বাংলা ছোটোগল্পে মুসলিম জনজীবন (পর্ব ৫)

পুরুষোত্তম সিংহ

‘দেশ’ (১৩৮৩ ) পত্রিকায় নিজেকে বক্তব্যজীবী লেখক বলে ঘোষণা করেছিলেন সিরাজ। আবার ‘কেন লিখি’ শীর্ষক প্রশ্নের উত্তরে লিখলেন ‘আমার কিছু বলার আছে’। ছোটবেলা থেকেই মনে ইচ্ছা ছিল লেখক হবেন।  কিন্তু কলেজে উঠে মিশে গেছেন আলকাপ দলে। পিতামাতা বাড়ি ফিরিয়ে সাতাশ বছরের সিরাজকে বিবাহ দিয়ে দিয়েছেন সংসারি হওয়ার জন্য, কাগজ কলম নিয়ে বসে আছেন, কী লিখবেন ! সামান্য জীবনে সংগ্রহ করেছেন বিপুল অভিজ্ঞতা, তাই সাজিয়ে দিতে চাইলেন কথাভুবনে । ফলে আমরা পেলাম মুর্শিদাবদের হিজল লালবাগ সহ রাঢ় বাংলার এক ভিন্ন চিত্র। তবে এ চিত্রের সঙ্গে তারাশঙ্করের মিল নেই। সিরাজ নিজেই নিজের পথ করে নিয়েছিলেন। কানে সর্বদা বাজত স্ত্রীর কথা –“নিজের মতো করেই লেখো। অন্যের মতো নয়।“ ‘আমার কিছু বলার আছে’ শীর্ষক জবানবন্দি থেকে তাঁর লেখনবিশ্বের যাবতীয় ধারণা পাঠকের জানা জরুরি। আমরা সামান্য অংশ তুলে ধরি –

‘’এই সত্তর ছুঁই- ছুঁই জীবনে পিছু ফিরে তাকালে দেখতে পাই, যা দেখেছি-জেনেছি-বুঝেছি, তা মানুষকে জানাতে চেয়েই তো লিখতে শুরু করেছিলুম। কিন্তু আরও কিছু তাগিদ কি ছিল না ?

ছিল। ছোটোবেলা থেকেই কেন যেন মনে হত, যে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছি, তা আমার মনের মতো নয়। তাই বারবার বলতে ইচ্ছা হত, ‘না’ সবকিছুতেই ‘না!’ পরে আলব্যের কামুর ‘বিদ্রোহী’ বইয়ে পড়েছিলাম, বিদ্রোহী সে-ই, যে বলতে পারে, ‘না’। কিন্তু নিজের অজ্ঞাতসারে ‘না’ শব্দটি ঘোষণার জন্য আমার লেখালেখি, তা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আমার সব লেখাতেই ওই ‘না’ শব্দটি আত্মগোপন করে আছে। আরও একটা কথা। আমার মধ্যে অতর্কিত টের পেয়েছি, যেন বা এক প্রফেট এসে চিৎকার করে বলতে চাইছেন, মানুষ ! মানুষ ! তুমি এসব কী করছ ? তুমি কী করছ , তা জানো না।“ ( কেন লিখি, মিত্র ও ঘোষ, পৃ. ১১১, ১১২ )

