গল্প কথা ( পর্ব ৯)

বিপুল দাস

নয়

আমি জানি না আজ কারখানার গেটে গিয়ে ক্লোজারের নোটিস দেখব কি না, আমি জানি না আমার সন্তানকে স্কুলবাসে তুলে দেবার পর সে সুস্থ শরীরে বাড়ি ফিরবে কি না, আমি জানি না লোন নিয়ে অনেক কষ্টে তৈরি করা আমার বাড়ির ছাদ আজ ভূমিকম্পে আমার মাথার ওপর ভেঙে পড়বে কিনা, আমি জানি না নদীর পারে আমার চালাঘর আজ প্রবল বন্যায় ভেসে যাবে কি না, আমি জানি না রাষ্ট্রের বুলডোজার এসে আজ রাতে আমার বস্তি উচ্ছেদ করে দিয়ে যাবে কি না, আমি জানি না সামান্য অজুহাতে আজ গভীর রাতে পুলিশ আমার দরজায় কড়া নাড়বে কি না। আমি জানি না আজ অফিস যাওয়ার পথে জঙ্গী-পুলিশের লড়াই-এ মাঝে আমার বুকেই গুলি লাগবে কি না। আমি জানি না আমার সামান্য জ্বর সর্দিকাশি থেকে প্রবল শ্বাসকষ্ট শুরু হবে কিনা। রোদ-ঝলমল সুস্থ জীবনযাপনের ভেতরে খুব ম্লান ছায়ার মত এই সমস্যাগুলো লুকিয়ে  থাকে। এই হল অস্ত্বিত্ত্বের সংকট।

এবার গুন্টার গ্রাসের ভাষণ লক্ষ করব। লিখনপদ্ধতি আবিস্কারের আগেই কিন্তু কথকঠাকুর এই গল্পগুলোই রকমফেরে বলেছেন। অশুভ দানবশক্তির বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম, গুপ্তহত্যা, একজন হিরোর আবির্ভাব, ফ্যাট ইয়ার, লীন ইয়ার, গণহত্যা – কখনও পুরুষকার, কখনও দৈবের শক্তিতে শেষ পর্যন্ত মানুষের জয়ের কীর্তি তো মানুষেরই মানসজাত কল্পনার প্রতিচ্ছবি। কথক শুধু ইচ্ছেপূরণের ইশারাটুকু দিয়ে যায়। আসলে, এ সময়ের একজন শক্তিশালী গল্পকার শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় বারে বারে বলতেন, মসৃণ জীবনযাপনে কোনও শিল্প তৈরি হয় না। অস্ত্বিত্ত্বের সংকট আর বেঁচে থাকার সংশয়ের ভেতর দিয়েই শিল্প গড়ে ওঠে। বেঁচে থাকার ওই ডিফেনস্‌ মেকানিজমের বর্ণনার ভেতর দিয়েই শিল্প তৈরি হয়। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে সেই বর্ণনা যদি স্লোগান সর্বস্ব হয়, তবে তা কখনই শিল্প হয়ে উঠতে পারে না। শুধু মেনিফেস্টো।

তা হলে গল্প আর ঘটনার নীরস বর্ণনা কখনও এক হয় না। আসলে গল্পের ভেতরে থাকে স্ট্রেস থেকে বেরিয়ে আসার একটা প্রাণান্তকর চেষ্টা। একটা পাথরকে তার স্বাভাবিক অবস্থান থেকে উঁচুতে নিয়ে গেলে তার ভেতরে কাজ করার শক্তি আসে, একটা রবারের টুকরোকে টেনে লম্বা করলে সেও কাজ করার শক্তি সঞ্চয় করে, জলের স্রোত অনেক উঁচুতে থাকে বলেই প্রবল বেগে টারবাইন ঘোরাতে পারে। এ রকম অজস্র উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, যা থেকে আমরা বুঝতে পারি অস্বাভাবিক অবস্থা থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় আসার জন্য প্রত্যেকটা বস্তুর ভেতরে স্ট্রেস ও স্ট্রেনের খেলা চলে। মানুষের জীবনযাপনে, বেঁচে থাকার ভেতরেও সব সময় সেই ফোর্স কাজ করে। যা স্বাভাবিক নয় সেই ঘটনাই মানুষের কল্পনাকে উশকে দেয়। এক সময় সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ মানুষের কাছে অস্বাভাবিক ঘটনা ছিল। তা থেকে প্রাচীন মানুষ গল্প তৈরি করত। আজ সেটা আমাদের কাছে স্বাভাবিক ঘটনা। সেখানে আর কোনও গল্প নেই। কিন্তু যদি দেখি সব দিক দিয়ে সফল একজন মানুষ আত্মহত্যা করেছে, সেটা একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার। তার পেছনে একটা গল্পের খোঁজ করি আমরা। রাস্তায় পুলিশ কোনও মানুষকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, আমাদের বিস্ময় জাগে না, কিন্তু যদি দেখি সাধারণ একজন মানুষ পুলিশকে কলার ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, সেটা আমাদের কাচ্ছে খুবই অস্বাভাবিক। বুঝতে পারি এর পেছনে একটা গল্প আচ্ছে। রাস্তায় আজ যে ঘটনা দেখলাম, রাতে হয়তো একা একা চিন্তা করি। তখন অনেকগুলো ‘যদি’ আপনা হতেই আমাদের ভাবনায় ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। গাড়িটা যদি আমাকেই চাপা দিত … এখান থেকেই গল্প শুরু হয়। না হলে তো সেটা শুধু একটা দুর্ঘটনার বিবরণ হত। ফোটোগ্রাফিক সত্য আর শিল্পীর হাতে-আঁকা ছবির সত্যের ভেতরে এখানেই ফারাক হয়ে যায়। আমার পকেট থেকেই যদি পার্সটা চুরি হত, লোকটাকে যদি কেউ হাসপাতালে নিয়ে না যায়, ওর বাড়ির লোক যদি খবর না পায়, নীপা কেন আজ একবারও ফোন করল না, বাড়িতে কি কোনও দুর্ঘটনা ঘটেছে – এই সব অসংখ্য ‘যদি’র সুতো বেয়ে আমাদের মনে অবচেতনেই গল্প তৈরি হতে থাকে। অর্থাৎ মনন ও চিন্তনের অস্বাভাবিক অবস্থা থেকে রেহাই পেতেই যেন কল্পকথার জন্ম হতে থাকে। এ জন্যই গুন্টার গ্রাস বলেছিলেন প্রাচীনকালের সেই সব কথকদের ভেতর যারা অশিক্ষিত ছিলেন, তারা অন্যদের চেয়ে ভালো গল্প বলতে পারতেন। অর্থাৎ তারা মিথ্যেগুলো শ্রোতাদের কাছে আরও বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারতেন।

247