অপর্ণা চক্রবর্তী

ভাগীরথী-২ শৃঙ্গ অভিযানের আজ শেষ পর্ব। শেষ পর্বের শুরুটা করবো তাদের নিয়ে যাদের কথা না বললে কোন অভিযানের কথা,পাহাড়ে যাওয়ার কথা কিছুতেই সম্পূর্ণ হতেই পারে না ।তারা হচ্ছেন আমাদের গাইড এবং আমাদের পোর্টাররা। কঠোর পরিশ্রমী, কর্তব্যনিষ্ঠ,অথচ মুখে সবসময় হাসি, এই মানুষগুলোর উপরেই নির্ভর করে চলতে হয় পাহাড়ে। আর একটা কথা না বললেই নয় তা হলো এই অভিযান পথের খাওয়া-দাওয়া। গাইড সরবনজি আর পোর্টাররা মিলে আমাদের জন্য রান্না করতো। ওরা একটা মশলা বানিয়ে রাখত। সেই মসলার মধ্যে সব ধরনের মশলা গুঁড়ো করা ছিল। ডাল, তরকারি,ডিম যা রান্না করছে সব তরকারিতে ওই মশলাটাই দিতো বলে সবগুলোর স্বাদই লাগতো একইরকম !একদিন রাত্তিরে সবার খাওয়ার পর কিছু ভাত বেশি হয়ে গেল। পরদিন সকালবেলা বাসিভাত, জল, চিনি আর কিছু গুড়ো দুধ দিয়ে তৈরি হয়ে গেল উপাদেয় পায়েস! মোটামুটিভাবে ১৬ হাজার ফিট ওঠার পরে দুতিন চামচ চা,কফি,জুস ছাড়া বেশি আর কিছু খাওয়া যায়না।তখন একটু চা-কফি চকলেট খেতে হয়।ক্যাম্প-১এ যাওয়ার আগে সরবনজি আমাদের জন্য লঙ্কা আর রসুন দিয়ে খুব সুন্দর একটা আচার বানিয়ে ছিল। আসলে রসুন শরীরকে গরম রাখে রাখে বেশি উচ্চতায় আচারটা মুখের স্বাদ বাড়ায় শরীরে গরম রাখে।কিন্তু সেটার বেশীরভাগটাই আমরা এবিসিতেই শেষ করে ফেলে ছিলাম। একবার খাওয়ালো লাউয়ের পোকোড়া। লাউকে ওরা লৌকি বলে। ওদিককার লাউগুলো হয় লম্বা মতন।আমাদের এদিককার চিচিঙ্গার মতো দেখতে।

এবার শেষ পথটুকুর কথা:-

২১শে সেপ্টেম্বর ছিল আমাদের আনন্দের দিন। সবাই মিলে খুব আনন্দ করলাম ।অভিযান সফল হয়েছে। সফলভাবে শৃঙ্গ জয় করে ফিরে এসেছে শংকর, নীলাদ্রি আর আমাদের গাইড সরবনজি।সবাই সুস্থ আছে। এরপরে আমরা সবাই মিলে নীচে নামব। তাই সেদিন আমরা আনন্দে মেতে উঠলাম। কিন্তু প্রকৃতিকে কোনদিন বোঝা যায় না।সেই দিন বিকাল থেকেই খারাপ হতে শুরু করলো আবহাওয়া। আমাদের গাইড সরবনজি আমাদের আগেই বলেছিলো যে, ২০শে সেপ্টেম্বরের পর থেকে এদিককার আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করে। সেটা তিন চার দিন পর্যন্ত থাকে। আর ঠিক সেটাই হল। ঠিক সন্ধ্যের পর থেকেই শুরু হলো ভারী তুষারপাত। দেখতে দেখতে আমাদের টেন্টগুলো ঢেকে যেতে লাগলো সাদা বরফে। চারিদিকে শুধু বরফ আর বরফ। বরফের তলায় চাপা পড়ে গেল সবকিছু। আমরা সবাই আমাদের টেন্টের মধ্যে কোন ভাবে সময় কাটানোর চেষ্টা করতাম। কিন্তু তার আগে আমাদের টেন্টের ওপর পড়া বরফ সরাতে শুরু করার প্রয়োজন ছিল। কারণ আমাদের টেন্টগুলো বরফের ভার সহ্য করতে পারবে না। সেগুলো ভেঙে পড়বে। আর টেন্ট যদি ভেঙে পড়ে তাহলে তা দুর্বিষহ হয়ে দাঁড়াবে আমাদের জন্য। কারন এই দুর্গম পথে এই টেন্টগুলোই আমাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল।ফলে আমরা সবাই মিলে শুরু করলাম বরফ সরাতে। খাবারের প্লেট গুলো তখন বরফ সরানোর কাজে ব্যবহার করলাম আমরা।প্রচন্ড বরফ চারদিকে।বারবার ঢেকে যাচ্ছে তাবু ।আমরা বাইরে বেরোচ্ছি বরফ সরাচ্ছি আবার ভেতরে ঢুকছি।এমনি করেই কাটলো দুদিন।

