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার একটা উদ্‌বৃত্ত মায়ায় ভরা বিকার। না, আমি অতটা কাঠখোট্টা নই, নেহাত ব্যাখ্যা করতে পারিনি, তাই উলটোপালটা বলেছি।“  শফিক ও লিলিকে নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘মিনি মাগনার চুমকুড়ি’ গল্পটি। এক অদ্ভুত নায়ক শফিককে গড়ে তুলেছেন হাসান সাহেব এ গল্পে। পাগলাটে শফিকের মনেও যে প্রেমের জন্ম হতে পারে, সেও যে ভালোবাসতে পারে, তাঁরও যে চুমু খাবার অধিকার আছে ও মিলিত হতে পারে তা এ গল্পে দেখিয়েছেন লেখক। আর সে মিলনের জন্য প্রয়োজন ছিল একাকিত্ব, নির্জনতা ও পরস্পরের ভাব বিনিময় –তাই নিয়েই এ গল্পের কাঠামো বিবর্তিত হয়েছে।

               ‘মাটি পাষাণের বৃত্তান্ত’ গড়ে উঠেছে এক মুসলিম জমিদার ও ভূমিহীন কৃষককে কেন্দ্র করে। ভূমিহীন চাষি একামতউল্লা বংশ পরম্পরায় ধরে শোষিত হয়ে আসছে। সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন সে জমিদারকে জানিয়েছিল যে সরকারি তরফ থেকে একামতউল্লা এক একর জমি পয়েছে। এমনকি এ খবর একামতউল্লাকেও জানিয়েছিল মোনাজাতউদ্দিন। কিন্তু এ খবর জমিদার শোনামাত্রই হতাশ হয়ে যান। আসলে জমিদার দীর্ঘদিন ধরে শোষণ করে আসছে কৃষককে। পেট ভাতায় বংশ পরম্পরায় ধরে কাজ করে যাচ্ছে একামতউল্লারা। আজ সেই শোষণ উন্মুক্ত করে দিয়েছে এক উদার সাংবাদিক। জমিদারও জমি আঁকড়ে থাকতে চায়, জমির পরিমাণ যতই হোক না কেন সে কিছুতেই ছাড়তে চায় না। ফলে জমিদারের মনস্তাত্ত্বিক বিকিরণের নানাদিক লেখক দেখিয়েছেন এ গল্পে। সত্য কীভাবে মিথ্যা হয়ে যায়, মানুষ কীভাবে মানুষকে শোষণ করে, মানুষের স্বাধীনচেতনায় কীভাবে হস্তক্ষেপ করা হয় এসব নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘সাক্ষাৎকার’ গল্পটি। হুমায়ুন কাদিরের প্রকৃত নাম রহমান সাহেব কিনা তা নিয়ে তিন বন্ধু গোলাম কবির, গোলাম রব্বানী ও গোলাম নাবীদের হস্তক্ষেপ, অত্যাচার ও কীভাবে প্রশ্নের পর প্রশ্নের জালে মিথ্যা সত্যে পরিণত হয়, মানুষ হারিয়ে ফেলে প্রকৃত সত্য তা লেখক চমৎকার ভাবে দেখিয়েছেন।

