পুরুষোত্তম সিংহ

সাহিত্যের মূল প্রেরণা কল্পনা না বাস্তবতা – এ নিয়ে বিভেদ আছে মতান্তর আছে। তবে লেখার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার জগৎই যে বড় কথা সে নিয়ে সংশয় নেই। কবিতার একটি বড় জায়গা অবশ্যই কল্পনা কিন্তু গল্প উপন্যাসের ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতাই বড় ভূমিকা নেয়। পারিপার্শ্বিক পরিবেশই লেখকের মননভূমি। তবে আধুনিক লেখকেরা আর কেউই পুরোপুরি বাস্তবতাকে নির্ভর করে গল্প লেখেন না। জাদুবাস্তব, কহুকের বাস্তবতা বা বাস্তবতার কুহক সেখানে বড় ভূমিকা নেয়। আর বড় লেখক কোনদিনই সমকাল, স্বজাতি ও স্বগোষ্ঠীকে অতিক্রম করে যান না। স্বজাতি ও স্বগোষ্ঠীর দ্বায়ভার যেন বর্তে যায় সেই সাহিত্যিকের কাছে। আর সেজন্যই লেখককে পেতে হয় আঞ্চলিক শিরোপা। বাংলা কথাসাহিত্যে মুসলিম জনজীবন প্রথম প্রবল ভাবে নিয়ে এলেন সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ। সিরাজের আগে পৃথক জাতি হিসেবে মুসলিম জনজীবনের কথা বাংলা কথাসাহিত্যে আসেনি। স্বাধীনতার পূর্বে শরৎচন্দ্র ও অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের লেখায় মুসলিম জনজীবন উঠে এলেও তা ছিল বাঙালি মুসলিম। পৃথক জাতি হিসেবে বা সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে মুসলিম সমাজের কথা তিনিই প্রথম তুলে আনলেন। আর সেই ধারকেই বহমান করে নিয়ে চলেছেন আফসার আমেদ, আবুল বাশার, সোহারাব হোসেন ও নীহারুল ইসলাম।

        বিমল কর ‘আমি ও আমার তরুণ লেখক বন্ধুরা’ গ্রন্থে লিখলেন –“আমাদের অবাক করার মতন গল্প সিরাজের জামার পকেটে অনেক ছিল” (পৃ. ৬৫ )। গল্পের বহুমাত্রিকা আখ্যান নিয়ে তিনি আসরে এসেছিলেন। আসলে আলকাপ দলের মাস্টার যে গল্পভুবনেও মাস্টার হয়ে উঠবে তা সেদিন বিমল কর বুঝতে পরেছিলেন। বিমল কর তাঁকে ইয়ার্কি করে বলতেন ‘সিরাজ সাহেব’ আর শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলতেন –‘এই যে বাংলার শেষ নবাব’। স্বাধীনতা উত্তরকালে বাংলা কথাসাহিত্যে অর্থ শতাব্দী ধরে তিনি তো রাজত্বই করে গেলেন, আর এপার বাংলায় মুসলিম জীবনের ইতিবৃত্ত লেখায় তিনি শেষ নবাব নয় প্রথম নবাব। তবে তাঁর গল্পের শেষ সত্য কী, তা জেনে নেওয়া যেতে পারে কথাসাহিত্যিক রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য থেকে –“সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের গল্পে মানবিকতা চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। মানবিকতার কোনো বিকল্প নেই, এই সত্যটিকে পাঠক হৃদয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করে দিতে চান। এর ভেতর যন্ত্রণা আছে, দুঃখ আছে, বেদনা আছে কিন্তু কলিজার সত্যই চূড়ান্ত সত্য। “ ( শতাব্দী শেষের গল্প, মিত্র ও ঘোষ, প্রথম প্রকাশ ২০০১, পৃ. ১০৭ )

            মুর্শিদাবাদের হিজল অঞ্চলের অন্ত্যজ হিন্দু- মুসলিম সমাজের কথা বারবার উঠে এসেছে তাঁর রচনায়। এসব মানুষদের সঙ্গেই সিরাজের কৈশোর জীবন কেটেছিল। এ প্রসঙ্গে কথাসাহিত্যিক অমর মিত্র বলেছেন –

