কুলিক রোববার : প্রবন্ধ

বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জনজীবন (পর্ব ৩)

পুরুষোত্তম সিংহ

“চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েই কপাল ফিরল তার। আর যারা ধরা পড়েনি, তারা এখনও নাকনি-চুবানি খাচ্ছে।“ (‘সারেঙ’ তদেব, পৃ. ৫৫৫ ) অচিন্ত্যকুমারের অন্যতম সেরা গল্প ‘সারেঙ’। ব্যাখ্যার দ্বারা এ গল্পের রস পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয় – শ্রেষ্ঠ প্রন্থা গল্পপাঠ। জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা থেকে অচিন্ত্যকুমার গল্প লিখেছেন। তাই তাঁর গল্পে যেমন চরিত্রশালা এসেছে তেমনি ঘটনার ঘনঘটা করেন নি। সংক্ষিপ্ত ঘটনার মধ্যেই দৃঢ়পিনদ্ধ বক্তব্য তুলে ধরেছেন। ‘সারেঙ’ গল্পে মানবিক বোধে উত্তীর্ণ হয়েছে সারেঙ। গোলবানুর আগের পক্ষের ছেলে নাসিম জাহাজের বিনা বেতনে কুলি হয়ে চলে যায়। জাহাজের কর্মচারীদের বিচিত্র জীবন ও অত্যাচারের ইতিবৃত্ত তুলে ধরেছেন লেখক। গল্পের মূল সুর ফুটে উঠেছে শেষে। গ্রামের চাষিদের বহু ফসল ঠকিয়ে নেয় সারেঙ। এমনকি জাহাজের যাত্রীদেরও বহু বিষয় হাতিয়ে নেয়। তেমনি একদিন জাহাজে যাত্রী নতুন বধূর গহনা চুরি করে নাসিম। বরযাত্রীরা নাসিমকে প্রহার করতে শুরু করলে সারেঙ নিজের সন্তান বলে পরিচয় দেয় –

-“আচকান গায়ে, কিস্তিটুপি মাথায়, চটিপায়ে সারেঙ এসে হাজির। বলে, ‘কী হয়েছে ? কে মারছে আমার ছেলেকে ?’

– ছেলে ! সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। সারেঙ সাহেবের ছেলে ।

– কে বল, ‘ও আপনার চাকর ছিল তো জানতাম।‘

– ‘চাকর ! মিথ্যে কথা । ও আমার বিয়ার ঘরের ছেলে। আমার মা –হারা সন্তান। ওকে মারে কে ?” (‘তদেব’, পৃ. ৫৫৫ )

অত্যাচারী সারেঙের এই রূপান্তরই গল্পের কেন্দ্রীয় বিষয়। নাসিম যার গহনা চুরি করতে গিয়েছিল পরে দেখা যায় সে ছিল গোলবানু। যে গোলবানু একদিন নাসিমকে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিল সেই গোলবানুই আজ অন্যের হাত থেকে রক্ষা করেছে নাসিমকে। আর এই চুরির জন্যই পদোন্নতি হয়েছে নাসিমের। গোলবানু ও সারেঙের মহৎ সত্তায় উত্তরণেই গল্পের উপসংহার ঘটেছে।

                    অমর মিত্র তাঁর ‘যাদুজীবন’ গল্পে দেখিয়েছিলেন এক জাদুকরের মৃত্যুতে অন্য জাদুকরের উত্তরণ কীভাবে ঘটেছিল। বংশীলাল মেলায় জাদু দেখাতে এসেছে। রিকসাওয়ালা সুলেমান এসেছে জাদু দেখতে। ক্লান্ত বংশী ঘুমিয়ে পড়েছে আর সুলেমানকে বলেছে মেলায় মানুষের সমাগম হলে ডেকে দিতে। মেলা পরিপূর্ণ হয়ে উঠলেও ক্লান্ত বংশী আর জাগে না। মেলার সবাই ভেবেছে সুলেমানই হয়ত প্রকৃত জাদুকর যে মৃত মানুষকে বাঁচিয়ে তুলবে। অসাধারণ বর্ণনাভঙ্গির দ্বারা লেখক জাদুকর বংশীলালের জীবন তুলে ধরেছিলেন। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘বাঁশবাজি’ গল্পে এসেছে এক মুসলিম জাদুকর মন্তাজের কথা। নিম্নবিত্ত মুসলিম সমাজের প্রতিনিধি মন্তাজ। মেলায় মেলায় পেটের উপর বাঁশ রেখে ঘোড়ানোই হল ‘বাঁশবাজি’ র খেলা। এই সামান্য রোজগারে সংসার চলে না। তাই শরীর জীর্ণ মন্তাজের। মন্তাজ আজ এসেছে মেলায় খেলা দেখাতে। ইতিপূর্বে বড় ছেলে ইন্তাজ বাঁশ থেকে পড়ে গিয়ে জখম হয়েছে, তাই আজ নিয়ে এসেছে ছোটছেলে আকুকে। কিন্তু আকু কান্নায় অস্থির করে ফেলেছে বাঁশ থেকে পড়ে যাবে বলে। আকুর এই কান্না দেখে দর্শকরা কেউই পয়সা দেয় নি, ভেবেছে আজ বোধহয় খেলাই হবে না। তখন এগিয়ে আসে জখম হওয়া বড় ছেলে ইন্তাজ। ইন্তাজের শরীরের বর্ণনা লেখক নিদারুণ ভাবে দিয়েছেন –

