বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জীবন (পর্ব ৭)

পুরুষোত্তম সিংহ

জুলাই, ৫,২০২০: নিজের গল্প সম্পর্কে সিরাজ নিজেই জানিয়েছেন –“নিটোল গার্হস্থ্যের গল্প আমার আসে না। যৌবনে তো ছিলাম ছন্নছাড়া উড়ানচন্ডী ভবঘুরে। ক্রমে জেনেছিলাম, মানুষ যতই বড়াই করুক প্রকৃতপক্ষে সে প্রকৃতির করতলগত। প্রকৃতির হাতে লাটাইয়ের মাঞ্জা –সুতোর ডগায় মানুষ যেন এক বর্ণময় ঘুড়ি। তাই আমার গল্পে আনিবার্যভাবে এসে গেছে সেইসব মানুষজন, যারা নিজেদের বন্দিদশায় আক্রান্ত এবং সতত আর্তনাদ করে।“ (বিননির্মাণ ১২, তদেব, পৃ. ৩২ ) আসলে সিরাজ নিজেও ছিলেন এক চিরপালাতক যুবক, প্রকৃতির গহীন অরণ্যেই তিনি নিজের স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। যেখানে নিজের স্বাধীনতা খুন হয়েছে সেখান থেকেই পালিয়ে গেছেন, সে বাড়ি হোক আর চাকুরি ক্ষেত্র হোক ! ফলে তাঁর গল্প উপন্যাসে মানুষের বন্দি দশার মর্মরহস্য আমরা দেখতে পাই। তবে কিন্তু এ বিষয়ে তিনি জগদীশ গুপ্ত বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্তরাসূরী নন, সে পথ সিরাজের নিজস্ব, সেখানে তিনি একক ও দক্ষ শিল্পী। 

                                                  স্বামীর ভাগ কোন নারীই কাউকে দিতে চায় না। নারীত্বের চিরন্তন সত্য প্রতিষ্ঠিত স্বামীকে কেন্দ্র করে একার সংসারের মধ্য দিয়ে, সেখানে সতীনকে ভাগ দিতে চায় না। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘বাদশা’ গল্পেও নারীর সেই চিরন্তন আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গল্পের মধ্য পথে মনে হয়েছিল লেখক বুঝি আনমনীকে মহৎ, উদার নারী হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেবন, কিন্তু তিনি সেই পথে না গিয়ে নারীর চিরন্তন আদর্শেরই জয় ঘোষণা করেছেন। হাজী সাহেবের বাড়িতে রাখালের কাজ করত বাদশা। কিন্তু হাজী সাহেবের ইচ্ছা ছিল তাঁর জমি, বাড়ি ঘরের যেন কিছু ক্ষতি না হয়। এজন্য তিনি বাদশার সঙ্গে নিজের কন্যার বিবাহ দিয়ে বাদশাকে ঘর জামাই করে রেখেছিলেন। সংসার সুখেই চলেছিল কিন্তু বাদশার আর ভালো লাগে না আনমনীকে, কেননা আনমনীর যৌবন বিদায় নিয়েছে। আর মুসলিম হাদিসে যেহেতু চার বিবাহের নিয়ম আছে ফলে বাদশা আবার বিবাহ করতে চায়। কারণ হিসেবে জানায় আনমনীর নাকে গন্ধ, তাই সে তাঁর পাশে ঘুমাতে পারে নে ফলে নতুন বিবাহ করবে। আসলে এ ছিল মিথ্যা অভিযোগ। তা বুঝতে পারে আনমনী, ফলে সে নানাভাবে প্রমাণের চেষ্টা করে নাকে গন্ধ নেই। কিন্তু মুসলিম নিয়ম অনুসারে তো আর আনমনী স্বামীর বিবাহ ঠেকাতে পারে না, ফলে সে জানায় এ বাড়িতে সতীন আনা চলবে না। আর এ বাড়ি যেহেতু আনমনীর বাবার ফলে অর্থের হাতছাড়া হবে বলে বাদশা তালাকও দিতে পারে না। ফলে বাদশা শহরে গিয়ে আবার বিবাহ করে আয়নাকে। কিছুদিনের মধ্যেই সব টাকা শেষ হয়ে যায়, বাড়িতে যেহেতু আয়নাকে আনা যাবে না তাই সে আয়নাকে তালাক দিয়ে আবার গ্রামে ফেরে। প্রথমে আনমনী অভিমান করলেও পরে স্বামীকে মেনে নিয়েছে। আয়না চালের ব্যবসা করত, আজও সে গ্রামে এসে বাদশার বাড়ি থেকে চাল কিনেছে, আনমনী ও আয়না দুজনেই সব জানে তবুও কিছু বলেনি।

                        আসলে এই বিবিধ বিবাহের ফলে সবচেয়ে ক্ষতবিক্ষত হতে হয়েছে নারীদের। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ এ গল্পে সেই তালাকের প্রসঙ্গ এনে নারীর ক্ষতবিক্ষত অবস্থানটি চিহ্নিত করেছেন। বাদশা তালাক দিতে পারে নি আনমনীকে শুধুমাত্র অর্থের প্রত্যাশায়। কিন্তু গ্রামীণ জীবনে এই তালাক সহজেই ঘটে। আনমনী তাঁর স্বামীকে ফিরে পেয়েছে, আয়না দরিদ্র বলেই পরাজয় বরণ করে নিতে হয়েছে। এ গল্পে দুই নারী এক পুরুষ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষ নিজের খেয়াল খুশি মত নারীকে ব্যবহার করেছে। তবে ব্যঙ্গ যে নেই তা নয় ! বাদশা আজ আনমনীর কাছে ফিরেছে শুধুমাত্র অর্থের জন্যই। সেই সঙ্গে মনে পড়ে গ্রামীণ প্রবাদ ‘সুখে থাকতে ভূতে কিলায়’ এর কথা। বাদশার সেই ভূত চেপেছিল কিন্তু যখন দেখল অর্থই জীবনের শেষ সত্য তখন সে আয়নাকে তালাক দিতে বাধ্য হল। তবে আনমনী প্রতিবাদ করেছিল ঘরে সতীন আনতে দেবে না, আয়নারা কোন প্রতিবাদ করেনি। গরিব বলেই প্রতিবাদের কোন জায়গা ছিল না। সে অর্থহীনতায় হয়ত গর্ভবতী হয়েছিল কিন্তু যেখানেই ক্ষুধাই বড় সত্য সেখানে নারীর সতীত্বের মূল্য কতটুকু ! আর বাদশারা নিজের সুখকেই ভালোবেসেছে, নারী হৃদয় বোঝে নি। লেখক বাদশার চমৎকার বর্ননা দিয়েছেন –

“বাদশা বরাবর শান্ত, নিরীহ আর অমায়িক। তার চেহারায়  উদাসীন সৌন্দর্য আছে। দৃষ্টি ভাসা –ভাসা অনেক দূরে ঘোরে। মাঠের দিকে তাকালে পুরো একটা দিগন্ত ও আধখানা আকাশকে ধরে রাখার ক্ষমতা তার ঈষৎ পিঙ্গল চোখ দুটির আছে। তার এই চাউনি দেখলে মনে হবে, সে আজীবন ধানক্ষেতের মধ্যে দিয়ে হেঁটে কোন এক মক্কায় পৌঁছাতে চায়। একদা সন্ধ্যায় রাখাল ছেল বাদশাকে বাঁ-কাধে চাঁদ নিয়ে মাঠ থেকে আসতে দেখেই পছন্দ হয়েছিল ধার্মিক মানুষ তোরাপ হাজীর।“ ( গল্প সমগ্র, পঞ্চম খণ্ড, তদেব, পৃ. ২৪৪ ) 

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ এক মহান ভারতীয়ত্ববোধের কথাকার। মুসলিম সমাজের প্রসঙ্গ তাঁর গল্পে এলেও তিনি ভারতবর্ষের অতি সাধারণ মানুষের কথা লিখতে চেয়েছেন, আর প্রেক্ষাপট হিসাবে বেছে নিয়েছেন মুর্শিদাবাদের প্রান্ত অঞ্চলগুলিকে। সেই মিলনগাথার কাহিনি শুনিয়েই আমরা সিরাজের প্রসঙ্গ শেষ করব। গল্পের নাম –‘বুঢ়াপীরের দরগাতলায়’। দরিদ্র মানুষের কোন ধর্ম নেই, ক্ষুধার্ত মানুষের কোন ধর্ম নেই, আর তা থাকা সম্ভবও নয়, সেই সত্যে লেখক গল্পের চরিত্রকে পৌঁছে দিয়েছেন। পীরকে আমরা হিন্দু মুসলমানের মিলন কেন্দ্র হিসাবেই আমরা দেখেছি। সিরাজ এ গল্পে সেই পীর তলাকে পটভূমি করে এক মহান মিলন সংগীত আমাদের শোনালেন। আজ বিচ্ছিন্ন ভারতবর্ষের সমাজ ব্যবস্থায় এ গল্প বড় প্রাসঙ্গিক। দরগাতলায় মানুষের দানের আশায় বসে থাকে বেন্দাবন। সে অন্ধ বলে ছেলে নির্মলকে সঙ্গে নিয়ে যায়। সে পরিশ্রমী ছিল কিন্তু আজ অন্ধ, সংসারে অভাব বলে এখানে সামান্য সাহায্য পাওয়া ছাড়া আর তাঁর উপায় নেই। কিন্তু আজ দরগাতলায় মানুষও বেশি আসে না। একদিন এক হাজিসাহেব এই দরগাতলায় প্রণাম করতে আসে। সে হিন্দুর ছেলে নির্মলের আনা জলে পা ধুয়ে নামাজ পড়ে –“হাজিসায়েব একটু হকচকিয়ে যান। হিঁদুর ছেলের হাতের পানিতে ওজু করেছেন ! কোদাতলার গোঁসা হবে না তো ?” ( গল্প সমগ্র, প্রথম খণ্ড, প্রথম প্রকাশ ১৩৯৩, পৃ. ১৪০ ) বাচ্চা ছেলেটি মুগ্ধ করে হাজিসাহেবকে। আর হাজিসাহেবের আচারণে মুগ্ধ হয় বেন্দাবন। বহুদিন পরে সেও সমান্য খেতে পেয়েছে হাজিসাহেবের করুণায় –“হাজিসায়েব গলা চড়িয়ে অন্ধের উদ্দেশে বলেন, বেন্দাবন ! খোদা-ভগমানের দুনিয়ায় খাদ্যের জাত নাই। আছে কি ? তুমার ছেলেটাকে কিঞ্চিৎ হালুয়া পরটা দিই।“ (তদেব, পৃ. ১৪৪ )

                        হাজিসাহেবের আচারণে বেন্দাবন মুগ্ধ। হাজিসাহেব নিঃসন্তান বলে বেন্দাবনের ছেলেকে নিয়ে যেতে চায়। বেন্দাবন দত্তকের কথা বলে হাজিসাহেব জানায় মুসলিম ধর্মে দত্তকের রীতি নেই তবে সব দানপত্র করে দেব। বেন্দাবন এ কথায় রাজি হয়, নগদ পঞ্চাশ টাকাও পায়, শুধুতাই নয় মাঝে মাঝে সন্তানকে দেখে আসার কথাও বলে। কিন্তু এই হাজিসাহেব ছিল আসলে ছেলেধরা। ফলে স্ত্রীর কাছে যেমন গঞ্জনা শুনতে হয়েছে তেমনি বড় পুত্রও ভৎসনা এনেছে। তবে হাজিসাহেবের টাকায় বেন্দাবন আজ বিড়ি বাঁধে, সেখান থেকে সংসার আজ কিছুটা সুখের মুখ দেখেছে। বেন্দাবনের স্ত্রীর নাম সুখেশ্বরী, সে কোনদিন সুখের মুখই দেখেনি। অথচ আজ কিছুটা সুখে এসেছে কিন্তু সন্তানকে হারাতে হয়েছে। আজ বেন্দাবন দরগাতলায় বসে শুধু পীরের কাছে কামনা করে সন্তান যেন সুখে থাকে, কোনদিন যেন ফিরে আসে। গল্প শেষে পিতৃহৃদয়ের আর্তনাদ বড় হয়ে উঠেছে। সিরাজের গল্পে প্রকৃতি ভীষণ বড় হয়ে ওঠে। তাঁর চরিত্রগুলি যেন প্রকৃতিরই সন্তান। সিরাজ মুসলিম জীবন নিয়ে লিখলেও এক উদার মানবপ্রেমিক জীবনবোধ তাঁর ছিল। তাঁর গল্পে হিন্দু মুসলিম পৃথক কোন জাতি বা সত্তা নয়, আসলে তিনি নিজের ভূগোলকে সামনে রেখে ভারতবর্ষের গল্প লিখতে চেয়েছেন, ফলে সেখানে কখনও হিন্দু বা মুসলিম এসেছে, আর এই শ্রেণি পরিচয় উঠিয়ে দিয়ে বলা যায় মানুষ এসেছে।

                ভারতীয় ঐতিহ্যকে সামনে রেখেই সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ গল্প লিখতে চেয়েছেন, লিখেছেন। এক মহান ঐতিহ্যবোধ, অসম্প্রদায়িক চেতনা ও উদার মন নিয়ে তিনি গল্পের কাহিনিকে সাজিয়ে তুলেছেন। মুসলিম জীবনকে প্রেক্ষাপটে রেখে তিনি গল্প লিখলেও তা কখনোই মুসলিম জীবনের কাহিনি হয়ে দাঁড়ায় না, এক ভারতবর্ষের গল্প হয়ে তা আত্মপ্রকাশ করে। গল্পের আখ্যানকে রূপদান করার জন্য তিনি বেঁছে নিয়েছেন স্বভূমির মানুষদের। মুসলিম সমাজের প্রতি তাঁর ধারণা যেমন প্রবল ছিল তেমনি বিশ্বাস ছিল। সে বিশ্বাস যখনই ভেঙে গেছে তখনই তিনি আঘাত করেছেন। তিনি হিন্দু মানুষ বা মুসলিম মানুষের কাহিনি লিখতে চাননি, তিনি চেয়েছিলেন মানুষের কাহিনি লিখতে, সে মানুষ দুই জাতিরই হতে পারে। সে মানুষ রাঢ়বঙ্গের নিম্নবিত্তের মানুষ। গল্পের জন্য আঞ্চলিক রঙ ব্যবহার করতে হয়েছে কিন্তু তা কখনোই আঞ্চলিক হয়ে ওঠে না, বা একটি শ্রেণির কাহিনি হয়ে ওঠে না, তা হয়ে ওঠে মানুষের কাহিনি।

22