কুলিক রোববার : গল্প কথা (পর্ব ১০)

বিপুল দাস

কিন্তু শ্রোতার কাছে গল্প মোহময় এবং আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার জন্য আরও কিছু ফ্যাক্টর কাজ করে। সাংবাদিকের দেওয়া ঘটনার নিখুঁত তথ্যের বিবরণ কখনও গল্প হয় না। তা হলে রোজ খবরের কাগজ বোঝাই গল্প আমাদের পড়তে হত। কোনও স্বাভাবিক ঘটনা কখনওই আমাদের মনের জগতকে আলোড়িত করে না; কিন্তু ঘটনা অস্বাভাবিক হলেই তার ভেতরে কিছু শক্তি জন্মায়। সেই শক্তি ঘটনাকে অন্য এক পরিণতির দিকে ঠেলতে থাকে। যেমন রবার টেনে বড় করলে তার ভেতরে একটা শক্তি সঞ্চিত হয়, এই শক্তি একটা পাথরের টুকরোকে অনেক দূরে ছুঁড়ে দেয়। ঘটনাও স্ট্রেস থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করে। সেটা কাজ করে আমাদের চিন্তার জগতে। আর মুক্তি পাওয়াই গল্প তৈরির রসায়ন। ঘটনার তো অনেকগুলো তল বা মাত্রা থাকে। সেগুলোকে যদি গল্পঘরের জানালাদরজা মনে করি, তবে সেই বিভিন্ন পথে কল্পনার আসাযাওয়া শুরু হয়। তখন আর ঘটনার শুকনো বর্ণনা নয়, গুন্টার গ্রাসের ভাষায় এক ‘মিথ্যেবাদী’ গল্প শোনাতে বসে কবে সে এক ঝর্ণার ধারে প্রকান্ড এক বাঘ দেখেছিল, কিংবা গুহার ভেতরে সে দেখতে পেয়েছিল অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক পশুর চেহারার এক ভয়ংকর প্রাণী। এক নাবিক মৎস্যকন্যার গল্প শোনায়। একজন মোমেন বলে যে প্রতি অমাবস্যায় পিরসাহেব কালো আলখাল্লা পরে এক গাছ থেকে অন্য গাছে উড়ে যায়। সে নিজের চোখে দেখেছে। একটি বাচ্চাছেলে তার ঠাকুদার কাছে যুদ্ধের গল্প শোনে। কেমন করে স্পেনীয় আর্মাডা এসে ইনকাদের সমস্ত সোনা লুঠ করে নিয়েছিল, সেই গল্প শত বছর ধরে ল্যাটিন আমেরিকার পথে পথে ভেসে বেড়ায়। মানুষ শুনতে থাকে দেবদেবীর মাহাত্ম্যমূলক আখ্যান, নির্দয় প্রকৃতির কাছে অসহায় আত্ম-সমর্পণের গল্প, প্রবল শক্তির কাছে নতজানু হওয়ার আখ্যান। হিরো ওয়রশিপের প্রবৃত্তি থেকে বীর যোদ্ধাদের কাহিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এখনও উপন্যাসে, সিনেমায়, টিভি সিরিয়ালে সংকটাপন্ন মানুষ সেই হিরোর কাছে নতজানু। দুষ্টের দমন করে যে হাততালি পায়, আসলে পাঠক, শ্রোতা বা দর্শকের সঙ্গে ওই বীরপুরুষের এক ধরণের আইডেন্টিটি হারমোনাইজেশন ঘটতে থাকে। ইচ্ছাপূরণের তীব্র আকাঙ্ক্ষায় মনে হয় আমিই জিৎ, আমিই দেব, আমিই শাহরুখ খান। 

বীরত্বমূলক আখ্যানগুলোর ভেতরেও সেই কল্পনার সুতো ছড়িয়ে দেবার টেকনিক কাজ করে। সেই সুতো দিয়ে যে যত রঙিন জাল বুনতে পারে, যে যত বড় ‘মিথ্যুক’, সে তত হাততালি পায়। একা বীর খালি হাতে কুড়িজন অস্ত্রধারীর সঙ্গে লড়াই করে নায়িকাকে উদ্ধার করে শেষ পর্যন্ত আমরা একটা দমচাপা নিঃশ্বাস ছাড়তে পারি। বুকের ভেতরে বিশ্বাসের বাতাস বয়ে যায়। একটা গল্প শোনার পর বাড়ি ফিরে সেই গল্প মনের ভেতরে জারিত হতে থাকে। শ্রোতা সেই গল্প থেকে আর একটা উপ-গল্প তৈরি করে। পুরনো গল্প মরে না। তার স্রোতে এসে মিশতে থাকে পরবর্তী সময়ের জলের ধারা, নতুন গল্প।

251