যে মৃত্যু অন্ধকার ডেকে আনে

পুরুষোত্তম সিংহ

 সকালে উঠে পড়ছিলাম অমর চক্রবর্তীর ‘প্লাস্টিক পলিটিক্স ও আমার শ্যামা সংগীত’ কাব্য। চা খেতে খেতে ফেসবুক দেখা আমার স্বভাব। কবি আশিস সরকারের পোস্টে মন খারাপের খবর পেলাম। তিনি আর নেই। কবি চলে গেছেন অন্তহীন দেশে। কী লিখবো ? চোখ ছলছল করছে। ‘অন্নসুন্দরী’র কবি সংসারের ‘স্বর্ণলতা’ ছিঁড়ে চলে গেছে ‘পরিতাপ’ হীন দেশে।

                চোখের সামনে ভাসছে ‘বাংলা উপন্যাসে পল্লীসমাজ’ গ্রন্থের কথা। কত গল্পই না হত। কীভাবে লিখবো সেসব কথা ? এক সকালে কি লেখা যায় ! চোখ ভেসে যাচ্ছে জলে। কলেজ জীবন থেকেই বিষ্ণ দে, অমিয় চক্রবর্তী, সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বহু কবিতা মুখস্থ বলতে পারতেন। সংসার সামলে কলেজে ক্লাস নিতে যেতেন। বলতেন –‘পরিমল দা’কে বলতাম আমাকে একটু পরের দিকে ক্লাস দেবেন।‘ কী পড়ছি বারবার শুনতেন।

                                                                   দিনাজপুরের কাব্যচর্চার ইতিহাসে এক স্মরণীয় নাম ব্রততী ঘোষ রায়। প্রায় চল্লিশ বছর ধরে সম্পাদনা করে চলেছেন ‘উত্তরবঙ্গের প্রগতি’ পত্রিকা। ‘উত্তরবঙ্গের প্রগতি’ ‘চয়ন’কে কেন্দ্র করেই দিনাজপুরের নবীন মহিলা কবিরা উঠে এসেছে। এখন প্রশ্ন হল কবিতায় মহিলা পুরুষ এই বিভাজন কেন ? মহিলারা একটি নির্দিষ্ট পরিমণ্ডলের মধ্যেই কাব্যিক সত্তার বিকাশ ঘটান। আশাপূর্ণা, সূচিত্রা ভট্টাচার্যরা একটি নির্দিষ্ট পরিমণ্ডলের মধ্যেই উপন্যাসকে বেঁধেছেন। দেশভাগে সবচেয়ে বেশি অত্যাচারিত হতে হয়েছিল মহিলা সমাজকে, অথচ জ্যোর্তিময়ী দেবী ছাড়া দেশভাগকেন্দ্রিক উপন্যাসে অন্য মহিলা ঔপন্যাসিকরা প্রায় নীরব পথের যাত্রী। ব্রততী ঘোষ রায়ের কাব্য গুলি হল ‘অন্নসূন্দরী’, ‘স্বর্ণলতা ছিঁড়ে যাক’, ‘মুছে যাক সব পরিতাপ’, ‘চতুর্থ সূত্রের খোঁজে’, ‘ল্যাম্পপোষ্টরা’, ‘মৃৎপাত্রে ছবি’, ‘এই একটু আমি’, ‘ভেজাপুথি’ ও ‘সূয্যি নিবি আয়’ ( ছড়া )। ‘স্বর্ণলতা ছিঁড়ে যাক’ কাব্যটি প্রকাশিত হয় ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে। ভার্চ্যুয়াল ওয়ার্ল্ডে কবিতা লেখার বিরোধীতা করেন তিনি।  তাঁর কবিতার সহজাত ধর্ম হল প্রকৃতির অনাবিল স্নিগ্ধতার বহিঃপ্রকাশ। নাগরিক জীবনের ক্লান্তি থেকে বাঁচতে তিনি যেন প্রকৃতির কাছেই আশ্রয় নেন। কিশোর বয়স থেকেই কবিতা পড়তে ভালোবাসেন। তিনি এক আলাপচারিতায় আমাকে বলেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি যখন অতিক্রম করেন তখন আধুনিক কবিদের কবিতা প্রায় কণ্ঠস্থ ছিল। কবিতাতেও সে প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। ‘জলের নির্জন হয়ে ফিরে আসে’ যেন জীবনানন্দের চেতনাজগতে আমাদের নিয়ে যায়। ‘বনভূমিতে এসো’, ‘ঘাসের বিস্তার নয়, জলধারা নয়’ কবিতাগুলিতে প্রকৃতির মায়াময় বর্ণনা উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। ‘রাধার পর খাওয়া, খাওয়ার পর রাধা / তেইশ বছর যেন এক চাকাতেই বাঁধা’। বাঙালি নারীর যে চিরন্তর স্বরূপ তা ফুটে ওঠে ‘আমার মা’( মুছে যাক সব পরিতাপ ) কবিতায়। মজ্জায় আধুনিক কবিতা মিশে থাকায় কবিতার আঙ্গিক, চিত্রকল্প, শব্দগত ব্যঞ্জনা ও প্রাণভ্রমরা সৃষ্টিতে তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর কবিতা সম্পর্কে সমালোচক অলোক রায় লিখেছেন – “ব্রততী ঘোষরায় সেই প্রতিবাদী কবি। তাঁকে ‘মহিলা কবি’ বলে ছাপ মেরে দেওয়ার কোনো দরকার নেই। তিনি কবি, আমাদের কালের একজন বিশিষ্ট কবি।“

