বটগাছ ———শেখর সরকার

গাছ নিয়ে কথা বলতে গেলে যে গাছটির কথা আমার প্রথমে মনে আসে, সে হলো আমাদের জাতীয় বৃক্ষ। মজার কথা হলো আমাদের জাতীয় পশুপাখির ন্যায় জাতীয় বৃক্ষও যে আছে আমাদের মধ্যে অনেকেই সেটা জানেন না। স্বাধীনতা আন্দোলনে অনেক বিপ্লবীকে ইংরেজ সরকার যে গাছের ডালে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ছিল সেই গাছটি হল অতি পরিচিত , আমাদের জাতীয় বৃক্ষ বট গাছ।

পশ্চিমবঙ্গ তথা সারা ভারতেই একে দেখতে পাওয়া যায়।বাংলাতে বট, হিন্দিতে বট বা বরগদ, ইংরেজিতে ব্যানায়ন, অসমীয়াতে ভাট,তামিলে অলা নামে পরিচিত।

গাছটি বংশ বিস্তার করে পাখির মলের মাধ্যমে।বট ফল খেয়ে পাখিরা মল ত্যাগ করলে সেই মলে অবস্থিত বটবীজ অঙ্কুরিত হয়। তাইতো বড়বড় পুরানো গাছের উপরে এবং পুরানো বিল্ডিংয়ে বট ,পাকুড় গাছ দেখা যায়। চারাগাছ আস্তে আস্তে নীচের দিকে মূল বিস্তার করে।
এটি একটি বৃক্ষ জাতীয় চিরহরিৎ, দ্বিবীজ পত্রী , সপুষ্পক উদ্ভিদ।পাতা গুলো মোটা, ডিম্বাকৃতি, নিচের দিকটা হৃদয়াকৃতি।ফল ছোট, গোলাকার।পাকলে লাল হয়। বটের বিজ্ঞানসম্মত নাম Ficus benghalensis। এটি মালবেরি ফ্যামিলির অন্তর্গত একটি গাছ।

সারাদেশে প্রায় ৮৯ রকমের বট জাতীয় গাছ দেখা যায়।যেমন বট, পাকুড়, অশ্বথ,যজ্ঞডুমুর ইত্যাদি।

বট গাছের ইংরেজি নাম ব্যানায়ন হবার পেছনে একটি গল্প আছে। ইংরেজরা ভারতে এসে দেখল গ্রামের বড় বট গাছের নীচে বানিয়ারা‌ (অর্থাৎ ব্যবসায়ীরা) দোকান নিয়ে বসেছে। দুরদুরান্ত যাত্রায় ক্লান্ত বানিয়ারা রাস্তায় বট গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছে।তাই থেকে তারা এই গাছের নাম দেয় ব্যানায়ন। ভারতীয় সাহিত্য সংস্কৃতি ধর্মের বিরাট অংশজুড়ে আছে বটগাছ। বটগাছ হিন্দুধর্মে অমরত্বের প্রতীক। হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস করা হয় বট গাছের ডালে শ্রীকৃষ্ণ দোল খেতেন। যজ্ঞে বট পাতা ব্যবহার করা হয়। ভারতবর্ষের বেশিরভাগ মন্দির প্রাঙ্গণে বট গাছ দেখা যায়। যেমন দক্ষিনেশ্বর মন্দিরের পঞ্চ বটি,পুরির জগন্নাথ মন্দিরে কল্পবট। আবার বৌদ্ধ ধর্মে গৌতম বুদ্ধ বট গাছের নিচে সিদ্ধি লাভ করেছিলেন বলে সেই গাছের নাম হয় বোধিবৃক্ষ।

আমাদের সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র, সত্যজিৎ রায় সবার লেখাতেই বটগাছের উল্লেখ পাই।

প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসা পদ্ধতিতে বটগাছের বহুল ব্যবহার আছে। বিভিন্ন রকম ব্যাথা সারাতে বট গাছের সাদা রস লাগানো হয়। ডায়াবেটিসে বটফল ও বাকল ব্যবহার করা হয়। চামড়ার রোগ, দাঁতের সমস্যা ও asthma রোগে বটের সাদা তরুক্ষীর ব্যবহার করা হয়। ডায়রিয়া এবং বমি সারাতেও বটের ব্যবহার আছে।