“ গত শতকের ৫০ এর দশকে যে লেখকদের আবির্ভাব তাঁদের ভিতরে সিরাজ, শ্যামল, মহাশ্বেতার লেখায় অন্ত্যজ মানুষ এসেছে তার রক্তমাংস নিয়ে। আর সিরাজ এখানে নিজেকে আলাদা করে নিলেন অন্ত্যজ বাঙালি মুসলমানকে আমাদের সাহিত্যে নিয়ে এসে। হ্যাঁ, স্বাধীনতার পরে এই বাংলায় সিরাজই প্রথম অর্গল খুলে দিলেন। তার আগে সেইভাবে কিছু ছিল না। দেশভাগের পর ওপার বাংলায় বাঙালি মুসলমান তার আত্ম পরিচয় লিখেছে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, আবু ইসহাক, মহামুদুল হক থেকে পঞ্চাশের দশকে হাসান আজিজুল হক বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। এই বাংলায় আরম্ভ করলেন সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ।“ (‘গল্পের হাতছানি’, প্রথম প্রকাশ ২০১৫, কারিগর পৃ. ৮৪)

বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে এক মাইলস্টোন ‘অলীক মানুষ’। হ্যাঁ. শুধুমাত্র এই একটি মাত্র উপন্যাসের জন্যই সিরাজ দীর্ঘদিন জীবিত থাকবেন বাঙালি পাঠকের মনে, অন্য উপন্যাসের কথা বাদ দিলেও। মুসলিম জীবনের মিথকে কেন্দ্র করে এরকম উপন্যাসের কাহিনি গড়তে একমাত্র তিনিই পারেন। সিরাজ জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ অক্টোবর মুর্শিদাবাদের খোশবাগপুরে। ‘ইবলিশ’ ছদ্মনামে প্রথম গল্প ‘কাঁচি’ প্রকাশিত হয় বহরামপুরের ‘সুপ্রভাত’ পত্রিকায় ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে। প্রথম উপন্যাস ‘নীল ঘরের নটী’ প্রকাশ পায় ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে নবপত্র প্রকাশের উদ্যোগে। খোসবাসপুর হিজল এসবই সিরাজের রচনার প্রেক্ষাপট। তবে তিনি কিন্তু আঞ্চলিক চিত্রকর নন। এক সর্বজনীন গ্রাহ্যতাবোধ তাঁর মধ্যে ছিল। এজন্যই কথাসাহিত্যিক ভগীরথ মিশ্র তাঁকে ‘ভারতীয় কথাকার’ বলতে দ্বিধা করেন নি। কেননা গ্রামীণ ভারতবর্ষকে তিনি তুলে ধরতে সচেষ্ট হয়েছেন। দেশজ- লোকজ ঘরনার কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে তিনি অন্যতম। এই গ্রামীণ প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেছেন-

“ শহরে যখন থাকি, তখন মনে হয় গ্রামে চলে যাই, গ্রামে গিয়ে থাকি। পাখি, গাছপালা, পুকুর এইসব। এই নিসর্গ চিত্রগুলো আমার চোখে ভাসে। আর যদি বিশেষ কোনো ছবির কথা বলতে চাও তাহলে বলবো আমাদের গ্রাম, গ্রামাঞ্চল তো, পূর্বদিকে ধাপে ধাপে মাঠে নেমে গেছে নদীর দিকে। তো নদী আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় দু মাইল।“(‘বিনির্মাণ ১২’, জানুয়ারি ২০১৩, পৃ.৮৪)