                 ব্রততী ঘোষরায়ের ‘ভেজা পুথি’ কাব্যটি প্রকাশিত হয় ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে। নারী জীবনের সাতকাহন থেকে সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিবর্তনের আভাস এ কাব্যগ্রন্থে ছড়িয়ে আছে। যুগান্তরের চিত্র যেমন আঁকেন তেমনি রণক্লান্ত বিধ্বস্ত রক্তক্ষয়ী অবক্ষয়িত সময় থেকে বাঁচতে হলে মানুষকে কাছে টেনে নেওয়া ছাড়া যে অন্য কোন পথ নেই সে কথাও জানান দেন –“ভালোবাসার বিকল্প বলে কিছু থাকে না।‘’(ভালোবাসার কথা) শব্দের ব্যঞ্জনা অপেক্ষা রূপসজ্জার দিকে তাঁর বিশেষ নজর। আধুনিকতার টানে খণ্ড সত্যের কথা বলেন ঠিকই কিন্তু শেকড় যে টেনে ধরে। ফলে কবিতার আঙ্গিকে পুরাতনের মধ্যেও নতুনত্বের আভাস দেন। এক নস্টালজিক মন যেন তাঁর কাব্যসত্যে বারবার উঁকি দেয়। আর সেই একাকিত্ব কাটাতে তিনি প্রকৃতির কাছে ধরা দেন –

“বন সন্ধানে গেলেই পাকে পড়বে

আঘাটায় বিঁধে যাবে গোটা জল যাত্রা, মনে পড়বে

কোনো অভাগী ভালবাসার পূর্বক্ষণ

উত্তরমুখী আকাশ দেখতে দেখতে অকাট বিশ্বাসে

প্রায় নির্বোধ ছিল।“

  • (‘বন সন্ধানে গেলে’ )

প্রকৃতির মধ্যে আত্মমগ্ন থাকতে ভালোবাসেন, তাই তো নিজের গৃহটির নাম রেখেছেন ‘বনতোষিণী’। সমাজের দুর্বিষহ বিভীষিকা দেখে যেমন আক্ষেপ করেন তেমনি আবার আশাবাদের সুরও ধ্বনিত হয়। বালিকা বয়স থেকেই তিনি কবিতার অনুরক্ত পাঠক। সে সত্য ধরা দেয় কবিতাতেও –

“ক্লাসে জীবনানন্দ না বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ. অমিয় চক্কোত্তি

কার কোন সিগনেচার বোঝাতে ঠেকে যাওয়া বুদ্ধদেবে

ঈস্‌ সমর সেনের সেই অমোঘ লাইন

কি করে ভুলে যাই সমস্ত যাপন জুড়ে

সমস্ত যজন জুড়ে আপাদমস্তক গিলে খাওয়া

সর্বভূক রবীন্দ্র ঠাকুর।“

  • ( ‘অর্ধ কলমকারির সিগনেচার’ )

আবার গল্পের আভাস কোনো কোনো কবিতায় মেলে। কবিতা যেন তাঁর কাছে দর্শন। সে দর্শনে উঠে আসে বঞ্চিত শোষিত মানুষের বেদনা। সমস্ত দলাদলির ঊর্ধ্বে পথে নামেন। সবাই যখন খ্যাতির বিড়ম্বনায় কলম থামিয়ে রাখেন তখনই তিনি গর্জে ওঠেন –

‘’মানুষের পাশে দাঁড়াতে একজন মানুষ যাচ্ছেন

তাঁর সত্তর বছরের নড়বড়ে আয়ু নিয়েও

তুমি দেখতে পাওনা।“ 

  • ( ‘তুমি যেমন’ )

 আদ্যপ্রান্ত একজন রোমান্টিক কবি ব্রততী ঘোষরায়। এক মিষ্টিসিজম বিরাজ করে তাঁর কাব্যগুলিতে। প্রকৃতির নির্জন কাননে যেমন বিরাজ করেন তেমনি নতুন লেখা কবিতাগুলি পাণ্ডুলিপিতে যখন শোনাতেন, দেখতাম বড্ড বেশি মৃত্যুর প্রসঙ্গ। সে প্রসঙ্গ তুললে বলতেন –‘আসলে ওই দিকেই তো এগিয়ে যাচ্ছি।‘ অবশেষে তিনি ‘ওই’ দিকেই চলে গেলেন।

2