লাল গেঞ্জি

অনেকক্ষন থেকে লক্ষ্য করছেন সুজয়বাবু, লাল গেঞ্জি পড়া বছর পঁয়ত্রিশের একটা লোক ট্রেনের এদিক ওদিক বারবার তাকাচ্ছে। কুচকুচে কালো গায়ের রং, চুলগুলো অগোছালো, একটা ধুলোমাখা কালো প্যান্ট পড়ে আছে, পায়ে হাওয়াই চপ্পল। ট্রেনে খুব পকেটমারি হচ্ছে আজকাল। সুজয়বাবু লোকটাকে চোর ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছেন না। তাই নিজের মানিব্যাগটা পেছনের পকেট থেকে সামনের পকেটে রাখলেন। সুজয়বাবুর স্টেশন চলে এসেছে, বেশকিছু লোকের সাথে উনিও নামলেন স্টেশনে। নামার সময় খেয়াল করলেন লাল গেঞ্জি পড়া লোকটাও নামলো। কিন্তু নামার পর তাকে আর দেখলেন না। কেজানে কার পকেটমারা যাবে আজ। প্ল্যাটফর্মের ভিড় দিয়ে হেঁটে চললেন। হঠাৎ শুনলেন সামনের ভিড়ে চোর চোর চিৎকার। প্রায় সাথে সাথেই ট্রেনও ছাড়লো। আর তখনই চিৎকারটা থেমে আবার গেলো গেলো চিৎকার শোনা গেলো। ট্রেন চলে যেতেই প্ল্যাটফর্মের একদিকে ভিড় হয়ে এলো। কেউ একজন ট্রেনে কাটা পড়েছে। লোকেদের মুখে শুনলেন একজন পকেটমার পকেটমেরে পালাতে গিয়ে ট্রেনে কাটা পড়েছে। সুজয়বাবু দেখার জন্য এগিয়ে গেলেন, কিন্তু ভিড়ে কিছু দেখতে পেলেন না। ট্রেনে তার পাশে যে লোকটি দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই পকেটমেরে পালাতে গিয়ে কাটা পড়েছে কিনা কে জানে। সারাদিন অফিস করে সুজয়বাবু ক্লান্ত, তাই আর না দাঁড়িয়ে বাড়ির দিকে হাঁটলেন। সুজয়বাবুর বাড়ি স্টেশন থেকে মিনিট কুড়ির হাঁটাপথ, হেঁটেই যাওয়া আসা করেন, কিন্তু ভেতরের আর একটা রাস্তা দিয়ে যেখানে সময়ও লাগে কম আর রাস্তা ফাঁকা থাকে। রোজকার মতো আজও সেই রাস্তাতেই হেঁটে বাড়ি ফিরছেন। মাথায় ঘুরছে লাল গেঞ্জি পড়া পকেটমারের ট্রেনে কাটাপড়ার কথা। কেনোইবা এসব কুকর্ম করতে যায় এরা, বেঘোরে প্রাণটা দিতে হলো কম বয়সি লোকটাকে। খুব খারাপ লাগছে সুজয়বাবুর। হাঁটতে হাঁটতে কানে এলো পেছনে হওয়াই চপ্পল পরে হাঁটার চট্ চট্ শব্দ। দিনকাল ভালোনা, চুরি-ডাকাতি চারিদিকে হচ্ছে। সুজয়বাবুর পকেটে মানিব্যাগে অফিস থেকে বেড়িয়ে এটিএম থেকে তোলা বেশকিছু টাকাও রয়েছে। আর এই রাস্তাটা বেশ ফাঁকা লোকজনের তেমন যাওয়া আসা নেই। পা চালাতে চালাতে একবার পেছনে ঘুড়ে তাকালেন, চোখে পরলো একটা লাল গেঞ্জি পড়া লোক হেঁটে আসছে। মনেপড়ে গেলো ট্রেনে দেখা লোকটার কথা। একটু ভালো করে দেখলেন এতো সেই ট্রেনের লোকটাই। যে ট্রেন থেকে নামার আগে তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল, আর যাকে ভেবেছিলেন পকেটমারি করতে গিয়ে ট্রেনে কাটা পড়েছে। তাহলে কি ও কাটা পড়েনি, সেকি অন্য কোনো পকেটমার ছিল! খেঁয়াল হলো লোকটা যেনো তার দিকেই খুব দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে। সুজয়বাবুর বুঝতে বাকি থাকলো না লোকটা তার পিছুই নিয়েছে, তার মানিব্যাগ মোবাইল ছিনতাই করতেই আসছে। ফাঁকা রাস্তা, যদি একটা ছুরি বার করে ভয় দেখিয়ে তার সর্বস্ব লুট করতে চায় তাহলে দিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। সুজয়বাবু এবার দৌড়াতে আরম্ভ করলেন, পেছনের লোকটিও যেনো ওনারই গতিতে ওনারই দিকে এগিয়ে আসছে। সুজয়বাবু হাঁপিয়ে উঠলেন। বাড়ির কাছাকাছি এসে আর দৌড়াতে নাপেড়ে মদনের চায়ের দোকানে ঢুকলেন। দোকানে মদন ছাড়াও দুজন লোক বসেছিলেন। তার হাঁপানো দেখে তারা জিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছে। উনি হাঁপাতে হাঁপাতে সব ঘটনা বলতে যাচ্ছিলেন তখনই লাল গেঞ্জি পড়া লোকটা চায়ের দোকানে তাদের সামনে এসে দাঁড়ালো। সুজয়বাবু ভয়ে ভয়ে তার দিকে তাকালো। মদন ও দোকানের অন্য দুজনও লোকটির দিকে দেখলো। লাল গেঞ্জি পড়া লোকটাও হাঁপাচ্ছে আর হাঁপাতে হাঁপাতে সুজয়বাবুর পাশে বসলেন। পকেট থেকে একটা মোটা মানিব্যাগ বার করে সুজয়বাবুর দিকে এগিয়ে দিলেন। সুজয়বাবু মানিব্যাগটার দিকে দেখলেন আর খুব অবাক হলেন। মানিব্যাগটা তার খুব চেনা চেনা লাগলো। ভাবতে ভাবতে নিজের পকেট হাতড়ালেন, দেখলেন তার পকেটে তার মানিব্যাগটা নেই। বুজলেন এটা তারই টাকা ভর্তি মানিব্যাগ। লাল গেঞ্জিপরা লোকটি উঠে দাঁড়ালো, লোকটি নিজের হাত নাড়িয়ে আর মুখে শব্দ করে মিনিট খানেক ধরে কিছু বোঝালেন। সুজয়বাবু যা বুঝলেন তাহলো, ট্রেন থেকে নামার সময় ওনার পকেট থেকে মানিব্যাগটা পড়ে যায়। লোকটি সেটা পায়, আর সুজয়বাবুকে সেটা ফেরত দেওয়ার জন্যই পেছন পেছন ছুটতে ছুটতে আসে। আর সব কথার শেষে সুজয়বাবু যেটা বুঝলেন লোকটি পিছু নিতে নিতে তাকে ডাকতে পারেনি কারণ সে বোবা।

1