বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জীবন (পর্ব ১২)

পুরুষোত্তম সিংহ

আগস্ট, ৯,২০২০: ইলিয়াসের ‘যোগাযোগ’ গল্পে মাতা ও সন্তানের এক নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। মাতা সন্তানের সম্পর্কই বোধহয় পৃথিবীর সমস্ত সম্পর্কের মধ্যে মধুরতম। যেখানে কোন হিংসা, দ্বেষ, লালসা নেই। সেই মধুরতম সম্পর্কেই তিনি চরিত্রকে পৌঁছে দিয়েছেন এ গল্পে। রোকেয়ার সন্তান খোকন। রোকেয়া শোনে তাঁর মামা অসুস্থ। তাই সে পিতা সোলায়মান আলির সঙ্গে চলেছে স্বরূপখালি গ্রামে। ছেলে চঞ্চল ও পরীক্ষা বলে বাড়িতে রেখে গেছে। কিন্তু সেখানে গিয়েই শুনেছে ছেলে আঘাত পেয়েছে। সন্তানের জন্য মাতার উৎকণ্ঠা, স্নেহ, ভালোবাসা, সংশয় লেখক আবিষ্কার করেছেন এ গল্পে। সংবাদ পাওয়া মাত্রই রোকেয়ার উৎকণ্ঠা, সে প্রসঙ্গে রোকেয়ার বাল্যজীবন, পিতার স্নেহ সব এসেছে। আর এই উৎকণ্ঠিত স্নেহের চিত্র আবিষ্কারের জন্য লেখক এক চলনশীল গদ্য গড়ে তোলেন। ট্রেনের গতির মত সে গদ্য এগিয়ে যায়। চরিত্রের মুখে আঞ্চলিক ভাষা প্রয়োগে আঞ্চলিকতা যেমন ফুটে ওঠে তেমনি এক ঝড়ঝড়ে গদ্য যেন পাঠককেও ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আজ হসপিটালে ফিরেছে রোকেয়া। সন্তানের মুখ ধরে চুমু খেতে চেয়েছে। তবে সন্তান আজ তাকিয়ে থাকা ছাড়া কোন অনুভব প্রকাশ করেনি। চঞ্চল খোকনকে এমন ভাবে শান্ত দেখে মাতা উদ্বিগ্ন, তবে মনে শান্তিও আছে সন্তানকে সামনে থেকে দেখতে পারার। রোকেয়া ট্রেনেই অবচেতনে স্বপ্ন দেখেছিল সন্তান আর নেই, কিন্তু স্নেহের কাছে সমস্ত স্বপ্ন যে বৃথা সে সত্য আজ উপলব্ধি করেছে। 

 ইলিয়াস প্রথম থেকেই স্বতন্ত্র আখ্যানভুবন গড়ে তোলায় নজর দিয়েছিলেন। প্রচলিত রীতির বিপরীতে বসে আখ্যানভুবন সাজাতে চেয়েছিলেন। ফলে ইলিয়াসর রচনার পরিমাণ স্বল্প। গল্পে তিনি মুসলিম জীবন নিয়ে এলেও তা এক পৃথক অবস্থানে বিরাজ করে। কিন্তু কেন এই পৃথকত্ব ? আসলে তিনি চেয়েছিলেন বাংলা গল্পের পঙ্কিল দশা থেকে বাংলা গল্পের মুক্তি ঘটাতে। এজন্যই ‘বাংলা ছোটগল্প কি মরে যাচ্ছে ?’ প্রবন্ধে লিখলেন –“ছোটগল্পের জন্য ভরসা করতে হয় লিটল ম্যাজাগিনের ওপর। প্রচলিত রীতির বাইরে লেখেন বলেই লিটল ম্যাগাজিনের লেখদের দরকার হয় নিজেদের পত্রিকা বার করার। বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বাংলায় ছোটগল্পের ছিমছাম তনুখানি অনুপুস্থিত, সাম্প্রতিক মানুষকে তুলে ধরার তাগিদে নিটোল গপ্পো ঝেড়ে তাঁরা তৈরি করেছেন নানা সংকটের কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত ছোটগল্পের খরখরে নতুন শরীর। এইসব  লেখকদের অনেকেই অল্পদিনে ঝরে পড়বেন, সমালোচকদের প্রশংসা পাবার লোভ অনেকেই সামলাতে না –পেরে চলতে শুরু করবেন ছোটগল্পের সনাতন পথে। হাতে গোনা যায় এমন কয়েকজনও যদি মানুষের এখনকার প্রবল ধাক্কা খাওয়াকে উপযুক্ত শরীরে উপস্থাপনের দায়িত্বপালন অব্যাহত রাখেন তো তাতেও ছোটগল্পের মুমূর্ষু শরীরে প্রাণসঞ্চার সম্ভব।“ (সংস্কৃতির ভাঙা সেতু, প্রথম প্রকাশ ১৯৯৬, মাওলা বাদার্স, ঢাকা, পৃ. ৭৭ )

