মনসুর আলী গাজী

বাবুদের আমবাগান কল্যাণ চৌধুরী এলাকার জমিদার। না। তথাকথিত জমিদার বলতে যা বোঝায় তা নয়। কমলপুর গ্রামে কল্যাণবাবুর জায়গাজমির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। তাই লোকে ওনার বড়লোকয়ানা অবস্থা বোঝাবার জন্য কথার মাঝে ‘জমিদার’ শব্দটা ব্যবহার করে থাকে। তবে তার থেকে আরও জনপ্রিয় নাম ‘বাবু’। লোকে ভালোবেসে এই নামে ডাকে। তা এই বাবু অর্থাৎ কল্যাণবাবু কেন জনপ্রিয় তার পরিচয় কিছু ঘটনা থেকে মেলে। এক দম্পতি বিয়ের পর কোনো কারণে গাঁ-ছাড়া হয়ে এই কমলপুর গ্রামে চলে আসে। এসে থাকার জায়গা পায় না। বাবুর কাছে খবর গেল। বাবু ওদেরকে দু'-কাঠা জমি দিয়ে দিলেন। একেবারে এমনিতেই। কোনো মূল্য ছাড়াই। ওরা আজও সেখানে ঘর বেঁধে রয়েছে। বাচ্চাকাচ্চা হয়েছে। তা এহেন বাবুর এক বিশাল আমবাগান ছিল। বাবুর দরাজ হৃদয়। গাঁয়ের ছেলেরা দিন নেই রাত নেই বাবুর আমবাগানে পড়ে আছে। আম কুড়োয়। গুলি খেলে। ডাংগুলি খেলে। লুকোচুরি খেলে। শিশুরা ঘর-ঘর খেলে। মানে কঞ্চি, চ্যাড়া, গাছের পাতা এসব দিয়ে ঘর বানিয়ে খেলে। হা-ডু-ডু, ছোটাছুটি এসব নানান রকমের খেলা আর কী। কিছু দুষ্টু ছেলে থাকে। তারা বড় বড় আমগাছের নিচু ডাল থেকে কাঁচা আম ছিঁড়ে নেয়। বাড়ি থেকে নুন আর লঙ্কাগুঁড়ো নিয়ে যায়। তা দিয়ে মেখে খায়। সেদিন জয় একেবারে দশ-দশটা বেশ বড়সড় কাঁচা গোলাপ খাস আম পেড়ে নিল। ওর মা বিমলা জানতে পেরে ওর কানটা ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে বাবুর কাছে নিয়ে এল। বাবু শুনে বললেন, ‘কীরে জয়, আম খাবি, আমায় বলবি তো। কাঁচা আম খাবি না পাকা আম?’ জয় কাঁদতে থাকে।

বাবু ওনার খাস চাকর পানাইকে বললেন, ‘পানাই ওকে কুড়িটা পাকা আর আর কুড়িটা কাঁচা আম এনে দে তো। ভাঁড়ার ঘরে আছে। দেখ্ গিয়ে।’
‘সত্যিই বাবু একটা লোক বটে! কোথায় বকাবকি করবেন…তা না করে এতগুলো আম দিয়ে দিলেন।’, ভাবতে ভাবতে আমগুলো হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে জয়কে সাথে করে নিয়ে ফিরতে লাগল ওর মা।
বাবু এমনই মানুষ।
নীরেন বাবুর কাছে এল। বলল, ‘বাবু, জমিতে চাষ দেবো। দানা কিনব। দু’শো টাকা লাগবে। গাঁটে একটা কানাকড়ি নেই।’
বাবু তখন ওনার চাকরবাকরদের সাথে হাটে ফসল বেচে বাড়ি ফিরে বারান্দার তক্তপোশে বসে টেবিলফ্যানের হাওয়া খাচ্ছিলেন। আর কাঁধে একখানা গামছা। মাঝেমাঝে তা দিয়ে গা মুচ্ছিলেন। পাশে একতাড়া টাকা রাখা ছিল। তা থেকে দু’টো একশো টাকার নোট নিয়ে নীরেনের দিকে আগিয়ে দিলেন।
’বাবু পেন্নাম।”, এই বলে নীরেন মাথা নুইয়ে প্রণাম করে চলে এল।
কিছুদিন পর নীরেন বাবুর কাছে এল। এসে বলল, ‘এই নেন বাবু সেই দু’শো টাকা যেটা আপনি একদিন আমারে দে খুব সাহায্য করেছেলেন।‹
‘তুই যা। ওটা তোকে আর দিতে হবে না।’, বললেন বাবু।
’বাবু, আপনার জন্যি গাঁয়ের মানুষ অনেক ভালো আছে। সবাই আপনারে খুব ভালোবাসে। মান্যি করে। তা টাকাটা নেবেন না বাবু?’
