জম্মু-কাশ্মীরের পুলওয়ামা সন্ত্রাসবাদী হামলার ১৮ মাস পর আত্মঘাতী জঙ্গি হামলায় চার্জশিট দাখিল করল জাতীয় তদন্তকারী এজেন্সি (এনআইএ)। মঙ্গলবার ২৫ অগস্ট ১৯ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ১৩,৮০০ পাতার চার্জশিট দাখিল করে এনআইএ। ২০১৯ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ কাশ্মীরের পুলওয়ামায় কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী, সিআরপিএফের কনভয়ে অতর্কিতে হামলা চালিয়েছিল জইশ জঙ্গিরা। যার জেরে সিআরপিএফের ৪০ জওয়ান শহিদ হন। জখম হন আরও আট সিআরপিএফ। গত বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি সিআরপিএফের ওই কনভয়টি জম্মু থেকে শ্রীনগরে যাওয়ার পথে পুলওয়ামার লেথপুরায় আত্মঘাতী হামলাটি চালিয়েছিল আদিল আহমেদ ডর। তদন্তে সামনে আসে, আদিল ছিল জইশ-ই-মহম্মদের জঙ্গি।

চার্জশিটে জইশ-ই-মহম্মদ প্রধান মাসুদ আজহার-সহ ১৯ জন জঙ্গি নেতার নাম রয়েছে। যারা গত বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামায় আত্মঘাতী হামলার ছক কষেছিল। এছাড়াও ১৩,৮০০ পাতার চার্জশিটে পাকিস্তানের নামও উল্লেখ করেছে এনআইএ।

মাসুদ আজহার ছাড়াও জইশ প্রধানের ভাই আবদুল রউফ আসগার ও আম্মার আলভি এবং ভাইপো উমর ফারুকের নামও রয়েছে এনআইএর দাখিল করা চার্জশিটে। ফারুক আবার ইব্রাহিম আথারের ছেলে। এই ইব্রাহিমই ১৯৯৯ সালে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের আইসি-৮১৪ বিমান অপহরণে অভিযুক্ত।

এনআইএ সূত্রের খবর, গোটা হামলার মূল ষড়যন্ত্রী উমর ফারুক ২০১৮ সালের এপ্রিলে ভারতে প্রবেশ করে৷ সেই-ই আইইডি জড়ো করে৷ ২০২০ সালের ২৯ মার্চ ফারুকের মৃত্যু হয় কাশ্মীরে একটি এনকাউন্টারে৷ আইইডি বিশেষজ্ঞ জঙ্গি কামরানেরও মৃত্যু হয় ওই এনকাউন্টারে৷

NIA-এর চার্জশিটে পুলওয়ামা হামলার একাধিক চমকপ্রদ তথ্য সামনে এসেছে:

১) পুলওয়ামা সন্ত্রাসবাদী হামলার ছক কষা হয়েছিল পাকিস্তানে বসে। হামলার প্রশিক্ষণ নিতে জইশ জঙ্গিদের পাঠানো হয়েছিল আফগানিস্তানে। সেখানে জঙ্গি শিবিরে জইশ ক্যাডাররা প্রশিক্ষণ নেয়। আল-কায়দা-তালিবান-জইশ-ই-মহম্মদ (Al-Qaida-Taliban-JeM) ও হক্কানি-জইশ-ই-মহম্মদের (Haqqani-JeM) শিবিরে বিস্ফোরক ব্যবহার ছাড়াও জঙ্গিপনার বিভিন্ন কৌশল তারা রপ্ত করে তারা পাকিস্তানে ফেরে।

২) পুলওয়ামা হামলার মূল অভিযুক্ত মহম্মদ উমর আফগানিস্তানে গিয়েছিল ২০১৬-১৭ সালে। সেখানে জঙ্গি হামলার প্রশিক্ষণ নিয়ে পাকিস্তানে ফেরে। ২০১৮ সালের এপ্রিলে আন্তর্জাতিক সীমান্ত জম্মু-সাম্বা সেক্টর দিয়ে ভারতে অনুপ্রবেশ করে। পুলওয়ামায় জইশ-ই-মহম্মদের কম্যান্ডারের দায়িত্ব নেয়।

৩) ভারতে ঢোকার পরেই মহম্মদ উমর তিন পাকিস্তানি সহযোগী– মহম্মদ কামরান, মহম্মদ ইসমাইল ও কারি ইয়াসির ছাড়াও লোকাল জঙ্গি সমীর ডর ও আহমেদ ডরের সঙ্গে বসে আইইডি ব্যবহার করে নিরাপত্তা বাহিনীর উপর হামলার প্রস্তুতি চূড়ান্ত করে।

৪) শাকির বাসির জান, পির তারিক আহমেদ শাহ ও বিলাল আহমেদ এই জঙ্গিদের আশ্রয় দিয়েছিল। ১৪ ফেব্রুয়ারি হামলার আগে জম্মু-শ্রীনগর হাইওয়েতে রেকি করেছিল শাকির বসির।