‘সাড়ে চার হাত মাটি’ এক কৃষকের জীবনে নিপীড়নের গল্প। আর সে নিপীড়নের দর্শক ছিলেন লেখক নিজেই। দেশ স্বাধীন হয়েছে, জমিদারি প্রথা বিলোপ হয়েছে কিন্তু কৃষকের ওপর অত্যাচার আজও কমেনি। আজ জমিদারের স্থান দখল করেছে সুদখোররা। বাবর আলি ওরফে বাবরু এক কৃষি পাগল মানুষ। জমির সঙ্গে তাঁর হৃদয়ের সম্পর্ক। কিন্তু তাঁর সব জমিই গেছে খাজনা দিতে না পারার কারণে। আর খাজনা দেবেইবা কি করে, বর্ষায় ফসলই হয় নি। এমনকি নিজের বাড়িটিও সুদের কারণে হাতছাড়া হয়েছে। বাবরুর চিন্তা নিজের কবর নিয়ে। কেননা সে সবার পাশে গোরস্থান নিতে চায় না। আজ বাবরু ভূমিহীন চাষি, সে শিশিরের ফার্মে কাজ করে। সে অত্যন্ত পরিশ্রমী কিন্তু তাঁর একটাই জেদ – এই ফার্মে কিছু জমি তাঁর ছিল ফলে সেখানেই যেন তাঁর কবর দেওয়া হয়। বাবরুর এই দাবির মূল্য কতটুকু জমিদারের সন্তান শিশিরের কাছে ! ফলে তা হাস্যকর মনে হয়, এমনকি বাবরুকে মনে হয় পাগল –“বাবরু বলল, “কথাটা মোনে আছে তো বাবুমশাই ? পয়সা লয়, কিছু লয় –খালি চারহাত মাটি বাবুমশাই –আপনার পায়ে ধরি। সাড়ে তিন হাতেই চলত। তবে কিনা মাথার পেছনে আধহাত পায়ের পেছনে আধহাত জায়গা লাগবে। ক্যান কী, দুদিকে ফেরেশতা এসে দাঁড়াবে। তেনাদেরও জায়গা চাই।“ (গল্প সমগ্র, প্রথম খণ্ড, করুণা, ১৯৮৭, পৃ. ৫৬ ) কিন্তু জায়গা হয় নি ! আর কেনইবা জায়গা হবে, ভারতবর্ষে দরিদ্র মানুষদের জন্য জায়গা কোথায় ? পঞ্জবার্ষিক যোজনায় গড়ে ওঠা একটি ড্যামের অবস্থা বিপন্ন দেখে সব দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। সেই জলে সমস্ত গ্রাম ভেসে গেছে, ভেসে গেছে বাবরুও। তাঁর দেহ শিয়াল কুকুরে খেয়েছে ,আর তাঁর কবর হয় নি। সেই যে কবি বলেছিলেন –“মাটিতে যাদের ঠেকে না চরণ মাটির মালিক তাহারাই হন।“ সেই রীতিতে আজ জমিদার শিশিররা। আর মাটিতে সামান্য জায়গা হয় নি বাবরুর। তাই বাবরুর কথক শেষে শুনিয়ে যান –“তাহলে বাবরু শেষ পর্যন্ত মাটি পেল না ! কেন পেল না বাবরু ? সে তো মাটিকে ভালবাসত । মাটির গন্ধ শুঁকে আবিষ্ট পৃথিবীকে দেখত। তবু সে মাটি পেল না কেন ? বেশি নয়, মাত্র সাড়ে চার হাত মাটি !” (তদেব, পৃ. ৫৭ )

                        ‘ডালিম গাছের জিনটি’ গল্পে মুসলিম মিথের সঙ্গে সমসাময়িক হিংসার রাজনীতি স্থান পেয়েছে। চিরকালই শ্রেণিশত্রুরা সাধারণ মানুষকে সামনে রেখে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করেছে। আর সে চরিত্র যদি মুসলিম হয় তবে অত্যাচার আরও প্রবল। নাসিররা চিরকাল পরাজয়ের নায়ক। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ গ্রামজীবন দেখেছেন, গ্রামের রাজনীতির জটিলতা বুঝেছেন ফলে এসব আখ্যান খুব সহজেই তাঁর হাতে সফল রূপ পেয়েছে। একদিকে দুগারাজি ও অন্যদিকে মির্জার কন্যা দিলবাহার ভোটে দাঁড়িয়েছে। নাসির হল দুগারাজির বেতনভুক্ত কর্মচারী। এই নাসিরের পরিচয় দিতে গিয়ে লেখক লিখেছেন –“কপালে, দুই ভুরুর মধ্যিখানে স্থায়ী লম্বাটে নীল তিলক, যার স্থানীয় নাম ‘রাখাল – ফোঁটা।‘ সে অতীতে এক রাখাল ছিল। ন্যাকড়ায় ঘুটিঙ বেঁধে থুতু দিয়ে তার স্মৃতি। নাসিরকে রূপবান করেছে ওই চিহ্ন, তাতে ভুল নেই। তাঁর গোঁফ, ঝাঁকড়া চুল, ব্রোঞ্জ নির্মিত শরীর, তার মুখের হাসিতে ঐতিহাসিক ফৌজদারদের লক্ষণ আছে, এবং মধ্যযুগে ইচ্ছে করলে এরাই নবাব –বাদশাহ হতে পারত। কেল্লাবাড়ি থেকে কাটরা কলোনি পর্যন্ত ঘরে ঘরে তার সাগরেদ।“ (গল্প সমগ্র, পঞ্চম খণ্ড, করুণা, প্রথম প্রকাশ ২০০২, পৃ. ৩০ ) দুগরাজি নাসিরকে বলেছিল সে যেন দিলবাহারকে বিবাহ করে। কিন্তু নাসির কোনদিনই বলতে পারে নি। বলতে গিয়েছিল কিন্তু পারে নি। ইতিমধ্যেই ভোটের রাজনীতি শুরু হয়েছে, দুগারাজির পক্ষ দিলবাহারদের পরাজিত করতে উদগ্রীব হয়েছে। যখন দেখছে নাসিরের দ্বারা কোন কাজই হচ্ছে না, তখন দুগরাজির পক্ষ নাসিরকে হত্যা করে সমস্ত দোষ চাপিয়ে দিয়েছে দিলবাহারের ওপর। ভোটে হত্যার জন্য যেহেতু বিরোধী পক্ষই দায়ী সেই সুযোগ নিয়েছে দুগরাজিরা। প্রকৃত সত্য চাপা পড়ে গেছে মিথ্যার আড়ালে। ভোটের রাজনীতিতে পড়ে একটি নিষ্পাপ নারী জীবনের পতন ঘটে গেছে।

