কুলিক রোববার :প্রবন্ধ

বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জনজীবন (পর্ব ২)

পুরুষোত্তম সিংহ

        ( ২ )

            দুর্ভিক্ষ ও বস্ত্রসংকটের প্রেক্ষাপটে লেখা অন্যতম দুটি গল্প হল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দুঃশাসনীয়’ ও সুবোধ ঘোষের ‘তমসাবৃতা’। মানিকের গল্পে ছিল প্রতিবাদীভাবনা আর সুবোধ বাবুর গল্পে প্রাধান্য পেয়েছিল নবজীবনের আশা। দুটি গল্পের তুলনামূলক আলোচনায় সমালোচক অরুণকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন –

“মানিকের নিরুত্তাপ কাটা-কাটা ভঙ্গিতে রাবেয়ার প্রতিবাদ মর্মান্তিক হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে সুবোধ ঘোষের শান্ত সমাহিত ভঙ্গিতে জবার শ্রেণী –চরিত্র-উপলব্ধি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মানিকের গল্প শেষ হয়েছে রাবেয়ার জলে ডুবে আত্মহত্যার নিরাসক্ত বর্ণমায়। সুবোধ ঘোষের গল্প শেষ হয়েছে বিবসনা মৃত্তিকাবধূদের ক্ষেতের কাজ সেরে ফেরার আনন্দে। এই প্রত্যাবর্তনে আছে শ্রমের আনন্দ, কর্মের তৃপ্তি।“ (‘কালের পুত্তলিকা, চতুর্থ সংস্করণ ১৪১০, দে’জ, পৃ. ৩৪৯ )

অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘বস্ত্র’ গল্পটি প্রকাশিত হয় ১৩৫২ বঙ্গাব্দে। এটিও দুর্ভিক্ষ ও বস্ত্র সংকটের প্রেক্ষাপটে লেখা। নবজীবনের আশা খোঁজেন নি লেখক, মজুতদারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদেই তিনি নীরব হয়েছেন। মোবারক রাতে বাড়ি ফেরার সময় শুনছে বৃদ্ধ ছাদেম ফকিরের চিৎকার। অন্ধকারে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় ছাদেম ফকির হেঁটে যাচ্ছিল। পরের দিন মোবারক নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা করেছে ছাদেমের জন্য। কিন্তু ছাদেম সেই নতুন কাপড় দিয়ে ফাঁসি নিয়ে আত্মহত্যা করেছে –প্রতিবাদ জানিয়েছে মজুতদারদের বিরুদ্ধে। ছাদেম ইচ্ছা করলেই সেই কাপড় টুকরো টুকরো করে বাড়ির সবার লজ্জা নিবারণের উপযোগী করতে পারতো কিন্তু করে নি। মৃত্যুর দিনে ছাদেমের বাড়িতে এসে দেখা যায় কেউ নেই। আসলে বাড়ির রমণীরা ছিল সবাই নগ্ন-তাই কেউ দেখা দেয় নি। পরের দিন মোবারক সেই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় কান্না শুনতে পায় ছাদেম ফকিরের বাড়িতে। আজ তারা আত্মঘোষণা করেছে স্বজন হারানোর কান্নায়। সবার পরিধানে ঝুলন্ত লাসের নতুন কাপড়ের ছিন্ন টুকরো –

“তাদের পরনে, সন্দেহ কি, আমরাই দেয়া সেই লাল পড়ে ধুতির দুই ছিন্ন অংশ। ফালা দেবার আগে খুলে নিয়েছে ছাদেমের গলা থেকে, লাশখানায় চালান দেবার আগে। সেই কাপড়ে সসম্মান তিন অংশ বোধ হয় হতে পারত না। আর, আগেই শাশুড়িতে –বৌয়ে ভাগ করে নিলে ছাদেম ফকির মরত কি করে ?”(‘বস্ত্র’, ‘একশ এক গল্প’ তদেব, পৃ. ৫৩১)

বীভৎস রসের প্রাধান্য পেবেছে এ গল্পে। নবজীবনের ইঙ্গিত নয় প্রতিবাদেই ক্ষান্ত হয়েছেন লেখক। এই বীভৎস রসের সঙ্গে তারাশঙ্করের কোনো কোনো গল্পের মিল হয়ত পাঠক পেতে পারেন। ছোটোগল্প মানেই চমক, ছোটোগল্প মানেই প্রশ্ন ; ছোটোগল্প পাঠককে বিরাট জিজ্ঞাসার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। এ বিষয়ে অচিন্ত্যকুমার সার্থক শিল্পী। তাঁর প্রতিটি গল্পই একটি করে ম্যাজিক জার্ণি। সেই ম্যাজিক পরিস্ফূটিত হয় গল্পের শেষ কয়েক লাইনে। শেষ পরিচ্ছেদ পাঠককে স্তব্ধ করে দেয়, পাঠকের মননে আলোড়ন তোলে প্রশ্নের ঝড় – আর এই আলোড়ন তুলেই গল্প থেকে বিদায় নেন লেখক।

