শৌভিক রায়

জুলাই ১৮,২০২০ : সদ্য উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ফলপ্রকাশের পর থেকে যে ব্যঙ্গবিদ্রুপ চলছে তাতে বিস্মিত হচ্ছি। কেননা, পরীক্ষা না দিয়ে নম্বর পাওয়ার জন্য ছাত্র-ছাত্রীরা দায়ী নয়। সচেতন কোনও ছাত্র-ছাত্রী সেটি চায় না বলেই ব্যক্তিগতভাবে মনে করি।

ইতিমধ্যে সমাজমাধ্যমে অতীতের নম্বর প্রাপ্তিকে সেন্টিগ্রেড ও বর্তমানকে ফারেনহাইটের সঙ্গে তুলনা করে মিম বানানো শুরু হয়েছে। এই ব্যাপারটিও বোকা বোকা লাগছে। আমরা বোধহয় ভুলে গেছি যে, আগে যে সিলেবাস অনুসরণ করা হত, এখন তা করা হয় না। প্রশ্নের পদ্ধতিও বদলে গেছে। এই সিলেবাসে নম্বর তুলবার সুযোগ অনেক বেশি।

সিলেবাস ও পরীক্ষা পদ্ধতির বদলেও আমরা অনেকসময় অখুশি। অথচ, আজ থেকে তিরিশ-চল্লিশ বছর আগেকার সিলেবাস এখনও পড়ানো হলে আমরাই প্রশ্ন তুলব যে, কেন এসব পড়ানো হচ্ছে! অতীতের ধাঁচে প্রশ্নপত্র হলেও চেঁচাবো যে, যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছি না! অন্যান্য বোর্ড প্রচুর পরিমাণে নম্বর দিলে আমরা বলি যে, ওরা দেয়, আমরা কেন দিই না? আবার আমাদের বোর্ড নম্বর বেশি দিলেও বলে উঠি ‘এত নম্বর কেন!’ আসলে আমরা নিজেরাই জানি না যে, ঠিক কী চাই আমরা! আর এই সব নানাবিধ চেঁচামেচি ও বিদ্রুপে আমার আপনার বাড়ির সদ্য পাশ করা ছাত্র বা ছাত্রীটির মনের কী অবস্থা হচ্ছে, সেটা কি আমরা কেউ ভাবছি?
আচ্ছা, আমরা তো নিজেরা কোভিড উনিশের জন্য নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কেউ কি একবার ওদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম যে, ওরা কী চায়? জুন মাসে দিনক্ষণ ঘোষণা করেও প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য পরীক্ষা বাতিল করতে হয়েছে। একবারও কি কেউ আমরা আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিক অবস্থাটা জানতে চেয়েছিলাম সে সময়? এই যে পরীক্ষা বাতিল, পরীক্ষা হবে, পরীক্ষা হবে না…এই অবস্থায় আমাদের কাউকে কোনও দিন পড়তে হয়েছে? কোন্ মানসিক যন্ত্রণায় ওদের দিনগুলি কাটাতে হয়েছে সেটা বুঝবার সামান্য চেষ্টা করেছি? আর আজ যখন একটি পদ্ধতি অবলম্বন করে ফল ঘোষণা করা হয়েছে, তখন আমাদের নখ দাঁত বেরিয়ে পড়েছে শাণিত আক্রমণের জন্য।