            মুসলিম জীবন নিয়ে এক অসামান্য গল্প ‘হরবোলা ছেলেটা’। পৃথিবীতে বোধহয় মাতৃস্নেহই সবচেয়ে মূল্যবান। মাতৃস্নেহের অভাবে সন্তান যেমন রুগ্ন হয়ে যায় তেমনি সব বোধ হারিয়ে ফেলে। এ গল্পে সিরাজ চমৎকার কায়দায় মাতৃস্নেহের অভাবে সন্তানের স্বাভাবিক জীবনের বিচ্ছিন্নতাকে দেখিয়েছেন। তবে গল্পের প্লটে কোন মুন্সিয়ানা নেই। আসলে সিরাজের চরিত্ররা বড় হয়ে উঠেছে তাঁর ভূগোলেই। সে হিন্দুও হতে পারে, মুসলিমও হতে পারে। তিনি হিন্দু মুসলিমকে পৃথক করে গল্পের শ্রেণি চরিত্র সাজিয়ে দেন নি। সেই ভূগোলকে পরিস্ফূটিত করতে সেই সব চরিত্ররা স্বভাবিক ভাবেই উঠে এসেছে। এ গল্পের সাদেরালির ছেলে নাদেরালি। সাদেরালি ছিল দিন মজুর, তাঁর স্ত্রী পুত্র নিয়ে ছিল সুখের সংসার। কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে সুলেমানের ছিল অবৈধ প্রণয়। আর তা একদিন সাদেরালির চোখে ধরা পড়ে যায়। ফলে স্ত্রী কাটারি দিয়ে আঘাত করে স্বামীর পায়ে, এমনকি স্ত্রী সুলেমানের সঙ্গে চলে যায়। স্ত্রী তালাক চাইলে সাদেরালি পাঁচ হাজার টাকা দাবি করে, কিন্তু দুই হাজার টাকায় রফা হয়। কাঁটা পা নিয়েই সাদেরালি কাজ করছিল কিন্তু সেখানে পচন ধরে তা বাদ দিতে হয়। ফলে আজ সাদেরালি ভিখারিতে পরিণত হয়েছে। প্রথমে পুত্রকে সঙ্গে নিলেও পুত্র এখন নিজেই যেতে পারে। কিন্তু পিতা বারবার বলে দিয়েছে সে যেন ভিক্ষা করতে কাঁকরগড়ে না যায়। কিন্তু সাদেরালি একদিন ভুল করে সেখানে গিয়ে মাতার কাছ থেকে দুই টাকা নিয়ে আসে, তা জানে না পিতা, সেই টকায় সামন্য চা খায় সে, কিন্তু যখন জানতে পারে এ টাকা স্ত্রীর তখন আর মেনে নিতে পারে না নিজেকে ও পুত্রকে –

“হঠাৎ হু হু করে কেঁদে ওঠে ছেলেটা। তখনি খোঁড়া লোকটা তার কাঁধ খামচে ধরে। থাপ্পড় মারে গালে। নেমকহারাম !