মনস্তত্ত্বের দোলাচলতায় নারী পুরুষকে দুলিয়েছেন ইলিয়াস। এই মনস্তত্ত্বের ক্রমবিকাশ বাংলা গল্পে নতুন নয়। কিন্তু ইলিয়াসেরই মনে হয়েছিল ‘বাংলা গল্প কি মরে যাচ্ছে’। জৈব প্রবৃত্তির  তাড়নায় তাঁকে আমরা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্তরাসুরী বলতে পারি। ইলিয়াস তাঁর গল্পে উড়ান দিয়েছেন নিজের মত করে। এখানেই তিনি স্বতন্ত্র। মানুষের দেহজ কামনা –বাসনাকে প্রতি পদক্ষেপে চিহ্নায়িত করে ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘তারাবিবির মরদ পোলা’ গল্পে মাতা ও সন্তানের যৌন পিপাসা যেমন ফুটে উঠেছে তেমনি সন্তানের জন্য মাতার প্রতি পদক্ষেপে সন্দেহের চিহ্ন দেখতে পাই। রমজান আলির দ্বিতীয় স্ত্রী তারাবিবি। রমাজান যখন তারাবিবিকে বিবাহ করে তখন তাঁর যৌবন অতিক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু তারাবিবি ভরা যৌবনে। সে স্বামীর কাছে যৌনসুখ পায়নি। সে জন্য অভিমানও প্রকাশ করতে ছাড়েনি। এই তারাবিবির সন্তান গোলজার আলি। গোলাজারের বিবাহ হয় সখিনার সঙ্গে। পুরুষের বহুমুখী রিপু প্রবৃত্তির কথা তারাবিবি জানে। ফলে সে সন্তানকে সবসময় সন্দেহের চোখে দেখেছে। এমনকি বারবার সাবধান করে দিয়েছে। গল্পের প্রথম তারাবিবির এইসব অভিযোগের কোন ভিত্তি পাওয়া যায় না। আলি হাসেন ও স্ত্রী রাবেয়া একদিন ঘুরতে এসেছিল গোলজারের বাড়িতে।  এই রাবেয়াকে নিয়ে সন্দেহ করেছিল তারাবিবি। এমনকি পুত্রবধূ সখিনার কাছে মিথ্যা অভিযোগ এনেছিল। এ অভিযোগ তারাবিবি এনেছে গোলজারের বন্ধুর বোন দীপালীকে কেন্দ্র করেই। কিন্তু প্রশ্ন হল কেন এই মিথ্যা অভিযোগ ? তারাবিবি নিজে যৌনজীবনে সুখী না হলেও অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েনি। তবে পুরুষের লালসা সম্পর্কে সে সচেতন। ব্যর্থ লালসার জন্য সে স্বামীকে যেমন ভৎসনা দেয় তেমনি পুত্রকে বিপরীত ভৎসনা দেয় যেন অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে না পরে। কিন্তু এই অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার জন্য তো পুরুষ বা নারী কেউই দোষী নয়। আসলে মানব মনের যে প্রবৃত্তি তা যেন নিজেই প্রকাশ হয়ে যায়। হয়তবা পুরুষের দিক থেকেই সে ডাক আসে। আজ গোলজার ঘরে যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছে কাজের লোক মাতারির সঙ্গে। এই দৃশ্য ধরা পড়ে যায় পিতা রমজান আলির চোখে। রমজান যখন পুত্রকে ভৎসনা দিতে ব্যস্ত, তখনই তারাবিবি পুত্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। যৌনতার দাবি নিয়ে স্বামীর সমস্ত ভৎসনাকে নৎসাত করে দিয়েছে-

