রাজারাম সাহা
“তোর গানে পেঁচিরে, সব ভুলে গেছি রে… “
সুকুমার রায়ের লেখা এই বিখ্যাত ছড়াটির তাৎপর্য অপরিসীম। সত্যিই তাই পেঁচার ডাক যারা শোনে তারা শুধু সেটা নিয়েই ভাবেন। আমরা যারা পাখি দেখতে ভালোবাসি তাদের পেঁচার প্রতি এক অদ্ভুত টান থাকে। একবার আওয়াজ শুনলেই তাকে খুঁজে বের করে দেখার ইচ্ছা হয়। আবার অপরদিকে সাধারণ মানুষ পেঁচার ডাক শুনে ভয় পায়। কেনিয়ার কিকুয়ু উপজাতি গোষ্ঠী, ওমানের লোকেরা পেঁচা কে মৃত্যুর প্রতীক হিসেবে ভাবে তাই এদের দেখা পেলে, বা আওয়াজ শুনলেই ভাবে অসুস্থতা বা মৃত্যুর ডাক এসেছে। আবার আমাদের দেশে লক্ষ্মী পেঁচাকে লক্ষ্মী ঠাকুরের বাহন মনে মনে করা হয়। তাই লক্ষ্মীপেঁচাকে ধনসম্পদ ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবেও মানা হয়। আবার কণ্ঠী পেঁচা বা কাল পেঁচার ডাক শুনে বাড়িতে কেউ মারা যেতে পারে এমন কুসংস্কার ষও আমাদের সমাজে বিদ্যমান।
পেঁচা নিশাচর পাখি হওয়ার জন্য সাধারণত রাতেই বের হয় তাই তাদের অন্য পাখিদের তুলনায় কম দেখা যায়। আমরা এদের সম্বন্ধে জানিও খুব কম তাই খুব সহজে এদেরকে নিয়ে তৈরি বিভিন্ন কুসংস্কার অন্ধবিশ্বাস সহজে মেনে নিই।
আন্টার্টিকা মহাদেশ বাদে সারা পৃথিবীতে প্রায় 250টি প্রজাতির পেঁচা দেখা যায়। সারা পৃথিবীতে এদের নিয়ে কোনো না কোনো গল্প রয়েছে যা অন্য কোন পাখিদের নিয়ে নেই।
গ্রীস দেশের প্রাচীন সভ্যতায় দেবী এথেনার বাহন হিসেবে পেঁচাকে দেখা যায়। বর্তমানে গ্রীসের মূদ্রা ইউরোতেও পেঁচার ছবি দেখা যায়।
” The owl “নামক কবিতাটি একসময় পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল। কালীপ্রসন্ন সিংহ তাঁর ছদ্মনাম রেখেছিলেন “হুতুম পেঁচা”। আবার হ্যারি পটারের গল্প গুলিতেও পেঁচাকে সংবাদ বহনকারীর ভূমিকায় দেখা যায়। বিভিন্ন দেশের ডাক টিকিটেও স্থান পেয়েছে পেঁচা।
পেঁচা নিয়ে রহস্য, কুসংস্কার, আলোচনা আজ নতুন নয়। মিশরের শিলালিপিতেও পেঁচা স্থান পেয়েছিল। প্রায় প্রতিটি সভ্যতার মানুষদের সাথে পেঁচা কোনো না কোনো ভাবে জড়িয়ে ছিল এবং আছে।
পেঁচা নিঃশব্দে উড়তে পারে যা তাদের শিকার ধরার পক্ষে খুব উপযোগী এবং অন্য পাখিদের থেকে আলাদা করে। তাদের প্রবল ঘ্রান শক্তি ও দৃষ্টিশক্তি শিকার ধরতে সহায়তা করে। এদের পালক খুব ঘন ও নরম হবার জন্য উড়বার সময় কোন শব্দ হয় না। এরা এদের মাথাকে 270 ডিগ্রী পর্যন্ত ঘোরাতে পারে। পেঁচাকে দিনের বেলা খুব কম দেখা যায় কিন্তু একটু লক্ষ্য করলে কোন কোন গাছের উচু ডালে ছায়ার মধ্যে বসে থাকতে দেখা যায়। কাক ,ফিঙে প্রভৃতি পাখিরা দিনের বেলায় এদের আক্রমণ করে তাই এরা দিনের বেলায় আড়ালে থাকতেই ভালোবাসে।লক্ষ্মী ঠাকুরের বাহন হওয়ার ফলে এদের সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে ভাবা হয়। এদের ধরতে পারলে গৃহস্থরা মাথায় সিঁদুর পরিয়ে লক্ষ্মীর আসনে বসাতে চায়, আটকে রাখতে চায় ধনসম্পত্তি পাবার অন্ধবিশ্বাসে। কিন্তু অন্য পাখিদের মতো পেঁচাও খোলামেলা থাকতে পছন্দ করে। এধরনের কুসংস্কার এই প্রজাতিকে বিপদের দিকে ঠেলে দেয়। এদের আটকে রেখে পূজা করলে কোনরূপ ধনসম্পত্তি প্রাপ্তি হয় না।