“কে যেন হঠাৎ পেটের মধ্যে টেটা ঢুকিয়ে দিল – এমনকি আঁতকে উঠলাম। ছেলেটার বুকে – পেটে টানা-টানা ঘা, কোথাও দগদগ করছে, কোথাও কোসা পড়ছে, কোথাও বা পুঁজ উঠছে দলা পাকিয়ে। সেই ঢনঢনে মাছিটা হঠাৎ আর কটা গুয়ে মাছিকে ডেকে এনেছে। যখন ঘুরে দাঁড়াল ইন্তাজ, তখন খানিক স্বস্তি পেলাম। কেন না পিঠটা ওর মসৃণ নিদাগ।“ ( ‘বাঁশবাজি’ তদেব, পৃ. ৫৯২ )

সদ্য ম্যালেরিয়া থেকে উঠে এসেছে মন্তাজ, শরীর হয়ে গেছে রোগা ধূসর। চাঁপুলির বাবুদের বাড়িতে খেলায় ছেলের ভর সে রাখতে পারে নি। আজ ভেবেছে খেলা দেখানোর আগে কিছু পয়সা পেলে কিছু খেয়ে খেলা দেখাবে। কিন্তু কেউ পয়সা দেয় না। সেই জীর্ণ শরীরে খেলা দেখাতে গিয়ে আজও ইন্তাজের ওজন রাখতে পারে নি – আজও জখম হয়েছে ইন্তাজ। পিতা-পুত্রের এই শোচনীয় জীবনযুদ্ধের গল্প হল ‘বাঁশবাজি’। এ বাজি যেন জীবনের বাজি, পিতা-পুত্রের জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার বাজি। জুয়া খেলা বা বাজি তো চিরদিন টিকতে পারে না, সে তো নিয়মের দাস্যতা স্বীকার করে না। আর যেখানে দারিদ্র্যতা নিত্যসঙ্গী সেখানে বোধহয় একমাত্র বাজি ক্ষুধার তাড়না। জীর্ণ শরীরের ক্ষুধার তাড়নাই আজ মৃত্যুমুখে ঠেলে দিয়েছে পিতা-পুত্রকে। তবে তাঁরা হেরে যায় নি। নতুন ভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন আছে-

“কাছেই দাতব্য চিকিৎসালয়। যতদূর সম্ভব ঘায়ের ছৌঁয়া বাঁচিয়ে ইন্তাজকে ধরাধরি করে কারা নিয়ে গেল ডাক্তারখানায়। ঘটনাটা সদ্যসদ্য ঘটেছে বলে দাতব্য চিকিৎসালয় একেবারে ফিরিয়ে দিতে পারবে না হয়ত। নইলে এমনিতে ঘায়ের ওষুধ নিতে এলে ফিরিয়ে দিত নিশ্চয়ই। কেননা প্রতিবারের ওষুধ নেবার সময় এক আনা করে পয়সা তার হাতে আসে, সে কি তা দিয়ে পেটের উপরের ঘা শুকোবে, না পেটের ভিতরের ঘা ?” ( তদেব, পৃ. ৫৯৩ )

