ঝড়ের প্রবাহমানতায় উচ্চারিত শ্রেণী সংগ্রামের বাণী

বিপুল মৈত্র

নজরুল যেভাবে বেড়ে উঠেছিলেন তাতে শ্রেণী সংগ্রামের কথা তাঁর লেখায় প্রতিভাত হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শোষক আর শোষিতকে পরস্পর বিরোধী এবং সংগ্রামরত দুই শ্রেণী হিসেবে কাব্যে উপস্থিত করানো অত্যন্ত দমের কাজ। নজরুল সেই দুর্বার সাহস দেখিয়েছেন- তাই লিখেছেন
” ওরে চাষা বাঁচার আশা গেছে অনেক আগে
গোরের কাছে কাঁদা আজো ভালো লাগে?
চোখ বুজে তুই দেখবিরে আর করবে চুরি চোর
বাঁশের লাঠি পাঁচনি তোর তাও কি হাতে নাই?”
তার সামনে রয়েছে সাঁওতাল- কৃষক বিদ্রোহ, উপজাতি চাষীদের আন্দোলনের দৃষ্টান্ত, তাঁর লেখনী লাঠি হাতে নিয়ে শোষকের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ কৃষক সংগ্রামের কথা তুলে ধরবে এটাই স্বাভাবিক।
জমিদার মহাজনের শোষণে যাদের সব শেষ হয়েছে তাদের আর ভয় কীসে? তাই তো তিনি বলতে পেরেছেন -” (আজ) জাগরে কৃষাণ! সবেতো গেছে
কিসের বা আর ভয়? /(এই) ক্ষুধার জোরেই করবো এবার সুধার জগৎ জয়।”
মানবতাবাদী চরিত্রের প্রকাশ আগেই প্রত্যক্ষ করা গেছে কবির মধ্যে, কিন্তু শ্রেণী সংগ্রামের চেতনায় কৃষকদের সংগ্রামে নামার আহ্বান নজরুলের পক্ষেই সম্ভব।
” লাঙল” পত্রিকায় যেমন শোষণের চিত্র প্রকাশিত হয়েছে তেমনি এই পত্রিকা শোষণের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই পত্রিকায় প্রকাশিত “সাম্যবাদী” কবিতাগুচ্ছতে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর সাম্যবাদী চিন্তা ধারা, বলেছেন” বর্তমান” সমাজ ব্যবস্থা কে পাল্টে দিয়ে নতুন এক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা। ” সেই সময়” ও এখন দুই সময়েই শোষক শোষণের জন্য ধর্মকে ব্যবহার করেছে। ঈশ্বর আর পাপের ভয় দেখিয়ে শোষক মানুষের সত্য উপলব্ধিতে ধোঁয়া সৃষ্টি করে রেখেছে।আর তাই তো তখন উচ্চারণের অভিলিপ্সা জাগে তাঁর ” ঈশ্বর” কবিতা–
” শিহরি উঠোনা, শাস্ত্রবিদেরে করো নাকো বীর ভয়
তাঁহারা খোদার খোদ প্রাইভেট সেক্রেটারি তো নয়
সকলের মাঝে প্রকাশ তাঁহার, সকলের মাঝে তিনি!”
জীবনের ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে,প্রথম মহাযুদ্ধে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে সোভিয়েত মধ্য এশিয়ার গৃহযুদ্ধের খবর ও সাম্যবাদের গৌরব- গাঁথা শুনে তাঁর উপলব্ধি হয়েছিল শ্রেণী সংগ্রামের চেতনা না থাকলে সত্যিকার মুক্তি অর্জন করা যায় না। তাই এই চেতনা থেকে এল” মানুষ” কবিতা- যেখানে তিনি অনায়াসেই বলতে পেরেছেন-
” গাহি সাম্যের গান-
মানুষ চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।”
আর মানুষ বলতে তো লিঙ্গভেদ বোঝায় না। নর-নারীর উভয়ের সমান অংশ গ্রহণ রয়েছে শোষণমুক্ত এক সুন্দর”আকাশ সম” সমাজ গঠনে। তাই” নারী” কবিতায় তিনি লিখেছেন-” সাম্যের গান গাই-