“ঘরের মইদ্যে গুণা, ঘরের মইদ্যে শয়তানী। নামাজ-বন্দেগী আমাগো ক্যামনে কবুল হয়।‘ চোপসানো গলায় রমজান আলী ফ্যাসফ্যাসে শব্দ করে,’আমাগো কুনো উন্নতি নাই, -ক্যান ? ঘরের মইদ্যে  আমাগো শয়তানের কারখানা। বারোটা মাস আমি বিছানের উপরে পইড়া থাকি, ক্যান ? হারামজাদা আহুক , আউজকা রাইতেই অর পাছার মইদ্যে লাথ মাইরা যুদিল খাদাইয়া না দেই।‘

‘হইছে !’ তারাবিবি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে স্বামীকে থামিয়ে দেয়, ‘এমুন চিল্লাচিল্লি করো ক্যালায় ? গোলজারে কি করছে ? পোলায় আমার জুয়ান মরদ না একখান ? তুমি বুইড়া মড়াটা, হান্দাইয়া গেছো কব্বরের মইদ্যে, জুয়ান মরদের কাম তুমি বুঝবা কামনে ?” (তদেব, পৃ. ১৪৭ )

সার্থক ছোটগল্পের সমস্ত ধর্ম এ গল্প পালন করেছে। তীব্র গতি, অনিবার্য পরিণামমুখিতা, শেষে ব্যঞ্জনা। আসলে জীবনধর্মের শ্বাশত দিকগুলি লেখক চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। সেখানে যৌনতা বা খিস্তি খেউড় কোন নঞর্থক দিক নয় তাও জীবনেরই অঙ্গ বলে মনে হয়েছে ইলিয়াসের।

                    ইলিয়াস প্রথম থেকেই সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার ওপর জোড় দিয়েছেন। দরিদ্র নিম্নবিত্ত মুসলিম সমাজের অর্থনৈতিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা চেষ্টা করেছেন। গল্প তাঁর কাছে ঠিক কাহিনির উৎসব নয়। কাহিনির মধ্য দিয়েই তিনি যেন গত অর্ধ শতাব্দীর মুসলিম জনজীবনের ইতিহাস লিখতে চেয়েছেন। সে সমাজের শোষণ, লড়াই সংগ্রাম, অর্থনৈতিক দোলাচলতা, উত্থান-পতন, সংগঠিত বিদ্রোহ, নারীর অবমাননা সমস্ত মিলিয়ে তিনি আখ্যান বিশ্ব গড়ে তোলেন। ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’ –প্রতিটি মাতারই তা কাম্য কিন্তু নিম্নবিত্ত জীবনে তা প্রহসন মাত্র। সামান্য ভাতের জন্য মানুষকে হাজারো পরিশ্রম করতে হয়। তবুও দিনের শেষে মেলে না আনন্দ। নিম্নবিত্ত মুসলিম জীবনের সহস্র বেদনা নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘দুধভাতে উৎপাত’ গল্পটি। জয়নাবের স্বামী কাসিমুদ্দিন বাইরে থাকে।  স্ত্রী জয়নাব সংসার চালায় গরুর সামান্য দুধ দিয়ে। ফলে সন্তানরা দুধভাত খেতে চাইলেও উপায় নেই। যেখানে পেটের সামান্য ভাতই জোটে না সেখানে দুধভাতের প্রসঙ্গ নিছকই হাস্যকর। তবে প্রতিটি পিতামাতাই সন্তানকে সুখে রাখতে চায়, আনন্দে রাখতে চায়। এই চাওয়ার মধ্যে কোন ভণ্ডামী নেই। আছে অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে নিত্য সংগ্রাম। গোরুর দুধ দিয়েই জয়নাবের সংসার চলত। কিন্তু মুদি দোকানে বাকি বেশি হয়ে যাওয়ায় গোরু দিয়ে দিতে বাধ্য হয় জয়নাব। আজ সে অসুস্থ, দুধ খেতে চায়। আর সে দুধ আনতে গেছে পুত্র ওইদুল্লা। হাশমত মুহুরির বাড়িতে এক বাচ্চা উচ্চারণ করেছিল সেই বহু চর্চিত পংক্তি –“নেই কোনো উৎপাত খায় শুধু দুধভাত”। কিন্তু দরিদ্র মানুষ দুধভাত পাবে কোথায় ? অর্থনীতির যে বৈষম্য তা লেখক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। জবনাব আজ দুধভাত খেতে গিয়ে বমি করে ফেলছে। আসলে সন্তানকে রেখে এ সুখ যে মাতার কপালে সহ্য হবার নয়। জীবনের বহুমাত্রিক বিন্যাস নিয়ে ইলিয়াস গল্পভুবনে পরিক্রমা করেন। মুসলিম জীবনের গভীর সত্যকে তুলে আনেন তিলতিল করে। সেখানে আবেগ বা আরোপিত বাস্তবতা নয় জীবনের অসহনীয় দিকগুলিকে এনে শিল্পভুবন সাজিয়ে তোলেন। এখানেই তিনি স্বসমাজের কথাকার, সময়ের কথাকার। 