সাহিত্য তো সময়ের দলিল। সময়ের দলিলি করণে অনেকে বিশ্বাস করেন না, তাদের কাছে কল্পনাই প্রধান। আবার অনেকে নিজের চোখে দেখা বাস্তবকে অস্বীকার করেন না। দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটকে কখনোই অস্বীকার করেন নি অচিন্ত্যকুমার। দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে লেখা মুসলিম জীবনকেন্দ্রিক একটি অসাধারণ গল্প হল ‘যতনবিবি’। নামকরণটি ব্যঙ্গাত্মক। যতনবিবির জীবনে যন্ত্রণাই বড় হয়ে উঠেছে। মেষপালক হানিফ জল থেকে সাহেবকে রক্ষা করেছিল বলে সাহেব তাঁর পদন্নোতি করে দেয়। জলের দেশ থেকে সে আসে শুকনো দেশে। কিন্তু সেখানে হানিফের কিছুই ভালো লাগে না। হঠাৎ একদিন হাজির হয় যতনবিবি সামান্য ভাতের জন্য। সেই ভাত নিয়ে যাবে পঙ্গু স্বামী গরিবুল্লার জন্য। সামান্য ভাতের জন‍্য মানুষকে কত সংগ্রাম করতে হয় তা এ গল্পে উঠে এসেছে। স্বামীর প্রতি যতনের ভালোবাসা লেখক অনবদ্য ভাবে তুলে ধরেছেন। হানিফের দেওয়া ভাত সে খায়নি, নানা অভিনয় করে নিয়ে এসেছে। সেই পঙ্গু স্বামীর মৃত্যুতে যতন আজ মুক্তি পেয়েছে-

-“কাঁদোনি ওর জন্যে ?’

– কাঁদবো কেন ? বেঁচে গেছে। বেঁচে গেছে ঘায়ের জ্বালা, খিদের জ্বালার থেকে।‘

– রোজ যেমন, তেমনি করেই খায় যতন, যেন বা অধিকতর তৃপ্তিতে।

– ভাতে আর তার ভাগ নেই হয়ত তারই নিশ্চিন্ততায়। আজকে খাওয়া যেন তার আরোগ্যের খাওয়া।

– কাচের চুড়ি ক’গাছ এগিয়ে দেয় হানিফ। বলে , ‘পরবে নাকি ?’

-যতন আহ্লাদ করে নেয় হাত বাড়িয়ে, বলে,-‘যদি কোনদিন ফের মানুষ পাই মনের মতন, পারবো সেদিন।“ ( ‘যতনবিবি’, তদেব, পৃ. ৫৯৮)

 যতনের প্রতি হানিফের ভালোবাসা আছে, হানিফ সাজিয়ে তুলেছে যতনকে। দুর্ভিক্ষ অতিক্রম করে যতনের যৌবন ফিরে এসেছে। যতন সহজ-সরল গ্রাম্যবধূ, প্রতিদান দিতে ভোলেনি। হানিফের যা সাহায্য তা সবই তো মনিবের টাকায়। যতন প্রতিদান দিতে চেয়েছিল হানিফকে। কিন্তু নয়তি বিরূপ, ফলে যতন আজ হয়েছে মনিবের ভোগের সামগ্রী। যতনের ভালোবাসা গড়ে উঠেছে হানিফের প্রতি। হানিফই তাঁর বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। তাই যতন বলে –

“আমি এমন নেমকহারাম নই । যে আমাকে এতদিন খাওয়ালো –পরালো, যার দৌলতে বেঁচে গেলাম। এই মহামারী থেকে, যার পয়সায় আমার এই শাড়ি-জামা-চুড়ি-বালা তাকে আমি ফেরাতে পারবো না কিছুতেই।‘ যতনের গলা কৃতজ্ঞতায় নম্র, আচ্ছন্ন।“ (‘তদেব’ পৃ. ৬০০ )

 কিন্তু সাহেব নিয়ে যায় যতনকে। শূন্য হৃদয় নিয়ে বসে থাকে হানিফ। জলের দেশের ছেলে হানিফ আজ জলেতে ভাসার সামর্থ হারিয়েছে। অচিন্ত্যকুমার ভাঙাচোরা মানুষের জীবনযন্ত্রণার কথাকার। তাঁর বেশিরভাগ গল্পই ব্যর্থতায় বা যন্ত্রণায় শেষ হয়। মানুষের জীবনের নির্মম নিয়তিকেই তিনি মেনে নেন। গল্পে তিনি নিছক কাহিনি ফাঁদেন না, চরিত্রের অন্তর রহস্যের মর্মগাথা উন্মোচন করাই তাঁর উদ্দেশ্য –আর সেই উদ্দেশ্য পূরণে তিনি এক মায়াবি ভাষা ব্যবহার করেন যা পাঠককে খুব সহজেই মুগ্ধ করে।