এদিকে আমাদের রেশনও তখন শেষ হয়ে এসেছে। ২২ তারিখ রাতে আমরা সবাই মিলে বসে ঠিক করলাম যেভাবেই হোক নীচে নামতে হবে আর দেরি করা যাবে না।শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে। রেশনও ফুরিয়েছে। বেঁচে থাকার জন্য নীচে নামতেই হবে নাহলে মৃত্যু অনিবার্য আমরা বুঝতে পেরে গেলাম। কিন্তু নীচে নামার পথটাও ভয়ঙ্কর। এমনিতেই রাস্তা দুর্গম। তার ওপরে বরফ পড়ে আরো ভয়াবহ হয়ে উঠেছে পথ।প্রায় হাঁটু পর্যন্ত ঢুকে যাচ্ছে বরফে। প্রতিমুহূর্তে প্রাণ হাতে করে নিয়ে যাওয়া।কোথায় বরফের ফাটল, কোথায় গর্ত কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু নীচের দিকে নামা ছাড়া আর কোন উপায় নেই আমাদের ।

পরদিন ২৩ তারিখ সকাল ৮টা নাগাদ যে যৎসামান্য জলখাবার বেচে ছিল তাই নিজেদের মধ্যে ভাগ করে খেয়ে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র টুকু কাঁধে নিয়ে বাদবাকি সব মালপত্র টেন্টে ফেলে রেখে বেরিয়ে পড়লাম আমরা ভুজবাসার উদ্দেশ্যে। ঠিক হলো আবহাওয়া ঠিক হলে আমাদের মালপত্র নিয়ে আমাদের কাছে পৌঁছে দেবে পোর্টাররা। আমাদের সাথে আমাদের গাইড আর দুজন হ্যাপ ছিল। ওদের অনুসরণ করে আমরা চলতে আরম্ভ করলাম। ওরা আমাদের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিল যে ওরা যেখানে যেখানে পা ফেলবে আমরাও যেন ঠিক সেইখানেই পা ফেলি। কারন একটু এদিক-ওদিক হলেই অনিবার্য মৃত্যু। পথের দূরত্বও অনেকটা। নন্দনবন পর্যন্ত পৌঁছানোর পর আমার শরীর জানান দিল আর আমি চলতে পারব না। সবারই প্রচন্ড ক্লান্ত লাগছিল কারণ আমরা খুব অল্প খাবার খেয়ে বেরিয়েছিলাম। প্রচন্ড পরিশ্রমের ফলে ক্যালোরি খরচ হয়ে গেছে। আর আমাদের সাথে খাবার বলতে তখন পকেটে থাকা কিছু চকলেট আর কিছু গুড়বাদাম। কিন্তু সেগুলো তখন পকেট থেকে বের করে খাবার মত শক্তিটুকুও ছিল না আমাদের।কাজেই পকেটেই পড়ে থাকল চকলেট। কিছুই আর খাওয়া হলো না। হেঁটেই চলেছি শুধু।কিছুতেই আর রাস্তা শেষ হচ্ছে না। এদিকে তুষারপাত শেষ হওয়ার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। শরীরের সমস্ত জামাকাপড় ভিজে গেছে। এই অবস্থাতেই ভয়ঙ্কর দুর্গম পথ অতিক্রম করে আমরা শেষ পর্যন্ত পৌঁছলাম গোমুখ।কিন্তু গোমুখ পর্যন্ত এসে আমি আমাদের দলের সদস্যদের বললাম,”আমি আর যেতে পারবো না। তোরা আমাকে এখানেই রেখে চলে যা।”কিন্তু সামিট করে ফেরা শংকর বলল, “তুমি না গেলে আমরাও যাব না।” ওখানে কিছুক্ষণ সবাই মিলে বিশ্রাম নিলাম ভেজা শরীর নিয়েই।