শৌভিক রায়

বিদ্যালয় শিক্ষা ও সমাজসেবার ক্ষেত্রে খ্রিস্টান চার্চের ভূমিকা সর্বযুগেই অনস্বীকার্য। সময়ের নিয়মানুসারে চার্চ বিভিন্ন সময় নানা ভাগে বিভক্ত হলেও, তাদের অবদান একইরকম রয়ে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষা ও সেবামূলক কাজের জন্য যে চার্চগুলি বিখ্যাত তাদের মধ্যে সেভেনথ ডে অফ অ্যাডভান্টিস্ট চার্চ অন্যতম। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টানদের একটি অংশ যিশুর দ্বিতীয় উত্থানে বিশ্বাসী হয় পড়েন এবং সেই সূত্র ধরে আমেরিকায় শুরু হয়েছিল মিলেরাইট আন্দোলন। এই আন্দোলন থেকেই ১৮৬৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় সেভেনথ ডে অফ অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চ। সেই সময়ে চার্চের সদস্য-সংখ্যা সাড়ে তিনহাজার হলেও, আজ এদের অধীনে সারা বিশ্বে রয়েছে পাঁচ হাজারের বেশি প্রাথমিক এবং প্রায় আড়াই হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়। প্রায় সাড়ে তিনশ হাসপাতালের পরিচালনাও করছেন এরা।

সেভেনথ ডে অফ অ্যাভভেন্টিস্ট চার্চ প্রতিষ্ঠিত, উত্তরের সমৃদ্ধ জনপদ ফালাকাটার, রেমন্ড মেমোরিয়াল হাই স্কুল কালের যাত্রায় সত্তরটি বছর পার করে দিল। ডুয়ার্সের শিক্ষাক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, কেননা এই বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে রয়েছে অরুণাচল প্রদেশ, অসম, বিহার, লাদাখ, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, সিকিম, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ-সহ ভারতের নানা রাজ্যের বাসিন্দারা। রয়েছে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান থেকে আসা শিক্ষার্থীরাও। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মধ্যেও ভারতের প্রায় সব রাজ্যের মানুষদেরই দেখা যায়। সত্যি বলতে, রেমন্ড মেমোরিয়াল হাই স্কুল ফালাকাটার বুকে থাকা এক টুকরো ছোট্ট ভারত।

তবে স্বাধীনতার দুই বছর পর ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ের স্থাপনের পেছনে চা-বাগানের ভূমিকাকে অস্বীকার করা যায় না। ডুয়ার্সে চা-বাগান প্রতিষ্ঠার জন্মলগ্নে নেপাল ও ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে দলে দলে শ্রমিক নিয়ে আসা হয়েছিল। এইসব হতদরিদ্র, শোষিত ও বঞ্ছিত মানুষদের কাছে খ্রিস্টান ধর্মের গ্রহণযোগ্যতা অন্য ধর্মের চাইতে বেশি ছিল, কেননা মিশনারীরা নানাভাবে তাদের কাছে পৌঁছতে পেরেছিলেন। গত শতকের চল্লিশের দশক সময়কালে ফালাকাটার আরণ্যক পরিবেশে বন কেটে তৈরী হচ্ছিল কাদম্বিনী ও কোচবিহার চা-বাগান। আশেপাশের নানা অঞ্চলেও চলছিল চা-বাগান তৈরীর কাজ। আর তার জন্য তদানিন্তন ছোটনাগপুরের কার্মাটার-সহ নানা প্রান্ত থেকে প্রচুর পরিমাণে শ্রমিক আনা হয়েছিল এবং প্রায় তাদের সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত হয়েছিলেন সেভেনথ ডে অফ অ্যাডভান্টিস্ট চার্চের এম জি চ্যাম্পিয়ান ও সি জে জেনসন। ধর্মপ্রচারের পাশাপাশি তাদের উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিকদের সন্তানদের মধ্যে শিক্ষাবিস্তার।

একদা ভুটানের অন্তর্গত ফালাকাটা সেই সময় ছিল অত্যন্ত সুন্দর। তেপান্তরের মাঠের মতো বিরাট মেলার মাঠের উত্তরে ঝকঝক করত নীল পাহাড়। জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের সীমা ছুঁয়ে যেত ফালাকাটাকে। অবিভক্ত জলপাইগুড়ি জেলার প্রথম মহকুমা ফালাকাটায় সেই সময়ে ছিল থানা, ড্রামাটিক হল, তহশিল অফিস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন সৈনিকদের ব্যবহৃত আবাসস্থলটি পরিণত হয়েছিল গ্রন্থাগারে। ডুয়ার্সের নিয়মানুযায়ী সারা বছরই ফালাকাটায় ছিল না ঠান্ডা না গরম আবহাওয়া। হত প্রচুর বৃষ্টিপাত। কার্মাটারের চাইতে তুল্য বিচারে পছন্দের জায়গা ছিল সেই সময়ের ফালাকাটা। এখানে কাজ করবার সুযোগ ও প্রয়োজনও ছিল বেশি। তাছাড়াও কার্মাটারে রবিনসন এস ডি এ হাই স্কুলের দায়িত্বে থাকা এম জে চ্যাম্পিয়ান নিজেও চাইছিলেন বিদ্যালয়টিকে সেখান থেকে অন্যত্র সরাতে। কেননা, কার্মাটারে বিদ্যালয়টি সেভাবে পরিচিতি পাচ্ছিল না।

