Categories
পরিবেশ

পরিবেশ:ভালোবাসি বাংলার পাখি:বসন্তবৌরি

রাজারাম সাহা

বসন্ত বৌরি (barbet)

আমাদের আশেপাশে সব সময় যে পাখি গুলি দেখতে পাই তাদের মধ্যে অন্যতম ‘বসন্তবৌরি’। বসন্তবৌরি খুবই সুন্দর ও আকর্ষণীয় একটি পাখি। যার রূপ ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। সম্পূর্ণ শরীরে সবুজ রঙের পরিমাণ বেশি থাকে বলে একে অনেকে বনটিয়া ভেবে বসে। কিন্তু এরা টিয়া পরিবারের অন্তর্গত নয়। আবার গাছে ঠোঁট দিয়ে টুকরে টুকরে গর্ত করে বাসা বানায় বলে আমরা অনেকে বাসা বানাবার এই পদ্ধতি দেখে সবুজ রঙের কাঠঠোকরা ভেবে ভুল করে থাকি।
আমাদের দেশে আমরা ১০ রকম প্রজাতির বসন্তবৌরি দেখতে পাই। তারমধ্যে আমাদের জেলায় দেখে থাকি তিন ধরনের বসন্তবৌরি।

নীলকন্ঠ বসন্তবৌরি ( Blue Throated Barbet)


এই পাখিটির নামের সাথে আমরা হয়তো অনেকেই পরিচিত নই কিন্তু বসন্তকালে এই পাখির ডাক শুনতে পাননি এমন মানুষ হয়তো পাওয়া যাবে না। বট, পাকুর, বা বাড়ির পেঁপে,আম,জাম প্রভৃতি গাছে এ পাখিটি দেখা যায়। এই পাখির প্রায় সম্পূর্ণ শরীরটি সবুজ রঙের হওয়ার জন্য গাছের পাতার মধ্যে মিশে থাকে তাই সহজে দেখা যায় না। পাখিটির কপাল ও মাথার উপর লাল রংয়ের হয়। কপালের শেষভাগ হলুদ এবং তারপর সামান্য কালো রংয়ের কিছু পালক থাকে। গলা ও বুকের উপরের অংশ, গাল, চোখের পাশ দিয়ে গাঢ় আকাশী রং থাকে। ঠোটের নিচের অংশে এই গাঢ় আকাশী রং থাকার জন্যই ইংরেজিতে এই পাখিকে Blue Throated Barbet বলা হয়। বুক, পেট সবুজ রঙের হয়, ডানা গাঢ় সবুজ। ঠোঁট বেশ শক্ত ও মোটা সাদা রঙের হয়,তবে ঠোঁটের সামনের অংশে হালকা কালচে ভাব থাকে এবং শেষের দিকে হলদে আভা থাকে। ধূসর রঙের পা ও চোখ লাল রংয়ের হয়। পুরুষ ও স্ত্রী পাখি দেখতে একই রকম। মার্চ থেকে জুলাই মাসে এরা গাছের নরম কান্ড ঠোঁট দিয়ে টুকরে টুকরে গর্ত করে বাসা বানায় এবং তিন চারটে ডিম পাড়ে। বট, পাকুর, পেঁপে, আম প্রভৃতি ফল ছাড়াও কিছু পোকামাকড়, শুয়োপোকা খেতে এদের দেখা যায়। কুলিক পক্ষীনিবাস ও তার আশেপাশে বনাঞ্চলে একটু ভালো করে দেখলে এদের খুব সহজেই দেখা যায় এবং আমাদের লোকালয়- এ বিভিন্ন ফল গাছে এদের বসে থাকতে দেখা যায়।

স্যাকরা বসন্তবৌরি ( Copper Smith Barbet):-

ছোট বসন্তবৌরি বা স্যাকরা বসন্তবৌরি নামে পরিচিত এই পাখিটিকে কিছু প্রবীণ পক্ষী প্রেমিককে “ভগিরথ” নামে ডাকতেও শুনেছি। এই পাখিটি নীলকন্ঠ বসন্তবৌরি থেকে আকারে অনেকটাই ছোট। এর দৈহিক আকৃতি 16 থেকে 17 সেমি । এই পাখিগুলো যেহেতু গাছের নরম কান্ড বা ডালে টুকরে টুকরে বাসা বানায় এবং বিভিন্ন ধরনের ফল খায় তাই এদের ঠোঁট হয় মোটা এবং শক্ত। ঠোঁটের পাশ দিয়ে গোঁফের মত কালো রংয়ের কয়েকটি লোম থাকে। ঠোঁটের রং কালো। মাথার সামনের অংশ লাল রংয়ের হয় এবং পিছনের অংশ কালো। চোখের চারপাশে খয়েরি রংয়ের লোম থাকে। কালো ঠোঁটের নিচে হালকা হলুদ এবং গলায় লাল রংয়ের মোটা রেখা থাকে। বুক ও পেট হালকা সবুজ ও সাদা পালকের মিশ্রন দিয়ে তৈরি। মাঝে মাঝে গাঢ় সবুজ রঙের লম্বা লম্বা দাগ থাকে। পুরুষ ও স্ত্রী পাখি দেখতে একই রকম। এদের রঙ সবুজ রঙের হওয়ার সুবাদে খুব সহজেই এরা গাছের পাতার সঙ্গে মিশে যায়। তাই এদের একটু কমই দেখা যায়। বট, পাকুর, জলপাই গাছে এদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। সাধারণত জোড়ায় বা পাঁচ ছয়টি পাখির ছোট দলে থাকে এরা। জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত বাসা বানায়, প্রজনন করে ও তিন থেকে চারটি ডিম পাড়ে। এদের ডাক অনেকটা তামার পাত পেটানোর আওয়াজের মত তাই এদের নাম হয়েছে Copper Smith Barbet.

দাগি বসন্তবৌরি (Lineated Barbet):-

নীলকন্ঠ বসন্তবৌরির থেকে আকারে প্রায় 27-28 সেমি বড় হয় দাগি বা রেখা বসন্তবৌরি। শান্ত ও লাজুক স্বভাবের এই বসন্তবৌরিটিকে সাধারণত ডুমুর গাছের আশেপাশে দেখা যায়। ডুমুর ছাড়াও বট পাকুড় গাছে একা বা জোড়ায় থাকে এরা। এদের মাথা, ঘাড়, বুক ধূসর রঙের তার উপর হালকা খয়রি রঙের ছিট ছিট থাকে। চোখের চারপাশে হলুদ চামড়া থাকে। সম্পূর্ণ শরীর গাঢ় সবুজ রংয়ের হয়। পা হলুদ ও ঠোঁট হালকা গোলাপী হয়। সাধারণত বড় গাছে একটু উপরের দিকে ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই মাসের মধ্যে বাসা বানায় এরা।

এই তিনটি পাখিই আইইউসিএন ( I. U.C.N) লাল তালিকায় ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত। কিন্তু আমাদের আশেপাশে যে পরিমাণে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে তাতে যে কোনো দিন এই অত্যন্ত সুন্দর পাখিগুলোও সংরক্ষিত প্রজাতির হয়ে যেতে পারে।

তাই এদের বাঁচাতে বেশি করে গাছ লাগান ও চারপাশের গাছগুলোকে বাঁচান।

2209

Leave a Reply