‘না বললাম তো। তুই ও টাকা দিয়ে তোর ছেলের একটা জামা কিনে দিবিএখন, বুঝলি?’
নীরেন খুশি হয়ে চলে এল।
এসব কারণে গাঁয়ের লোকেরা কল্যাণবাবুকে বেশ শ্রদ্ধা করে।
এসব ছাড়াও বাবুর একটা লক্ষ্যণীয় কর্ম আছে। তা প্রতিবছর তিনি করে থাকেন। ওনার যে বিরাট আমবাগান আছে, তাতে বলতে গেলে অনেক আমগাছ আছে, তা প্রায় গুনলে সত্তর থেকে আশিটা তো হবেই। সেই আমবাগানে যখন আমপাড়া হয়, তখন গাঁয়ের এহেন লোক থাকে না যে বাবুর বাগানের কাঁচা পাকা সব ধরনের আম চাখে না।
গাঁয়ে গুনে গুনে প্রায় তিরিশ থেকে পঁয়ত্রিশ ঘর লোক থাকে। প্রতি বাড়িতে দশ কিলো করে কাঁচা আম আর দশ কিলো করে পাকা আম বাবুর পাঠানো চাই। গাঁয়ের লোকেরা তা পেয়ে মহাখুশি।
তারা বাবুর ডাকে যেকোনো সময় সাড়া দিতে প্রস্তুত। অর্থাৎ দরকারে-অদরকারে বাবু যদি গাঁয়ের কাউকে ডেকে পাঠান, তাহলে সে তার সব কাজ ফেলে ছুটে যায় বাবুর কাছে।
আমবাগানে যখন আম পাড়া হয় তখন বাবুর চাকরবাকরদেরকে সাহায্য করবার জন্য অনতিবিলম্বে হাজির হয়ে যায় মদন, সমীর, জ্যোতি, নীরেন, করিম এইসব গ্রামবাসীরা। মেয়ে-মহিলারা, বাচ্চারা সবাই আসে। গাছের তলা থেকে আম কুড়িয়ে ঝুড়িতে রাখে।
এভাবে আমের মরসুমে যেদিন করে আম পাড়া থাকে সেদিন করে যেন উৎসব বসে। আম্রপালি, গোলাপ খাস, বোম্বাই, হিমসাগর, ল্যাংড়া কী নেই বাবুর বাগানে! লোকেরা ওইদিন সকালে বাড়ি থেকে কিছু না খেয়ে একেবারে খালিপেটেই চলে আসে। সারাদিন আম খেয়েই ওরা পেট ভরিয়ে নেয়। অনেকে ঘর থেকে অনেকটা পরিমাণে নুন, জিরে-মরিচের আর লঙ্কার গুঁড়ো নিয়ে যায়। কাঁচা আম ছুরি দিয়ে ছাল ছাড়িয়ে কেটে মজা করে খায়। বাবু কিছু বলেন না। বরং কেউ না খেলে বাবু বকেন। বলেন, “এই তুই শুধু কুড়িয়েই যাচ্ছিস। দু-একটা খা।”
তারপর বেলার দিকে সে এক কান্ড করে থাকেন বাবু। চাকরদেরকে দিয়ে কাছের বাজার থেকে যারা বাগানে আম পাড়ছে, আম কুড়োচ্ছে, তাদের এক-একজনের জন্য তিনশো গ্রাম করে পেটাই পরোটা, সাথে দেড়-প্লেট করে আলুকষা, আর চারটে করে বড় রসগোল্লা আনতে পাঠান। পুরুষ মহিলা সবাই বেশ তৃপ্তি খায়। আমতলায় বসেই খেয়ে নেয়। তারপর জল খেয়ে চলে আধঘন্টা বিশ্রামের পর্ব।
বিশ্রাম নিতে নিতে মদন জ্যোতিকে বলে, “জ্যোতি, একটা কতা বলছিলুম, বুঝলি, যদ্দিন বাবুর বাগান আছে তদ্দিন আমরা এট্টু আম খেয়ে নিই, কী বল্?।”
জ্যোতি গামছা ঘোরাতে ঘোরাতে বলে, “আমাদের বাবু মানুষটা লোকে ভালো। অন্য লোক হলি এত এত এমনি কারুকে খাওয়াত? মোটেই না। তাই তো আমরা বাবু ডাকলি হাঁকলি অমনি সব ফেলে রেখে বাবুর কাছে গে পড়ি।”
“এত আমগাছ কোনো লোকের একসাথে থাকতি পারে? আচে কি কোথাও কারো? বাবু ভালো মানুষ, তাই ভগবান এত কিছু দিয়ে রেকেচেন ওনারে। দেখ্ এই বিঘের পর বিঘে শুধু কত ভালো ভালো আমের গাছ।”
“বুঝলি মদন, বাবুকে আজ একটা কতা বলিচি…”
“কী কতা রে জ্যোতি?.. ”
“আমি বলিচি বাবুর যখন ভোরবেলা আম বাজারে যায় তখন আমি বাবুর চাকরবাকরদের সাথে হাটে যাব।”
“গে?…”
“হাটে গে বাবুর আম বেচে দেবো। তারপর বাবু আমারে যা দেন দেবেন।”
“তা বাবু কী বললেন?”