                    ‘পিতৃবিয়োগ’ গল্প গড়ে উঠেছে ইয়াকুব ও আশরফ আলিকে নিয়ে। পিতার সঙ্গে তেমন কোন সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি ইয়াকুবের। পিতা আশরফ ছিল দৃঢ় শক্তিশালি চরিত্র। কোন রকম আবেগকে সে পাত্তা দিত না। সেই পিতার মৃত্যুতে পুত্রও কোন আবেগকে ধরে রাখেনি। আশরফ আলি ছিল পোস্টমাস্টার। বিবাহের কিছুদিন পরেই স্ত্রী মৃত হয়। সন্তানকে তিনি নিজেই মানুষ করতে চেয়েছিলেন কিন্তু শাশুড়ি জোহরা বিবির আবেগের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। সেই থেকে ইবাকুব মামার বাড়িতে বড় হয়ে উঠেছে। পিতা টাকা পাঠাতো ঠিকই কিন্তু পুত্রের কোন আবেগকে প্রাধান্য দেয়নি। গ্রামে নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়েছে। পুত্র ইয়াকুবও বড় হয়ে কারখানায় যোগ দিয়েছে।  কোনদিন মনে হয়নি গ্রামে এসে পিতাকে দেখে যাওয়ার কথা। আজ পিতার মৃত্যু উপলক্ষে গ্রামে ফিরেছে। গ্রামের মানুষ আশরফ সম্পর্কে ভালোমন্দ নানা কথা বলেছে কিন্তু কোন কথাই গ্রাহ্য করেনি ইয়াকুব। পিতার মৃত্যুর দাফননামা শেষ করেই কোন রকম আবেগকে প্রাধান্য না দিয়ে সেও কর্মস্থলে ফিরে গেছে। আদর্শ পিতার চরিত্র হিসেবে লেখক ইয়াকুবকে গড়ে তুলেছেন। মানবজীবনে চরিত্রের বহুবিধ স্তর বর্তমান। চরিত্রের নানাস্তরে লেখককে প্রবেশ করতে হয়। ইয়াকুব ও আশরফ তেমনই চরিত্র। সমস্ত শ্রেণি চরিত্র থেকে নিজেদের পৃথক করে রেখেছে। আর সেই চরিত্র নিয়ে স্বতন্ত্র ভুবন গড়ে তুলেছেন লেখক।