আমার চক্ষে পুরুষ রমনী কোনো ভেদাভেদ নাই।
বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী,অর্ধেক তার নর।”
” নারী” কবিতায় আরো শোনা যায়-
” কোনো কালে একা হয়নি কো জয়ী
পুরুষের তরবারী, প্রেরণা দিয়াছে শক্তি দিয়াছে বিজয় লক্ষ্মী নারী” ।
আন্তর্জাতিকতায় বিশ্বাসের কথা পূর্বেই ব্যক্ত হয়েছে।
তাই “দুনিয়ার শ্রমিক এক হও” এই রণধ্বনি তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব বোধের মধ্য দিয়েই নতুন এক মানব সভ্যতার বিজয় কেতন উড়বে। তাই তো তিনি লিখতে পেরেছেন-
“সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আমি
এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনো এক মিলনের বাঁশী।
মহা মানবের মহা বেদনার আজি মহা উত্থান,
ঊর্ধে হাসিছে ভগবান, নীচে কাপিতেছে শয়তান।”
এই বিশ্বাস ই নভেম্বর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব নজরুলকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিল, যে ভাবনার মধ্যে দিয়ে বের হয়ে এল-
” তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
ঐ নতুনের কেতন ওড়ে
কাল- বোশেখির ঝড়।”
নূতনের ধারায় ধাবিত হবে আর সমালোচনার ঝড় প্রত্যাঘাত হানবে না- তা তো হয় না ‌ তাই “শনিবারের চিঠি” নিয়মিত ভাবে তাঁর বিকৃত সমালোচনা করে গেছে। কিন্তু তাতে তাঁর লেখনী থেমে থাকে নি। জবাব দেবার চেষ্টা করেছেন” আমার কৈফিয়ৎ” এ এবং বক্তব্য শেষ করেছেন এই বলে-
” ক্ষুধাতুর ছেলে চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত একটু নুন।/ বেলা বয়ে যায় খায়নিকো বাছা,কচি পেটে তার জ্বলে আগুন। / কেঁদে ছুটে আসি পাগলের প্রায়।
স্বরাজের নেশা কোথা ছুটে যায়!
কেঁদে বলি ‘ ওগো ভগবান’ তুমি আজিও আজ কি?
কালি ও চুন/ কেন ওঠে নাক তাহাদের গলে, যারা খায় এই শিশুর খুন।”
এই কথা গুলি নজরুল বলতে পেরেছেন কেননা তিনি তাঁর জীবনের পরতে পরতে শোষক ও শোষিতের দ্বন্দ্ব দেখেছেন, তাই সহজেই এই দ্বন্দ্ব বোঝেন। অপর দিকে নভেম্বর বিপ্লবের সাফল্য মনে আশার সঞ্চার করেছে চিরদিন মানুষ মার খাবে না, বৈষম্য আর শোষনের অবসান ঘটবেই। আর এই বিশ্বাস থেকেই তো ” আমার কৈফিয়ৎ” । না, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরও এই বিশ্বাসে চিড় ধরে না। কিউবা,লাউস, ভিয়েতনাম – নতুন স্বপ্ন দেখায়। আর ” আমার কৈফিয়ৎ” তো শাশ্বত। তাই বর্তমানে সমাজের যেখানেই শোষক ও শোষিতের দ্বন্দ্ব রয়েছে, শোষিত প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পায় নজরুলের ” নারী,সাম্যবাদী, আমার কৈফিয়ৎ” এর মধ্যে দিয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের এক প্রান্তে এই স্পন্দন কি ধ্বনিত হচ্ছে?
আসলে যতদিন শোষণের বীজ থাকবে, সাহিত্যাকাশে নজরুল হাতিয়ার হিসাবে থাকবেন, ততদিন তো বটেই।

22