“বললেন ‘যাবি’।”
“তাই?”
“তা আর বলচি কী? দেখবি কাল থেকেই আমি বাবুর সাথে হাটে যাব। বাবুর আম বেচতি।”
“তা আমার কতাটাও বল্ না বাবুকে।”
“ঠিক আচে। একটু পরে তো বাবু আসবে। বলিয়েই নাহয়…”
এমনই স্নেহমধুর সম্পর্ক বাবু আর গ্রামবাসীদের মধ্যে।
কিছু পরে বাবু এলেন। জ্যোতি বাবুকে বলল, “বাবু, এই মদনা আপনার চাকরদের সাথে হাটে যাবে বলচে।”
বাবু বললেন, “তা যাবে। কাল ভোর চারটেয় চলে আসিস তোরা, কেমন?”
“হ্যাঁ বাবু। ঠিক আচে।”, বলে মদন।
বাবু সবাইকে বললেন, “এই তোরা তাড়াতাড়ি নে রে। ঝড় উঠতে পারে। আমগুলো ঝুড়িতে তুলে নে।”
সবাই শশব্যস্তভাবে আম তুলতে লাগল। এরা বাবুকে যে ভয় করে তা নয়। বাবুকে ভালোবাসে। কাজ করিয়ে নেবার জন্য ভয় প্রদর্শন জরুরি না। শুধু ভালোবাসা আর ভালো ব্যবহারই যথেষ্ট।
পরদিন ভোরবেলা চার-চারটে ভ্যান -ভর্তি কাঁচা আর পাকা আম গেল গাঁয়ের হাটে। চাকর গেল তা প্রায় আটজন। সাথে গেল জ্যোতি আর মদন।
আম বেচার সব টাকাপয়সা এরা বাবুর হাতে তুলে দিল। এরা বাবুর অত্যন্ত বিশ্বস্ত। বাবু প্রত্যেককে পঞ্চাশ টাকা করে দিলেন সকালে টিফিন করার জন্য। আম বেচা যখন শেষ হলো তখন প্রায় সকাল সাতটা। সবাই অসীমের হোটেল, যেটা ফল বিক্রির বাজারের একেবারে পাশেই অবস্থিত, সেখানে গিয়ে পেটভরে কেউ রুটি-মুরগির মাংস, কেউ রুটি-আলুকষা, কেউ পরোটা-মুরগির মাংস, কেউ পরোটা-আলুকষা, সাথে ডিমসেদ্ধ এসব খেলো।
ফিরে এসে সবাই বাবুর থেকে চারশো টাকা করে পারিশ্রমিক পেল। সবাই টাকা নিয়ে খুশিমনে যে যার বাড়ি চলে গেল।
“কী রে মদন, বাজার করতি যাবি নে?”, বলে জ্যোতি।
“তুই যাবি?”, বলে মদন।
“হ্যাঁ যাব।”
“চল্ আমিও যাই তাহলে… ”
“গিয়ে কিছু চাল কিনতি হবে বুঝলি মদন?”