তারপরে আবার চলতে শুরু করলাম বিধ্বস্ত শরীরে। চলতে গিয়ে দেখলাম গোমুখের ডান দিকে যাবার পথে যে রাস্তাগুলো দেখেছিলাম সেই রাস্তাগুলো সম্পূর্ণ মুড়ে গেছে বরফে। বাধ্য হয়ে উল্টো দিকে যেতে হল। সেই রাস্তাটা আবার ভয়ঙ্কর।চারিদিকে বরফের ফাটল। একবার পা পিছলে গেলে অনিবার্য মৃত্যু। কিন্তু এবার কিছুটা যাবার পর আমার মনে হলো আমার আর যাওয়ার ক্ষমতা নেই। আমি আর বেঁচে ফিরতে পারব না আমার পরিবারের কাছে।কাছের মানুষদের আর দেখতে পাবোনা। ঠিক এইরকম যখন অবস্থা আমার, সামনে দেখতে পাচ্ছি মৃত্যু,শরীর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে গেছে, এক ফোঁটা শক্তিও আর অবশিষ্ট নেই শরীরে ঠিক তখনই আমার সামনে ভেসে উঠলো আমার মেয়ে আর আমার স্বামীর মুখ। ঠিক তখনই কোথা থেকে এক প্রচন্ড শক্তি এসে ঘিরে ধরল আমার মনকে। মনে মনে বললাম,”না যেভাবেই হোক, বেঁচে আমাকে ফিরতেই হবে।আমার মেয়ের কাছে।” দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে চলতে শুরু করলাম আবার। এইভাবে চলতে চলতে প্রায় ৭টার সময় আমরা এসে পৌঁছালাম ভূজবাসার উল্টো পাড়ে। সেখানে আবার গঙ্গা পারাপার করতে হবে একটা দড়ি বাঁধার ট্রলি করে।৫-৬ জন করে পারাপার করা হচ্ছে এক এক বারে।আর ওই ব্যবস্থাটা সেদিন থেকেই চালু হয়েছে।আমরা সবাই যখন ট্রলি করে ওপারে গিয়ে শেষমেষ ভূজবাসায় পৌছালাম তখন চারিদিকে অন্ধকার গাঢ় হয়ে গেছে।সবারই অবস্থা প্রচন্ড খারাপ। আমার সর্বাঙ্গ ঠাণ্ডায় কাঁপছে। আমি আর কথা বলতে পারছিনা। তখন আমাদের দলের সবথেকে বর্ষিয়ান সদস্য তরুণদা, যার পাহাড়ের অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের, আমাকে বললো গরম জল আর চা খেতে।গরম চা খেয়ে সত্যি কিছুটা উপকার হবে ভাবলাম কিন্তু শরীরের কাঁপুনি থামলো না। তারপর কিছুক্ষণ আগুনের সামনে থাকার পর তরুণদা বলল, এবার জামাকাপড় ছেড়ে নাও।আমাকে একজোড়া মোজা দিলো পরার জন্য। আর চকলেট খেতে বলল। কারণ শরীরে ক্যালোরি না গেলে শরীর গরম হবে না। আমি ঘরে গিয়ে অনেক কষ্টে ভেজা পোশাক ছেড়ে শুকনো পোশাক পরলাম। আর চকলেট খেলাম।তবুও মনে হচ্ছে আমার নিঃশ্বাস যেন এখনই বন্ধ হয়ে যাবে। তারপর তিন-চারটে কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে পড়লাম। হাত পায়ের আঙুলগুলো অবশ হয়ে আসছিল। নড়াতে পারছিলাম না।ঘন্টা দুয়েক এভাবে শুয়ে থাকার পর খাওয়ার জন্য ডাক আসলো।তারপর খেতে গেলাম ।সামান্য কিছু খাবার খেয়ে আবার শুয়ে পড়লাম। এই ভাবেই কেটে গেল সেই রাতটা।

পরদিন সকাল হতে উঠে দেখলাম শরীরটা আগের থেকে অনেকটাই ভালো লাগছে। কালকের সব কষ্টাটাই যেন মনে হলো ভয়ঙ্কর কোন দুঃস্বপ্ন ছিল। সেই দিনটা আমরা ভূজবাসায় থেকে গেলাম।

