মৃন্ময় গোস্বামী

জুন ১৩,২০২০: মন্মথর শরীরটা দীর্ঘদিন যাবৎ ভালো যাচ্ছে না। কোনো কিছুতেই আজকাল তার মন বসে না।পড়াশুনো লেখালেখি ছেড়েই দিয়েছে।কাজ করতে ভালো লাগে না।কাগজে পড়ছে, খবরে শুনছে,দেশের আর্থিক পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর খারাপ। চাকরিতে নাকি ব্যাপক ছাঁটাই হবে।এই খবরে সে বেশ উৎফুল্ল হয়।কারণ, চাকরিটা গেলে সে বাঁচে।পেনশনটা না থাকলে আরো ভালো হতো।তাহলে বাজার করবার ঝামেলাটাও থাকতো না।উঠে দাঁড়ালেই শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। এ কী হল হোলো তার!খোলা জানালার ধারে বালিশে মাথা রেখে, বাইরের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে সে ভাবছে, এই ভাবে তো আর চলে না। এই পরিস্থিতি থেকে তাকে ঘুরে দাঁড়াতেই হবে।আসলে সে ধরেই নিয়েছে যে, তার শরীরের শক্তির ভান্ডার শূন্য। সে ভাবতে লাগলো তার পরিচিত রুগীদের কথা।ষাঁড়ের মতো স্বাস্থ্যের অধিকারী নব্বই কেজির নৃপেন রোগে ভুগে নিংড়ানো গামছার মতো হয়ে গিয়েও দিব্যি টগবগিয়ে ছুটছে। পরিতোষএর মাসতুতো ভাই তিন তিনবার হার্ট এ্যটাক সামলে নিয়েও নিয়মিত বনগাঁ শিয়ালদা ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করে।এই সমস্ত মানুষের কথা ভেবে হঠাৎ সে শরীর ও মনে শক্তি ফিরে পায়। মাঘের মাঝামাঝি ঝলমলে আকাশ। গাছপালায় সোনাগলা রোদ লেপটে রয়েছে। অপরূপ দৃশ্য দেখে, মনটা তার কেমন যেন সুস্থ সুস্থ হয়ে ওঠে।এজ ঝটকায় বিছানায় উঠে বসে।বিছানা থেকে মেঝেতে পা রাখবার আগে সে জানালা দিয়ে দেখতে পায়, পাখিরা আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে।হঠাৎ তার ভাবনা ডানা ম্যালে। পাখিদের কাছ থেকে মন্মথ শিক্ষা পায় যে, ঘরে থাকলেই রোগ চেপে ধরবে।তার মনটা কাব্যিক হয়ে ওঠে।বাংলা ভাষার গাদাগুচ্ছের কবিতার মধ্যে থেকে একটা কবিতা তার কণ্ঠে ভর করে।তার ঠোঁট নড়ে ওঠে।মুখগহ্বর থেকে শব্দ নির্গত হয়ে কথার সৃষ্টি করে।সে কথাগুলো আওড়ায়। কথাগুলো কবিতা হয়ে ওঠে, 'থাকবো না কো বদ্ধ ঘরে, দেখবো এবার জগৎটাকে।" জগৎটাকে দেখার প্ল্যান করতে করতেই বোশেখ চলে আসে। নতুন বছর মন্মথকে নতুন ভাবে ভাবায়। বেরোতেই হবে। বেরোনোর আগে জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে থাকে। মাথায় চিরুনি বুলোতে বুলোতে তার দৃষ্টি চলে যায় প্রতিবেশী অসীমবাবুর আম গাছে।সমস্ত গাছ যৌবনে ভরপূর আমে ভরে রয়েছে। আম দেখতে দেখতে তার মনটা কেমন উদাস হয়ে যায়। আমের কথা ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে যায় বিভূতিবাবুর অপুদূর্গার কথা।ঝড় জলে এম কুড়োনোর কাহিনী। মনে পড়ে বিখ্যাত পথের পাঁচালীর কথা। এবারে বাস্তবে চলে আসে। ভাবতে থাকে আম বড়ো হয়েছে। এখন আম পাকবে। বাজারে আমের গন্ধ। নীল নীল মাছি।বাড়িতে আমের আগমন। ফলের রাজা আম। এই দেশেই কত রকমের আম আছে। দেশের রাজা মহারাজরা তাঁদের বাগানে কতরকমের আম চাষ করতেন!নামের কী বাহার তাদের!দেশের রাজধানীতে জাতীয় ফল আমের উৎসব হয়।