    ‘যুগলবন্দি’ পৃথক জীবনবোধের গল্প। এ গল্পে ইলিয়াস উচ্চবিত্ত মুসলিম সমাজের অন্দরমহলে প্রবেশ করেছেন। সরোয়ার কবির ও জেসমিন হোসেনের সুখের সংসার। উচ্চবিত্ত সমাজের ধ্যান ধারণা নিয়ে তাঁরা বেঁচে থাকে। সরোয়ার কবির ও জেসমিন নিজের জীবনচর্চায় ব্যস্ত। এক্সারসাইজ দিয়ে দিন শুরু না করলে তা নাকি ঠিক শুরু হয় না ! জেসমিন কবির নিজেকে স্লিম রাখতে নানা পদ্ধতি ব্যবহার করে। নিজের খাদ্য প্রণালী সম্পর্কেও সে সচেতন। তাঁদের সখের কুকুর আরগস। অন্যদিক আছে আসগরের মধ্যবিত্ত পরিবার। আসগর নিজের জীবনের উন্নতির জন্য, নানা সুযোগ সুবিধার জন্য সরোয়ার কবিরের সঙ্গে থাকে। আসগরের পিতা গোলাম হোসেন ছিল সমান্য চকুরিজীবী। ফলে মধ্যবিত্তের ধ্যান-ধারণাকে আঁকড়ে তাঁরা বাঁচতে চেয়েছে। এই মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে আসগরকে আজ দিন কাটাতে হয় উচ্চবিত্ত সরোয়ার কবিরের সঙ্গে। মধ্যবিত্তের দোলাচলতা, উচ্চবিত্তের নানা মানসিকতা, জীবনবোধ সব মিলিয়ে ইলিয়াস এমন এক আখ্যান এ গল্পে গড়ে তুলেছেন যা অনন্য। জীবন কীভাবে পাল্টে যাচ্ছে, জীবনের রন্ধে রন্ধে সময় প্রবেশ করে মানুষের যাপনচিত্র কীভাবে পাল্টে যাচ্ছে, সময় সরণি কীভাবে মানুষকে গ্রাস করছে, আর সেই জীবনস্রোতে মানুষ কীভাবে হারিয়ে যাচ্ছে সেই জীবনবোধের গল্প ইলিয়াস এ আখ্যানে আমাদের শুনিয়েছেন। 

                            ইলিয়াস খুব বেশি গল্প লেখেননি। কিন্তু জীবনদৃষ্টির গভীরতায় বাংলা গল্পে তা ভিন্ন পরিসর তৈরি করেছে। জীবনের যে চলমানতা তাই তিনি দেখাতে চান ভিন্ন পরিসরে, ভিন্ন আখ্যানে। জীবন সম্পর্কে এক উদার আস্তিক্যবোধ নিয়েই তিনি গল্পভুবন গড়ে তুলেছেন। ‘লেখকের দায়’ নামক নিবন্ধে তিনি লিখেছিলেন –‘’আমাদের এই উপমহাদেশে ব্যক্তির বিকাশ প্রথম থেকেই বাধা পেয়ে এসেছে। এখানে ব্যক্তিপ্রবরটি জন্ম থেকেই পঙ্গু ও দুর্বল। পাশ্চাত্যের সর্বত্রই যেহেতু ব্যক্তিসর্বস্বতায় জয়গান, আমাদের এখানেও তাই জন্মরোগা ব্যক্তিটির দিকেই আমাদের লেখকদের অকুন্ঠ মনোযোগ। বাংলা উপন্যাসে প্রথম এই রুগ্‌ণ ব্যক্তির শরীরে তেজ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই নকল তেজ তাকে শক্তি জোগাতে পারেনি। কেবল তা-ই নয় বাংলা সাহিত্যের প্রথম সফল উপন্যাসগুলোয় বরং দেশের কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতাকে প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের মর্যাদাই দেওয়া হয়। অথচ, অন্যান্য সাহিত্যের উপন্যাসে তখন প্রচলিত সংস্কার, মূল্যবোধ ও বিশ্বাসকে অবিরাম আঘাত করা হচ্ছে।‘’ (সংস্কৃতির ভাঙা সেতু, পৃ. ১৪৫ ) স্বসমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ, সংস্কারকে আঘাত করেই গল্পের প্লট নির্মাণে এগিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ব্যক্তির অন্তঃসত্তাকে আঘাত করে ব্যক্তিত্ব নির্মাণে অগ্রসর হয়েছেন। সেই ব্যক্তিত্ব ঘুণধরা সমাজের পঙ্কিলসার রূপ বহন করেনা। ইলিয়াস তাঁদের নির্মাণ করেছেন এক আদর্শের ওপর। এজন্যই ওসমান, তমিজরা আজও পাঠকের সত্তাকে নাড়া দেয়।

24