মুসলিম জীবন নিবে লেখা একটি অসাধারণ গল্প হল ‘জুলেখা’। সিরাজ সাহেব মানবতার শিল্পী। তিনি নিছক মুসলিম জীবনের ধর্মান্ধতায় বিশ্বাস করেন না। অসাধারণ বর্ণনাভঙ্গির দ্বারা তিনি তুলে ধরেছেন জুলেখা ও অঞ্জুমানের বাল্যজীবনের ভাঙা- গড়ার কাহিনি। জুলেখা কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ে। পদ্মা নদীর ধারের যেসব গরিব মানুষের দল রাঢ় অঞ্চলে ভাত খাওয়ার লোভে আসতো তাঁদের দলেই এসেছিল জুলেখা। সেই জুলেখা ও অঞ্জুমানের বাল্যজীবনের যে নিবিড় সখ্য গড়ে উঠেছিল তাঁকে কেন্দ্র করেই এ গল্পের কাহিনি নির্মিত হয়েছে। নারীর মধ্যে রয়েছে ভালোবাসার বীজ, আর সেই ভালোবাসাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে একটি বৃত্ত কিন্তু নারী বিকেন্দ্রীভূত হলে বৃত্ত শূন্য হয়ে যায়- আর সেই ভাঙা বৃত্তেই এ গল্পের পরিণতি পৌঁছেছে। অঞ্জুমানের থেকে জুলেখা দুই বছরের বড় হলেও তাঁদের কোনো বাঁধাধরা নিয়ম ছিল না। নারী মানেই নীড়, নারী মানেই বিবাহ। কিন্তু জুলেখার যৌবন তখনও বিকশিত হয় নি। অন্যদিকে অঞ্জুমান ভেবেছে জুলেখার বিবাহ হয়ে গেলে সে তাঁর খেলার সাথি হারাবে, প্রিয় সঙ্গী হারাবে এজন্য সেও চেয়েছে যেন বিবাহ না হয়। সব মিলিয়ে এটি বিপন্ন শৈশবের গল্প। অঞ্জুমানের প্রিয় সাথি কালু কুকুরকে হত্যা করে প্রথমে ডিপুটি মামা তাঁদের দলের যে ভাঙন ধরিয়েছিলেন শেষে জুলেখাকে নিয়ে গিয়ে অঞ্জুমানের বুক শূন্য করে গিয়েছেন। বাল্য, কিশোর ও যৌবনের প্রবেশ এই তিনটি পর্যায় লেখক অতন্ত্য সুন্দর ভাবে দেখিয়েছেন। প্রথম জীবনে অঞ্জুমান জুলেখাকে স্পর্শ করতে চাইলে জুলেখা সম্পর্কের প্রশ্ন তুলতো। অঞ্জুমান যখন বড় হলে সেই তাঁকে বিবাহ করতো তখন জুলেখা বলেছে সে তাঁর পিসি হয়, পিসিকে বিবাহ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আজ জুলেখা যৌবনে প্রবেশ করেছে যৌন সত্তাগুলি বিকশিত হয়েছে। জুলেখা প্রথম যৌনতার স্বাদ পেতে চেয়েছে অঞ্জুমানের কাছ থেকেই। ভিন্ন পুরুষকে সে মেনে নিতে পারেনি-

“ জুলি আমাকে সে রাতে আদরে অস্থির করে ফেলেছিল। সে আমার গালে ঠোঁটে রেখে ফিসফিস করে অনর্গল কথা বলেছিল। সে বলছিল, ‘শিগরির- শিগগির তুমি বড়ো হয়ে ওঠো। সোনার ছেলেটা ! তুমি যদি বড়ো হতে, কে সাহস পেত আমাকে বিয়ে করার ? সে দু –হাতে আমার মুখটা আঁকড়ে ধরে আবেগে ছটফট করে বলছিল ‘ছোটো বেলাকার মতো আমার নাক চুষে দাও। আমার গাল কামড়ে খেয়ে ফেলো।‘ আমি চুপচাপ দেখে সে কাত হয়ে চুল খুলে সেই চুল ছড়িয়ে আমাকে ঢেকে দিতে দিতে বলছিল ‘আমার এই চুলগুলো তুমি কত ভালোবাস। এই নাও তোমাকে চুল দিয়ে লুকিয়ে রাখলাম।“ (‘জুলেখা’, ‘ শ্রেষ্ঠ গল্প’, তৃতীয় সংস্করণ ১৪১১, দে’জ, পৃ. ১৪৮) 

মুসলিম সমাজে নারী সম্পূর্ণ পরাধীন, তার সমস্ত আশা- আকাঙ্ক্ষা বির্সজন দিতে হয় পরিবারের ইচ্ছার কাছে। ব্যতিক্রম নয় জুলেখাও। তাই বিপত্নীক মামা ডেপুটি ম্যাজিস্টেটের সঙ্গে বিবাহ করতে হচ্ছে। ভুলে যেতে হচ্ছে অঞ্জুমানকে। অঞ্জুমান ও জুলেখার স্নেহের বাল্য জীবন বিপর্যস্ত হতে চলেছে, আর পাঠকের মনে পড়ছে সেই স্মরণীয় উক্তি- ‘বুঝিবা বাল্যপ্রণয়ে অভিসম্পাত আছে।‘