পরিবেশেগত দিক দিয়েও বটগাছের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে। একটি বট গাছ প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন সরবরাহ করে থাকে।যা টাকার অঙ্কে অনেকটা। বটগাছ বিভিন্ন প্রানিদের আবাস ও খাদ্যের ভান্ডার হিসাবে কাজ করে।বট ফলের উপর প্রচুর পাখি, স্তন্যপায়ী ও পোকামাকড় নির্ভরশীল।আমি নিজে বট গাছে যে সব পাখি দেখেছি তারা হল বিভিন্ন ধরনের হর্নবিল (ধনেশ) ,তিন রকমের বারবেট(বসন্ত বৌরি),টিয়া, ঘুঘু,পায়েড ময়না,কমন ময়না,কোকিল,হরিতাল, ফিঙে, পামপাদুর উল্লেখযোগ্য। স্তন্যপায়ীদের মধ্যে বানর, কাঠবিড়ালি, বাদুড়,মালবার জায়েন্ট কাঠবিড়ালি, ইঁদুর। প্রচুর পিঁপড়ে বটগাছে দেখা যায়।

জঙ্গলে বট ফল মাটিতে পড়লে তা বিভিন্ন তৃণভোজী প্রাণীদের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়।বট গাছের নিচের মাটি ভালো জৈবসার।বটর ফল, পাতা মাটিতে পড়ে এবং তার সাথে যুক্ত হয় বট গাছে বসবাসকারী বিভিন্ন প্রজাতির মল বা রেচন পদার্থ। মাটিতে থাকা বিভিন্ন মাইক্রোবস এদের ভালো জৈবসারে পরিনত করে। বট গাছের বনসাই ঘর সাজাতে ব্যবহার হয়।

আমাদের পরিবেশে বট গাছের অবদান অনস্বীকার্য। একটি গাছ ২৫০ থেকে ৩০০ বছরের বেশি বাঁচে এবং এত এত দিন ধরে আমাদের অক্সিজেন দেয়। বিভিন্ন প্রজাতিকে খাদ্য ও আশ্রয় দেয়। বট গাছের এই অবদানের জন্য বট গাছ আমাদের জাতীয় গাছ। National book trust এর চিহ্ন বটগাছ।

ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় চিহ্নতেও বট গাছ দেখা যায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে বর্তমানে বটগাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।কখনও রাস্তা চওড়া করার জন্য, কখনও নগরায়নের জন্য ব্যপকহারে কাটা হচ্ছে এই প্রাণ দায়ী গাছটিকে। যেহেতু বটগাছের কাঠের মূল্য নেই তাই নতুন করে বট চারা রোপণ করাও হচ্ছে না।

পরিবেশ রক্ষার জন্যই হোক বা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই হোক হাজার হাজার সেগুন, ইউক্যালিপটাস,চিকরাশি প্ল্যান্টেশন এর মধ্যেই বটগাছ রোপন ও সংরক্ষণ করা উচিত।
বটগাছ সংরক্ষণের কথা বলতে গেলে পদ্মশ্রী Saalumarada Thimmakka-র কথা বলতেই হবে।যিনি আমাদের তথাকথিত শিক্ষায় শিক্ষিত নন।তিনি একজন শ্রমজীবী মহিলা। সালুমারাদা ৮০০০ গাছ লাগিয়ে বড় করেছেন। তারমধ্যে ৩৮৫টি বট গাছ। আমরা প্রত্যেকে যদি একটা করে বট গাছ বড় করতে পারি, তবে পৃথিবী আরো সুস্থ ও সবুজ হবে। প্রচুর জীব প্রজাতি তাদের বাসস্থান, খাদ্য ফিরে পাবে এবং মনুষ্য প্রজাতির অস্তিত্ব আরো কিছুটা এই পৃথিবীতে দীর্ঘ স্থায়ী হবে।

আমাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো আছেন যাদের ইচ্ছে আছে কিন্তু উপায় নেই। তারা ভাবে বট চারা কোথায় রোপন করব? আমরা আমাদের বাড়ির আশপাশের ফাঁকা জায়গায় ,নদীর পাড়ে ,বাঁধের উপরে এবং যে কোন মন্দিরে প্রাঙ্গণে বট গাছ রোপন করতে পারি। সেটা যদি বাড়ি থেকে অনেক দূরে হয় তাও চিন্তা করার কিছু নেই।আপনিও ইচ্ছে করলে শিবরাম চক্রবর্তীর মত দেবতার জন্ম দিতে পারেন।বটগাছটা রোপন করে তার নিচের মাটিতে একটি মাটির ঘট ,আম পল্লবে সিঁদুর লাগিয়ে রেখে এবং গাছটাকে একটা লালসালু দিয়ে পেঁচিয়ে দিলে আপনাকে আর সংরক্ষণ করতে হবে না ,প্রচুর লোক তার দায়িত্ব নিয়ে নিবে।

4699