‘মেলাসমা’ বা মেচেদা মুখের চামড়ার একটি খুবই পরিচিত সমস্যা। পৃথিবীতে প্রায় ৮.৮ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষের মধ্যে মেচেদার সমস্যা দেখা যায়। পুরুষ এবং মহিলা উভয়ের ক্ষেত্রেই মেচেদা দেখা যায় তবে মহিলাদের মধ্যে এর উপস্থিতি বেশী সংখ্যায় পাওয়া যায়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে গালে মেচেদা দেখা যায়, তবে কপালে, নাকের উপর, ঠোঁটের আশপাশে, এমনকি চিবুক এর উপরের অংশেও মেচেদা হতে পারে।
কারণ – মেচেদা হওয়ার কারণ গুলির মধ্যে দুটি সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি হল হরমোন আর দ্বিতীয়টি হল সূর্যের অতিবেগুনীরশ্মি। হরমোন এর তারতম্যে মেচেদার উপস্থিতি লক্ষণীয়। গর্ভাবস্থায় অথবা রজোনিবৃত্তির পর এই কারণে মহিলাদের মধ্যে মেচেদার হার লক্ষণীয় ভাবে বৃদ্ধি পায়। এছাড়া জীনগত কারণে মেচেদা হতে পারে। অনেক রোগী এসে বলেন, “ ডাক্তারবাবু আমার বয়সী বা আমার থেকে বেশী বয়সের অনেকের মুখ পরিষ্কার, কিন্তু আমার মুখে এত বেশী মেচেদার দাগ কেন?” তাঁদের উদ্দ্যেশ্যে বলি, খেয়াল করে দেখবেন হয় আপনার মা, মাসী, পিসি কারোর মুখে মেচেদা খুব অল্প বয়সে শুরু হয়েছে আর না হলে আপনাকে হয়ত অনেক বেশী সময় রোদে কাজ করতে হয়। অনেকে বলেন, “ আমি তো বাইরে বেরোইনা, আমার রোদ লাগবে কি করে?” তাঁদের বলব ভালো করে ভেবে দেখুন, বারান্দায় বা ছাদে রোজ কাপড় মেলতে যান কিনা, ছেলে মেয়েদের স্কুলে দিতে যাওয়া, আনতে যাওয়া করেন কিনা, মাঝে মধ্যেই বাজার করতে বেরোতে হয় কিনা। মনে রাখবেন প্রতিদিন অল্প করে রোদ্দুর লাগলেও তার থেকে মেচেদা হতে পারে। মেঘলা দিনেও কিন্ত সূর্যের অতিবেগুনীরশ্মি(প্রায় ৮০ শতাংশ) পৃথিবীতে এসে পৌছায়, সুতরাং মেঘলা দিন কিংবা শীতের দুপুরে আরামদায়ক রোদ লাগালেও আপনি মেচেদা হওয়ার দিকে এক ধাপ এগিয়ে থাকলেন।
কিভাবে রোধ করবেন – যেকোনো রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কিছু কারণ মানুষের হাতে থাকে আর কিছু হাতের বাইরে। এক্ষেত্রেও তা একই ভাবে প্রযোজ্য। জীনগত কারণ আমাদের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা আপাতত সম্ভব নয়। সুতরাং আপনার নিকট আত্বিয়ের মধ্যে মেচেদা হওয়ার প্রবনতা থাকলে আপনারও মেচেদা হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। হরমোন জনিত কারণ গুলি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, যেমন যদি কারোর গর্ভ নিরোধক বড়ি খেয়ে অত্যাধিক মেচেদার সমস্যা হয় সেক্ষেত্রে তার জন্য অন্য ধরণের গর্ভ নিরোধক ব্যাবস্থার কথা ভাবা যেতে পারে। যে জিনিসটি মুলত আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি তা হল সূর্যের ক্ষতিকারক অতিবেগুনিরস্মি কে প্রতিরোধ করা। আমাদের দেশে যে পরিমাণ সূর্যরশ্মি বিকিরিত হয় তার জন্য সারা বছরই আমাদের ছাতা ব্যাবহার করা উচিত। যদি ছাতা ধরে বেরোতে অসুবিধা থাকে সেক্ষেত্রে ওড়না কিংবা টুপি ব্যাবহার করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে সানস্ক্রিন কখনই ছাতার বিকল্প হতে পারেনা। সানস্ক্রিন যারা ব্যাবহার করেন তাঁদের উদ্দ্যেশ্যে বলি, নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে সান স্ক্রিন ব্যাবহার করবেন, তা না হলে পুরোটাই ভস্মে ঘি ঢালা হবে। বাইরে বেরনোর অন্তত আধ ঘণ্টা আগে সান স্ক্রিন মাখতে হবে। যদি দিনের অনেকটা সময় বাইরে থাকতে হয় সেক্ষেত্রে ২ ঘণ্টা অন্তর সানস্ক্রিন পুনরায় লাগাতে হবে। খেয়াল রাখবেন সকাল ১০ টা থেকে বিকেল ৪ টে পর্যন্ত যাতে সানস্ক্রিন সক্রিয় থাকে। সব ধরণের সানস্ক্রিন সবাই ব্যাবহার করা ঠিক নয়, যেমন যাদের ব্রণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাঁদের ক্ষেত্রে এক ধরনের সানস্ক্রিন নিরাপদ আবার যাদের খুব সংবেদনশীল ত্বক তাঁদের ক্ষেত্রে আর এক ধরনের সানস্ক্রিন ব্যাবহার করা উচিত। তাই সবসময় বিশেষজ্ঞের মতামত নিয়ে সানস্ক্রিন ব্যাবহার করবেন।
চিকিৎসা – বর্তমানে মেচেদার অনেক রকম চিকিৎসা রয়েছে। তবে সবার আগে যেটা দরকার সেটা হল ধৈর্য। আমরা অনেক সময় চটজলদি মেচেদা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য অনেক বাজার চলতি ক্রিম ব্যাবহার করি। এগুলির মধ্যে অধিকাংশ সংখ্যক ক্রিমে স্টেরয়েড জাতীয় উপাদান থাকে যা মুখের নরম ত্বকের জন্য যথেষ্ট ক্ষতিকর। এইসব ক্রিম বেশীদিন ব্যাবহার করা হলে মুখের চামড়া পাতলা হওয়া, মুখে পশম বেরোনো, ব্রণ হওয়া, মুখ লাল হয়ে জ্বালা করার মত অনেক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই মেচেদা হলে ত্বক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারবাবুদের পরামর্শ নিন।সূর্যরস্মি থেকে মুখ বাচিয়ে চলুন।

73