        নকশাল আন্দোলন, জমি পাট্টা ও জমিদারের শোষণ নিয়ে একটি অসাধারণ গল্প হল ‘মাটি’। এ গল্পের মূলে আছে শোষণ কিন্তু গল্পমূল্য বিচারে স্বতন্ত্র। জমিদার – কৃষকের দ্বন্দ্ব সমাসে কৃষক কীভাবে নিঃস্ব হয়ে যায় তারই করুণ চিত্র উঠে এসেছে এ গল্পে। আশির দশকে পাট্টা প্রথায় জমি পেলেও বহু জমিদারের অত্যাচারে সে জমি টিকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না তা উঠে এসেছে। তেমনি স্বাধীনতার কুড়ি বছর পরেও জমিদারি শাষণ অব্যাহত ছিল, কারো ভাগ্যে একশো বিঘা আর কেউ নিঃস্ব। সেই নিঃস্ব মানুষদেরই প্রতিনিধি ল্যাংচা ফৈজু। পাট্টা প্রথায় সে জমি পেয়েছিল একুশ শতক,সঙ্গে ব্যাঙ্ক থেকে লোন পেয়েছিল  হাল বলদ ও বীজ। অভাবী পেয়ে সে কেঁদে ফেলেছিল। জীবনে প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও সে উঠে দাঁড়িয়েছিল। নানী ফতেমার কথা মতো বিবাহ করতে রাজি হয়েছিল। বিবাহ করে এনেছিল কালা বোবা এক কন্যাকে। কিন্তু বিধাতা বিরূপ। ফৈজুর জীবনে যখনই সুখের আভাস এসেছে তখনই সে জমির দিকে নজর যায় মোক্তার কানুহরির। জমিদারের অত্যাচারে সমস্ত ফসল নষ্ট হয়ে যায়। জমি, ফসল হারিয়ে অনিশ্চিত জীবনের সন্ধানে ফৈজু পাড়ি দেয় শহরে। স্ত্রী-পুত্র থাকায় এখন দায়িত্ববোধ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। শহর থেকে ফিরে এসে দেখে পুত্রের মৃত্যু হয়েছে। এভাবেই ভেঙে গেছে একটি মুসলিম পরিবার- ট্র্যাজিক চরিত্রে পরিণত হয়েছে ফৈজু। লেখক অনবদ্য গদ্য ভাষায় ফৈজুর জীবনের পরিণতি তুলে ধরেছেন-

“ নিষ্ঠুর মুখে বুড়ি বলল, ছেলে কি আছে বাপ ? চিমসে হয়ে ঝুলত কোলে। বাছা আমার গোরে শুয়ে আছে শান্তিতে। ফৈজুর বাপের মন। গোরস্থানে গিয়ে ছেলের কবর খুঁজে হন্যে হয়। তিন মাসের বাচ্চা। ভিড়ের অলায় চাপা পড়ে আছে কোথায়। ফৈজু যায় শ্বশুর লেদুমিয়ার গাঁয়ে। মিয়ার ভিটেতে ঘুঘু চরছে। বিটিতে নিয়ে বাপ চলে গেছে শহরে। শহরে সুখ, গাঁয়ে অকাল বারোটা মাস। কুড়িয়ে খেলেও দুটো মানুষের পেট ভরে যারে।“(‘মাটি’, ‘গল্প সমগ্র’ প্রথম খণ্ড, প্রথম প্রকাশ ২০১৩, করুণা প্রকাশনী, পৃ. ১৭৬) 

