কলমে ও ক্যামেরায় শুভময় ব্যানার্জী

জাকানা প্রজাতির পাখির গড়ন অনেকটা আমাদের চির পরিচিত ডাহুক পাখির মত হলেও এদের মধ্যে পার্থক্য আছে। সুদর্শন এই পাখিটিকে একসময় গ্রামের দিঘী বা ঝিলে বিচরণ করতে দেখা গেলেও শিকারিদের অত্যাচারে এরা আজ গ্রামীণ জনপদ থেকে অনেকটাই বিতাড়িত।

বর্তমানে বিভিন্ন পক্ষীনিবাস ও বড় জলাভূমি গুলিতে বছরের বিশেষ সময় এদের বেশি বিচরণ করতে দেখা যায়।

এই ধরনের পাখি গুলি ভারত, বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিভিন্ন দেশগুলিতে দেখতে পাওয়া যায়।

এই পাখির বাংলা নাম – জলপিপি বা দলপিপি।ইংরেজি নাম – ব্রোঞ্জ উইন্ড জাকানা (Bronze -Winged Jacana)
গোত্রের নাম – জাকানিদি ।এদের বৈজ্ঞানিক নাম- মেটোপিডিয়াস ইন্ডিকাস (Metopidius Indicus)

জলাভূমিতে বিচরণকালে অদ্ভুত সুন্দর পি -পি -পি সুরে ডাকার কারণে, এদের আমরা বাংলায় জলপিপি বলে থাকি। এদের পা ও পায়ের আঙুলগুলি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি লম্বা হয়ে থাকে। এরা জলে ভাসমান পাতা গুলির উপর ভর দিয়ে অতি দ্রুত চলাচল করতে সক্ষম। এরা যখন ওড়ে তখন এদের গলা সামনের দিকে ও পা ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে।

স্ত্রী ও পুরুষ জাকানা পাখি প্রায় একই রকম দেখতে হলেও স্ত্রী পাখি পুরুষ পাখির তুলনায় আকারে কিছুটা বেশি বড় হয়। লম্বায় স্ত্রী পাখি ৩২ সেন্টিমিটার ও পুরুষ পাখি প্রায় ২৯সেন্টিমিটার লম্বা হয়। মাথা ,ঘাড় ,গলা ,বুক উজ্জ্বল নীল রঙের হয় । পিঠ ও ডানার রং সবুজাভ ব্রোঞ্জ ।ওড়ার পালক কালচে বাদামি রঙের। লেজ আকারে ছোট । ঠোঁটের গোড়ায় সামান্য লাল রং দেখতে পাওয়া যায়। চোখের উপর একটি লম্বা সাদা অংশ থাকে যা ঘাড়ের পিছন পর্যন্ত বিস্তৃত। এদের পা গুলি হয় হালকা সবুজ রংয়ের । পূর্ণবয়স্ক জাকানা পাখির থেকে কমবয়স্ক জাকানা পাখিগুলির দেহের রং কিছুটা অন্য রকমের হয়।

খাদ্যাভ্যাস:-
জলজ উদ্ভিদের পাতা ,ঘাস,ছোটখাটো পোকামাকড়, জলজ বিভিন্ন ফল ও বীজ এদের প্রধান খাবার।

প্রজনন :-
এদের প্রজনন কাল শুরু হয় সাধারণত বর্ষার পরে (ভারতবর্ষে জুন থেকে সেপ্টেম্বর এর মধ্যে)। পুরুষ জাকানা পাখিরা নিজেদের এলাকা নির্ধারিত করে। স্ত্রী জাকানা পাখিরা প্রজনন কালে একাধিক পুরুষ জাকানা পাখির সাথে মিলিত হয় এবং তিন-চারটি করে ডিম পেড়ে অন্যত্র অন্য কোন পুরুষ জাকানা পাখির সাথে মিলিত হওয়ার জন্য চলে যায়। ডিমে তা দেয়া থেকে শুরু করে বাচ্চা প্রতিপালনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পুরুষ জাকানা পাখির ওপরে থাকে ।স্ত্রী জাকানা সাধারণত জলাভূমিতে থাকা বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদের পাতার উপরে ডিম পাড়ে । এদের ডিম গুলি দেখতে শঙ্কু আকৃতির, উজ্জ্বল বাদামী রঙের । ডিমের উপরে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কালো দাগ দেখতে পাওয়া যায়। পুরুষ জাকানা পাখি শত্রুদের হাত থেকে তাদের বাচ্চাদের নিরাপত্তার জন্য নিজের ডানার তলায় আশ্রয় দেয়।২৯ দিন বাদে ডিম ফুটে বাচ্চা হয় এবং এই বাচ্চাগুলি মোটামুটি দশ সপ্তাহের মধ্যে স্বাবলম্বী হয়ে যায়।

সংরক্ষণ:-
আই ইউ সি এন(International Union for Conservation of nature) এই প্রজাতিকে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত বলে চিহ্নিত করেছেন ।
কিন্তু ক্রমবর্ধমান মানব সভ্যতার অট্টালিকার বিস্তার এই সমস্ত পাখিদের বাসস্থান গুলিকে ক্রমেই সীমিত করে চলেছে।এছাড়াও নদী জলাভূমি গুলিতে আগাছা ও আবর্জনার বৃদ্ধি এই সমস্ত পাখিদের খাদ্য সংস্থানের অভাব ঘটাচ্ছে। তাই আমাদেরকে বিশেষ যত্নশীল হতে হবে পরিবেশকে পাখিদের বসবাসের উপযুক্ত করে তুলতে হবে ।

38