কনক রঞ্জন সেন

বাস থেকে তো কেউ নামেনি। তখন একজন বলল ওরা শিলিগুড়িতে কালো চশমা (sun glass) কিনতে গিয়েছিল। বুঝলাম ওরা ওখানেই ছাড়া পড়েছে। আমাদের চিন্তা বেড়ে গেল। কি হবে ওদের? ওরা কি বাড়ি ফিরে যাবে নাকি এখানেই আসবে? তখন তো আর এখনকার মতো ফোনের ব্যবস্থা ছিল না। কিছু করার নেই আমরা মনের দুঃখে সকলে ধীরে ধীরে YOUTH HOSTEL-এ এসে উঠলাম।

ভজন সেন, গোপাল দেব, অর্ণব সিনহা, তরুন সরকার এরা সব রাস্তায় দাঁড়িয়ে শিলিগুড়ি থেকে আসা গাড়ি গুলিতে খোঁজ করতে লাগলো। প্রায় রাত 9টা পর্যন্ত খোঁজাখুঁজি করে সবাই ফিরে এল। সকলের মনেই দুশ্চিন্তা ছেলেগুলোর কী হলো! আমাদের এতদিনের প্রস্তুতি কি বিফলে যাবে! এই সমস্ত ভেবে ভেবে প্রায় না ঘুমিয়ে কোনমতে খেয়ে সারারাত কেটে গেল।

পরদিন বেলা ৮টা নাগাদ নুটুদাও পৌছে গেলেন। সব শুনে বললেন সান্দাকফু যাওয়া হবে না, বাড়ি ফিরে যেতে হবে। সকলের মনটা খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু কোনো উপায় নেই। লিডারের হুকুম। ভাবলাম চলেই যেতে হবে যখন তখন আশপাশটা একটু ঘুরে দেখি।

আমরা কয়েকজন হাঁটতে হাঁটতে ম্যালের পাশে বাস স্ট্যান্ডে এসে গেলাম। ঘুরতে ঘুরতে দেখি একটি ছোট গাড়িতে লেখা আছে মানেভঞ্জন। গাড়ি দেখে আমরা আলোচনা করতে লাগলাম এই গাড়িতে আমরা আজ যেতে পারতাম, কিন্তু হলো না। ঠিক সেই সময় গাড়ির ড্রাইভার আমাদের দিকে এগিয়ে এসে বলল “মানেভঞ্জন যাবেন? কত জন আছেন? 14 জন?” আমি বললাম হ্যাঁ। আমার কথা শুনে সিগারেটের খাপে পেন্সিলে লেখা একটি চিরকুট আমার হাতে দিল। চিরকুটে খুলে দেখি তাতে লেখা আমাদের অনেকের নাম! আর তারপর লিখা আছে- “আমরা মানেভঞ্জনে, ইতি তমাল ও খগেন।”

ব্যাস আমাদের আনন্দ আর কে দেখে! দৌঁড়ে চলে গেলাম YOUTH HOSTEL-এ। বাকি সকলকে বলতেই ওরাও আনন্দে নেচে উঠলো। সকলে তাড়াতাড়ি স্যাক (স্যাক বলতে তখন এখনকার মতো রুক স্যাক কারও কাছে ছিল না। সকলেরই ছিল হ্যাভার স্যাক)নিয়ে চড়ে বসলাম গাড়িতে। ছোট গাড়িতে 13 জন কোনও মতে পৌঁছে গেলাম মানেভঞ্জন। সেখানে পৌঁছেই দেখি দাঁড়িয়ে আছে তমাল ও খগেন!!
ওরা তো আমাদের দেখেই আনন্দে চিৎকার করে উঠলো। ওদের মুখে শুনলাম ওরা গাড়িতে সুখিয়া পোখরি এসে সেখান থেকে দৌঁড়ে অনেক রাতে এখানে এসে পৌঁছেছে। সারারাত অনেক কষ্টে স্থানীয়দের সহযোগীতায় রাত কাটিয়েছে।

