বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জনজীবন (পর্ব ১০)

পুরুষোত্তম সিংহ

ওয়ালীউল্লাহ ‘খণ্ড চাঁদের বক্রতায়’ গল্পে লেখক খণ্ড মুহুর্তকে অনন্ত ব্যঞ্জনা দিয়েছেন। শেখ জব্বর আজ বিবাহ করে এনেছে চতুর্থ বিবিকে। এ বিবাহ আগেই হয়েছিল কিন্তু কন্যার বয়স কম বলে সে পিতৃগৃহে ছিল। আজ শেখ জব্বর বিবিকে উপযুক্ত মনে করলে ঘরে ফিরিয়ে এনেছে। সে যেহেতু গ্রামের প্রতিষ্ঠিত বিত্তবান মানুষ তাই সবার দৃষ্টি সেদিকে। তেমনি ঘরে রয়েছে তিন বিবির কোলাহল ও নতুন বিবিকে কেন্দ্র করে নানা সুখ –দুঃখের গল্প। ‘চৈত্রদিনের এক দ্বিপ্রহরে’ গল্প গড়ে উঠেছে আনোয়ার ও ছালেহাকে নিয়ে। মুসলিম জীবন সম্পর্কে ওয়ালীউল্লাহের যাবতীয় বক্তব্য পাওয়া যাবে এ গল্প পড়লেই। ঐতিহ্যময় মুসলিম জনজাতি আজ কেন পিছিয়ে পড়ল, কেন শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মুসলিম জীবন সংস্কৃতিহীনতায় ভুগছে, সে জাতির ইতিহাস কোথায় লুকিয়ে আছে, সেই লুপ্ত ইতিহাসের পুনরুদ্ধার কেন হচ্ছে না –এসব বহু প্রশ্নের সম্মুখে তিনি পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেন। মনে রাখতে হবে এ গল্পের রচনাকাল ১৯৪২। তখনও এই মহাদেশে মুসলিমকে মানুষ ঘৃণার চোখে দেখেনি, তা শুরু হল দেশভাগের পর থেকে এপার বাংলায়। আলোয়ার ছেলাহা নামে একটি মেয়েকে বন্ধু হিসাবে পেয়েছিল। এই মেয়েটিকে তাঁর মনে হয়েছিল বেশ বুদ্ধিমতী। তাই আনোয়ার তাঁর সঙ্গে দেশের ইতিহাস, মুসলিম ধর্ম ও মুসলিম কৃষকদের অভাব নিয়ে আলোচনা করেছে। একটি জাতির ইতিহাস কীভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে, জাতির ইতিহাসকে কীভাবে মিথ্যা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে, মুসলিম চাষিদের এই বিপন্নতার কারণ কী, এই চাষিদের জন্য আনোয়ারের সমবেদনা ফুটে উঠতে দেখি। মুসলিম ধর্ম সম্পর্কে সে ছালেহাকে জানিয়েছে –“শুধু ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে সুষ্ঠু জ্ঞান থাকলেই  যে কেউ একজন অসাধারণ ব্যক্তি হয়ে উঠতে পারে।“ (তদেব, পৃ. ১২৮ )। আনোয়ারও দরিদ্র যুবক, কিন্তু ছালেহা বিত্তবান। চৈত্রদিনের এক দুপুরে আনোয়ার তাঁর প্রেমের প্রস্তব জানিয়েছে ছালেহাকে। সে জানে এ প্রেম মান্যতা পাবে না আর্থিক অনটনের কারণে তবুও সে জানাতে ভোলেনি কেননা তাঁর প্রেম পবিত্র। ব্যর্থ হয়েছে, আর তা হওয়া স্বাভাবিক। তবুও সে অন্তরের কথা জানাতে ভোলেনি। লেখক সমাজ অর্থনীতি, ইতিহাসের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে ব্যক্তি প্রেমে ব্যর্থতার এক করুণ কাহিনি আমাদের শুনিয়ে দিয়েছেন। ছালেহা আনোয়ারের দৃষ্টিতে সাধারণ মেয়ে না হলেও, কেতাবী বিদ্যা বহু আয়ত্ত করলেও সে সমাজিক ভয়কে উপেক্ষা করতে পারেনি। তবে আনোয়ার দরিদ্র হলেও নিজেকে সম্মানীয় ব্যক্তি মনে করে, এই তাঁর গৌরব। সে নিজেকে ঐতিহ্য সম্পন্ন মুসলিম মানুষ মনে করে –