ফালাকাটায় চা-শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করবার ফাঁকেই চ্যাম্পিয়ান ও জেনসন তাই জমি খুঁজতে শুরু করেছিলেন। আজকের ফালাকাটা স্টেশন লাগোয়া পাঁচশো একর জমি সে সময় চা-বাগান তৈরীর জন্য ভাবা হয়েছিল। কিন্তু বালু জমি হওয়াতে চা-বাগানের মালিক ও ম্যানেজাররা সেই জমিতে কোনও আগ্রহ দেখান নি। চ্যাম্পিয়ান ও জেনসন সেই জমি পছন্দ করলেন। তাঁদের ও অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চের শুভানুধ্যায়ী মিসেস রেমন্ড আর্থিকভাবে সহায়তা করলেন। জমি নিজেদের অধিকারে এলে শিক্ষাব্রতী চ্যাম্পিয়ান কার্মাটারে রবিনসন এস ডি এ হাই স্কুলকে স্থানান্তর করলেন ফালাকাটায়। শুরু হল এক নতুন অধ্যায়।

ফালাকাটায় বিদ্যালয় শুরুর দিনগুলিতে কার্মাটার থেকে প্রিন্সিপাল চ্যাম্পিয়ানের সঙ্গে ছয়জন মহিলা ও নয়জন পুরুষ অর্থাৎ মোট পনের জন ছাত্রছাত্রী জিপে চেপে এসেছিলেন। পথে দুর্ঘটনায় একজন ছাত্র মারা যান। চ্যাম্পিয়ান নিজেও আহত হয়েছিলেন। সেইসময় দুটি তাঁবুতে সকলের থাকবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫২ অবধি চ্যাম্পিয়ান ছিলেন স্কুলের প্রিন্সিপাল। বর্তমান ছাত্রাবাসটি তাঁর নামেই নামাঙ্কিত। চ্যাম্পিয়ানের যোগ্য সঙ্গিনী ছিলেন তাঁর স্ত্রী ডরোথি। ছাত্রী-আবাসের নামকরণে তাঁর স্মৃতি সযত্নে রক্ষিত আজও।

এম জে চ্যাম্পিয়ানের পর বিদ্যালয়ের দায়িত্ব নেন এল এন হেয়ার। তাঁকে বার্মা থেকে নিয়ে আসা হয়। তাঁর দুই বছরের কার্যকালে বিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামটি তৈরী হয়। তবে বিদ্যালয়ের ভবনগুলি নির্মিত হয় আরও পরে ই এ স্ট্রিটারের আমলে। তাঁর অবসরের পর এইচ ডি এরিকসন, ডি এইচ স্কাও, এ ডব্লু ম্যাথেসন হয়ে ১৯৬৯ সালে, প্রথম ভারতীয় হিসেবে, বিদ্যালয়ের দায়িত্বভার নেন ডি এস পোদ্দার। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বিদ্যালয়ের নানা কর্মকান্ড। আজ ‘কমপ্লিট স্কুল’ বলতে যা বোঝায় রেমন্ড মেমোরিয়াল হাই স্কুল ঠিক তা-ই। মিসেস রেমন্ডের স্মৃতিতে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে নিজস্ব জমি, চাষের বন্দোবস্ত, শস্যাগার, ট্রাক্টর, হাসপাতাল, খেলার মাঠ, প্রচুর গাছ, সেভেনথ ডে অফ অ্যাডভান্টিস্ট চার্চ ও উপাসনালয় ইত্যাদি সবকিছুই রয়েছে। ছাত্রসংখ্যাও দিনদিন বেড়ে চলেছে। বিদ্যালয়ের ফলও যথেষ্ট ভাল হচ্ছে।

ফালাকাটার বুকে এরকম এক টুকরো ভারত নিঃসন্দেহে ফালাকাটার মর্যাদা বাড়িয়েছে। শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও সেভেনথ ডে অফ অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চের অবদান ভুলবার নয়। রেমোন্ড মেমোরিয়াল হাই স্কুল ক্যাম্পাসের মধ্যেই তাই তৈরী হচ্ছে শতাধিক শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল। বালাতোর্ষা নদীর ধারে নির্মীয়মাণ এই হাসপাতালটি তৈরী হলে পারঙ্গেরপার, খলিসামারি, বাগানবাড়ি-সহ ফালাকাটার একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চল উপকৃত হবে।

তাই অনবদ্য প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রতিষ্ঠিত রেমন্ড মেমোরিয়াল হাই স্কুল যেন শুধুমাত্র একটি বিদ্যালয় নয়, বরং এক স্বপ্নপূরণের অসামান্য উদাহরণ।

53