যাইহোক, আমরা সেদিন মানেভঞ্জনেই ছিলাম। মানেভঞ্জনে তখন কয়েকটি মাত্র ঘর। সেখানকার নির্জন পরিবেশ আমাকে মুগ্ধ করেছিল। সারা বিকেল এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। তবে বর্তমানে মানেভঞ্জন অনেক পাল্টে গেছে। প্রচুর বাড়ি ঘর দোকান পাট, প্রায় ছোটখাট শহর।পরদিন রওনা দিলাম গৈরিবাসের উদ্দেশে। তার আগে সঙ্গে করে আনা পাঁচদিনের রসদ সকলের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হলো। খরচের কথা মাথায় রেখে পোর্টার নেওয়া হয়নি, মালপত্র বহন করতে হবে নিজেদেরই।

মানেভঞ্জন থেকে সকাল 7টায় রওনা দিলাম। কিছুদূর যাওয়ার পরই খাঁড়া চড়াই। প্রথম প্রথম খুবই অসুবিধা হচ্ছিল। ধীরে ধীরে মানিয়ে নিয়ে চলতে শুরু করলাম। কেউ আগে, কেউ পিছে। পাশ দিয়ে গাড়ির রাস্তা। রাস্তা বললে ঠিক বলা হবে না, পাহাড় কেটে কিছুটা জায়গা চওড়া করা হয়েছে। তার উপর বড় বড় বোল্ডার ফেলা। রাস্তা ধরে যেতে যেতে মাঝে মাঝে পাকদণ্ডী ধরে পথ শর্টকাট করার চেষ্টা করছি। পাশ দিয়ে একটি মালবোঝাই জীপ গাড়ি নাচতে নাচতে যাচ্ছে বোল্ডারের উপর দিয়ে। গাড়িতে বসে থাকা কয়েকজন স্থানীয় লোক হাত নাড়তে নাড়তে চলে গেল। কিছুক্ষনের মধ্যেই আমি ঘেমে নেয়ে একাকার। কিন্তু একটা দারুন অনুভূতি হচ্ছিল মনের মধ্যে। ঘন্টা দুয়েক হাঁটার পর পৌঁছে গেলাম মেঘমা বলে একটি জায়গায়, এখানে একটি মাত্র চায়ের দোকান।

কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে আবার চলতে লাগলাম। আবার চড়াই। কিছুটা যাওয়ার পর দেখলাম রাস্তা দু-ভাগ হয়েছে। বাঁদিকের রাস্তাটি নেপালের জ বাড়ী দিয়ে, আর ডানদিকের রাস্তাটি ভারতের মধ্য দিয়ে গৈরিবাস গেছে। এই ভাবে হাঁটতে হাঁটতে চারিদিকে পাহাড়-গাছপালা দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম গৈরিবাস। আমার আগেই সেখানে পৌঁছে গেছে কয়েকজন। একটি ছোট্ট বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে সকলে। উপরে টিনের চাল। শুনলাম এটা পঞ্চায়েত প্রধানের বাড়ী। আজ এখানেই থাকতে হবে। ( আমরা জানতাম এখানে কোনও ট্রেকার্স হাট নেই। যেটা ছিল সেটা GNLF এর আন্দোলনের সময় পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও এখন আবার একটি সুন্দর ট্রেকার্স হাট গড়ে উঠেছে।) এই ঘরে প্রধান সাহেব পরিবার নিয়ে থাকেন। আমাদের 15 জনের আশ্রয় হলো ঐ ঘরেরই মেঝেতে। বাঁশের মাচা দিয়ে তৈরি খাট, তার উপর সপরিবারে প্রধান। একমাত্র পাহাড়বাসীরাই বোধহয় দিতে পারে এরকম আতিথেয়তা।
সেদিন ছিল লক্ষ্মী পূজা। নুটুদা কয়েকজনের সহযোগীতায় রান্না করতে লাগল খিচুরি। তুষারের মায়ের দেওয়া নারকেল নাড়ু দিয়ে আমরা লক্ষ্মী পূজা উদযাপন করলাম। রাতে খিচুরি, পাঁপড় ভাজা ও আচার দিয়ে পরম তৃপ্তিতে খেয়ে বিছানা পেতে শুয়ে পড়লাম।

মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল, মনে হলো কে যেন ঠেলছে। কম্বলের ভেতর থেকে মুখ বের করে টর্চ জ্বেলে দেখি খাটের নীচে কতগুলো শুয়োর শুয়ে আছে। তারই একটা বোধ হয় ঠান্ডার জন্য আমার কম্বলের কাছে চলে এসেছে। আমি কোনমতে চোখ বুঁজে আবার কম্বল মুড়ি দিলাম। ভোরবেলা উঠে মুখ ধুয়ে ছাতু খেয়ে রওনা দিলাম। বেড়িয়ে দেখলাম পাহাড়ের গাঁ বেয়ে একেবারে খাঁড়া একটি রাস্তা অনেক উপরে উঠে গেছে। শুনলাম ঐ পাহাড়ের উপরেই সান্দাকফু। মনটা আবার চাঙ্গা হয়ে গেল। যত কঠিনই হোক ওখানে যেতেই হবে। চড়াই ভাঙতে ভাঙতে কতবার যে থেমেছি তার ইয়ত্তা নেই। রাস্তার পাশে মাঝেমধ্যে ইয়াকের দেখা পাচ্ছি। ওদের গলায় বাঁধা ঘন্টা বাজছে টুং টাং করে। ঝানু, তরুন এপথে বেশ কয়েকবার এসেছে। ওদের থেকে জানতে পারলাম এগুলো পোষা ইয়াক।মালিকেরা ওদের গলায় ঘন্টা বেঁধে দিয়েছে যাতে জঙ্গলের মধ্যে ওদের খুঁজে পেতে সুবিধা হয়। কিছুটা যাওয়ার পর দেখলাম একটি ছোটো জলাশয়, শুনলাম এটার নাম কালি পোখরি। জায়গাটা খুব সুন্দর। বেশ কিছুক্ষন প্রকৃতিকে অনুভব করে আবার চলতে শুরু করলাম।

দুপুরের দিকে পৌঁছলাম বিকেভঞ্জন বলে একটি জায়গায়। সেখানে শুধুমাত্র একটি ভাঙ্গা ঘর, তারই মধ্যে চা, পকোড়া, ইয়াকের মাংস বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ইয়াকের দুধ দিয়ে তৈরি নারকেলের মতন শক্ত টুকরো টুকরো জিনিস পাওয়া যাচ্ছে। এটাকে সুপরি বলে, এটা খেলে নাকি শরীরে শক্তি পাওয়া যায়। আমিও কয়েকটি কিনে চুষতে চুষতে রওনা দিলাম সান্দাকফুর দিকে। ( এই বিকেভঞ্জনে এখন Home stay হয়েছে।)
সান্দাকফু আর মাত্র দুই কিমি, ভাবলাম যাক প্রায় পৌঁছে গেছি। তখন কি আর জানতাম ওই 2 কিমি যেতে 3 ঘন্টা সময় লাগবে! একে তো খাঁড়া রাস্তা তার উপর পরিশ্রান্ত শরীর। কোনও মতে শরীরটাকে টেনে হিঁচরে নিয়ে পৌঁছলাম সান্দাকফু। দেখলাম শুধু আমি নই প্রায় সকলেই ক্লান্ত।

সান্দাকফুতে গিয়ে উঠলাম একটি টিনের চালের ঘরে। টিন দিয়েই ঘেরা ঘরটি, দরজা প্রায় ভাঙ্গা। এটি একটি পুলিশ ক্যাম্প। তবে কোনও পুলিশই দেখলাম না। ওখানে আগে থেকেই আছে কলকাতার তিনজন ছেলে। আমি কয়েকজনকে নিয়ে রুটি তরকারি তৈরি করলাম পরের দিন ফালুটের রাস্তায় খাওয়ার জন্যে। রাতে টিনজাত মাংস দিয়ে নুটুদার রান্না করা বিরিয়ানি খেয়ে সবাই ঘুমিয়ে পরলাম।

পরের দিন সকালে রওনা দিলাম ফালুটের উদ্দেশে। সকাল থেকেই আকাশ ছিল ঘন কালো মেঘে ঢাকা। ঘন্টাখানেক চলার পরই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। পাহাড়ের ধারে দাঁড়িয়ে কোনও মতে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করলাম। নুটুদা এবং কয়েকজন মিলে সিদ্ধান্ত নিল এই বৃষ্টিতে ফালুট যাওয়া ঠিক হবে না। ফিরে এলাম আমরা। সারাদিন মন খারাপ করা আবহাওয়া। সকলে মিলে গান, গল্প, খেলাধুলা করে সময় কাটালাম।