Brown hawk owl ( কাল পেঁচা):-
পেঁচার জগৎ রহস্য কুসংস্কারাচ্ছন্ন। কাল পেঁচা নাম থেকেই অনেকে মনে করে দুর্ভাগ্যের প্রতীক। কিন্তু আসলে তা নয়। এরা ইঁদুর শিকার করে কৃষকের ফসল বাঁচিয়ে দেয়। দুর্ভাগ্যের বিষয় আমরা এদের সম্পর্কে বিশেষ না জানার ফলে বিভিন্ন কুসংস্কার গুলো খুব সহজেই মেনেনি। কাল পেঁচা সাধারণত জঙ্গল ও জলাশয়ের ধারে থাকে। এই পেঁচার ডাক আমরা গ্রামাঞ্চলের নদী বা পুকুর পাড়ে, বাঁশঝাড়ে রাতের অন্ধকারে শুনে থাকি।
প্যাঁচার চোখ দুটো মুখগহবরের সামনের দিকে থাকে। কপাল ফ্যাকাশে, চিবুক সাদা ,বাঁকানো ঠোঁটের উপরটা সাদা। ডানা লম্বা ও ছুঁচোলো।রঙ গাঢ় খয়েরি । বুক পেট সাদা তার উপর খয়েরি রঙের লম্বা লম্বা দাগ থাকে। পা হলুদ হয়। পেঁচা গাছের কোটরে বাসা বানায়। এদের দিনের বেলায় গাছের উঁচু ডালে পাতার আড়ালে ছায়ার মধ্যে বসে থাকতে দেখা যায়। এরা নিশাচর হবার দরুন রাতের অন্ধকারে শিকার করে। দিনের আলোতে যদি দেখা যায় এদের তা হলে এরা চোখ বড় বড় করে করে তাকিয়ে থাকে। সাধারণত একই স্থানে অনেকক্ষণ ধরে বসে থাকে পেঁচা। একবার যে স্থানে বসে বিরক্ত না করলে সেখানেই বসে থাকতে থাকতে দেখা যায় এদের।
Spotted Owlet ( কোটোরে পেঁচা ):- লক্ষ্মী পেঁচা ও কাল পেঁচা থেকে আকারে অনেকটাই ছোট হয় কোটোরে পেঁচা। সেজন্য এদের নামের সাথে owl না বসে owlet বসানো হয়েছে। এদের মাথা গোলাকার, চোখ হলুদ হয়। মাথা, ঘাড়, পিঠের রং ধূসর বাদামি এবং তার মাঝে সাদা ছিট ছিট থাকে। বুক, পেটের রং সাদা তার মাঝে বাদামি ছিট ছিট থাকে। ঠোঁট হলুদ রঙের হয়। এদের ডাক ভীষণ কর্কশ। খুব সতর্ক থাকে এরা। ইলেক্ট্রিকের তারে, গাছের ডালে প্রায়শই দেখা যায় এই পেঁচাকে। গাছের কোটোরে নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাসে বাসা বানিয়ে তিন চারটি ডিম পাড়ে। টিকটিকি, গিরগিটি ইঁদুর প্রভৃতি ছোট প্রানীকে রাতে শিকার করে।
Indian scops owl ( কন্ঠী পেঁচা) :- লক্ষ্মী পেঁচা, কাল পেঁচা, কোটোরে পেঁচা থেকে একটু ভিন্ন ধরনের দেখতে এই scops owl বা কন্ঠী পেঁচা । এদের খাড়া কানের পালক রয়েছে যা কপালকে ত্রিকোণাকৃতি করে দিয়েছে। এই খাড়া পালক গুলো শিং এর মত দেখায়। চোখগুলো কালো। সম্পূর্ণ শরীর লালচে আভা যুক্ত হালকা হলুদ। তারমধ্যে সাদা কালো ছিট ছিট থাকে। ধূসর রঙের ঠোঁটের উপর কপালের ধার দিয়ে সাদা রংয়ের পালক থাকে। গলা থেকে ঘাড় অব্দি সাদা কন্ঠী থাকে বলে নাম হয়েছে কন্ঠী পেঁচা। জানুয়ারি থেকে মে মাস এরা গাছের কোটরে বাসা বানায় ও তিনটি ডিম পাড়ে। পুরুষ থেকে স্ত্রী পাখির আকৃতি বড় হয়। scops owl দের মধ্যে এরা সবচেয়ে বড় হয়। সাধারণত ঘন পাতার গাছে এদের বেশি দেখা যায়। নিরিবিলি জায়গায় থাকতে ভালোবাসে এরা। পলাশ ফুল ও আকাশমনি গাছে বেশ কয়েকবার এদের দেখা পেয়েছি।