কী করতে পারত উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ? পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হলে অবশ্যই নিত। পরীক্ষকেরা খাতাও দেখতেন। নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে ফলও প্রকাশ করা হত। কিন্তু সেটাই তো সম্ভব হল না! তাহলে করণীয় কী ছিল? কোনও একটি পদ্ধতি অবলম্বন করা। সংসদ সেটিই করেছে। তাদের যেটা সবচেয়ে ভাল মনে হয়েছে। আজ অন্য কোনও পদ্ধতি নিলেও একইভাবে তীর চলত। কাটাছেঁড়া করা হত সেই পদ্ধতি নিয়েও। এই যে পরীক্ষা ব্যবস্থা…তার কি কোনও মন্দ দিক নেই? তিন ঘন্টার পরীক্ষায় একজন ছাত্র বা ছাত্রীর ভবিষ্যত নির্ধারণ হয় নম্বরের ভিত্তিতে। এটা কি একদম সঠিক পদ্ধতি? কোনও ভুল নেই এতে? তিনঘন্টার পারফরমেন্সে একজন ছাত্র বা ছাত্রীকে মাপা সম্ভব? কোনও কারণে যদি তার পরীক্ষার দিন কোনও সমস্যা হয়, তাতে তার ফল খারাপ হতে পারে না? পরীক্ষকের মেজাজ-মর্জির ওপরেও যে অনেকসময় নম্বর নির্ভর করে সেটা ভুলে গেলে হবে?

সবচেয়ে খারাপ লাগছে এটা ভেবে যে, সংসদের নেওয়া এই সিদ্ধান্তের জন্য ছাত্রছাত্রীদেরকে ট্রোলের মুখে পড়তে হচ্ছে। যেন এই অবস্থার জন্য ওরাই দায়ী! সব পরীক্ষা না দিয়েও, কেন ওরা টিভির পর্দায় মুখ দেখাচ্ছে? পাল্টা প্রশ্ন করি। কেন সংবাদ মাধ্যম ওদের কাছে যাচ্ছে? না গেলেই তো হয়! কাগজের পাতা ওদের ছবি দিয়ে না ভরালেই তো হয়! ওরা কি যেচে সংবাদমাধ্যমের কাছে গেছে? মনে তো হয় না সেটা। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন যে, এই পদ্ধতিতে অনেক ছাত্রছাত্রী অন্যায্য সুবিধে (পড়ুন ‘নম্বর’) পেয়ে গেল। ঠিক কথা। কোনও ভুল নেই। কিন্তু বিকল্প কী ছিল? সেটাও তো জানা নেই। নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রে, এই রকম পরিস্থিতিতে, যে পদ্ধতিই নেওয়া হক না কেন, প্রশ্ন উঠবেই। মজাটা হল, প্রশ্নটাই উঠবে শুধু। উত্তর বা বিকল্প কিন্তু কেউই বলতে পারছি না। আর সবচেয়ে বড় কথা হল যে, এসবের কোনোটির জন্যই ছাত্রছাত্রীরা দায়ী নয়। তাই ওদের এই নম্বর প্রাপ্তিকে এভাবে বিদ্রুপ অত্যন্ত গর্হিত বলে মনে করি।

আসলে আমরা শুধু নম্বরটিই দেখছি। আমরা জানি না যে, কলেজে ভর্তি হতে গিয়ে এবার ওদের কী ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে এবং সেটা এই রাজ্যের বিভিন্ন কলেজেই! আজ থেকে দু’বছর আগে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু কলেজে কাট অফ মার্কস ছিল একশো। আমাদের ছাত্রছাত্রীরা ওরকম নম্বর পায় না বলে অ্যাপ্লাইটুকুও করতে পারে না, সুযোগ পাওয়া তো দূরের কথা। অথচ কোনও অংশেই আমাদের ছাত্রছাত্রীরা কোনও দিক থেকে কম নয়। কিন্তু শুধুমাত্র নম্বর কম প্রাপ্তির কারণে তারা পিছিয়ে থাকে। আমরা তখনও কোমর বেঁধে গালিগালাজ করি। এবারও করছি। তবে নম্বর বেশি পাওয়ার জন্য। আর একটা পার্থক্য হল যে, এবার আমরা বিদ্রুপে ভাসাচ্ছি পরীক্ষা দিতে না পারা ছাত্রছাত্রীদের। ভুলে যাচ্ছি যে, দোষটা তাদের না। দোষটা সময়ের। দোষটা পরিস্থিতির।

32