স্বর্ণা দাস

কবিতা কী? কীভাবেই বা সাধারণ কথা কবিতা হয়ে ওঠে? এ প্রশ্নের উত্তর অদৌ কী সম্ভব দেওয়া! কবিতা থাকে কবির যাপনে। কবিতা থাকে দৈনন্দিন ঘর গৃহস্থালির কাজে। কবিতার ভালো মন্দের বিচার অপেক্ষিক। ভালো বা খারাপ কবিতা বলে কিছু হয় না। জীবনের গভীরতম স্থান থেকে উপলব্ধির জগৎ প্রকাশ করাকেই কী কবিতা বলা যেতে পারে? দৈনন্দিন যাপন চিত্রের টুকরো টুকরো ছবি কখনো বা কোনো ছবি না কিছু শব্দের অনুরণন উঠে এসেছে কবি কৌশিক জোয়ারদারের ‘ অপেক্ষার লম্বা হওয়া ছাই ‘ কাব্যে।
দর্শন শাস্ত্রের এই কৃতি অধ্যাপকের কবিতার ছত্রে ছত্রে অাছে জীবনকে নতুন করে দেখার দৃষ্টি।
‘ কবি ও দার্শনিক ‘ শিরোনাম কবিতায় একই ব্যক্তির দুটি সত্বার পরিচয় পাওয়া যায়। একদিকে দার্শনিকের পাণ্ডিত্য যে ভুল কে ভুল মন্দ কে মন্দ বলতে যুক্তি দিয়ে জীবনকে দেখতে অভ্যস্ত, অপরদিকে অাছে কবি সত্বার সারল্য, সারাজীবন ধরে একটি কবিতা লেখার প্রচেষ্টায় কালযাপন। হোক তা দার্শনিকের কাছে মন্দ এমনি মন্দ কবিতা লিখতে পারাটাই কবির সার্থকতা।
“তবু অামি কবিতাই লিখে যাবো
যা বলেছো হয়তো সত্য সবই
তবু অামি কবি
কবিতা লেখাই অামার ভাগ্য লিখন
মন্দ – কবিতা অামি লিখে যাবো
সমস্ত জীবন। ” ( কবি ও দার্শনিক)

কবিতা তো জীবনের কথা বলে। জীবনের মৌলিক চাহিদার কথা বলে শরীর বারবার উঠে অাসে কবিতার বিষয় হয়ে। যৌন্যতাকে বাদ দিয়ে কবিতা সম্ভব? কবির একাধিক কবিতায় প্রিয়তমের শরীর হয়ে উঠেছে কবিতাময়
‘ দুচোখের অাশ্চর্য প্রেম ছড়িয়ে পড়েছে তোমার শরীরময়
নাহলে তো শরীরের নাম মাংস, মহাশয়। ‘ ( দেহজ)
উপলব্ধির গভীরতম স্থান থেকে জীবনকে দেখা কবির কাজ। সাধারন হয়েও কবির থাকে এক অসাধারণ চোখ, অনন্ত এই বিশ্বে জীবনের সন্ধান করেন কবি। ” জীবন ” কবিতায় কবির সেই সন্ধানের প্রকাশ পাওয়া যায়।
” মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অাছি অনন্তকাল
অামি ও অামার দরোজা __
এইটুকু সার।
কোনো দিক বাহির ভিতরই বা কোন দিকে
অাঙুলে সময় স্তব্ধ অপেক্ষায়
বাকিটা সংসার। “

“অপেক্ষার লম্বা হওয়া ছাই ” কাব্য নামের প্রকাশ পায় কবির দীর্ঘ কোনো অপেক্ষায় । এ অপেক্ষা কার জন্য এ কী ‘ওয়েটিং ফর গডো’ সেই অপরিচিত গডো, ভারতীয় দর্শনে ঐশ্বরিক শক্তির, রবীন্দ্র নাথের ভাষায় ‘জীবন দেবতা’। যার সাথে মিলিত হতে চাই কবি মন।
কাব্য নামাঙ্কিত কবিতায় সেই অপেক্ষায় কথাই যেনো কবি বলেছেন।
” অপেক্ষা, সিগারেটের লম্বা হওয়া ছাই, ক্ষয়
এভাবেই গড়ে ওঠে সময় “
কবিতার শুরুতে যে অপেক্ষা কবিতার শেষে এসে রয়েছে ফিরে যাওয়ার কথা। কিন্তু এ ফিরে যাওয়াই বা কোথায়?
” ফিরে যাবো। কিছু পথ একা একা ব’য়ে নিয়ে যাবে
সময়ের বদ্ধমূলে সংস্কার। ” ( অপেক্ষায় লম্বা হওয়া ছাই)
‘ সময় ‘ সময়ের অাগে কিছু হবার না। সময়েই সব কাজ হয়। সকল অপেক্ষা সকল প্রতিক্ষার অবসান ঘটে সময় হলে, সময়ের বদ্ধমূলের কাছে সবই ফেলনা মাত্র।

‘পয়লা এপ্রিলের কবিতা’ শিরোনামে কবি অন্ধকারের বন্দনা করেছেন, এ অন্ধকার অাসলে অালোর উৎস, নতুন সৃষ্টির অাগে জঠরের অন্ধকার শিশুর বৃদ্ধির সহায়ক, কবি সেই অন্ধকারের বন্দনায় ব্যস্ত ।
” অনেকে অনেক কিছু পোষে
অামি পুষি অন্ধকার ” ( পয়লা এপ্রিলের কবিতা)
সমস্ত কাব্য জুড়ে এক অসাধারণ ধ্বনি কল্পের অবহ সৃষ্টি করেছেন কবি। নিন্মে কিছু কাব্য পঙক্তি উল্লেখ করা হলো __
” জ্বর মাপবো ব’লে
রোদ্দুরের গা’য়ে অামার কপাল রেখেছি ” ( অসুখ)

” তারপর….
অন্তহীন এই বৈরিতার কোনো এক ক্ষণে
ভূমি অার জলের অসতর্ক সঙ্গমে
মানুষের জন্ম হল
ঈশ্বরের এও এক শয়তানী খেয়াল “। ( জন্ম)

” তোর জন্ম নাকি অামার জন্ম ভুল
রক্তের উপর ঘুমিয়ে অাছে
একটি মৃত ফুল। ” ( এ অামার পাপ)

পরিশেষে বলা যায় কবিতার ব্যখ্যা করা বোকামির নামান্তর। কবিতা অনুভবের বিষয় , সেখানে থাকে ভালোলাগার অনুভব। বুদ্ধি দিয়ে যুক্তি দিয়ে পাণ্ডিত্য জাহির করে কবিতার ব্যখ্যা করলে তার সৌন্দর্যের হানি ঘটে। কবির কল্পনার জগতে ভর করে যে কাব্য পঙক্তি বেরিয়ে অাগে পাঠকের অনুভূতি জগতে তা অনুরণন জাগালে মিলে যায় দুইটি হৃদয়। এই তো সাহিত্য এই বুঝি ‘ সহৃদয় হৃদয় সংবাদী ‘।
‘ অপেক্ষায় লম্বা হওয়া ছাই ‘ তেমনি হৃদয় অনুভূতি জাগিয়ে তোলে পাঠক হৃদয়ে।

অপেক্ষার লম্বা হওয়া ছাই
কৌশিক জোয়ারদার
সোপান
মূল্য – ১১৫

36