“আমি কিছু সব্জি নেব। চল্।”
দু’জন বাড়ি না গিয়ে বাজারের দিকে হাঁটা দিল।
বছরের একটি দিন, পয়লা জানুয়ারিতে বাবু এবং গ্রামবাসীদের উদ্যোগে বাবুর আমবাগানে হয় এক বিরাট বনভোজন। নানান খাবারদাবার, রান্নাবান্না হয়। পুরো গাঁয়ের লোকেরা এতে অংশ নেয়। খরচের অর্ধেক দেন বাবু। বাকি অর্ধেক গ্রামবাসীরা নিজেরা ভাগাভাগি করে দেয়।
সে বনভোজনে থাকে ভাত, মাছের ঝোল, মাছের কালিয়া, মাংস, ডাল, আলুভাজা, বাঁধাকপি চচ্চড়ি, শেষ পাতে চাটনি, পাঁপড়, মিষ্টি এসব আর একদম শেষে একগ্লাস করে ঠান্ডা পানীয়। কত মজা করে সবাই খায়। শেষে বিকেলের দিকে চলে লুডো খেলা। গাছতলায় বসেই।
এমন ভালো মানুষ বাবুর আমবাগানে একদিন একজন চোর আম চুরি করতে এসে ধরা পড়ল। যতীন ওর বাবার সাথে সেদিন রাত দশটায় বাবুর আমবাগানে গিয়েছিল আম কুড়োতে। ঝড় হয়েছে অল্পস্বল্প। আম হয়তো কিছু পড়েছে। সেই ভেবে বাবাকে সাথে নিয়ে একটা ব্যাগ হাতে করে নিয়ে আম কুড়োতে গিয়েছিল যতীন।
বোম্বাই আম গাছটার নিচে যেই গেছে দেখে গাছের ডালে একজন বসে। যতীনের বাবার বুঝতে দেরি হলো না। “এই চো-ও-ও-র চো-ও-ও-র…”, চিৎকার করে ওঠে যতীন।
সাথে সাথে আশপাশের কিছু লোকজন ছুটে এসে চোর ধরে ফেলে। চোর এ গাঁয়ের কেউ নয়। জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, দু’-তিনটে গ্রামের ওপারে কোনো এক গ্রাম থেকে সে এসেছে। সবাই বেদম মারতে লাগল চোরকে।
হঠাৎ খবর পেয়ে বাবু হাজির হন, “এই তোরা ছাড়্ ছাড়্। ওকে অত মারিসনে রে। বেচারা মরে যাবে। ছাড়্ ছাড়্।
ওকে এভাবে সবার হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বাবু একধারে ওকে নিয়ে এলেন।
”কীরে তোর চুরি করার দরকার হলো কেন?”, চোর ছেলেটাকে বলেন বাবু।
“বাবু আমি গরিব।”, বলে ছেলেটা।
“কাজ পেলে কাজ করবি?”
“কাজ? কে দেবে বাবু?”
“কেন, আমি দেবো। কাল থেকে তুই আমার চাকরবাকরদের সাথে থাকবি। আমার খেত-খামার-বাগানের কাজ করবি। কেমন?”
“ঠিক আচে বাবু।”
এভাবে চুরি করতে এসে চোর ছেলেটার চাকরি জুটে গেল বাবুর কাছে।
তিন মাস পর…
বাবু এখন খুব অসুস্থ। গাঁয়ের লোকেদের চোখে জল। খুব বিষণ্ণ তারা। অনেক সেবাশুশ্রূষার পর বাবু সুস্থ হলেন। ডাক্তার ওনাকে বিশ্রামে থাকতে বলেছেন। একেবারে চার মাস।
জ্যোতি বাবুর কাছে যায়। বাবুকে বলে, “বাবু, যদি অনুমতি দেন তো আমি আর মদন এই ক’দিন আপনার সবকিছু দেখভাল করতে পারি। তারপর আপনি সুস্থ হয়ে উঠলে আপনি সব দেখবেন।”
”ঠিক আছে।”, বিছানায় শুয়ে বাবু বলেন।
এখন থেকে বাবুর বাগান খেত সবকিছুর দায়-দায়িত্ব জ্যোতি আর মদনের।
আসলে এই গ্রামবাসীরা অত্যন্ত সহজ-সরল আর বিশ্বস্ত। এরা মিথ্যা বলে না। ঝগড়া করে না। মারামারি করে না। সবাই সবাইকে ভালোবাসে। গ্রামে সবসময় একটা শান্তির আবহ বিরাজ করে। তাই তো ওদের ওপর বাবুর এত ভরসা, এত বিশ্বাস।
বাবু সুস্থ হয়ে উঠলে আবার চলবে আমবাগানের উৎসব আর আনন্দসহকারে আম পাড়া, আম খাওয়া, বনভোজন করা। বাবু আবার সবার জন্য টিফিন আনতে হয়তো কখনো নীরেনকে পাঠাবেন, কখনো জ্যোতিকে বা কখনো মদনকে। আর আবার ফিরে আসবে সেই হাসিখুশি দিনগুলো। কেননা এ যে বাবুর আমবাগান, বাবুদের আমবাগান!… সমাপ্ত

45