ছোটগল্প : সমব্যথী
জুলাই ১৫,২০২০: কোনো এক রাজনৈতিক দলের মার্কামারা রিলিফের সামগ্রী নিয়ে প্রাপ্তি বাড়ি ফিরল। পড়নে ছিল সামান্য দামের একটি ফ্রক। কিছুটা ছেঁড়া আর কুঁচকানো কিন্তু পরিস্কার। বাড়ির উঠোন থেকে—‘মা দেখো কি পেয়েছি!’
রান্নাঘর থেকে মা হাঁক দেয়—
‘কি শুরু করলি কি! যত জ্বালা হয়েছে আমার! কি সাতরাজার ধন শুনিi!’
মায়ের এই শ্লেষ বাক্যের পর আর মুখ ফুটে কথা বলতে পারেনি। নিশ্চল, নিশ্চুপ হয়ে মোটের ওপর দাঁড়িয়েই ছিল।
ভাঙা ছিপছিপে ঘরে ছোট্ট বোনের কান্নার শব্দ শুনতে পেয়ে হাতে রিলিফের ব্যাগটা ফেলেই দৌড় দিল। বেশ কয়েক মাস হল পৃথিবীতে এসেছে তার বোন প্রত্যাশা। বোনের কান্না সহ্য হয় না তার। মায়ের থেকে যেন বেশি আগলে রাখে দশ বছরের প্রাপ্তি।
উনুনে খড়ি কয়টা ঠেলে বাইরে আসতেই মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে রিলিফের ব্যাগটা। মেয়ের এই কাণ্ডজ্ঞান দেখে তিনি বেজায় চটেছেন। আজ অভাব হয়তো হাঁড়িতে জানান দিচ্ছে তাই বলে স্বপ্নেও কখনও রিলিফের সামগ্রির কথা ভাবতেও পারেননি।
আজ পঁয়তাল্লিশ দিন হল ঘরে শুয়ে বসে দিন কাটছে পিনাকীবাবুর। ব্যবসা বলতে ঐ বাসনপত্রের। গোটা বিশ্বের মন্দার বাজার আর তার ওপরে সারা দেশ জুড়ে লকডাউন। এই দুয়ে মিলে অবস্থা ভীষণরকম খারাপ। তবু আজ তাকে বাড়ির আনাচে-কানাচে কাজ করতে দেখে বেশ তৃপ্তিবোধ করছে শম্পাদেবী।
পিনাকীবাবু যে কখন ওপাশের পেঁপে গাছটার যত্ন নিচ্ছেন তা টের-ই পাননি। তার সকাল থেকেই যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ছোট মেয়ের দেখাশোনা, সকালের এক গাদা কাপড়, বাসন— সব ছেড়ে ভ্যাঁপসা গরমের মধ্যে কাঠ ঠেলে রান্না। এসব নিত্যদিনের রুটিনে পরিণত হয়েছে। তবু ভালো লকডাউন বলে লোকটি তাকে অনেক সহ্য করে আজকাল।
‘এই যে শুনছ!’ রোদে ঘেমে যাওয়া লোকটিকে বলে উঠল।
‘হুম বলে ফেলো শুনছি! চাল বাড়ন্ত তো! সে কথা আমার মাথায় আছে।’ লকডাউনে দুই দুইবার চাল আনা হয়ে গেছে। ঘরবন্দি সময়ে যেন একটু বেশিই লাগছে।
‘আরে না গো, চাল তো তোমার বড়ো মেয়ে এনেছে!’