৫) মুদসির আহমেদ খান হামলায় ব্যবহৃত জিলেটিন স্টিক জোগাড় করে দিয়েছিল। শাকির বসির নিজের বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছিল আরডিএক্স।

৬) হামলার আগে আগে সাজিদ আহমেদ ভাট একটি মারুতি ইকো গাড়ি কিনেছিল। গাড়িটি কেনাই হয়েছিল আইইডি বিস্ফোরণ ঘটানোর লক্ষ্যে। অ্যামাজন থেকে চার কেজি অ্যামোনিয়াম পাউডার কিনেছিল ওয়াজির উল ইসলাম।

৭) পুলওয়ামা হামলার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় আদিল ডরের যে ভিডিয়োটি রিলিজ করা হয়েছিল, সেটি বানানো হয়েছিল ২০১৯ সালের জুনে।

৮) ২০১৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি এই হামলার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু, ভারী তুষারপাতের কারণে জঙ্গিরা তা করে উঠতে পারেনি। কারণ, জাতীয় সড়কে গাড়ি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

৯) জঙ্গিরা সাম্বা-কাঠুয়া সেক্টরে ঢোকার জন্য কী ভাবে চেষ্টা করেছিল, এনআইএ’র তদন্তে তা-ও বেরিয়ে আসে। জাতীয় সড়ক বন্ধ থাকায় ৬ ফেব্রুয়ারি জঙ্গিদের পরিকল্পনা বানচাল হয়। এরই মধ্যে শাকির বাসির ২০০ কেজির বিস্ফোরক বোঝাই মারুতি ইকো গাড়ি নিয়ে ১৪ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সড়ক ধরে চলে আসে। ওই দিনই পরিকল্পনা মাফিক সিআরপিএফ কনভয়ে হামলা চালায় আদিল আহমেদ ডর।

এনআইএ সূত্রে জানা গিয়েছে তদন্তে কিছু হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট, ছবি, ভিডিও অভিযুক্তদের মোবাইল থেকে পেয়েছেন আধিকারিকরা। সেগুলিও চার্জশিটের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে। সেইগুলিও আদালতে পেশ করা হচ্ছে।

এনআইএর চার্জশিটে থাকা ১৯ জনের নামের তালিকা –

১) মাসুদ আজহার আলভি, ৫২ বছর, পাকিস্তানি নাগরিক

২) রউফ সাগর আলভি, ৪৭ বছর, পাকিস্তানি নাগরিক

৩) আম্মার আলভি, ৪৬ বছর, পাকিস্তানি নাগরিক

৪) শাকির বশির, ২৪ বছর, জম্মু ও কাশ্মীরের পুলওয়ামার কাকাপোরার বাসিন্দা

৫) ইনশা জান, ২২ বছর, জম্মু ও কাশ্মীরের পুলওয়ামার কাকাপোরার বাসিন্দা

৬) পীর তারিক আহমেদ শাহ, ৫৩ বছর, জম্মু ও কাশ্মীরের পুলওয়ামার কাকাপোরার বাসিন্দা

৭) ওয়াইজ-উল-ইসলাম, ২০ বছর, জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগরের বাসিন্দা

৮) মহম্মদ আব্বাস রাথের, ৩১ বছর, জম্মু ও কাশ্মীরের পুলওয়ামার কাকাপোরার বাসিন্দা

৯) বিলাল আহমেদ কুছেরি, ২৮ বছর, বছর, জম্মু ও কাশ্মীরের পুলওয়ামার লালহারের হাজিবলের বাসিন্দা

১০) মহম্মদ ইকবাল রাথের, ২৫ বছর, জম্মু ও কাশ্মীরের বদগামের ছারে-ই-শরিফের বাসিন্দা

১১) মহম্মদ ইসমাইস, ২৫ বছর, পাকিস্তানি নাগরিক

১২) সমীর আহমেদ দার, ২২ বছর, জম্মু ও কাশ্মীরের পুলওয়ামার কাকাপোরার বাসিন্দা

১৩) আশাক আহমেদ নেঙ্গরু, ৩৩ বছর, জম্মু ও কাশ্মীরের পুলওয়ামার রাজপুরার বাসিন্দা

১৪) আদিল আহমেদ দার, ২১ বছর, জম্মু ও কাশ্মীরের পুলওয়ামার কাকাপোরার বাসিন্দা (খতম)

১৫) মুহম্মদ উমর ফারুক, ২৪ বছর, পাকিস্তানের নাগরিক (খতম)
১৬) মহম্মদ কামরান আলি, ২৫ বছর, পাকিস্তানের নাগরিক (খতম)

১৭) সাজ্জাদ আহমেদ, ১৯ বছর, জম্মু ও কাশ্মীরের অনন্তনাগের বিজবেহেরার বাসিন্দা (খতম)

১৮) মুদাসির আহমেদ খান, ২৪ বছর, জম্মু ও কাশ্মীরের পুলওয়ামার অবন্তীপুরার বাসিন্দা (খতম)

১৯) কারি ইয়াসির, পাকিস্তানের নাগরিক (খতম)

9