“আমি যে নিতান্ত গরিব, এতে আমি কেন নিজেকে এতটা সৌভাগভবান বলে মনে করি –জান ? কারণ, গরিব বলে আমার চোখ দুটি উন্মুক্ত, প্রসারিত। দুঃখে –দারিদ্র্যে নিপীড়িত মুসলমানেরা একটা আবছা আকাঙ্ক্ষা ও মিথ্যে মায়ায় ভুলে সর্বদা উন্মুক্ত ও অস্থির হয়ে থাকলেও তারা জানে তারা কী ; কী অবস্থা তাদের  ; কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ যদি হঠাৎ অর্থের নাগাল পায়, তখুনি সে জগতের বাস্তব আকৃতির কথা ভুলে যায়, ভুলে যায় যে সে মুসলমান। আমি বেঁচেছি ; আমি সত্যি সৌভাগ্যবান।“ (তদেব, পৃ. ১২৬ )

নদীমাতৃক বাংলাদেশকে সামনে রেখেই ওয়ালীউল্লাহ্ গল্পগুলি গড়ে তুলেছেন। গল্পের ভুবনে নদী এনে গল্পের গতিবেগকে তীব্র থেকে তীব্রতর করেছেন। সেই সঙ্গে রয়েছে গদ্যের আশ্চর্য তাল। সব লেখকই জীবনে সামনে রেখে গল্পের কাঠামো গড়ে তোলেন। কিন্তু যিনি গদ্যে শক্তিশালী, আখ্যান নির্মাণে নিপূণ দক্ষশিল্পী, তিনি কালের মণিকোঠায় টিকে যান। ওয়ালীউল্লাহ্ গদ্যের স্বচ্ছতায় একজন দক্ষ শিল্পী তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। আর সে জন্যই অর্ধশতাব্দী পরেও গল্পগুলি নতুন বোধ নিয়ে আমাদের কাছে উপস্থিত হয়।  ‘না কান্দে বুবু’ গল্প গড়ে উঠেছে আফতাব ও আছিমনকে কেন্দ্র করে। নুনা মিঞার সন্তান আফতাব শহরে থাকে। দীর্ঘ চারবছর পর সে জন্মভূমিতে যাচ্ছে। নুনা মিঞার কন্যা আছিমনের বিবাহ হয়েছিল কিন্তু স্বামী মারা যাওয়ায় সে পিতৃগৃহে ফিরে এসেছে। নুনা মিঞায় স্ত্রী আগেই মৃত হয়েছে। গ্রামে থাকে নুনা মিঞা ও আচিমন। দুজনেই চিন্তিত আফতাবকে নিয়ে। সেই আফতাবের ফিরে আসাকে কেন্দ্র করেই লেখক গল্প গড়ে তুলেছেন। গোটা গল্পটাই গড়ে উঠেছে আফতাব ও আছিমনের চেতনাকে কেন্দ্র করে। বাস্তবলোক থেকে লেখক গল্পকে নিয়ে গেছেন ভাবলোকে, সেখানেও বাস্তব উঁকি দিয়েছে। সে জানে বুবু আছিমন সারাদিন দুঃখে থাকে ভাইয়ের ফেরা নিয়ে। এই বুবুর দুঃখ কী করে ভোলাবে আফতাবের চেতনায় সেই চিন্তা বড় হয়ে উঠেছে। আর এই চিন্তায় স্বল্প পথ দূর থেকে দূরতর হয়েছে, আর সেই দূরতর পথেই লেখক আমাদের গল্প শুনিয়ে দিয়েছেন। সে দিদির জন্য কালো পাড় শাড়ি কিনেছে কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়েছে –“মুসলমান বিধবারা পাড়হীন শাড়ি পরে না।“ অবশেষে সে বাড়ি ফিরেছে। কিন্তু আজ নুনা মিঞা ও আছিমন আক্ষেপের সময় হারিয়ে ফেলেছে। বাধর্ক্য যেন সব কেড়ে নিয়েছে। বিগত চার বছর ধরে অপেক্ষা করতে করতে যেন তাঁরা সব হারিয়ে ফেলেছে। জীবনের সব ভালো -মন্দ বোধ হারিয়ে গেছে। লেখকও অনবদ্য গদ্যে আমাদের শোনান –