নিয়তিবাদ, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা, মুসলিম সমাজের প্রথাবদ্ধ সংস্কার ও সংস্কারকে অতিক্রম করে স্বাভাবিক ভাবে বাঁচা, তাঁকে কেন্দ্র করে ব্যঙ্গ- বিদ্রুপ সমস্তই প্রাধান্য পেয়েছে ‘দিওজেনিসের মৃত্যু’ গল্পে। ধর্মকে অবলম্বন করেই বেঁচে থাকে গ্রামীণ জীবন, সেই গ্রামীণ জীবনে প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে আঘাত আনলে বরণ করে নিতে হয় একঘরে জীবন, পদদলিত হতে হয়েছে এ গল্পের মহতাবকে। মুসলিম সমাজের প্রচলিত ধর্মীয় আচার নিয়ম মানে না মহতাব – এজন্য সমাজের কাছে বারবার গ্লানি সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে। এজন্য কোনো ক্ষোভ দুঃখ নেই মহাতবের। গ্রাম্য জীবনে এক নিঃসঙ্গ নায়ক মহতাব। সে আজ মৃত্যুপথযাত্রী, তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই এ গল্পের প্রেক্ষাপট গড়ে উঠেছে। সবাই ভেবেছে মহতাবের নরকে স্থান হবে। মৃত্যু শয্যায় সবাই প্রার্থনা জানিয়েছে মহতাবের কাছে সে যেন ক্ষমা চেয়ে নেয় সবার কাছে। কিন্তু মহতাব মেরুদণ্ড শক্তিশালী এক যুবক, জীবনে সে কারো কাছে কৃপা ভিক্ষা প্রত্যাশী নয়। সে মুসলিম ধর্মীয় নীতি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পালন করতে অনিচ্ছুক। মহতাবের এই বৈরাগ্যের কারণ পরিস্ফুটনেই গল্পের কেন্দ্রীয় সত্যটি উঠে আসে।কবর শয্যায় মহতাব শুধু ক্ষমা ভিক্ষা চেয়েছে ওহিদের কাছে। কেননা ওহিদের মৃত্যু ঘটেছিল মহতাবের জন্যই। মহতাবের প্রণয় ছিল ওহিদের স্ত্রীর সঙ্গে। তাই ওহিদের মৃত্যু ঘটলে মহতাব বিবাহ করতে পারবে তাঁর স্ত্রীকে। ফলে ওহিদের বাঘের মুখে পড়তে হয়েছিল। কিন্তু মহতাব শেষ পর্যন্ত ওহিদের স্ত্রীকে বিবাহ করেনি- বিবাগী হয়ে গেছে। তাই কবর শয্যায় ক্ষমা চেয়েছে ওহিদের কাছে-

“ না । কথা দিয়ে কথা রাখলে না। ইদিকে খামকো আমাকে একটা লোকের কাছে দূষী করল। সে মরার আগে বলে গেল, তুইও জানতিস মাগী ! আমি মাথা ভেঙে বললাম, বিশ্বেস করো। …. সে দু হাঁটুর ফাঁকে মুখ ঢুকিয়ে আবার কান্নাকাটি জুড়ে দিল। বুঝলাম, অকারণ একটা অতীতকাল বয়ে এনে এই প্রাক্তন নায়িকার ওপর ছুঁড়ে ফেলেছি। ওকে আঘাত করেছে।“(‘দিওজেনিসের মৃত্যু’ ঐ, পৃ. ৩৮১)

কিন্তু এখন প্রশ্ন হল গল্পের নাম ‘দিওজেনিসের মৃত্যু’ কেন ? লেখক মহতাবের মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন গ্রীকবীর দিওজেনিসের ছাপ। দিওজেনিসের প্রেমে পড়েছিল করিনাথের রাজকুমারী ইডোরা। কিন্তু ইডোরার সাথে বিবাহ হয় দিয়াক্রসের। ফলে দিওজেনিসের চক্রান্তে দিয়াক্রসের মৃত্যু ঘটে। কিন্তু দিওজেনিসের আর বিবাহ করে নি ইডোরাকে। সেই দিওজেনিসের ছাপ লেখক দেখেছেন মহতাবের মধ্যে। তবে মহতাবের মৃত্যুর পর কোনো মৃর্তি স্থাপিত হয় নি। সে এক অতিসাধারণ মানুষের মৃত্যু বলেই বিবেচিত হয়েছে। আসলে মহতাব ভারতবর্ষের মানুষ। ভারতবর্ষের প্রতিবাদী মানুষদের পরিণতি বোধহয় এমনই হয় !

                                                              সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের ‘কুর্শি- নামা’ গল্পের কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই মনে পড়ে প্রফুল্ল রায়ের ‘সাতঘোরিয়া’ ও অমর মিত্রের ‘হস্তান্তর’ গল্পের কথা। ‘সাতঘোরিয়া’ গল্পে দেখা যায় চাঁপিয়া নামে এক নারী সাত নম্বর ঘর করতে চলেছে। চাঁপিয়ার প্রথম বিবাহ হয় পঁচিশ বছর বয়সে। মাত্র পনেরো বছরের মধ্যেই তাঁকে পাল্টাতে হয়েছে ছয়টি ঘর, শুধুমাত্র জীবনে বেঁচে থাকার জন্য সমান্য খাদ্যের প্রয়োজনে। ভয়ংকর জীবন চাঁপিয়ার, বিবাহ যেন ছেলেখেলা –