‘মানে! ওইটুকুন একরত্তি মেয়ে চাল কেমন করে আনবে! বলি তোমার মাথাটা ঠিক আছে না কি উনুনের আগুনের মতো জ্বলছে।’
‘হ্যাঁ আমার মাথা ডিপ ফ্রিজের মতো ঠাণ্ডাই আছে।’ এরপর আর কোনো কথা চলে না। স্ত্রীকে নিয়ে ঘর করছে আজ প্রায় তেরো-চোদ্দ বছর হতে চলল। বিলক্ষণ চেনেন স্ত্রীকে। তাই আর কথা না বাড়িয়ে কাজে মন দিলেন।
ঐদিকে প্রত্যাশার কান্না থামেতে না পেরে মা’কে ডাকল প্রাপ্তি—
‘মা শিগ্গির এসো! আমি আর রাখতে পারছি না যে।’
মা’কে দেখে কান্নার রোল আরো দ্বিগুণ যেন বেড়ে গেল। মায়ের কোল পেয়ে একেবারে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।
দুই মেয়ে বলে কখনও মন খারাপ হয়নি সরকার দম্পতির। অবশ্য পড়শিরা কানঘুষা করত—আবারও মেয়ে! ওসব কানেই তুলতেন না। অবশ্য প্রথম কয়দিন মনটা একটু ভারি হয়েছিল বইকি। এখন ছোটোমেয়ের হাসিতেই নিজেরা হাসেন। পাড়ার কাকিমা-জেঠিমা গোছের মহিলারা খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারেননি।
‘মা কেমন যেন একটা গন্ধ না!’ —প্রাপ্তি বলে উঠল।
‘হ্যাঁ তাই তো! ভাত ভাত গন্ধ। সর্বনাশ! ভাত বুঝি তলে ধরেছে।’ মেয়েকে পেলে কেমন যেন হয়ে যান। সব ভুলে যান।
দৌড়ে গিয়ে ভাতের হাঁড়িটা নামিয়ে ফেলল। তারপর টুকিটাকি কাজ সেরে ফিরে এসেছে ঘরে।
মায়ের নরম বুক পেয়ে আবারও ঘুমিয়ে পড়েছে ছোটো মেয়েটি। এবার পড়েছে বড়ো মেয়েকে নিয়ে। স্নান করিয়ে, নিজে সেরে রান্না ঘরে। রান্না ঘর থেকে বড়োমেয়েকে বলল—
‘ডাক তো তোর বাবাকে। বল রান্না হয়ে গেছে। এসো খাবে।’
ডাকতে যাবে ওমনি বাবাকে দেখে বলল—
‘এই তো বাবা এসে গেছে।’
কালো রঙের মানুষটি যেন আজ বড্ড ঘেমেছে। স্বামীকে দেখে কষ্ট হয়েছিল শম্পাদেবীর।
‘আহা রে! কে করতে বলেছে এত কাজ? নয় লকডাউনই চলছে, তাই বোলে কি আধপেটা খেয়ে থাকতে পারতাম না?’
লকডাউনের কথা বলায় হঠাৎই উঠোনের দিকে দেখিয়ে রিলিফের কথাটা বলেই ফেলল—
‘দেখো তোমার মেয়ের কাজ দেখো! দেখলে, বলেছিলাম না চাল তোমার মেয়ে এনেছে।’
পাশেই বসেছিল প্রাপ্তি। মনের ভিতর ভয় বাসা বেঁধেছে। এই বুঝি ঘা কতক এসে পড়ল পিঠে। কিন্তু বাবার চলে যাওয়াতে ঘন মেঘ সরে যেন সূর্য হেসে উঠল। সে কি কখনও বুঝেছিল নাকি এ সব নিলে বাড়িতে এতো হাঙ্গামা হবে। পাড়ার কত লোক-ই নিল সেই সব। পাশের বাড়ির রুপালি নিল বলেই তো সে সাহস পেল।
রুপালির সাথে তার কতকালের ভাব। সকাল থেকে সন্ধে, যখনই সুযোগ পায় তখনই বাড়ির পেছনের পুকুর পাড়ে গিয়ে কত কি আসমান জমিন ভাবে। বর-বউ খেলা থেকে শুরু করে লুকোচুরি সব-ই তো তার সাথে। কৈ, রুপালির বাড়িতে তো এ-সবের কিছুই হচ্ছে না! মা যখন স্নান সেরে রান্না ঘরে এসেছিল সেই ফাঁকে বুনুকে আদর করে যখন ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, তখন চুপিচুপি তাদের বাড়ির অনেক কথায় সে তো শুনে নিয়েছে। বরং তার মা খুশি হয়ে বলেছিল—
‘হ্যাঁ রে! তুই আর একখানা আনতে পারলি না? দিনকাল ভালো না। কতদিন যে এভাবে থাকতে হবে কে জানে!’
