Categories
পরিবেশ

বাংলার গাছ, ডুমুর গাছ

৭/৮/২০২০,ওয়েবডেস্কঃ আজ পরিবেশে

বাংলার গাছ

ডুমুর গাছ

—————-শেখর সরকার

আমি পরিবেশকে ভালোবাসি ,তাই গাছ নিয়ে লিখতে গেলে সেই গাছগুলোর কথাই প্রথমে আমার লেখায় আসে যারা আমাদের বাড়ির আশেপাশে একাই জন্ম নেয়,মানুষের কোনো যত্ন ছাড়াই বেড়ে ওঠে এবং পরিবেশের প্রতি নিজের দায়িত্ব সম্পন্ন করে। এমনকি যাদের কোন CFT ভ্যালু নেই, যাদের দেখে কোন কাঠ ব্যবসায়ীর লালা ঝরে না। এরা পরিণত হলে কেউ কেটে নিয়ে তার জ্বালানীর প্রয়োজন মেটায় বা আগাছা বলে কেটে ফেলে। তার জায়গায় দখল নেয় নতুন একজন। আমি আজ তাদের কথাই বলব যারা থেকেও আমাদের কাছে নেই। বেশিরভাগ লোক এদের নামই জানে না বা জানলেও উপকারিতা অজানা। এমন দুটি গাছ হল খোকসা বা কাকডুমুর এবং যজ্ঞডুমুর।

কাকডুমুর বা খোকসা:-

এরা স্থানীয় উদ্ভিদ। পশ্চিমবাংলার সর্বত্রই দেখা যায়। ডুমুর প্রজাতির চিরহরিৎ গাছ। বিজ্ঞানসম্মত নাম Ficus hispida, হিন্দিতে গোবলা , ইংরেজিতেHairy Fig, সংস্কৃতিতে কাকোদুমবরিকা নামে পরিচিত।ছোট অবস্থায় ঝোপ সৃষ্টি করে। বড় হলে ছোট বৃক্ষের আকার নেয়। পাতাগুলো আকৃতিতে বড়, শিরিষ কাগজ এর মত খসখসে হয়ে থাকে, তাইতো গবাদিপশু ও পছন্দ করে না। কান্ডের গায়ে গোল গোল মার্বেলের থেকে একটু বড় আকৃতির ফল জন্মায়। যা যেকোনো ফলভুক পাখি যেমন বাড়বেট প্রজাতির পাখি ও স্তন্যপায়ীদের যেমন বানর, কাঠবেড়ালির, বাদুড় এর খুবই প্রিয়। পাখির মল এর মাধ্যমে বংশবিস্তার করে। পাতা আকৃতিতে বড় হওয়ায় টুনটুনি পাখি দুটি পাতা জোড়া দিয়ে তার মধ্যে বাসা বানায়। আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় খোকসা গাছের পাতা ব্যবহার করা হয় এবং ফল দিয়ে কাশির ওষুধ তৈরি করা হয়। এর মূলের রস জ্বরের চিকিৎসা এবং ফলের রস লিভারের সমস্যায় ব্যবহার করা হয়। ফলগুলো সাধারণত খাওয়া হয় না,তবে কিছু কিছু জায়গার লোকেরা খেয়ে থাকে কিন্তু বেশি পরিমাণে খেলে পেট ব্যথা ও বমিও হতে পারে।

যজ্ঞডুমুর:- ইংরেজিতে Cluster Fig নামে পরিচিত। সংস্কৃতে উদুমবারা, হিন্দিতে গুলার উর্দুতে ডিমিরি নামে পরিচিত। বিজ্ঞানসম্মত নাম Ficus glomerata (Ficus racemosa)। এটি একটি ভারতীয় উদ্ভিদ এবং আমাদের রাজ্যে সর্বত্রই পাওয়া যায়। গাছটি বৃক্ষজাতীয় চিরহরিৎ 25 থেকে 30 মিটার লম্বা হয়ে থাকে, পাতাগুলো আকৃতিতে অনেকটা লম্বাটে ও সূচালো । কান্ডের গায়ে গুচ্ছাকারে ফল ধরে , তাই ইংরেজিতে বলে Cluster Fig।ফল গুলি কাঁচা অবস্থায় সবুজ ,পাকলে লাল বা কমলা বর্ণ ধারণ করে। বানর,কাঠবিড়ালি, বাদুড়,বিভিন্ন প্রজাতির পাখি যেমন হর্নবিল , বারবেটর প্রিয় খাদ্য এই ফল, এছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির পিঁপড়ে এই ফলে দেখা যায়। কাঁচা ফল আমরা সবজি হিসেবে খেতে পারি। আমাদের রাজ্যে দক্ষিণবঙ্গে এই ফল খাবার প্রচলন আছে কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের উত্তরবঙ্গে এই ফল খাবারের তেমন প্রচলন নেই।
আমাদের দেশও যজ্ঞডুমুর নিয়ে উদাসীন। কিন্তু পৃথিবীর 50 টির বেশী দেশে এর ফল বাজারে বিক্রি হয়, মানুষ খেয়ে থাকে এবং চারা বানিজ্যিক ভাবে বিক্রি হয়ে থাকে। তাই যজ্ঞডুমুরের পুষ্টিগুণ জেনে নিই। যজ্ঞ ডুমুরের ফল পুষ্টিগুণে ভরপুর। 100 গ্রাম খাবারযোগ্য ফলে জল থাকে 81.1 গ্রাম ,প্রোটিন থাকে 1.3 গ্রাম ,ফ্যাট থাকে 0.6 গ্রাম।এছাড়াও আমরা এতে পাই.
Vitamin B2 =30•77%
Iron =16•25%
Copper =11•11%
Potassium =10•81%
Megnetiam =8•33%
Calcium =7•2%
Phosphorus =6•71%