পরের দিন অর্থাৎ ২৫শে সেপ্টেম্বর আমরা রওনা দিলাম গঙ্গোত্রীর উদ্দেশ্যে। বেলা এগারোটা নাগাদ আমরা পৌঁছলাম গঙ্গোত্রী। অনেকদিন পর আবার লোকের সমাগম দেখতে পেলাম ।

আমাদের দলের সদস্য নীলাদ্রি এবিসি থেকে ভূজবাসায় আসার পথে আমাকে খুব সাহায্য করেছিল। এই ছেলেটির মুখে যেন সবসময় হাসি লেগেই আছে। আর সবাইকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আছে। আমার তখন প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছিল। আমি হাঁটতে পারছিলাম না। তার ওপর পিঠের রুকস্যাক। নীলাদ্রি নিজের ভারী স্যাকের ওপর আমার স্যাকটাও পিঠে তুলে নিল। এমন নয় যে ওর কষ্ট হচ্ছিল না। প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছিল। সবারই খুব কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ও আমার জন্য যা করেছে আমি তা কোনদিন ভুলবো না ।ওকে দেখে আমার মনে হয়েছে আসলে পাহাড়ি মনের মানুষ এরকমই হয়। মুখে হাসি, মনে সারল্য, আর কঠোর পরিশ্রমী। তবে আমি আমার সংস্থা HMTA-এর দলে ছিলাম। যে দলের প্রত্যেকেই প্রতি পদক্ষেপে তৈরি একে অপরকে সাহায্য করার জন্য। গঙ্গোত্রীতে দু’দিন অপেক্ষা করার পর আবহাওয়া একটু ভালো হতেই পোর্টাররা আমাদের মালপত্র নিয়ে নেমে এলো।

পরদিন অর্থাৎ ২৭ তারিখ ভোর পাঁচটায় আমরা বাসে উঠলাম।পৌঁছলাম উত্তরকাশি। সেখানে এজেন্সির সঙ্গে কথাবার্তা শেষ করে সেইদিনই হরিদ্বার হয়ে আমরা পৌছালাম দিল্লি। তারপর ২৪ঘন্টার জার্নি করে দিল্লি। দিল্লী থেকে ট্রেন ধরে পৌছালাম রায়গঞ্জ।

রায়গঞ্জে এসে দেখি এইচএমটিএ এবং আমাদের পরিবারের সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সবাইকে দেখতে পেয়ে কি যে আনন্দ হল তা বোঝাতে পারবো না।এত কষ্টের মাঝে যে এত আনন্দ থাকে তা বুঝতে পারা যায় এইরকম ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা থেকে ফিরেই। তাইতো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অভিযাত্রীরা ভীষণ কষ্ট সহ্য করেও বিভিন্ন অভিযানে যান। আর তাইতো জন্ম নেয় ম্যালোরী, স্কট আর অমূল্য সেনের মতো মানুষরা। অনেকেই জানেন না যে পৃথিবীর কিছু মানুষ কত কষ্টই না করে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে নানা তথ্য সংগ্রহ করে আনার জন্য!

মৃত্যুর আগে পর্যন্ত মনে থাকবে আমার এই অভিজ্ঞতার কথা। আমার মনে হয় আমরা পাহাড়ে যাই বেঁচে থাকার জন্য। পাহাড় কে জয় করার জন্য নয়।কারণ পাহাড় কে কখনো জয় করা যায় না। তাই কতটা গেলাম, পাহাড়ের কতটা উঠতে পারলাম ,কতটা পারলাম না তাতে আসলে কিছুই এসে যায় না। এখানে হার-জিতের প্রশ্নই আসে না।অনেকে হয়তো ভাবেন পারা না পারাটা একটা বড় বিষয়। আমার মনে হয় এটা ঠিক নয়। আসলে পাহাড় আমাদের হিংসা শেখায় না, শেখায় উদারতা। পাহাড়ে গিয়ে উদারতা না শিখলে পাহাড়ে যাওয়ার কোনো অর্থই হয়না। আমি নিজেকে গর্বিত মনে করি এই অভিযানের একজন সহযাত্রী হতে পেরে ।আমি পাহাড় জয় করতে যাইনি। পাহাড়ের কাছে গিয়েছিলাম। আগামীতেও বারবার যাবো।তবে জয় করতে নয়,পাহাড় কে ভালবেসে।

25