        দুই সাংবাদিকের আত্মহনন নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘খনন’ গল্প। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদিকতা আজ কীভাবে বিক্রিত হয়ে গেছে, মানুষ কীভাবে শোষিত হচ্ছে তা দেখতে পাই এ গল্পে। হাসান সাহের গল্পে সামাজিক , অর্থনৈতিক ও মানুষের শোষণ-নিপীড়ন সব একই সঙ্গে উঠে আসে। তাঁর কাছে লেখা যেন শোষণের বিরুদ্ধে হাতিয়ায়। একজন প্রকৃত লেখকের সেটাই তো কাজ। খাল খননকে কেন্দ্র করে দুই সাংবাদিক শাহেদ ও মুনির খবর সংগ্রহে গেছে। খালের মাধ্যমে নদী থেকে জল এনে দুইপারের ফসল উৎপাদিত হবে। অথচ যাঁরা খাল খননের কাজে অংশ নিয়েছে তাদের কারও জমি নেই। তৃতীয় বিশ্বের অর্থনীতিতে এটাই আজ বড় সত্য। একদল মানুষ পরিশ্রম করবে আরেক দল মানুষ মুনাফা লুটবে। এই নিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে পারে সাংবাদিকরাই। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিকিয়ে গেছে সাংবাদিকতা। তাই শাহেদের মনে হয়েছে –“আমি হচ্ছি ভদ্দরলোক –মানে আগাপাছতলা ভণ্ড। আমার জীবিকা ভণ্ডামি। সাংবাদিকতার নাম করে ক্রমাগত ধাপ্পা দিয়ে যাচ্ছি।“ ( গল্প সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড, নয়া উদ্যোগ, প্রথম প্রকাশ ২০০৪, পৃ. ৫৯ ) আসলে একটি দেশ এই শ্রমজীবীদের ওপর নির্ভর করেই গড়ে ওঠে আর সবচেয়ে শোষিত হতে হয় এই শ্রমজীবী শ্রেণিদের। খাল পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে শাহেদ দেখেছিল এক বঞ্চিত নারীকে, যে লজ্জা ভুলে সামান্য খাদ্যের জন্য কাজে এসেছে। এই খাল কাটার জন্য শ্রমিকদের কোনো মুজুরি নেই, কেননা দেশে কাজের অভাব, তাই সবাই পেটভাতায় কাজে এসেছে। হোটেলে ফিরে শাহেদ মাংস খেতে বসে ঠিকই কিন্তু সেখান থেকে দেখে স্টেশনে এক ব্যক্তি ওজন করে ভাত বিক্রি করছে। এমনকি একটি ক্ষুধার্ত শিশু সমান্য ভাত খেয়ে নিলে প্রহার খেয়েছে। এই দৃশ্য দেখে শাহেদের সমস্ত খাওয়া বমি হয়ে যায়। আর এই শোচনীয় ঘটনা ভুলতে সে মদ সেবন করে এমনকি নারীসঙ্গও চায়। মুনীর নারী নিয়েও আসে, কিন্তু শাহেদ দেখে এই নারী সেই কাজের মহিলা, যে সমস্ত লজ্জা ভুলে কাজে অংশ নিয়েছিল। ফলে সে এবার নারী সঙ্গেও অস্বীকার করে। একটি খনন ও অনুষঙ্গ কিছু ঘটনাকে সামনে রেখে শাহেদের চরিত্রকে অঙ্কন করেছেন, বলা ভালো এক সাংবাদিকতার ইতিবৃত্ত লিখতে চেয়েছেন। এক ভয়ংকর জীবন সত্যের মুখোমুখি হয়ে হাসান সাহেবকে এসব গল্প লিখতে হয়েছে। সমাজ অর্থনীতির দিক থেকে বাংলাদেশ সেদিনও স্বনির্ভর হতে পারেনি। সেই সঙ্গে চলেছে লুন্ঠনরাজ ও মৌলবাদীদের চক্রান্ত। সেখানে সাহসী সাংবাদিককেও নিহত হতে হয়েছে। ফলে সাংবাদিকরাও দেশ সমাজ ভুলে আজ সুখের পেশা হিসাবে বেঁছে নিয়েছে এই পেশাকে। সেখান থেকে দাঁড়িয়ে হাসান সাহেব অঙ্কন করেছেন শাহেদ, মুনীরদের, যাঁরা সামান্য হলেও দেশের জন্য ভাবে, সাধারণ মানুষের ভাগ্য বিপর্যয় যাঁদের মনে অনুরণন তোলে।

                    হাসান সাহেব নিজেই বলেছেন –“যে বাইরে থেকে ভিতরে আসে, যে নতুন করে জন্ম নেয়, একটি নতুন দেশ যার অধিগ্রহণ করে, জীবন-মাকড়সার জটিল জালে যে আটকে যায় আমার অবস্থা যেন তাই। এখন আমি ভিতরের লোক।“ তাঁর গল্প ভিতরের গল্প, জীবনের ভিতরে যে জীবন সেই শরীরের শিরায় শিরায় তিনি পৌঁছে যেতে চান। তাই হাসানের আখ্যানভুমি গড়ে ওঠে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতাকে সামনে রেখে। ‘জননী’ গল্প গড়ে উঠেছে একটি যুবতী নারী আয়েশাকে কেন্দ্র করে। যে বিবাহ না হওয়া সত্ত্বেও সন্তানের জন্ম দেওয়ার ফলে সমাজের চোখে লাঞ্ছিত। কিন্তু এই সন্তানের জন্মের জন্য দায়ী কে ? সেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজকেই কাঠগোড়ায় দাঁড় করিয়েছেন লেখক। আয়েশা কাজ পেয়েছিল কথকের বাড়িতে, কিন্তু গৃহিণী আয়েশার সমস্ত পরিচয় জানতেই কাজ ছাড়িয়ে দিয়েছে। আয়েশার একটিই অপরাধ সে যুবতী থেকেও সন্তানের জন্ম দিয়েছে। এই আয়েশার জন্য লেখকের স্নেহ,মমতা, ভালোবাসা। কেননা কথকেরও কন্যা আছে। এই আয়েশাকে কেন্দ্র করে কথক ও স্ত্রীর সংলাপের মধ্য দিয়ে সমাজ অর্থনীতির নানা প্রসঙ্গ এসেছে। এমনকি এই আয়েশাকে কেন্দ্র করেই লেখক আজ একা হয়েছে। লেখক নিজেও জানেন এই শব্দমালা লিখে তিনি সমাজের কোন পরিবর্তন করা যাবে না বা সম্ভব নয়। তবে এছাড়াও তো লেখকের কিছু করার নেই, সেই বোধ থেকেই তিনি কলম নিয়ে বসেন –