                লেখার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার জগৎ বড় কথা। অভিজ্ঞতাকেই লেখক নিজের রঙে জাড়িত করে সৃজন করেন। অচিন্ত্যকুমারের বেশিরভাগ গল্পেরই প্রেক্ষাপট গ্রামীণ জীবন। সেই গ্রামীণ জীবনের খুঁটিনাটি তুলে ধরতে তিনি বদ্ধ পরিকর। গ্রামীণ জীবনে আইন –আদালত, মামলা যে কী ভয়ঙ্কর তা আমরা অনেক উপন্যাসে দেখেছি। সামান্য একটি চালতা গাছকে কেন্দ্র করে ‘পল্লীসমাজ’ উপন্যাসে দুটি পরিবার শেষ হয়ে গিয়েছিল। মাঝে থেকে লাভ হয়েছিল কিছু মুষ্টিমেয় শ্রেণির। গ্রাম্যজীবনে আর কিছু দালাল শ্রেণির লোক থাকে যারা সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করে নিঃস্ব করে দেয়। এই সব মানুষদের নিয়েই অচিন্ত্যকুমারের ‘সরবানু ও রোস্তম’ গল্প। দুটি নর-নারীর জীবন গ্রাম্য কোন্দলে কীভাবে বিপর্যস্থ হয়ে উঠেছিল তা লেখক নিপূণ ভাবে দেখিয়েছেন। শাশুড়ির অত্যাচার থেকে বাঁচতে সোরবানু বাপের বাড়ি এসেছিল। রোস্তম কোনদিনই স্ত্রীকে দেখতে যায়নি শ্বশুরবাড়ি একথা ঠিকই তবে যে ভালোবাসা ছিল না তা বলা যায় না। ছোটোগল্প তো দ্বন্দ্বের কথা বলে, বিন্দুতে সিন্ধু দর্শনের কথা বলে। অচিন্ত্যকুমারের ছোটোগল্প মানেই চমক, গল্পের নানা ফাঁক আবিষ্কার করতে তিনি বদ্ধ পরিকর। সাড়া গল্প জুড়েই রয়েছে একে অন্যের প্রতি দোষারোপের পালা এবং দুই পক্ষকে মস্তিস্ক যুদ্ধে লিপ্ত করতে সহযাত্রীদের উস্কানিমূলক কথাবার্তা। বিবাহ বিচ্ছেদ নিয়ে দুইপক্ষ আদালতে উপস্থিত হয়েছে –মামালা চলছে। এরই মধ্যে সরবানু ও রোস্তম সবাইকে ফাঁকি দিয়ে পাড়ি দিয়েছে ইছামতিতে। আসলে তাঁরা ভালোবাসার বন্ধনে মিলিত হতে চেয়েছে। সমস্ত দ্বন্দ্ব ভুলে আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে চেয়েছে। পাঠকের কৌতুহল চরিতার্থে সামান্য অংশ তুলে ধরি –

    “তারা ততক্ষণে টাবুরে নৌকায় করে ইছামতিতে ভেসে পড়েছে।

তাদের জীবনে এমন একটা দিন কোনদিন আসেনি। তাদের চার দিকে উকিল –মুহুরি ফয়লা সাক্ষী –সাবুদের ষড়যন্ত্র –তারই মধ্যে ছুটে পালিয়ে এসেছে তারা। চলে এসেছে নদীর উপর, ঝকঝকে আকাশের নিচে। আর কে তাদের ধরে। যদি ধরে, জলে লাফিয়ে পড়বে তারা। সাঁতরে পার হয়ে যাবে।“ ( ‘সরবানু ও রোস্তম’ তদেব, পৃ. ৬০৭ )

‘মাটি’ (১৩৪৬) গল্পটিকে ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে রেখে বিচার করতে চাই। বিংশ শতাব্দীর গ্রাম্যজীবন কীভাবে পাল্টে যাচ্ছে তার সুরটি লেখক ধরার চেষ্টা করেছেন। নবীন-প্রবীণের দ্বন্দ্ব যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে জীবিকার পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বিত্তশালী জমিদার আমানত, তাঁর জমির পরিমাণ সত্তর বিঘা। কিন্তু ডিক্রি জাড়ি করতে করতে তা দাঁড়িয়েছে দশ বিঘায়। সমস্ত মাছ যেমন জালে ধরা পড়ে না তেমনি কিছু নিম্নবিত্ত পালিয়ে বাঁচে, যেমন বাঁচতে চেয়েছে আজিজ। আমানত চায় না ছেলে আজিজ তাঁর মত কৃষক হোক। সে চায় আজিজ উচ্চশিক্ষিত হয়ে নিজের সমস্ত জমি ফিরিয়ে আনুক। আজিজকে শিক্ষিত করতে আজ সে সমস্ত জমি হারিয়েছে। চাষার হৃদয় উৎপাটন করে দিয়েছে সে ছেলের স্বার্থে। আজিজকে শিক্ষিত করতে সে অন্য ছেলেদের বঞ্চিত করেছে। আজিজ আজ চাকরি পেয়েছে আদালতে। আজ আর আমানতের রোজগার নেই তাই গ্রাম থেকে ভূমিচ্যুত হয়ে শহরে চলে আসতে হয়েছে। অথচ মন পড়ে আছে গ্রামের হারানো জমিতে। শহরে এসে পারিবারিক বৃত্তে ভাঙন ধরেছে। আজিজকে আজ আর কেউ যেন চাষার ছেলে বলতে না পারে সেজন্য সে পিতা আমানতকে দর্জির দোকানে নিয়োগ করেছে। একটি সম্পূর্ণ বিত্তভোগী কৃষক কীভাবে দর্জিতে পরিণত হয়েছে সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত লেখক এখানে তুলে ধরেছেন। কিন্তু যার হৃদয়ে জমির প্রতি অসীম মমতা তাঁর কি শহরে মন টেকে ! তাই আমানত শহরে থাকলেও মন পড়ে থাকে গ্রামে –