টি.ভি.তে দেখা যায় আম উৎসবের ছবি।কত মানুষ আম খাওয়ার উৎসবে যোগ দেয়।বাব্বা এরা খেতেও পারে!কিন্তু এই আম কি খাওয়া ভালো? মন্মথর ভাবনার গতি পাল্টে যায়। কী হবে আম খেয়ে!আমের সময় তো অন্য একটা ফল ও হয়।তার নাম জাম। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে। তার মনে পরে যায় সেই প্রবাদটা।"আম খেয়ে হয় যদি আমাশা। জাম খেয়ে দেখো তার তামাশা।" সত্যিই কি! যদি আম খেয়ে আমাশা হয়।তাহলে জাম খেলে কি সেই আমাশা সারে! তাহলে তো আমাশার বড়ি এন্ট্রোকুইনালের বাজার শেষ। ভাবতে ভাবতেই কাজ শুরু।মন্মথর তলপেটে মোচড় মেরে ওঠে।সঙ্গে সঙ্গে লুঙ্গির গিঁটটা মুঠো করে ধরে লাগায় ছুট। মন্মথর ছুট লাগানো দেখে বউ জোনাকি খিঁচিয়ে ওঠে। এই পড়ন্ত বিকেলে বেডরুমে একশো মিটার রান দেওয়া শুরু করলে কেন মুখপোড়া? ওদিকে মন্মথ দড়াম শব্দে পায়খানার দরজা বন্ধ করে সেই শব্দেই বউএর প্রশ্নের উত্তর দেয়। কিছুক্ষণ পর মন্মথ পায়খানা থেকে মুখ ব্যাজার করে বেরোয়। মুখে একটা অতৃপ্তির ছোঁয়া। জোনাকি বলে, কুইনাইন খাওয়া মুখ করে আছো কেন? মন্মথ মুখের জিওগ্রাফি না পাল্টেই উত্তর দেয়, বুঝলে, কিলিয়ার হোলো না। তোমার কোনোদিন কিলিয়ার হবে না। সেই বিয়ের পর থেকেই শুনছি, তোমার রাতে ঘুম হয় না আর কোনোদিন কিলিয়ার হয় না।এদিকে বাড়িতে যা রান্না হয়, তার চার ভাগের তিন ভাগই তো তোমার উদরস্থ হয়। বলি তলা দিয়ে যদি কোনোদিন কিলিয়ার না হয়, তাহলে উপর দিয়ে ওতো মাল ঢোকে কী করে?খাবার চিবোতে চিবোতে তো তোমার দাঁত ক্ষয়ে ক্ষয়ে মাড়িতে এসে ঠেকেছে। মন্মথ ধপ করে মেঝের ওপর বসে পড়ে। ঠিক-ই ছিলাম গো জোনাকি। খুব সুস্থ সুস্থ লাগছিলো। জানালা দিয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করছিলাম। হঠাৎ চোখ আটকে গেলো আম গাছে। বড়ো বড়ো আম। প্রকৃতির কি লীলা। এই সেদিন ছিলো সোনালী মুকুল আর আজ একেবারে পাকা আম। এই আমের কথা ভাবতে ভাবতেই তলপেটটা মুচড়ে উঠলো। তুমি মরবে। ঐ আম-ই তোমাকে শেষ করে দেবে।আমি হলফ করে বলতে পারি, তুমি মারা যাবার পর তুমি যদি তোমার রেক্টামে হাত দিয়ে দেখো নির্ঘাৎ তোমার রেক্টামে আমাশার আম লেগে থাকবে। মন্মথ হতাশ হয়ে বলে, আমি মারা যাবার পরও আমার আম পড়বে? এ কী সব্বোনেশে ব্যাপার! ঐ আমাশা নিয়ে আমি শ্মশানে যাবো কী করে? রাস্তায় যদি পায়খানা পেয়ে যায়। ,এবারে মন্মথ বউয়ের ঘনিষ্ঠ হয়ে বলে, জানো জোনাকি,আমি মারা যাবার আমার কোনো বিপদ হলে সেটা আমি সামলে নেবো। কিন্তু জীবন্ত অবস্থায় আমার এ কী দশা! দশ পা-ও হাটতে পারি না। জোনাকি কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলে ডুকরে কেঁদে ওঠে। সে কি গো!হাঁটুতে ব্যাথা হোলো নাকি?ওটা ভারি বাজে রোগ। ও রোগ সারে না।এ আমার কি হোলো গো! মন্মথ ব্যস্ত হয়ে বলে,তোমার আবার হোলো টা কি? জোনাকি বলে, হয় নি। হবে। সে কী গো!তোমারও আমাশা হবে? না গো। তোমার হাঁটুতে ব্যাথা হলে আমি কী করে খাবো? মন্মথ জোনাকির কথার ধরণ বুঝতে না পেরে বলে, দেখো জোনাকি, তোমার কথাবার্তা আমার যেন কেমন কেমন ঠেকছে।