                শোষণ পাল্টায় না, পাল্টায় শোষণের ইতিহাস ও শোষিত মানুষের চেহারা। আবহমান কাল ধরে এক শ্রেণির মানুষ শোষিত হয়েই আসছে। সেই শ্রেণি হল অশিক্ষিত নিম্নবিত্ত প্রান্তিক মানুষ। সেই প্রান্তিক মানুষদেরই কথাকার হলেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত। জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কর্মসূত্রে তিনি গ্রামে থেকেছেন। গ্রাম্য জীবনের মানুষ ও তাঁদের জীবনপ্রণালী তিনি নিবিড় ভাবে উপলব্ধি করেছেন। সেই উপলব্ধির ফল হল প্রত্যক্ষ নির্ভর মুসলিম জীবনকেন্দ্রিক এই ছোটোগল্প গুলি। স্বার্থই মানুষের শুভবোধ গুলিকে নষ্ট করে, মানুষকে বিপথে চালিত করে। যেমন করেছে ‘বেদখল’ গল্পের বশিরদ্দিকে। ইমানদ্দি ও বশিরদ্দি দুই ভাই, দুজনেই এক বাড়িতে থাকলেও সমস্ত পৃথক। জমিদার আজ চলেছে খাজনা না দেওয়া জমির দখল নিতে। জমিদারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়েছে দুই ভাই সমস্ত বিভেদ ভুলে। নয়েররা জানে ইমানদ্দির শরীরের জোড় ও শক্তির কথা। তাই তাঁরা কৌশলে ছোটভাই বশিরদ্দির সঙ্গে গোপনে আঁতাত করে। গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলো আইনি জটিলতায় কীভাবে বিপদের সমুখ্খীন হত তা লেখক গভীর ভাবে তুলে ধরেছেন। ইমানদ্দি খাজনা দিয়েছে অথচ তাঁর নামে খাজনা জমা হয় নি। বঙ্কিম ও প্রমথ চৌধুরী জানিয়েছিলেন সমস্ত জমিদারই অত্যাচারী নয়। কিন্তু ভগীরথ মিশ্র তাঁর কথাসাহিত্যের ভুবনে প্রায় সমস্ত জমিদারকেই অত্যাচারী হিসেবে তুলে ধরেছেন। আসলে জমিদার সত্তার চেতনায় যেন অত্যাচারের বিষ মিশে আছে। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। শ্রমিক-কৃষকের রক্ত শোষণ না করলে বোধহয় জমিদার হিসেবে কেউ সম্মান দেয় না। এ গল্পে লেখক প্রশ্ন তুলেছেন ঘরে অর্থ না থাকলে খাজনা দেবে কোথা থেকে –

“ লোকে চুরি –ডাকাতি করে, মেয়ে ফুসলায়, তবিল তছরূপ করে, জেল হয়, জেল খেটে ফের তার বাড়ি ফিরে আসে। তার বাড়িঘর লোপাট হয়ে যায় না। আর এ লোকটা হয়ত খাজনা বাকি ফেলেছে। গাফিলি করেই হোক বা দুর্বৎসরের জন্যেই হোক খাজনা দিতে পারেনি। সে কি চুরি –ডাকাতির চেয়েও খারাপ ? তার তারই জন্যেই সে নির্বিবাদে বাড়ির বার হয়ে যাবে !” (‘বেদখল’ তদেব, পৃ. ৫৩৭ )

 ইমানদ্দি প্রথমে বাড়িতে নায়েবদের কাউকে ঢুকতে দেয় নি, জমি বসতভূমি রক্ষায় সে বদ্ধ পরিকর। কিন্তু শেষে দেখা যায় বশিরদ্দিই এই চক্রান্ত ঘটাতে সাহায্য করেছে। জমিদারকে এই জমির জন্য সে সেলামি দিয়েছে পাঁচশো টাকা। আজ সমস্ত জমির মালিক বশিরদ্দি আর পথের ভিখারিতে পরিণত হতে হয়েছে ইমানদ্দিকে। পারিবারিক জীবনের এই বিচ্ছেদই এ গল্পের কেন্দ্রীয় বিষয়। সেই বিষয়কে ফুটিয়ে তুলতে লেখককে কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছে। গ্রাম্য জীবন যেমন সহজ-সরল তেমনি নর্দমায় ভরা পঙ্কিল বদ্ধ। সেই পঙ্কিলরূপই ফুটে উঠেছে এ গল্পে। বিচ্ছেদই সত্য হয়ে উঠেছে গল্পের শেষে, বশিরদ্দির মনের ইচ্ছা আজ পূরণ হয়েছে আর ইমানদ্দি পথের ভিকারিতে পরিণত হয়েছে। জীবন বোধহয় এমনই ! সেই জীবনবোধের নানারূপ সন্ধানে অগ্রসর হন লেখকরা। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী বাংলা কথাসাহিত্যে সেই পৃথক জীবনবোধ সন্ধানে যারা অগ্রসর হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত – সে বিষয়ে বোধহয় দ্বি-মত নেই।