ছেলেটা পড়ে যায় । কান্না সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেছে। নিষ্পলক তাকিয়ে বাপের মার খায়। সাদেরালি হাঁফাতে হাঁফাতে তাকে টেনে ওঠায় ফের। বেধড়ক মারতে থাকে। কষা কেটে রক্ত ঝরে। হিঙন হাজির ঘিয়ে রঙের সোয়েটারে ধুলো আর রক্তের ছোপ।

সাদেরালি চ্যাঁচায়, আজ থেকে তুই ফের আমার সঙ্গে ঘুরবি। তারপর পকেট থেকে সেই পয়সাগুলো ছুড়ে ফেলে খালের জলে। বার বার থুতু ফেলে। ছেলেটা আস্তে আস্তে উঠে বসল।

কিছুক্ষণ পরে ছেলেটার কাঁধ খামচে ধরে সে মাঠের পথে নেমেছে। খোদাতালার আসমানকে শুনিয়ে বলছে, আজ আমি শুয়োর খেলাম। যতদূর যায়, খোঁড়া লোকটা ধুয়োর মতো আওড়ায় কথাটা।“ ( গল্প সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড, তদেব, পৃ. ৩১ )

সাদেরালি আজ পুত্রকে সঙ্গে নিয়েই যায়। মাতা বলেছিল প্রতিদিন সে গ্রামে আসার জন্য কিন্তু পুত্র আর যেতে পারেনি। ফলে মাতা বহু কিছু নদী ঘাটে এনেও ফিরে যেতে হয়েছে। তেমনি বাবার সঙ্গে গেলেও সাদেরালির গলা দিয়ে আজ আর পাখির আওয়াজ বের হয় না। যা দিয়ে সে এতদিন রোজগার করত মাতৃস্পর্শে সে যেন তা ভুলে গেছে। মাতা কোনদিন পুত্রের খোঁজ নেয় নি তবে দেখা মাত্রই চিনতে পেরেছে, আদর করেছে। আসলে সুলেমানের সংসারে নিজেরই পুত্র অনেক, ফলে আগের পুত্রকে ভুলে থাকতে হয়েছে। কিন্তু দর্শনেই মাতৃস্নেহ জেগে উঠেছে। তেমনি সাদেরালি এক ক্ষতবিক্ষত চরিত্র। তাঁকে আজ ভিক্ষা করতে হয়েছে পা হারিয়ে যাওয়ায়, তবুও সে পূর্বের স্ত্রীর দান স্পর্শ করবে না, এমনকি পুত্রকেও করতে দেবে না। সাদেরালি চরিত্র ধর্মীয় নিয়মের চেয়ে অভিমান বড় হয়ে উঠেছে, তেমনি নাদেরালিও মাতৃস্নেহ পেয়েও তা আবার হারাতে হবে বলে অভিমানকেই সঙ্গী করেছে। যে অভিমানে আর তাঁর গলা দিয়ে পাখির ডাক প্রকাশ হয় নি।