“তার দিন আর কাটে না। অনড় হয়ে আসে হাত-পা। খাবার পর ঢেঁকুর ওঠে। তাই আজিজ তাকে বাজারে একটা খোপরি ভাড়া করে দিয়েছে। আমানত সেখানে বসে চোখে চশমা লাগিয়ে সেলাইয়ের কল চালায়। ফতুয়া বানায়, কুর্তা বানায়, শার্ট বানায়। অনেক সম্ভ্রান্ত ব্যবসা। আমানত আর চাষা নয়। খালিফা। আজিজ আর চাষার ছেলে নয়, খলিফার ছেলে। অনেক নরম লাগে শুনতে।

-কিন্ত যেদিন আকাশ কালো করে টিনের চালের পরে বৃষ্টি পড়ে ঝম্‌ঝম্‌ করে, আমানতের পা-কল কেমন আপনা থেকেই থেমে যায় –বৃষ্টিটা মনে হয় যেন কান্নার শব্দ, আর সেই শব্দে ভেসে আসে তার মাটির ডাক। তার মাটি তাকে ডাকে –ডাকে-অনেক দূর পর্যন্ত ডাকে। বলে , আমানত, চলে আয়। “( ‘মাটি’, তদেব, পৃ. ৬৪১ )

 এই ট্র্যাজিক পরিণতিতেই গল্পের উত্তরণ ঘটেছে। অচিন্ত্যকুমারের একটি গল্পের নাম ‘বৃত্তশেষ’। আসলে তাঁর সমস্ত গল্পে কাহিনির বিস্তার নয়, সংকীর্ণ পরিসরে ভাববস্তুকে দৃঢ়পিনদ্ধ ভাবে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। আর চরিত্রদের জীবন্ত করে তুলতে স্থানিক রঙের সঙ্গে মায়াবি ভাষা ব্যবহার করে গল্পকে রসসিক্ত করে তুলেছেন। ব্যঞ্জনা নয় গ্রামীণ মানুষের সহজ-সরল জীবনবোধেই তাঁর লক্ষ, আর সে লক্ষ পূরণে তিনি যে সার্থক কথাকার সে বিষয়ে দ্বি-মত নেই। দীর্ঘদিন ধরে গ্রামকে দেখেছেন, গ্রামের মানুষকে দেখেছেন, মানুষের সেই মর্মবেদনাকে তিনি দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। অচিন্ত্যকুমারের গল্পে মুসলিম জীবন এলেও তা ছিল বাঙালি মুসলিম। সংখ্যা লঘু মুসলিমদের কথা বাংলা গল্পে এসেছে আরও অনেক পরে। এই মুসলিম নিম্নবিত্ত মুসলিম জনজীবন। আসলে সামজের নিম্নবিত্ত মানুষের কথাই তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন। ফলে নিম্নবর্গের মানুষ বলতে আমরা যা বুঝি তা অচিন্ত্যকুমারের গল্পে ভীষণ ভাবে ফুটে উঠেছে, সেই নিম্নবিত্ত মানুষের অংশ হিসেবেই তিনি মুসলিম জনজীবন ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে সে জীবনের মানবিক দিকগুলিই তাঁর মূল লক্ষস্থল। মুসলিম অন্দরমহলে তিনি বিশেষ প্রবেশ করেননি, সে জীবন তাঁর বিশেষ জানার কথা নয়, তিনি দেখেছেন মাঠে ঘাটের মুসলিম চাষীদের, মুসলিম বধুটির পুকুর ধারে এগিয়ে যাওয়াকে, সেটুকুই তিনি নির্মাণ করে নিয়েছেন।

1019