আমরা কি চা খাব না?

পুরুষোত্তম

পাঠকের কলমে, জুন, ১০:২০২০: প্রিয় চা, আজ তোমাকে নিয়ে লিখতে বসেছি। রান্না ঘর থেকে ড্রয়িং রুমে তুমি কখন প্রবেশ করেছ নিজেই জানি না। জানার দরকারও নেই। তুমি পিপাসুর পিপাসা, গরিবের প্রাণভ্রমরা। আমাদের গুরুপদ কাকু। সে চায়ের দোকানে হালখাতা করেছিল। বাকি বাকি আর বাকি। এই পথ বেছে নিতে বাধ্য হলেন। কিন্তু চায়ের দোকানে কে হালখাতা করবে ? অবধারিত ভাবে কেউ টাকা দেয়নি। অভিমানে কাকু রাতে গণেশ ঠাকুর উল্টে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছিলেন। হ্যাঁ আমরা চা খাই। চা খেতে বহুদূর যাই। কখনও ভাঙাবাড়ি যাই। আমাদের বুম্বা আজ তিন মাস চা খেতে যেতে পারেনি। তাঁর বেদনা শুধু আমরাই জানি। আজ সবাই খ্যাপায় বুম্বা কবে চায়ের দোকান খুলবে ! চা তো খেলাম কিন্তু এবার টাকা দেবে কে ? কেউ দেবে না। সবাই দেখাবে পাপাইকে। তারপর একপালা গান । শেষে সমাধান। আগে ছিল সুকান্ত। এখন তাঁর রোজগার কমে গেছে। তাই কেউ তাঁকে দেখায় না। আমাদের আছে ধনেস কাকু। যিনি প্রতিনিয়ত চা দিয়ে চলেছেন।

 গপ্প বলি আমাদের অতিথি অধ্যাপকদের। একবার এক কাকু কিছু বলেছেন। পরের দিন বলা হল কলেজে কেউ চা খাবে না। গ্রুপে বলা হল কেউ যেন চা না খায়। কিন্তু চা প্রত্যাখ্যান ? পারবো না বাপু। চা খেয়ে টেয়ে গ্রুপে এস.এম.এস করে দিলাম, না আমাদের ঘরে কেউ খায়নি। সে মিথ্যা স্বীকার করে নিলাম এই সুযোগে। মধুপুরে এক দোকানে আমরা চা খেতে যেতাম দুপুরে। চা খেতে খেতে উত্তপ্ত করে ফেলি যে কোন চায়ের দোকান। বিশেষ করে রাজনীতির তর্ক। সে দোকানদার বলেছিল –তোমরা আমার দোকানে আসবে না, তোমরা শুধু ক্যাচাল কর। আমাদের জীতেন অভিনয়ের সঙ্গে দোকানে লাল চা খেতে বলে রাম খাচ্ছি। টাকা নেই তাই চা খেয়েই মদের পিপাসা মেটাচ্ছি। ভিন্ন বন্ধুরা এলে প্রচন্ড তর্ক করি। ভাবে হয়ত এই বুঝি দুই বন্ধুর মধ্যে বিভেদ ঘটল। কিন্তু আমরা আসল সত্যটা জানি। সে দোকান থেকে গিয়ে ভিন্ন দোকানে আবার চা খেয়ে হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরি। শিলিগুড়ি মোড়ে কাকু প্রতি কাপ  আট আনা পয়সা থেকে চা খাওয়াচ্ছে জীতেনকে। তিনি বলেন –‘আমার এখানে চা খেতে পয়সা লাগে না, থাকলে দিবা না থাকলে নাই’। আসলে তিনি জেল খাটা মানুষ। জীবনের বেদনা জানেন। তাই বলে কাকিমা থাকলে ফ্রি চা হবে না। সে দোকানে গিয়ে জীতেনের নাম করলেই আপনি চা পাবেন, পয়সা দিতে হবেনা। চা খেতে পয়সা লাগে না।

                আমি আর অরুণ কাকু মিটিং, সাহিত্য সভা যেখানেই যাই না কেন শেষে ফেরার সময় আবার একবার চা খাই। কাকু বলবে – আর এক রাউন্ড চা হবে নাকি পুরুষোত্তম  ? কাকুর ভাষায় ‘ভাই একটা মেজাজি চা দাও তো’। এবার কোচবিহার গিয়েছিলাম আমি অরুণ কাকু, তুহিন কাকু, তপন কাকু ও কৌশিক দা মিলে। কোচবিহার তো ঢুকবো সকালে, কিন্তু রাতেই প্রায় পৌঁছে গেছি। দাঁড়ানো হল এক চায়ের দোকানে। দোকানদার মদ খেয়ে ঘুমাচ্ছে। আমরা নিজেরাই চা বানিয়ে খেয়ে, পয়সা রেখে বিদায় নিলাম রাত তিনটের সময়। মালদার ‘ঘুটঘুটানি’ চা যদি আপনি খান চায়ের প্রতি ভক্তি চটকে যাবে। আপনি অবধারিত ভাবে শহরের বদনাম করবেন। মালদা থাকার সময় আমাদের ছিল গুড্ডি দি। বিকালে সে আমাদের চা খাওয়াতো। কাকিমার তো নির্দেশ-গুড্ডি বাচ্চাগুলোকে চা করে দে তো। গুড্ডি দি’ও মাকে প্রচন্ড ভয় পেত। মা থাকলে সামান্য বিস্কুট, চানাচুর। কিন্তু কাকিমা যেদিন না থাকতো আমাদের গুটি লাল। গুড্ডি দি আমাদের ইচ্ছামত বিস্কুট, চানাচুর, গাঠিয়া দিত। রায়গঞ্জে কোন অতিথি এল, আর তপন কাকু যদি দায়িত্বে থাকে তবে স্টেশনে সকালেই চা নিয়ে উপস্থিত হবে, সেখান থেকেও ভাগ বসাই। আমার কিছু পিসির টেকনিক – এই তোরা চা খাবি ? আপনি যদি ভদ্রতার খাতিয়ে না বললেন তবে গেল। দ্বিতীয়বার আর প্রসঙ্গ আসবে না। ছোটবেলায় খুব বদমাশ ছিলাম। চা ভালো না হলে খেয়ে কাপ জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিতাম। মা বলত – কাপ কই ? আমি-এখানেই তো রাখলাম। এখন আর ওসব করিনা। তবে এখনও করি। চা খেয়ে শর্মিষ্ঠা দি’কে খালি কাপের ছবি পাঠাই।

909