“ বন্যায় চাষের জমি ডুবে যাওয়ায় জমি মালিক কাজ থেকে তাকে ছাড়িয়ে দেয়। সুতরাৎ বিয়েও বরবাদ। পাঁচ নম্বর বিয়েটো চৌপট হল মরদ মরে যেতে। ছ- নম্বর বিয়েটা ভাঙলো আজন্মার জন্য।“(‘সাতঘোরিয়া’, ‘প্রফুল্ল রায়ের শ্রেষ্ঠ গল্প’, নবম সংস্করণ ২০১১, দে’জ, পৃ ১৬০)

তবু চাঁপিয়া ভেঙে পড়েনি, বিবাহ যেন নতুন করে বেঁচে থাকার কৌশল। অন্যদিকে অমর মিত্রের ‘হস্তান্তর’ গল্পের বিষয় হল মুসলিম পরিবারের বিবিজান নামে এক নারীর হস্তান্তর। বিবিজানের বিবাহের সংখ্যা চার। কাউকে পচন্দ হয় নি জীবিকার জন্য, কেউ মনের উপযোগী নয়, কেউ বা যৌন পিপাসা চরিতার্থ করতে অক্ষম। মুসলিম এক নারীর স্বাধীন জীবনের ইতিবৃত্ত তুলে ধরেছেন লেখক। তেমনি সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ‘কুর্শি- নামা’ গল্পে সালমা নামে এক প্রতিবাদী নারীর ব্যক্তি স্বতন্ত্রতার সাতকাহন লিপিবদ্ধ করেছেন। সালমা যেন রবীন্দ্রনাথের ভাষায় – এ নারী খেলা করবার নয়, এ নারীকে নিয়ে ঘর বাঁধা যায় না। মুসলিম সমাজের প্রচলিত সংস্কার সে ভেঙে দিয়েছে। সংসারের বদ্ধ নিয়মে আটকে থাকা নারী সে নয়। সেকেন্দারের বিবি থাকার সময় সে অন্তঃপুর থেকে বহিঃবিশ্বে পা দিতে চেয়েছে – যা সেকেন্দারের অন্য বিবিদের ভালো লাগে নি। এখন প্রশ্ন হল সালমার এই প্রতিবাদী চরিত্রের উৎস কোথায় ? সালমা এক ধর্ষিতা মেয়ে, ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র্যতাকে সঙ্গী করে বড় হয়ে উঠেছে। সালমার প্রতিবাদী চরিত্রের দুটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা যাক –

ক. “ আমাকে চমকে দিয়ে ঘর থেকে সালমা চেঁচিয়ে উঠল- খর্বদার মাগী মাগী করবিনে গুখেকোর ব্যাটা। তোর চৌদ্দপুরুষের চৌদ্দটা বউ মাগি।“

খ. “ সালমা বলল – মরে যাই ! চলে আয় বললেই বুঝি আর যাওয়ার হবে ! তুমি চলে যাও মিয়া, সালমা মির্জার বাড়ি থেকে আর যাচ্ছে না।“ (‘কুর্শি –নামা’, গল্প সমগ্র, তদেব, পৃ.৪৬)

চরম দারিদ্র্যতাকে সঙ্গী করেই বড় হয়ে উঠেছে সালমা। কিন্তু সে লোভী নয়। লেখক সালামাকে মহৎ করে অঙ্কন করেছেন। তাই সেকেন্দারের বাড়ি থেকে তালাক নিয়ে যাওয়ার সময় সে সমস্ত পরিত্যাগ করে গেছে কুর্শিনামা। সৈয়দ মুস্তফা সিরাজকে এজন্যই আমারা ভারতীয় কথাকার বলতে চাই সে সব সময় বিভেদ ঘোঁচাতে চেয়েছেন। মনে পড়ে ‘ভারতবর্ষ’ গল্পের কথা, এ গল্পের সালমা কুর্শি-নামা চুরির মাধ্যমে মুসলিম সমাজের শ্রেণিগত বিভেদ দূর করতে চেয়েছেন। আসলে এক ভারতীয়ত্ববোধের সন্ধানই ছিল তাঁর গল্প উপন্যাসের মূল কথা। এজন্যই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন –“আমরা থাকব না, কিন্তু সিরাজের নাম বাংলা সাহিত্যে থেকে যাবে।“

30