আমার মনে হচ্ছে, হয় তুমি পাগল হয়ে গিয়েছো নয়তো লুকিয়ে লুকিয়ে এম. এ. পাশ করেছো। জোনাকি বলে, ঘটে কোনো বুদ্ধি থাকলে তবে তো বুঝতে পারবে? আরে বাবা, তোমার হাঁটুতে ব্যাথা হলে তুমি বাজারটা করবে কী করে?আর বাজার না করলে আমি খাবোটা কী! মন্মথ বলে,আমার হাঁটু ব্যাথা সে কথা এ কথা তোমাকে কে বললো? কেন? তুমিই তো এইমাত্র বললে যে, দশ পা হাঁটতে পারো না। ওঃ দশ পা হাঁটার কথা?সত্যি জোনাকি, আমি হাঁটলেই আমার পেছনটা কেমন পেছল পেছল লাগে। এ নির্ঘাত আম। এই শালা বারোমেসে আম নিয়ে আমি একেবারে জর্জরিত হয়ে গেলাম। জীবনটাই হেল হয়ে গেলো। কত ডাক্তার দেখালাম। কত বড়ি খেলাম। কবরেজ টোটকা কিছুতেই কাজ হোলো না। কত কাকুতি করে ডাক্তারদের বলি, আমার আমাশাটা সারিয়ে দেওয়ার জন্যে। কিন্তু ডাক্তাররা পাত্তাই দেন না। ওটা নাকি আমার মনের রোগ।আচ্ছা জোনাকি, তুমিই বলো, এর কোনো মানে হয়! কোথায় আমের অবস্থান আর কোথায় মনের অবস্থান।তুমিই বলো, আম আর মনের অবস্থানের দূরত্ব কম করে আড়াই থেকে তিন ফুট তো হবেই। কি,ঠিক বলছি তো?মন্মথ হতাশায় ভেঙে পড়ে জোনাকিকে বলে, জোনাকি, আমার আম কি কোনোদিন কমবে না? জোনাকি আশ্বাস দিয়ে বলে, নিশ্চয় কমবে। কী করে? জোনাকি বলে, আমার ওষুধেই তোমার আম কমবে। মন্মথ উচ্ছসিত হয়ে বলে, ওষুধ কি স্বপ্নে পেয়েছো?দাও না। দাও না, তোমার স্বপ্নে পাওয়া ওষুধ।তোমার চিকিৎসায় একটু মানুষের মতো বাঁচি। জোনাকি বলে, দেবো। দেবো। সময় হলেই দেবো। বোশেখ যায় জৈষ্ঠ গিয়ে আষাঢ় আসে।আকাশ কালো করে মেঘ। মেঘ দেখে মনে হয় কোদাল দিয়ে মেঘ কেটে এম যাবে। সঙ্গে প্রচন্ড গুমোট। মন্মথ দড়দড়িয়ে ঘামছে।আকাশ ভেঙে নেমে এলো প্রবল বর্ষা সঙ্গে প্রবল শিলাবৃষ্টি। জোনাকি ঐ প্রবল শিলাবৃষ্টির মধ্যেই বারান্দা থেকে উঠোনে মন্মথকে ঠেলে ফেলে দেয়। মন্মথর সমগ্র শরীরে ইয়া বড়ো বড়ো শিল পড়ছে। মন্মথ শিলের দাপটে যন্ত্রনায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। নিজেকে বাঁচাতে সে বারান্দায় উঠে আসার চেষ্টা করতেই জোনাকি ঘর থেকে দরজার হাঁক দিয়ে মন্মথকে বাধা দিচ্ছে। কিছুতেই তাকে বারান্দায় উঠে আসতে দিচ্ছে না। ঘন্টাখানেক পর শিলাবৃষ্টি থামলো। মন্মথ চিৎ হয়ে উঠোনে পড়ে আছে। তার উত্থান শক্তি রহিত। জোনাকি এবারে মন্মথকে বারান্দায় উঠে আসতে বলে। মন্মথ উঠে আসার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।প্রচন্ড গরমের পর শিলা এবং বৃষ্টিতে মন্মথর বর্তমান অবস্থান ঠিক স্বর্গের আগের স্টেশন।মন্মথর মিনমিন করে বলে, এ তুমি কী করলে জোনাকি! আমি মনে হয় আর বেঁচে নেই। জোনাকি বলে, নাগো না। তুমি মরবে কেন? এটা তো আমের ওষুধ দিলাম। এবার তোমার আম নিয়ে আর কোনো চিন্তা নেই। মন্মথ জানতে চায়, কি করে? জোনাকি মুখ বেঁকিয়ে বলে, আহা! আহা,নেকু আমার!এত বয়স হলো। এত অভিজ্ঞতা তোমার। এত জানো তুমি। আর এটুকু জানো না যে, শিলাবৃষ্টিতে আম নষ্ট হয়।

19