                সিরাজের গল্প সম্পর্কে সমালোচক সুমিতা চক্রবর্তী লিখেছিলেন –“সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি –রক্ষার নামে সাম্প্রদায়িক বিভেদের চেতনাকে উশকে দেবার যে রাজনীতি আমরা প্রত্যক্ষ করছি আজকের ভারতে, সিরাজের গল্প তার বিষ –বাষ্প থেকে মুক্ত। তাঁর গল্প মানুষের গল্প। আর মানুষের যেহেতু একটা গোষ্ঠী নির্দিষ্ট ‘ধর্ম’ থাকে এখনও, তাই তাদেরও আছে। অবশ্য সম্প্রদায়িক বিভেদের দিকটাও এদেশে সত্যই প্রায়শ। কিন্তু সিরাজ এই নিয়ে লেখবার আগ্রহ বোধ করেননি। কোনো চাপিয়ে দেওয়া সাম্প্রদায়িক মিলনের বাণীও ঘোষিত হয়নি তাঁর গল্পে।“ ( ভূমিকা, গল্প সমগ্র, পঞ্চম খণ্ড, তদেব, পৃ. VII ) এ মন্তব্য একশো শতাংশ সত্য। তিনি জীবন সত্যের গল্প লিখতে চেয়েছেন। গল্পের যে সত্য তাই তিনি আবিষ্কার করেছেন। অর্থাৎ গল্পের অভিমুখ যে পথে গেছে তাই তিনি খুলে দিয়েছেন। এমনই একটি গল্প ‘মহারাজা’। এক মৃদু গদ্যে তিনি পাঠককে গল্প শুনিয়ে গেছেন। মানবতার জয় ঘোষিত হয়েছে এ গল্পে। সুলেমান মুহুরি আসে মহারাজার কাছে। বাল্যকালে এক নাটকে সামান্য অংশ গ্রহণের জন্য তাঁর এই নাম হয়েছিল। মিলিটারি চাকরি থেকে এসে সে এখন সাইকেল মেরামতের দোকান খুলেছে। কিন্তু তাঁকে গ্রামের লোক সম্মান দেয়, শ্রদ্ধা করে, তেমনি রয়েছে শারীরিক ক্ষমতা। সুলেমানের স্ত্রী চলে গেছে। তা ফিরিয়ে আনার জন্য জানায় মহারাজকে। সেও টাকার বিনিময়ে রাজি হয়। কিন্তু কেন সুলেমানের স্ত্রী চলে গেছে তা জানতে চায় নি। রাত্রির অন্ধকারে ভয় দেখিয়ে, চুরি করে সেই মেয়ে নিয়ে এসেছিল মহারাজা ও তাঁর দলবল। কিন্তু আজ সেই মহিলা আর গোপন রাখেনি কেন সে পিতৃগ্রহে চলে গিয়েছিল। সুলেমান এক অর্থপিশাচ লোভী, জমির প্রতি তাঁর প্রবল টান। আর সে মুনাফা লুটতে স্ত্রীকেও বেশ্যাতে পরিণত করতে ছাড়েনি। সমস্ত কথা শোনার পর মহারাজা আজ হতাশ। এই পরিস্তিতিতে নিজেকে বাচাঁতে সুলেমান আজ তালাক দিয়ে দেয় স্ত্রীকে। রাতের অন্ধকারে এই মহিলাকে কোথায় ফেলে আসবে মহারাজা ! ফলে নিজের বাড়িতেই নিয়ে আসে। এ গল্প পড়তে গিয়ে মনে পড়ে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘ডাকাত’ গল্পের কথা। তবে সিরাজ অচিন্ত্যকুমারের পথ অবলম্বন করেনি। তিনি নিজস্ব পথই গড়ে তুলেছেন। ‘ডাকাত’ গল্পে বিবস্ত্র তসলিমাকে নতুন বস্ত্র দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল ডাকাত দলের সর্দার দর্জন আলি। আর এ গল্পে তালাক প্রাপ্ত মহিলাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছে মহারাজা। দুজনই মানবতার নব দিশা দেখিয়েছে। কোন নীতি ধর্মের প্রচার বা বার্তা দেওয়া গল্পকারের উদ্দেশ্য নয়, জীবনের বহুবিধ পথে যে আদর্শ মানুষ এখনও আছে সেই কথাই লেখক ঘোষণা করতে চান। এবার আসি এ গল্পের গদ্য প্রসঙ্গে। ছোট ছোট হৃদয়গ্রাহী বাক্যে তিনি গল্পকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন পরিণতির দিকে। অযথা শব্দ প্রয়োগ বা গভীর ব্যঞ্জনা নয়, তিনি যেন মেপে মেপে সাজিয়েছেন বাক্যগুলিকে –

“ঘোষহাটি পশ্চিমে, সোনাডাঙা পুবে। রাস্তাঘাট কাঁচা ওদিকে। বর্ষায় কাদা জমেছে। মাঠেও চাষ পড়েছে। জলকাদা প্রচুর। অতএব আলপথই ভাল। ঘন ঘাস গজিয়েছে। ভয়টা শুধু সাপের। সুলেমান মহুরির টর্চ আছে। সাপের কামড়ে এখন মরতে চায় না সে। কিন্তু তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে। পায়ের সামনে টর্চের আলো ফেলছে সারাক্ষণ। তার পিছনে মোট তিনটি লোক। সুলেমানের সংশয় ঘুচছে না, চেঁচামেচি বড্ড হবে। গাঁয়ের গুণ্ডাগুলো এসে পড়লেই বিপদ।“ ( গল্প সমগ্র, প্রথম খণ্ড, তদেব, পৃ. ৯৩ )

শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পে আমরা এক মুসলিম চাষির পশুপ্রীতির নিদর্শন পেয়েছিলাম। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ‘গোঘ্ন’ গল্পে পশুপ্রীতির এক গল্প শোনালেন। এ গল্প এক যাত্রাপথের গল্প। সেই যাত্রাপথে এক পরাজিত মুসলিম চাষির গল্প। এ গল্পপাঠের শেষে পাঠকের স্তব্ধ হয়ে বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই। এক আশ্চর্য ভাষাশিল্পীর বাঁধুনীতে তিনি গল্পকে বেঁধে রেখেছেন। হারাই দোলাই দুই ভাই। রাঢ়দেশের চারু মাস্টারের সঙ্গে তাঁদের বিশেষ সখ্য ছিল। তাই হারাই পূর্বের কথা মত চারু মাস্টারের কন্যার বিবাহতে কুমড়ো ও কলাই ডাল পৌঁছে দিতে গিয়েছিল, ফেরার পথে নিয়ে এসেছে কিছু ধান নিজের গোরুর গাড়িতে। পথেই অসুস্থ হয়ে পড়ে গোরু ধনা। এই ধনা –মনাকে হারাই নিজ সন্তানের মতোই ভালোবাসে। তাই ধনায়ের অসুস্থায় সে চিন্তিত, কবিরাজের কাছ থেকে ওষুধ নিয়েছে, তবে কিছুতেই যেন যাত্রাপথ শেষ হয় না। গোটা গল্প জুড়েই আছে হারাইয়ের যাত্রাপথের বিবরণ। দিলজান এই বলদকে কিনতে চেয়েছিল কিন্তু ধনাই বিক্রি করেনি, পথ চলতে ধনা আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে , ফলে সকলের পরামর্শ মত সে ত্রিশ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে। পথেই দেখা হয়েছে বদর হাজীর সঙ্গে, তিনি মানুষ খাওয়াতে ভালোবাসেন। খেতে বসেই জানতে পেরেছে সে নিজের প্রিয় বলদের মাংস মুখে দিয়েছে, তখনই চিৎকার করে ওঠে –“হামাকে হারাম খাওয়ালেন ! ….. হামাকে হামারই বেটার গোশতো খাওয়ালেন। হেই হাজীসাব ! হামার ভেতরটা জ্বলে খাক হয়ে গেল যে ! এক পদ্মার পানিতেও ই আগুন নিভবে না গো।“ ( গল্প সমগ্র, প্রথম খণ্ড, করুণা, প্রথম প্রকাশ ২০১৩, পৃ. ৩১১ ) গ্রামীণ মানুষ পশুকে সন্তান হিসেবেই ভালোবাসে। আর এ ভালোবাসা আরও বেশি কেননা এই গোরু কৃষির সঙ্গে জড়িত, কৃষকের অন্নের সঙ্গে জড়িত। তাই হারাই পকেটে থাকা সামান্য পয়সা দিয়ে নিজে না খেয়েও ধনার চিকিৎসা করেছিল। তেমনি এই বলদ গুলি বাড়িতে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই পা ধুয়ে দিতেন। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই বলদ ছাড়া কৃষকের এক মুহূর্ত পরিত্রাণ নেই। শুধুমাত্র এই বলদের অভাবে বাঘাড়ীগ্রামে বহু মানুষ ভিখারিতে পরিণত হয়েছে। তাই বলদের মৃত্যু ঘটলে হারাইয়েরও কিছু করার থাকবে না ভিখারিতে পরিণত হওয়া ছাড়া। সেজন্য বলদের প্রতি ভালোবাসা আরও গভীর –

“ব্যাটা মরবে, ব্যাটা জন্মাবে। কিন্তু গরু মলে গরু কোথায় পাবে হারাই ! একটা গরুর দাম যোগাতে অর্দ্ধেক জমি বেচতে হবে। খোদা কি এটা বোঝেন না ? একটা গরুর অভাবে তার গাড়োয়ানী বন্ধ হবে। চাষবাস বন্ধ হবে। খন্দ ফলমুল ফিরি করতে আসা হবে না রাঢ়ে। বাঘড়ীমুলুকে কে এসব কিনবে ? না খেয়ে মারা পড়বে হারাইয়ের বহু- বেটা –বিটিয়া। ‘মুসাফির’দের মতো তাদেরও যে মরসুমে ভিখ মাঙতে যেতে হবে রাঢ়ে ! ঠিক এমনি করে একটা গরুর অভাবে বাঘড়ীর কত মানুষ মসাফির ভিখিরি হয়ে গেছে ! তাই ভেবে হারাই কাঁদে। নমাজে বসে থাকে অনেকক্ষণ। খোদাতালাকে ইনিয়ে বিনিয়ে সব কথা বোঝাতে চায়।“ ( তদেব, পৃ. ৩০৬ )

36