রাজারাম সাহা

পঞ্চম পর্ব

আমাদের জেলায় পরিযায়ী পাখিদের বেশ আনাগোনা রয়েছে। পরিযায়ী পাখি বলতেই সবার আগে শামুকখোলের নামটিই আমাদের মাথায় আসে। শামুকখোল পরিযায়ী হলেও দীর্ঘদিন ধরে বছরের পর বছর নির্দিষ্ট সময়ে একই জায়গায় বার বার ফিরে আসে, বাসা বানায় তাই খুব সহজেই এদের আমরা চিনতে পারি। কিন্তু এদের বাদ দিলে আরো বেশ কিছু পরিযায়ী পাখি আছে যাদের খোঁজ আমরা তেমন ভাবে রাখি না। এদের মধ্যে অন্যতম হলো “দুধরাজ”।

দুধরাজ পাখিটিকে ইংরেজিতে Asian Paradis flycatcher বলা হয়। এশিয়া মহাদেশে এই স্বর্গীয় পাখির বাস এবং এরা উড়ন্ত পোকামাকড় খায় বলে এদের নাম হয়েছে Asian Paradis flycatcher।

কেন এদের Paradis bird বা স্বর্গীয় পাখি বলা হয় এই প্রশ্নটা যেমন আমার মনে এসেছিল আশা করি পাঠকদের মনেও এই কৌতুহল জাগবে। আবার এটাও আশা রাখি একবার এই পাখিটিকে স্বচক্ষে দেখলে খুব সহজেই যে কেউ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাবে। আমাদের দেশে প্রাপ্ত সুন্দর পাখি গুলির মধ্যে এটি অন্যতম। নানা রঙ বেরঙের পালকের বাহার হয়তো নেই এদের শরীরে কিন্তু তা সত্ত্বেও এরা ভীষণ সুন্দর হয় দেখতে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ পাখির বুক, পেট, পিঠ, লেজ সম্পূর্ণ শরীর দুধ সাদা রংয়ের। তাই এদের নাম দুধরাজ। ডানার অগ্রভাগে

কালো রং থাকে। মাথা, মুখ ও গলা নীলচে কালো। এদের মাথায় বুলবুল পাখির মতো ঝুঁটি থাকে, তাই অনেকে এদের সাহেব বুলবুল বলে থাকে। কিন্তু এরা বুলবুলের বংশোদ্ভূত নয়। এদের লেজ অনেকটা বড় হয়। এই লেজের জন্যই এদেরকে অন্যান্য পাখি থেকে ভিন্ন ও আকর্ষণীয় করে তোলে। এই পাখিটি লালচে বাদামী রঙের হয় ও লেজ ছোট থাকে। চোখের পাশে নীল রংয়ের বর্ডার থাকে। প্রথম অবস্থায় পুরুষ পাখির রং লালচে বাদামি থাকলেও পরবর্তীতে রঙ পরিবর্তিত হয় দুধসাদা রংয়ের রূপান্তরিত হয়।

সাধারণত বাঁশঝাড়ে বাঁশের সরু কঞ্চিতে বা গাছের নিচু সরু ডালে শুকনো সরু ডাল , মাকড়সার জাল, তুলো দিয়ে পেয়ালার মতো দেখতে cup nest বা বাসা বানায়। বাসার আকৃতি খুব বড় হয় না তাই সহজে দেখে চেনা যায় না। এদের মধ্যে বছরের পর বছর একই এলাকায় বাসা বানানো প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বেনে বউ, ফিঙে, কমলা দামা প্রভৃতি পাখির আশেপাশে এরা বাসা বানায়। অন্য কোন পাখি যেমন হাঁড়িচাচা, শিকরা প্রভৃতি পাখিরা বাসার কাছে এলেই এরা আক্রমনাত্মক রূপ ধারণ করে। দুধরাজ পাখি ভীষন সাহসী পাখি।

এরা উড়ন্ত পোকামাকড় খেয়ে থাকে। ফড়িং, প্রজাপতি, মথ প্রভৃতি এদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে।

মার্চ মাসের দিকে দক্ষিণ ভারত থেকে এরা আমাদের জেলায় আসে। এখানে বাসা বাঁধে, প্রজনন করে এবং বাচ্চা লালন পালন করে আগস্ট সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে চলে যায়। পুরুষ ও স্ত্রী পাখি একসঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে লালন পালন করে ছানাদের।ছানারা প্রথম অবস্থায় লালচে বাদামী রঙের থাকে। বড় হতে হতে স্ত্রী পাখি লালচে-বাদামি থেকে যায় কিন্তু পুরুষ পাখির লেজ ফিতার মতো বড় হয়। তাদের শরীর আন্দাজে লেজ অনেকটাই বড় হয়। পরবর্তীতে লালচে বাদামী থেকে ধীরে ধীরে সাদা রঙের হয়ে যায়। এদের ফিতের মত বড় লেজ ও ঝুটির জন্য ফিতে বুলবুল বা লেজ ঝোলা পাখি বলেও ডাকা হয়।

দুধরাজ আগে অনেক বেশি সংখ্যায় দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে সংখ্যায় কমই দেখা যায়। আকর্ষণীয় রঙের জন্য এদের শিকারির মুখে পড়তে হয়। শুধুমাত্র সৌখিনতার জন্য এদের লেজ কেটে নেওয়া হয়। এছাড়াও ঘন জনবসতি এদের বেড়ে ওঠার পক্ষে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমাদের সকলকে এদের প্রতি যত্নশীল ও সচেতন হতে হবে যাতে এরা হারিয়ে না যায়। কারণ এই পৃথিবীতে শুধুমাত্র মনুষ্য সভ্যতা থাকবে এমন নয়, এই পাখিগুলিরও বেঁচে থাকার সমান অধিকার রয়েছে।

624