রাতে খাওয়া দাওয়া করে শুয়ে পরেছি, মাঝরাতে হঠাৎ ঝানুর চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গে গেল। তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখি ঝানু আকাশের দিকে আঙুল তুলে বলছে ” ঐ দেখ।” তাকিয়ে দেখি মেঘের পর্দা ফাঁক করে তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে চাঁদ। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারিদিক। উল্টোদিকে তাকিয়ে দেখি চাঁদের আলো গিয়ে পরেছে কাঞ্চনজঙ্ঘার উপর। আবছা আলোয় ভেসে উঠেছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। এক মোহময় পরিবেশ। স্তব্ধ হয়ে দেখতে লাগলাম সেই অপরূপ দৃশ্য! এতদিনের কল্পনা এই কয়েকদিনের পরিশ্রম সব যেন স্বার্থক। মন ভরে গেল, আর কিচ্ছু চাই না। এই প্রচন্ড শীতে কতক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম জানিনা। কে যেন বলল রাত এখনও অনেক বাকি চলো ঘুমাই। কোনওমতে চোখ ফিরিয়ে ঝানুকে ধন্যবাদ জানাতে জানাতে ঘরে চলে এলাম। ভুলবো না এমন দৃশ্য, ভোলা যাবে না কোনও দিন।

এবার ফেরার পালা। সকালে রওনা দিয়ে বিকেভঞ্জন পর্যন্ত এসে বাঁদিকে খাঁড়া নেমে যাওয়া। সারাদিন বনের মধ্য দিয়ে চলা। দিনের বেলাতেও ঝিঁঝিঁপোকার ডাক, ঝরনার কুলুকুলু শব্দ, পাখির কলতান শুনতে শুনতে সন্ধ্যার সময় পরিশ্রান্ত দেহে পৌঁছে গেলাম রিম্বিক। আশ্রয় নিলাম প্রধান লজে। লজ বলতে ছোটো ছোটো ঘুপচি ঘর, তার মধ্যে তোষক পাতা। ট্রেকিং শেষ, তাই পরিশ্রান্ত শরীরেও সকলে মনের আনন্দে এদিক ওদিক ঘুরতে বেড়িয়ে পড়ল। লজ ছোটো হলেও লজের মালিক প্রধান সাহেবের আতিথেয়তার কোনো তুলনা নেই। আন্তরিকতার কথা তো বলে শেষ করা যাবে না। আমাদের অসুস্থ সদস্যদের নিজে হাতে গরম জলের সেঁক দিয়ে যেভাবে শুশ্রূষা করলেন তা ভুলবার নয়। পাহাড়ি মানুষদের পক্ষেই সম্ভব এমন মনোভাব দেখানো।

পরের দিন সকালে গাড়ি ধরতে স্ট্যান্ডে এলাম। রিম্বিক তখন নির্জন সুন্দরী। একটি মাত্র দোকান, কী পাওয়া যায় না সেখানে! মুদির জিনিস, জামা কাপড়, পোষ্টকার্ড, ডাকটিকিট এমনকি ঔষধ পর্যন্ত। বর্তমানে রিম্বিক তো ছোটখাট শহর। কিছুক্ষন পর বাস ছাড়লো। আমরা শিলিগুড়ি হয়ে বাড়ি পৌঁছলাম অনেক রাতে। একটি আশাপুরনের আনন্দ সারাজীবন মনে গেঁথে রইলো। তারপর অনেকবার সান্দাকফু গিয়েছি, বর্তমানে সান্দাকফুর অনেক পরিবর্তন হয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হয়তো একই থেকে গেছে, কিন্তু থাকা খাওয়া ও রাস্তার ক্ষেত্রে পরিবর্তন হয়েছে আমূল। এখন গাড়িতে কয়েক ঘন্টায় সেখানে পৌঁছান যায়। বিভিন্ন জায়গায় হোটেল, হোম-স্টে হয়েছে। রাস্তায় খাওয়ারও যথেষ্ট পাওয়া যায়। পরিশ্রম হয়তো কমেছে, সুবিধা অনেক বেড়েছে, কিন্তু প্রথম দেখা সান্দাকফু মনের ভেতর এমনভাবে গেঁথে আছে যা কখনও ভোলা যাবে না।

111