“বুবু কাঁদে না। বুবু গোয়ালঘরে কাঁদে না, চুলার আগুনের পাশে কাঁদে না, ঘাটে কাঁদে না, ঘরে কাঁদে না। তেজ নাই চলনে –বলনে, বুবু কাঁদেও না। সোনা ভাইটা দেশে ফিরছে, বুবু কাঁদে না। শাড়ি দেখে বুবু। বুবু শাড়ি দেখে, কাঁদে না। বুবু নীরবে শাড়ির জমিন দেখে হাত নিচে রেখে, বুবু কাঁদে না।“ (তদেব, পৃ. ৩০৮ )

‘অনুবৃত্তি’ এক প্রেমের গল্প, যা গড়ে উঠেছে আরশেদ হামেদ ও বেগমকে কেন্দ্র করে। আরশেদ জাহাজে চাকরি করে, এক রাতের অন্ধকারে মিলিত হয়েছে তাঁরা। নিভৃত কথনে প্রেমের আলাপ করেছে। আরশেদ রক্তজবা পড়িয়ে দিয়েছিল বেগমের মাথায়। বেগমের একটিই প্রার্থনা ছিল  আরশেদ যেন জাহাজের চাকরি ছেড়ে দিয়ে দেশে ফিরে আসে। কিন্তু প্রেমের চেয়ে চাকরি বড় মনে হয়েছে আরশেদের কাছে। জীবনের ভবিতব্যের কাছে তাঁর চাকরিই শেষ ঠিকানা মনে হয়েছে। এজন্য হয়ত বেগমের মাথা থেকে রক্তজবা ফুলটি পরে গিয়েছিল। কেননা এ ফুল প্রেমের প্রতীক। সফল স্বপ্নের প্রতীক। ব্যর্থ প্রেমিকার মাথায় তা শোভা পায় না। এমনকি বেগমও বলেছিল সে ফুল পিষে দিতে। আরশেদ জাহাজে করে চলে গেছে বিদেশে, ফিলাডেলফিয়া শহরে বসে আজ মনে ভেসে উঠেছে এক বিদেশিনীর মুখ। যে মুখে সে বেগমকে খুঁজে পেতে চেয়েছে। কিন্তু সব শূন্য থেকে গেছে। ‘নারী হৃদয় কে বুঝিবে ‘ –বোঝেনি আরশেদরাও। আসলে অর্থনৈতিক টানাপোড়েনই তাঁকে বুঝতে দেয়নি। কেননা সময় পরিস্তিতি আজ আলগা প্রেমে ভেসে যেতে দেবে না। তাঁর প্রেম সত্য, তবে তা থেকেও বড় সত্য নিজের কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখা। প্রেমহীনতায় বেগমের কথা আমরা জানি না, লেখক সে অবকাশও রাখেনি। আসলে সার্থক ছোটোগল্পের সব ধর্ম এ গল্প পালন করে চলেছে।  