মা’কে বলতে চেয়েও এ-সব কথা বলা হয়নি। বললে নির্ঘাত ক’ঘা পড়ত পিঠে। বয়স বছর দশেক হলেও বাড়ি ফেরার মুহূর্তেই মায়ের চণ্ডীরূপ দেখে আন্দাজ করতে বাকি ছিল না তার। সে জানত শেষ ভরসা একমাত্র তার বাবা। বাবা যখন কিছু না বলেই সরে পড়ল তখন এ যাত্রায় একপ্রকার রক্ষা।
‘কৈ গো! ভাত বেড়ে কতক্ষণ থাকতে হবে শুনি? আমার হয়েছে যত জ্বালা। ভেবেছি মানে মানে যদি মেয়েটি উঠবার আগেই রান্না ঘর থেকে বিদায় নিতে পারি। তা বোধ হয় আর হল না।’
বাবাকে আসতে দেখে প্রাপ্তি থালাতে ভাত নিয়ে যেন ভাতের সঙ্গে খেলা করছে। শম্পাদেবী দেখতেই বলে উঠল—
‘কি রে তোর আবার কি হল?’
চমক ভাঙ্গতেই বলল—
‘না, কিছু না।’
–‘না, কিছু না মানে? তবে খাচ্ছিস না কেন?’
–‘আ! তুমি আবার চেঁচাচ্ছ কেন?’ মেয়ের পক্ষ নিয়ে বলেন বরাবর পিনাকীবাবু।
–‘না, চেঁচাবে না। এই অভাবের দিনে একটি ভাতও নষ্ট করা যাবে না।’
খাওয়া শেষ হবার আগেই পিনাকীবাবু বলে উঠলেন—
‘দেখ্ মা, তুই যা আজ করেছিস তাতে অন্যায় কিছু নেই। পরিস্থিতি মানুষকে বাধ্য করছে। আর তাছাড়া তুই তো খেতে পাস না এমনটা নয়। আমাদের চেয়ে বেশি দরকার এ-গ্রামে তেমন মানুষ অনেক আছে। তুই তাদের কথা একবারও ভাবলি না!’
এবারে তার হঠাৎ করে মনে এলো রুপালিদের কথা। তার মা বলছিল রুপালিকে আর এক প্যাকেট আনতে পারিসনি। শেষে বাবাকে বলল—
‘বাবা, আমি শুনেছি রুপালিকে ওর মা বলছিল আর এক প্যাকেট আনতে পারিসনি?’
মায়ের দিকে তাকিয়ে—
‘তাদের ঐ প্যাকেটা দেবো মা? কাল বর-বউ খেলার সময় ও বলছিল, তারা নাকি দু’দিন ধরে জল দেওয়া ভাত আর গাছের লঙ্কা দিয়ে ভাত খাচ্ছে। আমরা তো তবু এই ডাল-ভাত পেট পুরে খেতে পাচ্ছি।’
ওদের এই প্যাকেটটা দিয়ে দি মা, –বাবা!
মেয়ের এহেন কথা শুনে কি পিনাকীবাবু, কি শম্পাদেবী কেউ-ই নয়নের জলধারা ধরে রাখতে পারছিলেন না। নিজের আবেককে ধরে রাখতে না পেরে পিনাকীবাবু মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। পিতা-কন্যার এহেন স্নেহ-ভালোবাসা দেখে স্বামী-সন্তানের জন্য গর্বে বুক ভরে উঠেছিল শম্পাদেবীর।