        ‘ডাকাত’ গল্পে মানবিক মহিমায় উত্তীর্ণ হয়েছে ডাকাত দলের সর্দার দর্জন আলি। নারী জাতির প্রতি সহানুভূতি আজ তাঁকে শ্রেষ্ঠ আসন দিয়েছে। সে ডাকাত দলের সর্দার তবে নিরীহ নারীর প্রতি তাঁর কোনো লোভ নেই তা ফুটে উঠেছে। গল্পটি বস্ত্র সংকটের প্রেক্ষাপটে লেখা। তসলিমা ও পবন গাজির দারিদ্র্যের সংসার। এক বস্ত্রের তসলিমা নদীতে স্নানে নেমে কাপড় গাছে শুকতে দেয়। কিন্তু প্রবল হওয়ায় কাপড় মাঝ নদীতে পরে যায়, তসলিমা ধরার চেষ্টা করেছিল কিন্তু বিবস্ত্র বলে লজ্জায় অন্য ঘাটের কাছে অর্ধমগ্ন অবস্থায় পড়েছিল। এদিকে দর্জন আলি ডাকাতি থেকে ফেরার পথে ঘাটে মৃতব্যক্তি দেখে কবর দেওয়ার কথা ভাবে। কিন্তু মুসলিম নিয়ম অনুসারে বিবস্ত্রকে কবর দেওয়া যায় না তাই দর্জন তাঁর দলের ছেলেদের কাপড় আনতে বলে। কিন্তু কাপড়ে তসলিমাকে শোয়ালেই সে নিজেকে কাপড় জড়িয়ে লজ্জা নিবারণ করে। তসলিমা ও পবন গাজির দারিদ্র্যের সংসার। পবন গাজি চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে, জেল হয়েছে। তসলিমার মনে হয়েছে পবন ডাকাত হলে আর কোনো অসুবিধা হবে না। ভাগ্যক্রমে সে আজ ডাকাতের হাতেই এসে পড়েছে, ভেবেছে দর্জন হয়ত বাড়ি নিয়ে গিয়ে তাঁকে ছোটো বিবি বানাবে –

“ তসলিমা বুঝতে পেরেছে সে সটান একেবারে ডাকাতের বাড়ি চলে এসেছে। ঐ তার টিনের ঘর, এই কোলা, নদীর ঘাট। এখুনি তাকে বাড়ির মধ্যে নিয়ে যাবে পাথালিকোলা করে। বরু বিবি আছে, মাজু বিবি আছে, সে হবে ছুটু বিবি। আল্লা আজ তাকে একেবারে সৌভাগ্যের ঘাটে এনে পৌঁছে দিয়েছেন।“ (‘ডাকাত’ তদেব, পৃ. ৫১১ )

কিন্তু দর্জনের মহানুভবতায় সে ইচ্ছা পূরণ হয় না। দর্জন ফিরিয়ে দিয়েছে তসলিমাকে নিজের বাড়িতে। অন্যদিকে পবন শহরে গিয়েছিল বীজধানের জন্য লোনের টাকা আনতে। তসলিমা বাড়িতে আসার পর ফিরে আসে পবন। স্ত্রীর মুখে সমস্ত ঘটনা শুনে ও নতুন কাপড় দেখে সে বিস্মিত হয়ে বলে –“তবু যাক পেয়েছিস তো নতুন কাপড়।‘ পবন গাজি নিশ্বাস ছাড়ল।“ – এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মধ্যেই ফুটে উঠেছে গল্পের মূল সত্য। জীবনযুদ্ধে মানুষকে কতভাবে বাঁচতে হয়, সেই বাঁচার আর্তি ফুটে উঠেছে এ গল্পে। বিধাতার বিরুদ্ধে আভিশাপ বা মজুতদারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নয় পবন গাজির আছে সহজ –সরল বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসেই সে আজ খুশি স্ত্রী কাপড় পেয়েছে বলে। এমনই সহজ-সরল মানুষের জীবনচেতনা ও ভালোবাসার গল্প লেখেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত। সেই সঙ্গে গল্পে স্থানিক রঙ ও উপভাষার ব্যবহার এক সার্বিক রসগ্রাহীতায় পৌঁছে দেন।

571