                ‘একটি তুলসীগাছের কাহিনী’ গল্প দাঙ্গার পটভূমিকায় লেখা। তবে এ গল্পের কাহিনি বয়নে লেখক নিয়ে এসেছেন কিছু মুসলিম যুবককে। গল্পের শেষে যুবকদের আর গৃহকর্ত্রীর কথা মনে পড়েনি। শেষ লাইনে লেখক উচ্চরণ করেছিলেন –“কেন পড়ে নি সে –কথা তুলসীগাছের জানবার কথা নয়, মানুষেরই জানবার কথা।“ সে কথা জানেন লেখক। হিন্দু মুসলিমের এক অসম্প্রদায়িক মিলনের সেতু বন্ধনের মন নিয়ে তিনি এ গল্প লিখেছেন। দাঙ্গা হিন্দু –মুসলিম লাগায় না, তা লাগায় কিছু দাঙ্গাবাজ মানুষ। তাই মতিন, আমজাদ, কাদের, বদরুদ্দিন,  ইউনুস, হাবিবুল্লা, মোদাব্বের, এনায়েত ও মুকসুদ কেউই তুলসী গাছকে ধ্বংস করেনি। আসলে তুলসী গাছ তাঁদের কাছে পৃথক সংস্কৃতির বার্তা বহনকারী হলেও কেউ সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে চায়নি। জলের স্পর্শে, মানুষের স্পর্শে তুলসী গাছ যেমন বেঁচে উঠেছে তেমনি এই যুবকরাও বাঁচতে চেয়েছে। কিন্তু সমাজ, রাষ্ট্র তো মানুষের বাঁচার অধিকারকে লঙ্ঘন করে, বাঁচার স্বপ্নে একফোঁটা বিষ ঢেলে দেয়। রাষ্ট্রের কাছে ইউনুস, হাবিবুল্লা, এনায়েতদের বেঁচে থাকার মূল্য কতটুকু ? সেই বেঁচে থাকার আত্মকাহিনিই লেখক আমাদের শুনিয়েছেন। তুলসী গাছ রোগ নিরামকের ওষুধ হিসাবে গণ্য কিন্তু মানুষকে বাঁচাতে হলে আগে তো তুলসী গাছকে বাঁচতে হবে তেমনি দাঙ্গারোধে আগে এই যুবকগুলিকে বাঁচতে হবে। সেই বাঁচার গল্পই লিখেছেন ওয়ালীউল্লাহ।

    এক অসম্প্রদায়িক মন নিয়েই তিনি গল্প উপন্যাসে বিচারণ করেছেন। তবে তিনি মনে প্রাণে ছিলেন বাঙালি মুসলমান। স্ত্রী আন মারি ওয়ালীউল্লাহ জানিয়েছেন বাঙালি মুসলমান হিসেবেই তিনি নিজেকে বেশি গর্ব অনুভব করতেন। এমনকি কর্মজীবন শেষে বাংলাদেশে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। ‘বাঙালি মুসলমান’ নামক পরিচ্ছেদে স্ত্রী লিখেছেন –‘’লক্ষ করার বিষয়, আমি বাঙালি হিন্দুর বিপরীতে তাকে বাঙালি মুসলমান হিসেবে আখ্যায়িত করছি। কেননা, ধর্মীয়ভাবে না হলেও সাংস্কৃতিকভাবে সে বাঙালি মুসলমানই ছিল। সেভাবেই সে বেড়ে উঠেছে।‘’ (আমার স্বামী ওয়ালীউল্লাহ, তদেব, পৃ.  ) কেননা দেশকে সে প্রবলভাবে ভালোবাসতো। দেশের মানুষ ও শেকড় সন্ধানে সর্বদা সে ব্যস্ত ছিল। এমনকি গভীর ভাবে লক্ষ রাখলে দেখা যাবে ওয়ালীউল্লাহ ছেলের নাম রেখেছেন মুসলিম জীবনকে সামনে রেখে অথচ কন্যার নাম পাশ্চাত্য। সন্তানের মধ্য দিয়ে সে যেন নিজের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে চেয়েছিল। ফলে গল্প উপন্যাসেও সে মুসলিম জনজীবন নিয়ে আখ্যান রচনায় স্বচ্ছন্দবোধ করত।

26