এ থেকে আমরা বলতেই পারি বেদানার থেকে ডুমুরের ফলে বেশি আয়রন থাকে। তাই ডুমুরের ফল খেলে লোহিত রক্ত কণিকা তৈরি করে রক্তাল্পতা (যাকে আমরা অ্যানিমিয়া বলি) দূর করে।

হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মে প্রাচীনকাল থেকেই এই গাছের উল্লেখ আছে। এই গাছ ছাড়া দুর্গাপূজা হত না, কারণ যজ্ঞে এই গাছের কাঠ ব্যবহার করা হয়। তাই থেকে গাছের নাম যজ্ঞ ডুমুর।

আয়ুর্বেদে এই গাছের প্রতিটি অংশের বহুল ব্যবহার আছে। এই গাছের ছাল বেটে পেস্ট বানিয়ে মশা বা পোকামাকড় কামড়ানোর জায়গায় লাগালে আরাম পাওয়া যায়। ডায়রিয়ার ঔষধ হিসাবে এর ফল ব্যবহার করা হয়। পাতার গুঁড়ো দিয়ে আলসারের ওষুধ তৈরি করা যায়। মূল ডায়াবেটিসের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। গাছের সাদা রস তরুক্ষীর ডায়রিয়ার ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হয়। অর্শের ওষুধ তৈরিতে এবং কুষ্ঠ রোগের ওষুধ তৈরিতে আয়ুর্বেদে এর ব্যবহার আছে।

যজ্ঞ ডুমুর গাছ আমাদের গ্রাম বাংলায় যেহেতু সহজলভ্য তাই এর ফল সহজেই আমরা আমাদের খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারি। আমাদের দেশে জনসাধারনের একটা বড় অংশ নিম্নবিত্ত। আবার তাদের মধ্যেও একটা বড় অংশ অপুষ্টির শিকার। যজ্ঞ ডুমুরের ফল থেকে আমরা আমাদের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করতে পারি। মজার বিষয় বাসে ট্রেনে আমরা ত্রিফলার (হরতকি,বহেরা,আমলকি) যে মুখসুদ্ধি কিনে খাই তার বেশিরভাগ অংশটাই যজ্ঞ ডুমুরের ফল থেকে তৈরি, কারণ ডুমুরের দাম এদের থেকে অনেকটাই কম। আমরা অনেকেই ভাবতে পারি ডুমুর ফল তো দেখি কিন্তু খাব কি করে? আমি এখানে ডুমুর ফল খাওয়ার কয়েকটি সহজ পদ্ধতি কথা বলছি। জগ ডুমুর ফল পেড়ে নিয়ে এসে কেটে তার ভেতরের অংশগুলো পরিষ্কার করে মাংসল অংশটুকু রান্নার কাজে ব্যবহার করা হয়। এই এই ফলের কষাটে ভাব দূর করার জন্য অনেকেই হালকা করে সেদ্ধ করে নেয়। আবার অনেকে আঠা গোলা জলে ভালো করে ধুয়ে নেয়। ইচ্ছে করলে পরিষ্কার জলে ভালো করে ধুয়ে রান্না করা যায়। ধোয়া ডুমুর দিয়ে এঁচোড়ের মত বা মিক্সড ভেজিটেবল বা শুধু ভাজি করেও খাওয়া যায়। অনেকেই এর সুন্দর আচার বানায়। বাজারের অনেক কেনা মিক্সড আচারের মধ্যে ডুমুর দেওয়া থাকে।

সবশেষে একথা বলতেই পারি আমাদের আশপাশের পশুপাখিও তাদের পুষ্টির একটা বড় অংশই ডুমুর থেকে নেয়। আমরাও আমাদের পুষ্টির চাহিদা যজ্ঞ ডুমুরের ফল থেকে পূরণ করতে পারি। বেশি কিছু নয়, কোন গাছ নতুন করে লাগাতেও হবে না, শুধু আশে পাশের ডুমুরের গাছগুলো যাতে কেটে ফেলা না হয় সেটাই দেখতে হবে। তাহলেই আমরা, পশুপাখিরা সবাই নিজেদের চাহিদা পূরণ করতে পারবো।

3653

Leave a Reply