এই সব পেঁচা গুলি আমাদের আশেপাশেই দেখা যায়। এরা আইইউসিএন-এর লাল তালিকায় ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত। কিন্তু বর্তমানে এদের সংখ্যাটা অনেক কমে এসেছে।
লক্ষ্মী পেঁচা:- লক্ষ্মী ঠাকুরের বাহন হিসেবে পরিচিত এই পেঁচা টি সাধারনত লোকালয়ের আশেপাশেই থাকে। এদের মুখমণ্ডল পান আকৃতির হয়। মুখ, মাথা, বুক, পেট সাদা রংয়ের হয়। চোখ কালো, ঠোঁট
ছোট মাংসালো একটু বাঁকানো ধরনের হয় ফলে শিকার কে ছিড়ে খেতে সুবিধা হয়। মুখমণ্ডলের উপরের দিকে অর্থাৎ ভুরু সোনালী এবং গাল ও চিবুকের দিকে বাদামী রঙের পান আকৃতি গঠন করে। ডানার উপরের অংশ সোনালী এবং নিচের অংশ কালচে বাদামী, তার মাঝে সাদা ও কালো রঙের ছিট ছিট থাকে। পায়ের নখ গুলি খুব ধারালো। শরীর আন্দাজে মাথা বড় হয়। সাধারণত পরিত্যক্ত বাড়ি বা খামার বাড়িতে ফাঁকফোকরে বাসা বানায়। সন্ধ্যা রাতে এরা স্বীকার করতে ভালোবাসে। শিকারের জন্য খোলা জায়গা প্রয়োজন হয় এবং শিকার ধরে কোন খুটি বা ডালে বসে থাকতে দেখা যায়। ইঁদুরের হাত থেকে ফসলকে বাঁচাতে চাষের জমিতে ও খামারবাড়ি গুলিতে চাষীরা খুটি পুতে রাখতো যাতে এরা শিকার ধরে সেখানে বসতে পারে। ইঁদুর, ছোট পাখি, ব্যাঙ প্রভৃতি খেয়ে থাকে। লক্ষ্মী ঠাকুরের বাহন হওয়ার ফলে এদের সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে ভাবা হয়। এদের ধরতে পারলে গৃহস্থরা মাথায় সিঁদুর পরিয়ে লক্ষ্মীর আসনে বসাতে চায়, আটকে রাখতে চায় ধনসম্পত্তি পাবার অন্ধবিশ্বাসে। কিন্তু অন্য পাখিদের না এরাও খোলামেলা থাকতে পছন্দ করে। ধরনের কুসংস্কার এই প্রজাতিকে বিপদের দিকে ঠেলে দেয়। এদের আটকে রেখে পূজা করলে কোনরূপ ধনসম্পত্তি প্রাপ্তি হয় না।
আমার মনে আছে ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির আশেপাশে সন্ধ্যা হলেই কালপেঁচা ও কন্ঠী পেঁচার শুনতে পেতাম। কিন্তু আশেপাশে বড় গাছগুলো কেটে ফেলার ফলে বেশ কয়েক বছর ধরে তাদের ডাক শুনতে পাইনি। লক্ষ্মী পেঁচাকে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে মনে করি বলে তাকে ধরতে পারলে আমি ধনবান হবো-এই অন্ধ আস্থার উপর ভর করে আসলে নিজেদের অজান্তেই এদের ওপর অত্যাচার করে মানুষ। দিন দিন জমিতে কীটনাশকের প্রয়োগ বেড়ে যাওয়ার ফলে প্যাঁচাদের খাদ্য কমে আসছে। তারা প্রবল খাদ্য সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে কাল অতিবাহিত করছে। একটা পেঁচা যে পরিমাণ ইঁদুর খেয়ে থাকে তার ফলে কৃষকের প্রচুর ফসল নষ্টের হাত থেকে বেঁচে যায় কিন্তু আমরা সে কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবি না। দিন দিন তাদের বাসস্থান আমরা কেড়ে নিচ্ছি আমরা। তাদের খাদ্য তালিকাকে নষ্ট করে দিচ্ছে এবং এদের বিপদগ্রস্ত প্রজাতির দিকে খুব দ্রুত গতিতে ঠেলে দিচ্ছে।
একটি কথা বুঝতে হবে পেঁচারা কোন মতেই মানুষের সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যের প্রতীক না। এরা এরা অন্যান্য পাখির মতই নিশাচর একটি পাখি। যারা আমাদের নিঃশব্দে উপকারই করে যায়।আর পরিবর্তে আমরা এদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি।