লাল বাক্সের ঘুম ভাঙেনি

(বাকী দু আনার গল্প…)

              

রীনা সাহা

ওয়েবডেস্ক,জুন ২৮,২০২০: অনেকটা হেঁটে এসে থামলেন মাস্টারমশাই।কম মাইনের আমলের টিউশন টেবিলটার একপাশের লো-বেঞ্চে চার ছেলেমেয়ে,উল্টোদিকে রাশভারী চেয়ারে বসে মাস্টারমশাই, পাশে দাঁড়িয়ে স্ত্রী।অর্জন-উপার্জন, মিলেমিশে ভাগ হবে আজ।সম্পত্তির ভাগ হয়,নাকি হস্তান্তর?ভাগ যদিও বা হয়,ভোগ হয় কতটা?—হিসেব কষতে গুলিয়ে ফেলছেন মাস্টারমশাই।তবুও হিসেবী জীবন!শেষ জীবনের আইনে লেখা,হতেই হবে ভাগ—জমি-জিরেত,বাস্তুভিটে,গাছগাছালি,আসবাব।

সাদা কাগজে ভাগ লিখছেন মাস্টারমশাই,পাকা হবে কাল।পাঁচভাগ হবে, কিছুতেই মিলছে না ভাগ। অংকের মাস্টারমশাই জল হচ্ছেন,মুছে নিচ্ছেন,হাত রাখছেন বুক পকেটের সর্বিট্রেটে।সাদা কাগজে গরমিল বুঝে ভাগ মেলাতে এগিয়ে এলেন সহধর্মিনী। নিজের ভাগে খানকয়েক বাসনকোসন,দুখানা পিঁড়ি, একখানা শোবার ঘর আর একফালি বারান্দা রেখে বাকীটা স্নেহ বিলিয়ে দিলেন। মিলে গেল ভাগ।বড়বেলার ছোট চোখগুলো এক নিমেষেই অসুখ সেরে ঠান্ডা জল,যেন মায়ের হাতের জলপটি!চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন মাস্টারমশাই।পোষা কুকুরটা ঠায় বসেছিল পায়ের কাছে।ওটা তার ভাগ।চার জোড়া চোখ বাঁচিয়ে নিজের ভাগে রেখে দিলেন।

সব রাস্তাই চেনা বলে আজকাল রাস্তা হাঁটেন না মাস্টারমশাই—শ্মশানে হাঁটেন।গাছ-বেড়া ঘেরা শ্মশানের ভেতর দিকের মাটি বাঁধানো গোল মতো রাস্তাটায় গোল গোল পাক খেয়ে গা ঘামিয়ে ফিরে আসেন।ভোরের দিকে বাবুই-চড়ুই,কোকিল,ফিঙে,মাছরাঙাদের ভীড়। বিকেলের দিকে চিল-শকুন আর একটু অন্ধকার হয়ে এলে বাদুর,চামচিকেদের ওড়াউড়ি।নানা জাতের খোবলানো মাথার খুলি,হাড়গোড়,আধপোড়া কাঠের সাজে শ্মশান।আঁকে-ফাঁকে গজিয়ে ওঠা নাম না জানা বুনোফুল, হাড়জোড়া লতানে,লজ্জাবতী শুয়ে—চন্দন,অগরু,হাড়-মাংস পোড়া গন্ধ—বাড়ির বাতাসে গা সওয়া নাকের আলাদা লাগে। বুক টেনে শ্বাস নিয়ে ফিরে আসেন মাস্টারমশাই।

ফিরে এসে খানিকক্ষণ গীতা পাঠ—“বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়….”। তারপর লিখতে বসেন। তোষকের তলায় রাখা অনেকগুলো পোস্টকার্ড থেকে একটা টেনে নিয়ে লেখেন। রোজকার রুটিন বাঁধা—গীতা পাঠ আর কিছু না কিছু লেখা।ভালই আছেন মাস্টারমশাই।

“সব্যসাচী….

            চিতার পথে পাক খাচ্ছি বন্ধু,শূন্য থেকে পাটিগণিত।সরণ শূন্য—শূন্য খাদ,শূন্য একাই রাজা,রাজপাট কুরুক্ষেত্র।এ আমার গণিত-কাব্য,শূন্যের পৌনঃপুনিক,অসীম বা মহা এক কাব্য।তোমার সাহিত্যে  মিলবে না আমার কাব্য,বুঝবে না শূন্যের কারসাজি,ভগ্ন অংশ,দশমিক।সে কাব্যে কূট-ধার সখা আছে,পথ চিনে নিয়ে যাবে—হাত ধরে হেঁটে যাবে তুমি।আর আমি?অংকের ফ্যালাসির গরমিল মিলিয়ে ঋতমুখ হ’তে আর পারলাম কই,যে কুকুর সঙ্গে যাবে!

             ভালো থেকো,ভালো রেখো।বোটা খ’সে টুক করে পড়ে যাই যদি,অবসরে খোঁজ নিও।

 শেষ লিখি? তোমাদেরই দেওয়া হ্যাঁটা সেই নাম—লগারিদম্ ! হা হা হা।

পুনঃ—-পোষা কুকুরটা ফাঁকি দিয়েছি হে,রেখে দিয়েছি নিজের কাছে। “

           পরদিন সকালে কাক-পাখি আর লাল বাক্সটা জেগে ওঠবার আগেই পোস্টকার্ড হাতে বেরিয়েছিলেন মাস্টারমশাই।পোস্ট অফিস থেকে শ্মশান,মাইল দুয়েক টানা হেঁটে হাঁসফাঁস মাস্টারমশাই। তবুও হাঁটবেন রোজকার হিসেবের হাঁটা। হাঁটছেন তিনি—মাটি বাঁধা শ্মশান পথে। পাক খাচ্ছেন—মাইল মাইল পাক।পাক খাচ্ছে মাইল মাইল হিসেব—পাক ঘুরছে গোলপথ—-শ্মশান থেকে আকাশ,আকাশ থেকে শ্মশান। পাক খাচ্ছে সকালের পাখি,বিকেলের পাখি,সন্ধ্যের পাখি—সন্ধ্যে কি লেগে গেল তবে?রোদ চোখে ঘর খোঁজেন মাস্টারমশাই,ঝলমলে আলোর গায়ে সন্ধ্যে দেখেন—গীতা পড়েন,চিঠি লেখেন,শূন্য থেকে সিরিজ।শ্মশানের লতানে জড়িয়ে পায়ে,পা ফেলেন–একঘর,দুঘর,এক পা দু’ পা….মিলছে না ঘর,মিলছে না পা।লাল মলাট বাঁধা সেই বইটা আঁতিপাঁতি খুঁজছেন মাস্টারমশাই,অংক মেলাতে শেষ ভরসা তাঁর। কুকুরটা চিনতো।ঘোলা চোখে দেখছেন ছুটে আসছে কুকুরটা, মুখে নিয়ে তাঁর লালবই,কেশব নাগের পাটিগণিত।আজীবন নিয়ম মেনে পাটিগণিত কষা মাস্টারমশাই দূরত্ব আর সময় গুলিয়ে ঘরের রাস্তা আজও খুঁজছেন,পাশে বসে তাঁর নিজের ভাগ,তাঁর পোষা কুকুর।

25