মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য

 রসনা,জুন১৬,২০২০: মঙ্গোল সেনাবাহিনীকে যদি দশ দিনের পথ যেতে হত তাহলে প্রত্যেককে দেওয়া হত আঠারোটা ঘোড়া। শুধু ঘোড়ার রক্ত চুষে খেয়েই তাদের খিদে মিটত। ঘোড়ার একটা বিশেষ শিরা কেটে দেওয়া হত। সেখানে মুখ লাগিয়ে একপেট রক্ত খেত তারা। দৈনিক একটা ঘোড়া থেকে আধ পাঁইটের বেশি রক্ত নেওয়ার নিয়ম ছিল না। কেননা বেশি রক্ত নিলে কাবু হয়ে পড়বে ঘোড়া। মারা পড়বে। 

তেরোশো শতকে মার্কো পোলোর লেখা এই বিবরণ পড়ে চমকে ওঠাই স্বাভাবিক। আসলে মানুষ না খায় হেন প্রাণী নেই। সাপ, ব্যাং, টিকটিকি, ইঁদুর, আরশোলা, ফড়িং সবই মানুষের খাদ্য। চিনে পাখির বাসার ঝোল উপাদেয় খাবার। নেফা অঞ্চলে কুকুরকে মাংস খাইয়ে মাথার ওপর তুলে ঘুরিয়ে তার পর কুকুরের বমন থেকে মাংস উদ্ধার করে খাওয়ার চল আছে। একসময় প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ পশুর পাকস্থলীর মধ্যেকার উষ্মতায় পক্ক মাংসের আস্বাদ পছন্দ করত। সেই রীতি এখনও টিঁকে আছে। 

বাঙালির জিভে অবশ্য সাপ ব্যাং ইঁদুর শকুন সহ্য হবে না। আমাদের রোজের রুটিনে ঠাঁই করে নিয়েছে মাছের ঝোল। মাছেরও আবার জাত আছে। বাজারে গেলে দেখা যায় সমস্ত ভিড়টা বিশাল সাইজের ইলিশ, কাতলা, রুই কিংবা রাক্ষুসে আকৃতির চিতলের পেটির দিকে। তাদের আসন উঁচু চাতালে। মাথার ওপর চকচকে বিজলির আলো। কিন্তু চুনোমাছের জায়গা বাজারের এক প্রান্তে। মাটিতে। সেখানে মাথার ওপর দুশো পাওয়ারের বাল্ব জ্বলে না। রোদ্দুরের রং ধার নেয় লোকাল মাছেরা। তার মধ্যেই রসিক বাজারু ঠিক খুঁজে নেন উজ্জ্বল হলদে, রুপোলি আর সাদা মেশানো বোরোলি মাছেদের। বিহার থেকে আসা বরফ দেওয়া চালানি বোরোলি এড়িয়ে গিয়ে তাঁরা ঠিক পৌঁছে যান ছিপছিপে কবিতার মতোই স্লিম অ্যান্ড ট্রিম ফিগারের তিস্তার টাটকা বোরোলি বিক্রেতার সামনে।

বোরোলির কথা বলতে গেলে চলে আসে কবীরচাচার কথা। সাদা ফুলপ্যান্ট আর ঢোলা সাদা শার্ট পরা সাদা চুলের কবীরচাচা সার্কিট হাউজের কিচেনের দায়িত্বে ছিলেন দীর্ঘকাল। কখনও কাজের সূত্রে সেখানে গেলে একবার ঢুঁ মারতাম পাকঘরে। অদ্ভুত অদ্ভুত সব রান্না চেখে দেখতে দিতেন। মুচকি হেসে পড়া ধরার মতো করে সেই রান্নার উপাদানগুলি জানতে চাইতেন।   কখনও বলতে পারিনি। আমার বোকাবোকা মুখ দেখে কবীরচাচার করুণা হত। ভেঙে বলতেন সব। হাঁ হয়ে যেতাম শুনে। সাধারণ আলু পটল কুমড়ো দিয়েই জাদু দেখাতে পারতেন তিনি। একবার কী কী সব মশলা দিয়ে তৈরি ফুলকপির রোস্ট খাইয়েছিলেন। অমন উপাদেয় জিনিস তার আগে কখনও খাইনি। হেসে বলেছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায় আর তাঁর স্ত্রী মায়া রায়ের খুব পছন্দের জিনিস ছিল এটা। 

কবীরচাচার রান্নার কনোশয়ার ছিলেন স্বয়ং জ্যোতি বসুও। কখনও নিভৃতে ছুটি কাটাতে হলং বাংলোতে এলে অবধারিত ভাবে ডাক পড়ত ওঁর। চাকরি থেকে অবসর নেবার পরও কবীরচাচাকে তলব করা হত। আসলে কবীরচাচার হাতের বোরোলি মাছের ঝোল ছিল এই রাজ্যের দোর্দণ্ডপ্রতাপ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ভীষণ প্রিয় খাবার। কালো জিরে কাঁচা লংকা দিয়ে সেই পাতলা ঝোলে হলুদ একটু বেশিই দিতে হত। সেটাই ছিল ওঁর নির্দেশ। 

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যও পছন্দ করতেন কবীরচাচার হাতের বোরোলি মাছ। ভাজা ঝোল চচ্চড়ি কিছু একটা হলেই হল। ঝুমকোবেগুন আর টমাটো পেঁয়াজ দিয়ে একরকম রসা-ও বানাতেন কবীরচাচা। এখনকার মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য বেশিদিন কবীরচাচাকে পাননি। তিনি মসনদে বসার কিছুকাল পর ইন্তেকাল হয়ে গিয়েছিল এই আশ্চর্য মানুষটির।

পূর্ণিমার শেষরাতের চাঁদ যখন তার সমস্ত ঐশ্বর্য উজাড় করে ঢেলে দেয় মরা তিস্তার জলে তখন জলের মধ্যে হলদে আর রুপোলি ঝিলিক তোলে বোরোলি মাছের দল। এরাই জলপাইগুড়ির রুপোলি অভিজ্ঞান। তবে এটাও ঠিক যে, এর স্বাদের সূক্ষ্মতা বুঝতে পারে কেবলমাত্র বাঙালি রসনা। 

মানুষের খাদ্যাভ্যাস যুগে যুগে বদলায়। এক জায়গার মানুষের খাদ্য অন্য অঞ্চলের মানুষের কাছে ভক্ষ্য না-ও হতে পারে। চিনেম্যানদের বিজাতীয় খাদ্যবস্তু আমাদের জিভে জল আনে না। তবে হলফ করে বলতে পারি কবীরচাচার হাতের বোরোলি মাছের ঝোল প্লেটে পেলে চেটে চেটে খেত চিনেম্যানরা।

185