“পৃথিবীকে সে দেবে অমূল্য উপহার, গর্বে তৃপ্তিতে ভরে উঠেছে তার বুক, অবজ্ঞতার চোখে সে চেয়ে আছে মানুষের ইতর সংসারের দিকে। জানি এসব কিছু নয়, আমিই তৈরি করেছি দুষ্পাঠ্য দুর্জ্ঞেয় অক্ষরমালা, যা কেবল আমিই পড়তে পারি। এইসব অক্ষর কি দাগে-ঢাকা, ক্ষয়-পাওয়া সুদূর অতীতের কোনো শিলালিপিতে ছিলো, নাকি আমিই তৈরি করে নিয়েছি ?” (তদেব, পৃ. ২৪০)

 আজ আয়েশার স্থান হয়েছে গাছের তলায়। এই ইতিবৃত্ত শুনে কথকের স্ত্রীর চোখেও জল এসেছে কিন্তু তা হল আলগা সহানুভূতি। কেননা তাঁরা ইচ্ছা করলেই একটি নারীকে আশ্রয় দিতে পারত কিন্তু সমাজের ভয়ে পিছিয়ে এসেছেন। আয়েশাকে হয়ত বেঁচে থাকার জন্য, খাদ্যের জন্য বহু সন্তানের জন্ম দিতে হবে, পিতৃপরিচয়হীন সন্তান পৃথিবীর বুকে দাপিয়ে বেড়াবে। মেদিনী সে অত্যাচার সহ্য করলেও মানুষ দেবে গঞ্জনা। তবে এর জন্য আয়েশার কোনো আক্ষেপ নেই। তাঁর কাছে শুধু একটিই সত্য সে সন্তানের জননী। সন্তানের বুকে তিনি জন্মদাগ রেখে যেতে চান না । এই আয়েশার জন্য কথকের বেদনা রয়েছে, তবে তিনি কিছুই করতে পারেননি। শেষে শুধু জিজ্ঞাস করেছিলেন এবার পুত্র না কন্যা হয়েছে, উত্তরে দেখেছেন –“তার জনহীন জন্মদার সে সম্পূর্ণ খোলা রেখেছে।“ হাসানের আখ্যান বিশ্বে গল্প কথনের থেকে বিশ্লেষণী মনোভাব বেশি চোখে পড়ে। কেননা লেখার মধ্য দিয়েই তিনি সমাজকে কিছু দিয়ে যেতে চান –“লেখার আয়নায় আমার সময়কালের দেশ সমাজ পৃথিবীর বাস্তবতার কিছুমাত্র প্রতিফলন যদি ঘটাতে পারি, তাতে হয়তো এমন শক্তির উদ্বোধন ঘটবে যাতে শ্রম ও উৎপাদনের ফলের মতো কোনো প্রত্যক্ষ ফল ফিরিয়ে দিতে না পারার সংকোচও খানিকটা কেটে যাবে।“ ( ছোটগল্পের বিনির্মাণ, তপোধীর ভট্টাচার্য, তদেব, পৃ. ‌১২০) সেই সংকোচই কাটাতে চেয়েছেন তিনি। গভীর জীবনবোধ ও মননের চিন্তাবিন্যাস নিয়ে তিনি গল্প সাজিয়েছেন, চরিত্র নির্মাণ করেছেন। এই উপমহাদেশে উত্তর আধুনিক সাহিত্য যাঁরা নির্মাণ করে চলেছেন হাসান আজিজুল হক তাঁদের মধ্যে অন্যতম তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

14